শিকলে বাঁধা ছোটবেলা
· Prothom Alo
২০১২ সালের এপ্রিল মাসে কিশোরদের জন্য নববর্ষ সংখ্যা প্রকাশ করেছিল প্রথম আলো। কিশোর আলোর পূর্বসূরী বলা চলে এই সংখ্যাটাকে। এটি ব্যাপক জনপ্রিয় হওয়ার পর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়, বের হবে কিশোর আলো। সেই সংখ্যায় লিখেছিলেন প্রখ্যাত সব লেখকেরা। আসছে ১ অক্টোবর কিশোর আলোর ১৩তম জন্মদিন। জন্মদিনের আনন্দ পাঠকের সঙ্গে ভাগাভাগি করতে নববর্ষ সংখ্যা থেকে ধারাবাহিকভাবে লেখা প্রকাশিত হবে শুধু কিশোর আলো অনলাইনে। কিআ পাঠকের জন্য থাকল আফজাল হোসেনের শৈশবের গল্প। লেখাটি পত্র-পত্রিকায় ও কিছু শৈশব বইয়ে প্রকাশিত হয়েছে।
দৈর্ঘ্য-প্রস্থে ছোটবেলাটা মোটেও ছোট নয়। কোথায় তার শুরু আর কোথায় শেষ, তা বলা মুশকিল। শৈশব-কৈশোরের শুরু বা শেষ আমরা খুঁজি, তেমন নয়। তবে পেছন ফিরে তাকালে হুড়মুড় করে অসংখ্য স্মৃতি দৌড়ঝাঁপে সামনে এসে দাঁড়ায়।
সময় পাগলা ঘোড়ার মতো তাড়িয়ে বেড়াচ্ছে। জীবন বাঁচাতে দৌড়ে মরতে হচ্ছে, কেজো লোকদের হাতে পেছন ফিরে তাকানোর সময় নেই। তবে ফুরসতে কখনো তাকাতে পারলে লোকসান হয় না। প্রাণে জেগে ওঠে অসাধারণ ভালো লাগার অনুভব।
Visit bettingx.bond for more information.
মায়া জাগে, দুঃখ হয় অত সুন্দর সময়গুলো স্মৃতি হয়ে গেছে। তবে সৃষ্টির শ্রেষ্ঠ মানুষের সান্ত্বনা, চাইলে যখন ইচ্ছা তখনই সেসব স্মৃতিতে ফেরত যেতে পারে। সুখের বিষয়, পরীক্ষার পড়ার মতো হুলুস্থুল না করেও স্মৃতিগুলো ঝরঝরে মুখস্থ থেকে যায় সারা জীবন। আমার পায়ে শিকল পরানো থাকত। মনে হতেই ডান পায়ে শিকলটা অনুভব করা যায়। জানা কথা, সত্যি সত্যি সে শিকল এখন নেই, তবু একবার দেখে নিতে ইচ্ছা হয়। দেখে নিশ্চিত হতে চাই, না, সেই শিকল এখন নেই। আমরা ছিলাম দুই ভাই। আমি বড়, বাবুল ছোট। বাবুলের আরও অনেক নাম ছিল, ভালো নাম আলফাজ হোসেন। ইকবাল বলে ডাকা হতো, ছোট সাহেব বলেও ডাকা হতো তাকে। বেশি আহ্লাদ করে মধুবাবুল বলেও ডাকতেন দু-চারজন। আমার সবেধন নীলমণি একটাই নাম। কোনো ডাকনাম ছিল না। কেন ছিল না, ছোটকালে সে হিসাব একদিনও মাথায় আসেনি। আমার তখন হাজার হাজার বিষয়ে মাথা ঘামানোর সময়। মনে গিজ গিজ করত নানা ধরনের ইচ্ছা। ঘুম থেকে উঠে দুনিয়া উপভোগের ব্যস্ততায় নেমে পড়তাম, ঘুমাতে যাওয়ার আগপর্যন্ত ফাঁক ছিল না এক দণ্ড। ছোটটার অনেক নাম, আমার মাত্র একটা কেন? এমন চিন্তা মাথায় ঢোকার ফাঁকফোকর পর্যন্ত পায়নি, মনের মধ্যে ঢুকে খোঁচানোর সুযোগও হয়নি।
আমার গায়ের রংটা দাদার মোটেও পছন্দ ছিল না। ছোট ভাইটা ফরসা, সুবোধ ধরনের, সর্বদা ফিটফাট যার তার সঙ্গে তার মেলামেশা ছিল না, পড়াশোনায় মনোযোগী। অতএব, বাবুল ছিল দাদার প্রিয় নাতি। আমি ছিলাম দাদির প্রিয়। স্কুলে যেতে না চাইলে দাদি গায়ে-মাথায় হাত বুলিয়ে খুব করে বোঝাতেন। দাদার হাতের মার খাওয়া থেকে বাঁচাতে, পটিয়ে স্কুলে পাঠাতে পকেটে বা হাতে পয়সা গুঁজে দিতেন। একজন সহপাঠী যেন আমাকে সঙ্গে করে স্কুলে নিয়ে যায়, সে জন্য দাদি তার হাতেও পয়সা গুঁজতেন প্রায়ই। শুধু গায়ের রঙের কারণে দাদার অপ্রিয় ছিলাম, তা নয়। দাদা, রব্বানী ডাক্তার ছিলেন সেকালে গ্রামের অত্যন্ত ডাকসাইটে মানুষ। মানুষ তাঁকে ভয় পেত, সমীহ করত। সত্যিকার অর্থে তাঁর ছায়া মাড়াত না কেউ। আমি সকাল-সন্ধ্যা নিত্য তাঁর মান-মর্যাদা মাড়িয়ে দিতাম। দাদার প্রিয় হওয়ার কোনো যোগ্যতাই আমার ছিল না। আমার কাপড়চোপড় ফিটফাট থাকত না, চুল আঁচড়াতাম না। হাঁটুতে ধুলা মাখা থাকত। হাঁটতাম না, লাফিয়ে চলতাম। স্কুলে যেতে চাইতাম না, পড়ায় বসতে চাইতাম না। পরীক্ষায় খারাপ ফল করতাম। এখন বুঝতে পারি, দাদার আভিজাত্য, বনেদিপনা অটুট রাখার মতো কিছুই ছিল না আমার মধ্যে। তিরিশ দিনে পঞ্চাশবার দাদার হাতে মার খেয়েছি। উপলক্ষের অভাব হতো না। ঘর থেকে চাল চুরি করে নিয়ে বেদে নৌকায় গেছি ম্যাজিক শিখতে। তার বদলে মার। চুরি করে সাইকেল নিয়ে বের হয়ে গেছি কিন্তু সে সাইকেল রাস্তায় চালাইনি। পথ ছেড়ে বেপথে চালাতে ইচ্ছা হয়েছে। মনে হয়েছে, রাস্তায় তো সবাই চালাতে পারে, ধানখেতে নেমে সরু আইল পথ ধরে চালাতে পারাই তো কৃতিত্ব! সেটাকে দাদা কৃতিত্ব বিবেচনা করেননি। সোজা হয়ে ভদ্রবালকের মতো হাঁটতাম না, সে এক অপরাধ। আমার বইয়ের মলাট দ্রুত ছিঁড়ে যেত, সে-ও অপরাধ। পুকুরে গোসলে গিয়ে সবার সঙ্গে সাঁতরাতাম, সেটা মহা-অপরাধ। বাছবিচার না করে সব মানুষের সঙ্গে মেলামেশা করাটা খুব অপছন্দ করতেন দাদা। উঁচু-নিচুর ভেদ খুব মাথায় থাকত তাঁর। একবার ফুটবল খেলতে গেছি, দূর থেকে চোখ সরু করে দেখেছেন কাদের সঙ্গে খেলছি। মাঠ থেকে লোক পাঠিয়ে ডেকে এনে দুই গাল চড়িয়ে। লাল করে দিয়েছিলেন, তুই ওই ছোটলোকের খেলাটা কেন খেলতে গেছিস?
দুপুরের ভাত খাবার সময়আফজাল হোসেনের ৭১ বছরে পদার্পণ উপলক্ষে চ্যানেল আই তাঁদের নিয়মিত আয়োজন তারকাকথনকে বিশেষ অনুষ্ঠানে পরিণত করে।আমি নিরুত্তর, কী অপরাধ সেটা বুঝতে পারি না। তাঁর হুংকারে উঠান, বাড়িঘর কেঁপে ওঠে-ওটা কোনো খেলা হলো, ছোটলোকেরা খেলার নামে গায়ে লাথি মারে! উত্তম বংশের নাতি অধম গোত্রের মানুষদের সঙ্গে ফুটবল খেলে দাদার মাথা নত করে দিয়েছি। সে নত মাথা সোজা করতে কাঠমিস্ত্রি ডাকা হলো। হুকুম জারি করে এক জোড়া ক্রিকেট ব্যাট আর স্ট্যাম্প বানানো হলো মিস্ত্রিকে দিয়ে। তারপর শুরু হলো আভিজাত্য আর বনেদিয়ানার চর্চা। উঠানে খেলার আয়োজন হলো। মহাসমারোহে দুই নাতির ক্রিকেট খেলা দেখতে এবং দেখাতে কাছের লোকজনকে দাওয়াত দিয়ে ডেকে এনে বসালেন দাদা। গড়গড়া সাজানো, দাদা জলচৌকিতে বসে গড়গড়া টানেন আর কোলের ওপর খাতায় দুই নাতির রান লেখেন। কল্কি পাল্টাতে খানিকক্ষণ খেলা বন্ধ থাকে। বাড়ির রাখাল তামাকের বাহারি কল্কি পাল্টায়, তারপর আবার নামে বোলিংয়ে। রাখালের সঙ্গে নাতিদের সে ক্রিকেটটা কখনো অসম হয়ে ওঠেনি। বোধ হয় দাদার মাথায় সে হিসাবটা মেলানো ছিল।
রাখালের সঙ্গে ক্রিকেট ছিল বাড়ির মধ্যে, আমজনতার চোখের আড়ালে। দাদা হয়তো ভেবেছিলেন রাখালের সঙ্গে তো আর খেলা হচ্ছে না. রাখালকে দিয়ে একটা কাজ করানো হচ্ছে। রাখালের ছুড়ে দেওয়া বলটাকে বনেদি নাতিরা যে বেধড়ক পিটিয়ে চলেছে, সেটাই ছিল বোধ হয় দাদার জন্য বড়
আনন্দের আর অতি আমোদের ঘটনা।
আমার আমোদ বা আহ্লাদ পড়তে বসলেই লোপাট হয়ে যেত। মারের ভয়ে আমার স্বভাবে কখনো সামান্য পরিবর্তন আসেনি। নিত্যই জোর করে পড়তে বসাতে হতো। সুযোগ পেলে বই ফেলে ভেগে যেতাম বলে সমাধান হিসেবে দাদা কোথেকে যেন কিনে আনলেন শিকল। প্রায় পাঁচ-ছয়টা শিকল জুড়ে (বোধহয় কুকুরের গলার) সেটাকে দৈর্ঘ্যে এঘর-ওঘর পর্যন্ত করা হলো। শিকলের এক প্রান্ত থাকত ডাক্তার দাদার চেম্বারে নিজের চেয়ারের হাতলে তালা দিয়ে আটকানো। অপর প্রান্ত পাশের ঘরে আমার পায়ে জড়ানো।
নিয়ম ছিল আমাকে শব্দ করে পড়তে হবে। শব্দ না হলে দাদার ধারণা, শিকল খুলে বেরিয়ে যেতে পারি। পায়ের শিকলের তালা খুলে পালানো কখনোই সম্ভব ছিল না। কিন্তু দাদা ভাবতেন, আমার পক্ষে সবই সম্ভব। রোগীদের পরীক্ষা, পরামর্শপত্র লেখার ফাঁকে যদি লক্ষ করতেন পাশের ঘর থেকে পড়ার শব্দ আসছে না, শিকল ধরে ঝাঁকি দিতেন। শিকলের ও মাথার ঝাঁকি এ ঘরে আমার পায়ে পৌঁছালে জোরেশোরে পড়া পড়ে বুঝিয়ে দিতাম, ভেগে যাইনি, আছি আমি। ছোটবেলার স্মৃতিটূতি মোটেও আসল রং হারায় না, চিরনতুন থাকে। সম্পর্কগুলোও থেকে যায়। সে রকম। হিসাব করে দেখেছি, বন্ধুত্ব দুবার হয়। একবার শৈশব-কৈশোরে, আর একবার যৌবনকালে। এ দুই সময়ের বন্ধুত্ব চিরকাল একই রকম থাকে। অন্য কোনো সময়ে এ দুই সময়ের সম্পর্কের পরিধি বাড়ে, তেমনটা লক্ষ করা যায় না। আমার বন্ধু সাম্রাজ্য গত ৪০ বছরে একটু বেড়েছে তার উদাহরণ নেই। একাত্তর থেকে আমি ঢাকা শহরে আছি। গ্রামের বন্ধুরা আছে গ্রামেই। দেখা হয় কম। নিয়মিত যোগাযোগ আছে, তা বলা যাবে না। বছরে বার দুয়েক গ্রামে যাই। গ্রামের বাড়িতে এখন কেউ থাকে না। তবু যাই বাড়ির টানে, নাড়ির টানে।
ডাইনোসর যেভাবে পৃথিবী জয় করেছিলফেসবুকে এ ছবিটি শেয়ার করেছেন আফজাল হোসেনপরিচিত মানুষগুলোকে দেখে ভালো লাগে। বাজারের মোডে, চায়ের দোকানে সাধারণের ভিড়ে বসে আড্ডা দিতে ভালো লাগে। এখা আলা এখন নেই। মা. ভাইবোন, পরিবারের সবাই থাকি শহরে। তবু সময়-সুযোগ হলে গ্রামে যাই। অবাক হয়, খশি হয় গ্রামের মানুষ। তারা ভাবে, শহরে আছি, ভালো আছি। তবু বাপ-এদার ভিটা ভলিনি, এটা খুব ভালো কথা।
সেলিমের দোকানে বসে আড্ডা নিচ্ছি জেনে রাস্তার ওপাশ থেকে মনোরঞ্জন দা স্পেশাল চা বানিয়ে পাঠিয়ে দেয়। মুক্তিযোদ্ধা সংসদ থেকে গোলাম বা জামসেদ ভাই ডেকে নিয়ে যায়, সেখানে ভাঙা হাতলের চেয়ারে বসে টোস্ট বিস্কুট চায়ে ভিজিয়ে খাই। এলাকার মুক্তিযুদ্ধের অহংকার, বীর শাহজাহান মাস্টারকে নিয়ে কিছু করা যায় কি না, সে আলোচনা চলে। নূর আমিন তার মাছের আড়ত থেকে বড় টেংরা, পার্শে, ভেটকি মাছ ও চিংড়ি পাঠিয়ে দেয় বাসায়।
পুরোনো বন্ধুরা একসঙ্গে হয়ে পুরোনো স্মৃতির জায়গাগুলোতে ঘুরতে যাই। কোথায় শিয়ালের গর্তে আগুন জ্বালিয়ে ধোঁয়া ঢুকিয়ে শিয়াল তাড়াতাম, কোথায় থাকত বকপাখিদের বাসা সব খুঁজে বেড়াই। স্কুল পালিয়ে চিৎ হয়ে শুয়ে কোন জঙ্গলে সময় কাটাতাম, দেখতে যাই। কাঁঠাল চুরি করেছি কোন বাগান থেকে, কোথা থেকে কবে, কীভাবে শজারু
ধরেছি-সেসব জায়গা খুঁজে বের করি। ক্যামেরা সঙ্গে থাকে, ঢাকায় ফিরে ছেলেদের দেখাব বলে ছবি তোলা হয়।
জায়গাগুলো বদলেছে। ঘন জঙ্গল, নীরব দিঘি, ধু ধু মাঠ বা এক শ বছরের বটগাছ কোনো কিছুর সন্ধান এখন মেলে না। আমাদের সবার এখানকার চেহারায় যেমন সেই ছোটবেলার চেহারা হারিয়ে গেছে সেই রকম। আছে নেই, আছে নেই। দুঃখ হয় না, আমরা ভাসি আনন্দে। একসঙ্গে হওয়ার আনন্দ।
গোলাম হোসেন আর গোলাম মোস্তফা এদের রোজ একসঙ্গে থাকা হয়। অদ্ভুত লাগে এ দুজনকে দেখে। রাজনীতি করে দুজন, নেতাগোছের। গোলাম আর মোস্তফা পরস্পরের কঠিন প্রতিপক্ষ, কিন্তু সিগারেটের বেলায় এ ওর কাছ থেকে নির্দ্বিধায় চেয়ে খায়। দেখেছি, চা বা ঠান্ডা পানীয় ঠান্ডা মাথায় নিত্য ভাগাভাগি করছে। আমি গ্রামে গেলে এ দুজনকে তাদের দল নিয়ে, রাজনীতি নিয়ে ইচ্ছামতো বকাঝকা করতে পারি। দুজন মিটিমিটি হেসে বকা শোনে, তারপর একসময় বলে, দূর, বাদ দ্যাও তো ওসব.... ছোটবেলায় একবার মাথায় ঢুকেছিল, আমরা যে বন্ধু, তা পুরো গ্রামকে জানাতে হবে। কীভাবে জানান দেওয়া যায়? মাথায় এল বুদ্ধি। সাত-আটজন ন্যাড়া হয়ে গেলাম।
বন্ধুত্ব এখনো সে রকমই আছে মনে হয়। সময় গড়িয়েছে অনেক। জিয়াদ, রফিকুল পাড়ি দিয়েছে অন্য পৃথিবীতে। শহীদুল এখনো ঘোরতর অসুস্থ, নূর আলী, আনসার, গোলাম হোসেন নানা-দাদা বনে গেছে অনেক দিন আগে। এখন তারা নাতি-নাতনির সঙ্গে আহ্লাদ করে সময় কাটাতে পছন্দ করে। সম্প্রতি একসঙ্গে হয়ে মনে হলো চুল-দাড়ি পেকেছে, চেহারা বদলেছে মানুষগুলোর, তবে ভেতর বদলায়নি কারও। নূর আলী দেখা হতেই বলে, 'বাড়ির গাছে কুল ভর্তি হইয়ে আছে। এই কুল এখন কোথাও পাবা না, দেশি কুল। এইসোকুন সবাই মিলে নুন দে মেখে খাবানি।' ময়রার দোকানে দই-মিষ্টির প্লেট এগিয়ে দিয়ে চিত্তরঞ্জন হাসে, 'মনে আছে, স্কুল থেকে আসপার পথে কুলগাছে ঢিল মেইরে একজনের মাথা ফাটাইয়ে দিছিলে?' সে গাছটা কোথায়, কেমন আছে জানতে একদিন সময় করে আমরা সেই কুলগাছটার সামনে গিয়ে দাঁড়াই। আমাদের কথাবার্তা শুনে যাওয়া থামিয়ে সাইকেল ঘুরিয়ে ফেরত আসে পাড়ার বয়সে ছোট বিভূতি। আফসোস করে বলে, এখন আগের মতো গাছে কুল নেই, ঢিল মারার মানুষও নেই।
এখনকার ছেলেপিলেরা আমাদের মতো মাঠেঘাটে, বনেবাদাড়ে ঘুরে বেড়াতি পছন্দ করে না। সেদিন বিকেলে আমরা নূর আলীর বাসায় গিয়ে পেট ভরে নুন মেখে কুল খাই। টক-মিষ্টির ভেতর মনে দীর্ঘশ্বাস মাখামাখি হতে থাকে। কত দিন এ রকম মুহূর্ত জীবনে আসে না।
বিকেল শেষে নূর আলী, আনসার, গোলাম মোস্তফা, গোলাম হোসেন একসঙ্গে দাঁড়িয়ে একটা ছবি তুলি। ছবিতে চিত্তরঞ্জন বা চিত্ত নেই, সেদিন অন্য কোনো গ্রামে জমি মাপের কাজে গেছে সে। সাদাকালো দাড়িতে হাত বোলাতে বোলাতে আনসার প্রস্তাব করে, শহীদুল অসুস্থ, তার বাসায় গিয়ে সবাই মিলে একটা ছবি তুললে ভালো হয়।
হাত ধোয়ার সঠিক নিয়মআফজাল হোসেন ও রুনা লায়লাঠিক হয়, কোন দিন চিত্তর জমি মাপামাপির কাজ থাকবে না, জানতে হবে। ইয়াসিন রাত-দিন মাস্টারি নিয়ে ব্যস্ত থাকে, তাকেও বলা হবে, থাকিস তুই। সদ্য তোলা ছবিটা দেখি, সবাই মিলে দেখি। সফেদ দাড়ির নূর আলী হাসে, 'ছবিটা ঢাকায় গে তোমার ছেলেদের দেখাবা, ছেলেরা আকাশ থেকে পড়বে, ভাববে এইসব বুড়োধুড়ো লোকেরা তোমার বন্ধু হয়।' ঢাকায় ফিরে আরাফ আর ঈমানকে দেখাই সে ছবি। গ্রামের বন্ধুদের ছবি, ছোটবেলার বন্ধুদের ছবি।
দেখে ছোট ছেলে ঈমান হা হা করে হাসে। বড় ছেলে আরাফের অদ্ভুত প্রতিক্রিয়া পাই, 'বাবা, তোমাকে খুব হ্যাপি দেখাচ্ছে।' কথাটা শুনে কথা হারিয়ে ফেলি। চোখে জল আসবে মনে হয়। বলেছি, ছোটবেলাটা দৈর্ঘ্যে-প্রন্থে মোটেও ছোট নয়। সূর্যের মতো ঝলমলে তার উদয়, তা অন্তহীন। আমার জন্য দাদার সেই বিশেষ শিকলের গল্পের মতো। এক প্রান্ত থাকে কাছে। ছোটবেলার কোনো শব্দ অনেক দিন না পেয়ে শিকল ধরে ঝাঁকি দিলে অন্য প্রান্ত থেকে সাড়া মিলবে, ভেগে যাইনি, আছি আমি।
যুক্তরাষ্ট্রে বিরল দুই মাথার কচ্ছপের খোঁজ মিলেছে