লিটল ম্যাগাজিনের দিগ্দিগন্ত
· Prothom Alo

সাহিত্যের ইতিহাসে লিটল ম্যাগাজিনের ভূমিকা অনেকটা মাছের হ্যাচারির; মীনরেণুর মতো উঠতি লেখকের আঁতুড়ঘর। স্বাপ্নিক তরুণের হাত–মকশোর পাটাতন, প্রতিভাবানের নান্দনিক নিরীক্ষার প্ল্যাটফর্ম। লিটল ম্যাগাজিন বা লিটলম্যাগ সে অর্থে সাহিত্যের ঝরনা। প্রসারিত নদীর মতো বিপুল নয় তার প্রবাহ। কিন্তু ক্ষীণ ধারায় সে জাগ দেয় নতুনত্ব। পার্বত্য ছড়ার মতো সঞ্চার করে নতুন ভাবনার প্রাণরস। সত্যি বলতে, লিটলম্যাগ ছাড়া নতুন প্রজন্মের লেখকবৃত্তি হয়ে ওঠে দুরূহ। স্বকীয় কণ্ঠস্বর ও লেখনশৈলীর আবিষ্কার হয় অসম্ভব। উদ্ভাবনী কৌশল হয় স্থবির। বিশ্বের সব সাহিত্যের ইতিহাস তার সাক্ষী।
আধুনিক লিটলম্যাগের জন্ম ইউরোপে। আঠারো শতকের শেষ থেকে উনিশ শতক কালপর্বে, বহু বিচিত্র লেখার সম্ভার নিয়ে যেসব ‘মিসসেলানি’–জাতীয় পত্রিকা প্রকাশিত হতো, সেসবের গর্ভে। সংবাদ ও স্ক্যান্ডালের পাশাপাশি গল্প-কবিতাও প্রকাশিত হতো এতে। পাশাপাশি আবির্ভাব ঘটে বিশুদ্ধ সাহিত্য সাময়িকীর। ছাপাখানা প্রতিষ্ঠা, গণশিক্ষার বিস্তার ও নাগরিক সমাজের উত্থান লিটলম্যাগের উত্থান ত্বরান্বিত করে। অন্য কারণও ছিল। মূলধারার পত্রিকায় প্রাধান্য পায় গণরুচি ও বাজারের দাবি। কাটতির কারণে জনপ্রিয় রচনা প্রকাশে গুরুত্ব দেওয়া হয়। সিরিয়াস সাহিত্যের অবকাশ ওখানে ছিল কম। ফাঁকটুকু পূরণে এগিয়ে আসে ম্যাগাজিন।
Visit mchezo.co.za for more information.
লিটল ম্যাগাজিন ‘মীজানুর রহমানের ত্রৈমাসিক পত্রিকা’র একটি সংখ্যার প্রচ্ছদকালক্রমে জন্ম নেয় বিশুদ্ধ সাহিত্যপত্রিকা। আধুনিক লিটলম্যাগের জন্মদাত্রী। সাংস্কৃতিক বিবর্তনে সময়ের দাবি মেটাতেই লিটলম্যাগের জন্ম। প্রক্রিয়াটির কার্যকারণ অনুধাবন জরুরি। সাহিত্যপত্রিকা মাত্রই খোঁজে সামাজিক স্বীকৃতি, পাঠকের আনুগত্য ও আর্থিক ভিত্তি। প্রাতিষ্ঠানিকতার শক্ত ভিত অর্জিত হয় এ তিনের সম্মিলনে। এ তিনের ভারসাম্য নষ্ট হলে হারিয়ে যায় প্রকাশনা।
ম্যাগাজিনগুলো ছিল মূলত প্রবন্ধ–নিবন্ধ ধাঁচের লেখা প্রকাশের বাহন। পাশাপাশি ছিল রাজনৈতিক মতাদর্শ প্রচারের মুখপত্র। রাজনীতির পরোক্ষ অনুষঙ্গ হিসেবে প্রকাশ করে নতুন ধারার সাহিত্য। লালন করে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের প্রতিভাবান লেখক। প্রকাশক উইলিয়াম ব্ল্যাকউডের কথাই ধরি। তিনি ১৮১৭ সালে প্রতিষ্ঠা করেন তাঁর ব্ল্যাকউড’স ম্যাগাজিন। দৃষ্টিভঙ্গিতে ভীষণ রক্ষণশীল ছিল প্রকাশনাটি। কিন্তু এই ম্যাগাজিনে প্রকাশিত হয়েছে শেলি ও ওয়ার্ডসওয়ার্থের র্যাডিক্যাল ভাবনার কবিতা, প্রথম যুগের নারীবাদী ভাবনার মার্কিন লেখক জন নিলের প্রবন্ধ। পাশাপাশি প্রকাশিত হয়েছে জোসেফ কনরাডের আইকোনোক্ল্যাস্টিক উপন্যাসিকা ও বড় গল্প। তাঁর বিখ্যাত উপন্যাস হার্ট অব ডার্কনেস প্রথমে ব্ল্যাকউড’স ম্যাগাজিনেই ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত হয়। আরও প্রকাশিত হয় একঝাঁক প্রতিভাবান লেখকের রচনা, যাঁরা ইংরেজি সাহিত্যের বাঁক বদল করেছিলেন।
কালক্রমে জন্ম নেয় বিশুদ্ধ সাহিত্যপত্রিকা। আধুনিক লিটলম্যাগের জন্মদাত্রী। সাংস্কৃতিক বিবর্তনে সময়ের দাবি মেটাতেই লিটলম্যাগের জন্ম। প্রক্রিয়াটির কার্যকারণ অনুধাবন জরুরি। সাহিত্যপত্রিকা মাত্রই খোঁজে সামাজিক স্বীকৃতি, পাঠকের আনুগত্য ও আর্থিক ভিত্তি। প্রাতিষ্ঠানিকতার শক্ত ভিত অর্জিত হয় এ তিনের সম্মিলনে। এ তিনের ভারসাম্য নষ্ট হলে হারিয়ে যায় প্রকাশনা। ভারসাম্য রক্ষার চাপ আবার আরোপ করে অলিখিত সীমা, প্রাতিষ্ঠানিকতার গণ্ডি। লক্ষ্মণরেখার অতিক্রমণ তখন বিপদ। ফলে তৈরি হয় অনুচ্চারিত নীতিমালা ও রক্ষণশীলতার ছক। পাঠক ও পৃষ্ঠপোষকের প্রতি দায়বদ্ধতা থেকেই এই আনুগত্য। ঝোঁক বাড়ে সমধর্মী ও সমরুচির রচনা প্রকাশে। মান ধরে রাখার স্বার্থে প্রাধান্য পায় প্রতিষ্ঠিত লেখক। সাময়িকীর প্রাতিষ্ঠানিকতা অর্জনের এ এক অদ্ভুত কূটাভাস। নতুনত্ব ধারণ করে প্রতিষ্ঠা পাওয়া মাত্রই দেখা দেয় জাড্য। পত্রিকা রূপান্তরিত হয় রক্ষণশীলতার দুর্গে। প্রতিবন্ধক হয়ে ওঠে নতুন স্বর ও দেখার চোখের। অবধারিত হয়ে ওঠে নবীন ও প্রবীণের দ্বন্দ্ব। প্রতিক্রিয়ায় জন্ম নেয় নতুন আরেক পত্রিকা। অপেক্ষাকৃত তরুণ ও বিক্ষুব্ধ লেখকগোষ্ঠীর নতুন ছায়াতল। কালক্রমে পুনরাবৃত্তি ঘটে একই চক্রের।
লিটল ম্যাগাজিন ‘গাণ্ডীব’-এর একটি সংখ্যার প্রচ্ছদবিশেষ করে বলতে হয় মীজানুর রহমানের ত্রৈমাসিক পত্রিকার কথা। নামের মতো লেখার গুণমানেও অভিনবত্ব ছিল পত্রিকাটির। সম্পূর্ণ একক প্রচেষ্টায় লিটলম্যাগের গোল্ড স্ট্যান্ডার্ড তৈরি করেন সম্পাদক মীজানুর রহমান। এ পত্রিকার সারবান বিশেষ সংখ্যাগুলো এখনো চুম্বকের মতো আকর্ষণ করে পাঠক ও সংগ্রাহকদের। পাঠক এখনো খোঁজে এ পত্রিকার বৃক্ষ সংখ্যা, পক্ষী সংখ্যা, নদী সংখ্যা ও গণিত সংখ্যা। সংখ্যাগুলোর পুনর্মুদ্রণ লিটলম্যাগের ইতিহাসে অভাবনীয় ঘটনা।
লিটলম্যাগ সে অর্থে হৃদয়ের ক্ষরণের চিহ্ন, নবীনের আকুতি ও আত্মপ্রকাশের হাতিয়ার, সাহিত্যিক প্রতিষ্ঠা প্রাপ্তির বাহন। লিটলম্যাগ সে কারণেই স্বভাবত প্রতিষ্ঠানবিরোধী। আর্থিক ও নান্দনিক—উভয় অর্থেই এই বিরোধিতা। লিটলম্যাগের অন্তর্দ্বন্দ্বটা এখানেই। আয়তনে সে ছোট, প্রকাশনায় সৌকর্য্য বঞ্চিত, আর্থিক টানাপোড়েনে ন্যুব্জ। আরাধ্য তার প্রতিষ্ঠা পাওয়া। ওদিকে প্রতিষ্ঠাই তার বিনাশের কারণ। প্রতিষ্ঠাই বপন করে বিলয়ের বীজ। ঝরে পড়া লিটলম্যাগ সে অর্থে সফল। সফল লিটলম্যাগ মাত্রই প্রতিষ্ঠান হয়ে ওঠা, স্পিরিটে অ্যান্টিলিটলম্যাগ বনা। সহজ কথায়, লিটলম্যাগ মাত্রই কালের বিচারে ক্ষণস্থায়ী। স্থায়িত্বপ্রাপ্ত ও সফল লিটলম্যাগ রূপান্তরিত হয় বনেদি সাহিত্যপত্রিকায়।
সফল লিটলম্যাগের উদাহরণ প্রচুর। ব্রিটেনের দ্য ক্রিটেরিয়ান, গ্রান্টা, লিটারেরি রিভিউ ও মিস লেক্সিয়া সফল লিটলম্যাগ। মার্কিন ঐতিহ্যের পোয়েট্রি, প্যারিস রিভিউ, কেনিয়ন রিভিউ ও প্লাউশেয়ারও তা–ই। প্রথাগত অর্থে এগুলো আর লিটলম্যাগ নয়, জন্মকালে যদিও লিটলম্যাগ হিসেবে গণ্য হতো। কিছু অবশ্য জন্মলগ্ন থেকে ছিল প্রতিষ্ঠিত ব্যক্তিত্বের নেতৃত্বে। কিছু পেয়েছে প্রাতিষ্ঠানিক পৃষ্ঠপোষকতা। বাকিগুলো গড়ে উঠেছে উঠতি তরুণদের হাতে।
বঙ্গদর্শন পত্রিকার হাত ধরে বাংলা সাময়িকীর জন্ম। অর্ধশতাব্দীর মধ্যে বাংলায়ও দেখা দেয় লিটলম্যাগ। বিশ শতক বাংলা লিটলম্যাগের স্বর্ণযুগ। সবই অবশ্য বিশুদ্ধ সৃষ্টিশীল প্রকাশনা ছিল না। সব কটিই অতি তরুণের হাতে প্রতিষ্ঠিত হয়নি। রাজনৈতিক মতাদর্শও ক্রিয়াশীল ছিল কোনো কোনো প্রকাশনার পেছনে। পরিচয় সাময়িকী ঘিরে জড়ো হয়েছিল বামপন্থী রাজনৈতিক ধারার সারস্বত সমাজ। ধূর্জটিপ্রসাদ মুখার্জি ও সুধীন দত্তর আনুকূল্য পেয়েছিল প্রকাশনাটি। দেশ, জাতি ও সমাজভাবনার পাশাপাশি বিজ্ঞান ও দর্শনের তত্ত্বালোচনা প্রাধান্য পায় পরিচয়ে। হুমায়ুন কবির সম্পাদিত চতুরঙ্গ পত্রিকা কিংবা শিবনারায়ণ রায়ের জিজ্ঞাসাও তা–ই। তুলনায় পূর্বপ্রজন্মের সবুজপত্র–এর লক্ষ্য ছিল ভাষা ও সাহিত্যভাবনা। প্রমথ চৌধুরীর পৌরোহিত্য আর রবি ঠাকুরের আনুকূল্যে সবুজপত্র এনেছিল নতুন ভাব ও ভাবনা। লিটলম্যাগের প্রাণপুরুষ অবশ্য সদ্য গোঁফদাড়ি জন্মানো তরুণ। সবুজপত্র ও পরিচয়–এ তার সমাবেশ ঘটেনি।
সে সমাবেশ ঘটে কল্লোল এবং কালি ও কলম পত্রিকায়। মার্কিন পোয়েট্রির আদলে বুদ্ধদেব বসু গড়ে তোলেন কবিতাপত্র। আধুনিক বাংলা কবিতার আঁতুড়ঘর ছিল পত্রিকাটি। জীবনানন্দ দাশ থেকে শুরু করে নরেশ গুহ পর্যন্ত হাত পাকিয়েছেন কবিতাপত্র–এ। আরও পরে গদ্যচর্চায় শক্ত ঐতিহ্য স্থাপন করে কৃত্তিবাস। পূর্ব বাংলায়, আরও নির্দিষ্ট করে বললে, বাঙালি মুসলমানের হাতে প্রকাশনার শুরু সেদিন। তিরিশের দশকে ঢাকা থেকে প্রকাশিত শিখা প্রথম সফল লিটলম্যাগ। সমাজভাবনা ও বৌদ্ধিক তত্ত্বালোচনা ছিল শিখার লক্ষ্য। পঞ্চাশের দশকে অগত্যা প্রকাশিত হয়; পত্রিকাটি ছিল ক্ষণস্থায়ী, সমাজে প্রভাব বিস্তারে সক্ষম হয়নি। সরকারি পৃষ্ঠপোষকতায় প্রকাশ পায় মাহে নও। প্রায় কাছাকাছি সময়ে বাজারে আসে সমকাল। সিকান্দার আবু জাফর সম্পাদিত সমকাল ছিল প্রগতিশীল ও বামপন্থী চিন্তার প্রতি সহানুভূতিশীল একটি সাহিত্যপত্র। পূর্ব বাংলাকেন্দ্রিক বাঙালি জাতীয়তাবাদী চেতনা বিকাশের বাহন। মাহে নও ও সমকাল উভয়ে সাংস্কৃতিক লড়াইয়ে প্রাধান্য দিয়েছিল। উচ্চকণ্ঠ ছিল প্রকাশিত রচনার স্বর। নান্দনিকতা অপেক্ষা সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ঔচিত্যবোধের প্রকাশ ছিল দুই পত্রিকার লক্ষ্য।
সে তুলনায় ষাটের দশকের কণ্ঠস্বর ছিল নিমগ্ন, সমকালীন ইউরোপীয় সাহিত্যিক ভাবাদর্শে জারিত। কণ্ঠস্বর–এর পাতায় উঠে আসে পরাবাস্তববাদী কবিতা। ‘মাতৃহননের নান্দীপাঠ’-এর মতো নিরীক্ষাপ্রবণ গল্প। সত্তর-আশির দশকে বান ডাকে বাংলাদেশের লিটলম্যাগে। সারবান হয়ে ওঠে জাতিগত অস্মিতা। পঞ্চাশের প্রজন্মের মতো আর মুখাপেক্ষী থাকতে হয়নি পূর্ব বাংলার লেখককে। পাঠাতে হতো না লেখা কবিতাপত্র–এ। এখানেই তখন অজস্র পত্রিকা। অপেক্ষাকৃত প্রতিষ্ঠিত ব্যক্তির সম্পাদনায় প্রকাশিত হচ্ছে থিয়েটার, শিল্পতরু, রূপম, সুন্দরম প্রভৃতি। বিশেষ করে বলতে হয় মীজানুর রহমানের ত্রৈমাসিক পত্রিকার কথা। নামের মতো লেখার গুণমানেও অভিনবত্ব ছিল পত্রিকাটির। সম্পূর্ণ একক প্রচেষ্টায় লিটলম্যাগের গোল্ড স্ট্যান্ডার্ড তৈরি করেন সম্পাদক মীজানুর রহমান। এ পত্রিকার সারবান বিশেষ সংখ্যাগুলো এখনো চুম্বকের মতো আকর্ষণ করে পাঠক ও সংগ্রাহকদের। পাঠক এখনো খোঁজে এ পত্রিকার বৃক্ষ সংখ্যা, পক্ষী সংখ্যা, নদী সংখ্যা ও গণিত সংখ্যা। সংখ্যাগুলোর পুনর্মুদ্রণ লিটলম্যাগের ইতিহাসে অভাবনীয় ঘটনা।
লিটল ম্যাগাজিন ‘প্রান্ত’-এর একটি সংখ্যার প্রচ্ছদসুখের কথা, শূন্য দশক ও তৎপরবর্তীকালেও নিস্তব্ধ হয়নি সে গৌরবগাথা। দিগন্ত আরও প্রসারিত হয়েছে বাংলাদেশের লিটলম্যাগের। সৃষ্টিশীল সাহিত্যের পাশাপাশি দেখা দিয়েছে বিষয়ভিত্তিক প্রকাশনা। সমাজবিজ্ঞান–সম্পর্কিত প্রকাশনা বেড়েছে উল্লেখযোগ্য হারে। বাংলা ভাষায় একাডেমিক জার্নালের অভাব পূরণ করছে কিছুটা বিষয়ভিত্তিক পত্রিকাগুলো।
তুর্কি তরুণদের হাত ধরে এ সময়ে উঠে আসে আরও অসংখ্য লিটলম্যাগ। আশি ও নব্বইয়ের দশকেও বজায় ছিল সে ধারাবাহিকতা। গাণ্ডীব, প্রান্ত, নদী, নৃ, মন্ত্র, নিরন্তর, ফ্রি স্কুল স্ট্রিট, নিসর্গ, দ্রষ্টব্য, লিরিক, চালচিত্র, প্রতিশিল্প এ সময়ের উল্লেখযোগ্য কিছু নাম। স্মৃতি থেকে লিখছি, আরও নাম বাদ পড়া স্বাভাবিক। সেটা অবশ্য বাহ্য। সুখের কথা, শূন্য দশক ও তৎপরবর্তীকালেও নিস্তব্ধ হয়নি সে গৌরবগাথা। দিগন্ত আরও প্রসারিত হয়েছে বাংলাদেশের লিটলম্যাগের। সৃষ্টিশীল সাহিত্যের পাশাপাশি দেখা দিয়েছে বিষয়ভিত্তিক প্রকাশনা। সমাজবিজ্ঞান–সম্পর্কিত প্রকাশনা বেড়েছে উল্লেখযোগ্য হারে। বাংলা ভাষায় একাডেমিক জার্নালের অভাব পূরণ করছে কিছুটা বিষয়ভিত্তিক পত্রিকাগুলো। নতুন দিগন্ত, রাষ্ট্রচিন্তা, চিন্তাযান ও রাজনীতি–চর্চা এখন অনেক মননশীলের ভাবনা প্রকাশের বাহন। সৃষ্টিশীলতার আকাশ প্রসারিত করেছে শব্দঘর, শালুক, অগ্রবীজ, খেয়া, সারেং প্রভৃতি লিটলম্যাগ। বিষয়গুণের কারণে বিশেষ করে বলতে হয় মননরেখার কথা। পত্রিকাটির নদী ও মাজার সংখ্যা আমাদের মীজানুর রহমানের নাম স্মরণ করিয়ে দেয়।
লিটল ম্যাগাজিন ‘নদী’র একটি সংখ্যার প্রচ্ছদলিটলম্যাগের বৈশিষ্ট্য স্ফুলিঙ্গের সঙ্গে তুলনীয়। সময়ের ডাকে, তারুণ্যের দাবিতে স্ফুলিঙ্গের জন্ম। সময়ের সঙ্গে আবার বিলয়। অনেক লিটলম্যাগ জন্মকালীন প্রত্যাশা ধরে রাখতে পারেনি। সম্ভাবনা সত্ত্বেও হারিয়ে গিয়েছে অনেকগুলো। বাকিগুলো টিকে আছে বেঁচে থাকার তাড়নায়। আগের উচ্চাশা আর জৌলুশ যদিও আর অবশিষ্ট নেই। চলমান অনেক পত্রিকার ভাগ্যেও ভবিষ্যতে তা–ই ঘটবে। সেটাই নিয়তি, কিন্তু রয়ে যাবে ইতিহাসে। সময়ের স্মারক, তারুণ্যের উদ্দীপনার চিহ্ন রূপে।
এ সময়ের উল্লেখযোগ্য আরেকটি ঘটনা মাদ্রাসায় শিক্ষিত তরুণ-তরুণীদের সাহিত্যিক প্রচেষ্টা। অনেকের জানা নেই যে মতাদর্শ, প্রশাসনিক পদ্ধতি ও কারিকুলামের নিরিখে মাদ্রাসায় পার্থক্য থাকলেও মাদ্রাসাগুলো চরিত্রে একশিলা নয়। কওমি-আলিয়ানির্বিশেষে অনেক তরুণ আলেম আজ প্রমিত বাংলায় পারদর্শী। নিজের বক্তব্য ও আবেগ চোস্ত ভাষায় উপস্থাপনায় দক্ষ। সামাজিক উপেক্ষা আর প্রাতিষ্ঠানিক ভ্রুকুটি উপেক্ষা করে নিজের উপস্থিতি জানান দিতে এরা বদ্ধপরিকর। যাপিত জীবনের অভিজ্ঞতার সার সাহিত্যে তুলে আনতে উদ্গ্রীব। পাশাপাশি আছে ইসলামি ঐতিহ্যের সঙ্গে আধুনিকতার মিশ্রণের আকাঙ্ক্ষা। ইউরোপীয় ভাবধারার সঙ্গে স্বীয় ভাবনার তুল্যমূল্য বিচারের প্রবণতা। প্রচুর না হলেও বেশ কিছু প্রকাশনা আছে এদের। বাহাছ, চিন্তানামা, প্রলয়শিখা, মীরাছ, শিউলীমালা এদের মুখপত্র। অনলাইন ম্যাগাজিনের মধ্যে কেয়ারী আর যোগাযোগ প্রধান। কিছু লিটলম্যাগ সমাজ ও ইতিহাসমনস্ক, কিছু আবার ঐতিহ্যতাড়িত। বাকিগুলো সাহিত্যিক প্রচেষ্টায় রত।
লিটলম্যাগের বৈশিষ্ট্য স্ফুলিঙ্গের সঙ্গে তুলনীয়। সময়ের ডাকে, তারুণ্যের দাবিতে স্ফুলিঙ্গের জন্ম। সময়ের সঙ্গে আবার বিলয়। অনেক লিটলম্যাগ জন্মকালীন প্রত্যাশা ধরে রাখতে পারেনি। সম্ভাবনা সত্ত্বেও হারিয়ে গিয়েছে অনেকগুলো। বাকিগুলো টিকে আছে বেঁচে থাকার তাড়নায়। আগের উচ্চাশা আর জৌলুশ যদিও আর অবশিষ্ট নেই। চলমান অনেক পত্রিকার ভাগ্যেও ভবিষ্যতে তা–ই ঘটবে। সেটাই নিয়তি, কিন্তু রয়ে যাবে ইতিহাসে। সময়ের স্মারক, তারুণ্যের উদ্দীপনার চিহ্ন রূপে।
শিবলী আজাদ: যুক্তরাষ্ট্রে সিটি ইউনিভার্সিটি অব নিউইয়র্কের লিম্যান কলেজে ইংরেজি সাহিত্যের অধ্যাপক