হাসনাহেনা কেন সূর্য ডুবলেই জেগে ওঠে

· Prothom Alo

সন্ধ্যা নামলেই একটা গন্ধ চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে। মিষ্টি, ভারী, একটু ঘোরলাগা। তুমি বারান্দায় বসে হঠাৎ টের পাও, হাসনাহেনা ফুটেছে। অথচ দুপুরবেলা এই গাছের দিকে তাকালে কিছুই বোঝা যায় না। ফুলগুলো তখন গুটিয়ে থাকে চুপচাপ। যেন কিছুই বোঝে না। সূর্য ডুবতেই এক জাদু ঘটে যায়। ফুল ফোটে, গন্ধ ছড়ায়, আবহটাই বদলে যায়।

প্রশ্ন জাগা স্বাভাবিক। হাসনাহেনা কেন রাত বেছে নিল? দিনে ফুটলে এমন কী ক্ষতি হতো?

Visit tr-sport.click for more information.

দিনের ভিড় থেকে দূরে

দিনের বেলা প্রজাপতি আর মৌমাছি ফুলে ফুলে ঘোরে। ওরা রং দেখে টান অনুভব করে, চোখেই রং সহজে ধরা পড়ে। কিন্তু রাত নামলে দুনিয়া অন্ধকার হয়ে যায়। তখন রঙের আর কোনো দাম থাকে না। প্রজাপতি ঘুমিয়ে পড়ে, মৌমাছি বাসায় ফেরে। এ সময়টায় জেগে ওঠে অন্য একদল প্রাণী, রাতজাগা মথ। বিশেষত একধরনের বড় মথ আছে, যাকে বলে হক মথ বা স্ফিংক্স মথ। এরা অন্ধকারেও উড়তে পারে। লম্বা শুঁড় দিয়ে ফুলের গভীর থেকে মধু টেনে নেয় এরা।

কিন্তু অন্ধকারে ওরা ফুল খুঁজে পাবে কীভাবে? চোখ দিয়ে তো তখন রং দেখা যায় না। তাই হাসনাহেনা অন্য পথ ধরেছে। রঙের বদলে গন্ধ বেছে নিয়েছে সে। তীব্র, দূর পর্যন্ত ভেসে যাওয়া এক সুবাস। এই গন্ধ বাতাসে মিশে অনেক দূরে পৌঁছে যায়। মথ সেই গন্ধ শুঁকে শুঁকে ফুলের কাছে চলে আসে। এভাবেই ফুলের পরাগ এক গাছ থেকে আরেক গাছে পৌঁছায়। একেই বলে পরাগায়ন, অর্থাৎ একটা ফুলের পরাগ আরেকটা ফুলে পৌঁছে দেওয়ার প্রক্রিয়া।

দিনের প্রতিযোগিতাটাও এভাবে এড়িয়ে যায় গাছটা। দিনে ফুটলে গোলাপ, জবা, নয়নতারার মতো হাজারো রঙিন ফুলের সঙ্গে তাকে পাল্লা দিতে হতো। প্রজাপতি বা মৌমাছির নজর কাড়াও তখন বেশ কঠিন হতো। রাতে সেই ভিড়টা প্রায় থাকেই না। রাতজাগা মথরা তখন হাসনাহেনার একরকম একচেটিয়া অতিথি হয়ে ওঠে।

গাছপালা কীভাবে জানে, কখন ফুল ফোটাতে হবে

বাতাসেই লুকিয়ে আছে উত্তর

গন্ধ তৈরি করা গাছের জন্য মোটেও সহজ কাজ না। অনেক শক্তি এতে লাগে, অনেক রাসায়নিক যৌগও বানাতে হয়। দুপুরের রোদে বাতাস শুকনা থাকে, তাপও থাকে প্রবল। এ অবস্থায় সুগন্ধি যৌগ খুব তাড়াতাড়ি বাষ্প হয়ে উড়ে যায়। গন্ধ তাই বেশিক্ষণ টেকে না, দূরেও পৌঁছায় না।

রাতের বাতাস সম্পূর্ণ অন্য রকম। তাপমাত্রা নেমে আসে, বাতাসে জলীয়বাষ্প বাড়ে, বাতাসের গতিও কমে আসে। এই ঠান্ডা আর স্থির পরিবেশে সুগন্ধি অণু ধীরে ছড়ায়, বাতাসে অনেকক্ষণ ভেসে থাকে। একই পরিমাণ গন্ধ তাই রাতে অনেক বেশি কাজে লাগে।

হাসনাহেনা ফুলের মাঝে কালো পিপীলিকা

গাছের ভেতরে একটা ঘড়ি আছে

এবার আসল প্রশ্নে আসা যাক। সূর্য ডুবেছে, গাছ এটা বুঝল কীভাবে? গাছের তো চোখ নেই, হাতঘড়িও নেই। তবু তার ভেতরে একটা জৈবিক ঘড়ি সব সময় সচল থাকে। বিজ্ঞানীরা একে বলেন সার্কেডিয়ান রিদম, অর্থাৎ প্রায় ২৪ ঘণ্টার একটা স্বাভাবিক চক্র। মানুষের শরীরেও এমন একটা ঘড়ি চলে, যার জন্য রাত হলে ঘুম পায়, সকাল হলে ঘুম ভেঙে যায়। গাছের ঘড়িটা অনেকটা সে রকমই, শুধু কাজের ধরনটা আলাদা।

পাতায় বিশেষ কিছু প্রোটিন থাকে, যাদের নাম ফাইটোক্রোম। আলোর পরিমাণ আর রঙের বদল এরা টের পায়। দিনের আলো কমে এলে, লাল আলোর অনুপাত বদলে গেলে, এই প্রোটিন গাছের ভেতরে একটা সংকেত পাঠায়। সেই সংকেত ফুলের কুঁড়িতে পৌঁছায়। কোষগুলো তখন পানি টানতে শুরু করে, ফুলে ওঠে, পাপড়ি আস্তে আস্তে খুলতে থাকে। সঙ্গে সঙ্গে সুগন্ধি বানানোর রাসায়নিক প্রক্রিয়াও চালু হয়ে যায়।

একটা মজার তথ্য দিই এখানে। হাসনাহেনাকে যদি কয়েক দিন টানা অন্ধকার ঘরে রেখে দাও, তবু সে ঠিক সন্ধ্যার সময়েই ফোটার চেষ্টা করবে। কারণ, তার ভেতরের ঘড়িটা তত দিনে অভ্যাসে বাঁধা পড়ে গেছে। আলো আর অভ্যাস, দুটো মিলিয়েই চলে এই ঘড়ি।

টিউলিপ ম্যানিয়া কী, ফুল কিনে কেউ দেউলিয়া হতে পারে?

রোদ থেকে বাঁচার কৌশলও বটে

ফুলের পাপড়ি খুব পাতলা, খুব নরম। দুপুরের কড়া রোদ আর তাপ এই পাপড়ির জন্য সয়ে ওঠা কঠিন। রোদে পাপড়ির পানি দ্রুত শুকিয়ে যায়, ফুল তাড়াতাড়ি নেতিয়ে পড়ে। রাতের ঠান্ডা আর ভেজা বাতাসে ফুল অনেকক্ষণ তাজা থাকে। রাতে ফোটাটা তাই গাছের জন্যও একধরনের আশ্রয় হয়ে দাঁড়ায়।

বৃষ্টিস্নাত হাসনাহেনা ফুলের গায়ে পানি, দেখে মনে হচ্ছে মুক্তা ঝরছে। ছবিটি রোববার সকালে বগুড়ার কাহালু উপজেলার সিংড়াপাড়া গ্রাম থেকে তোলা। ছবি: সোয়েল রানা

সব মিলিয়ে যা দাঁড়ায়

এসব কারণ একসঙ্গে রাখলে বোঝা যায়, হাসনাহেনার এই অভ্যাস হুট করে তৈরি হয়নি। এর পেছনে আছে লাখো বছরের বিবর্তন। যেসব গাছ রাতে ফুটত, রাতজাগা মথের সাহায্যে তারা ভালোভাবে বংশ বাড়াতে পারত। যেসব গাছ দিনে ফুটত, প্রতিযোগিতায় তারা ধীরে ধীরে পিছিয়ে পড়ত। এভাবে প্রকৃতি বেছে বেছে রাতে ফোটা গাছগুলোকেই টিকিয়ে রাখল। আজকের হাসনাহেনা তারই ফল, লাখো বছরের এক ধীর পরীক্ষার ফসল।

তুমি যখন রাতে হাসনাহেনার গন্ধ পাও, মনে রেখো এটা শুধু সৌন্দর্যের গল্প নয়। এটা একটা কৌশল, লাখো বছর ধরে পরখ করে করে তৈরি হওয়া কৌশল। গাছটা আসলে তোমার জন্য গন্ধ ছড়ায় না, ছড়ায় রাতজাগা মথের জন্য। তুমি শুধু পাশের বাসিন্দা হয়ে সেই গন্ধটা পেয়ে যাও।

প্রকৃতিতে এমন ছোট ছোট রহস্য অনেক ছড়িয়ে আছে। একটু মন দিয়ে তাকালেই বোঝা যায়, প্রতিটা গাছ, প্রতিটা ফুল নিজের মতো করে বেঁচে থাকার একটা রাস্তা খুঁজে নিয়েছে। হাসনাহেনার রাত জাগাও তেমনই একটা গল্প। রূপকথা নয়, বিজ্ঞানের গল্প। যে গল্পের প্রতিটা লাইন প্রকৃতি নিজেই লিখেছে।

তথ্যসূত্র: নেচার ম্যাগাজিনপৃথিবীর সবচেয়ে বড় ফুল র‍্যাফ্লেসিয়া আর্নেল্ডিকে কেন মৃতদেহের ফুল বলা হয়

Read full story at source