যুক্তরাষ্ট্রজুড়ে পরিযায়ী পাখির ওড়ার জন্য আলো নিভিয়ে রাখার অনুরোধ

· Prothom Alo

প্রতি বছর পরিযায়ী পাখি হাজারো কিলোমিটার পথ পাড়ি দেয়। এই দীর্ঘ যাত্রায় এদের জন্য বড় বিপদ হয়ে দাঁড়ায় শহরের আলো। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ভবনের সঙ্গে ধাক্কা লেগে প্রতিবছর বিশ্বজুড়ে অন্তত ১০০ কোটি পাখি মারা যায়।

Visit grenadier.co.za for more information.

যুক্তরাষ্ট্রে ১২ সেপ্টেম্বর শনিবার শরতের মাইগ্রেশন বা পরিযায়ী পাখির চলাচল শুরু হয়েছে। এবার ৩০ কোটির বেশি পাখি আকাশে উড়বে বলে ধারণা করা হচ্ছে। পাখিদের নিরাপদে উড়ে যাওয়ার সুযোগ দিতে দেশটির বিভিন্ন শহরের বাসিন্দাদের বাড়িঘর ও ভবনের আলো নিভিয়ে বা কমিয়ে রাখার অনুরোধ করা হয়েছে।

এই পরিযায়ী দলে আছে বিভিন্ন প্রজাতির পাখি। কালোপোল ওয়ার্বলার, চিমনি সুইফট, স্কিসর-টেইলড ফ্লাইক্যাচারসহ শত শত প্রজাতির পাখি উত্তর গোলার্ধ থেকে দক্ষিণ আমেরিকার দিকে উড়ে যাবে। শীতের সময় তুলনামূলক উষ্ণ আবহাওয়া ও বেশি খাবারের সন্ধানে এরা এই দীর্ঘ পথ পাড়ি দেবে। 

পাখির এই  যাত্রা মোটেও নিরাপদ না। কর্নেল ইউনিভার্সিটির বার্ডকাস্টের গবেষক আদ্রিয়ান ডক্টর বলেন, প্রতিবছর অন্তত ১০০ কোটি পাখি আকাশচুম্বী ভবন ও আলোয় ভরা অন্যান্য স্থাপনার সঙ্গে ধাক্কা লেগে মারা যায়। বার্ডকাস্ট হলো এমন একটি অনলাইন ব্যবস্থা, যেখানে পাখিদের পরিযানের গতিবিধি প্রায়রিয়েল টাইম বা বাস্তব সময়ে দেখা যায়।

শীতকালেই কেন পরিযায়ী পাখি দেখা যায়?
যুক্তরাষ্ট্রে ১২ সেপ্টেম্বর শনিবার শরতের মাইগ্রেশন বা পরিযায়ী পাখির চলাচল শুরু হয়েছে। এবার ৩০ কোটির বেশি পাখি আকাশে উড়বে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

সাধারণত রাতের অন্ধকারে পাখিরা পরিযায়ী হয়। ১৯ সেপ্টেম্বর শনিবার সবচেয়ে বেশি পাখির দেখা মিলতে পারে যুক্তরাষ্ট্রের পূর্বাঞ্চলের মিনেসোটা ও মিশিগানে। এরপর এরা ইলিনয় ও ইন্ডিয়ানা হয়ে দক্ষিণের অঙ্গরাজ্যগুলোর দিকে যেতে পারে। সেখান থেকে উড়ে এরা যুক্তরাষ্ট্রের সীমানা পেরিয়ে দক্ষিণ আমেরিকার দিকে চলে যাবে বলে গবেষকেরা পূর্বাভাস দিয়েছেন।

পাখির নিরাপদ চলাচলের জন্য মিনিয়াপোলিস ও শিকাগোর মতো কিছু শহর বাসিন্দাদের ঘরের ও ভবনের আলো নিভিয়ে বা কমিয়ে রাখার অনুরোধ করেছে। ভবনের মালিক ও ব্যবস্থাপকেরাও বাইরে সাজসজ্জার জন্য ব্যবহৃত আলো ও উজ্জ্বল আলো নিভিয়ে রাখতে পারেন। প্রয়োজনে স্বয়ংক্রিয়ভাবে মানুষ বা কোনো প্রাণীর চলাচল বুঝে জ্বলে ওঠে এমন সেন্সরও ব্যবহার করতে পারে। পাখি সংরক্ষণ নিয়ে কাজ করা খ্যাতনামা সংগঠন অডুবন সোসাইটির পরামর্শ, রাত ১১টা থেকে সকাল ৬টা পর্যন্ত অপ্রয়োজনীয় আলো বন্ধ বা কমিয়ে রাখা ভালো।

বুনো পাখির মৃত্যুর অন্যতম প্রধান কারণ ভবনের সঙ্গে ধাক্কা লাগা। নিউইয়র্ক সিটি বার্ড অ্যালায়েন্সের নির্বাহী পরিচালক জেসিকা উইলসনের মতে, খারাপ আবহাওয়ার সময় অনেক পাখি দিক হারিয়ে উঁচু ভবনের সঙ্গে ধাক্কা খায়। আবার আলোয় আকৃষ্ট হয়ে অনেক পাখি উজ্জ্বল জায়গার দিকে উড়ে যায়। সেখানে কাচের জানালা থাকলে এরা সেটি বুঝতে পারে না। ফলে কাচে ধাক্কা লেগে আহত হয় বা মারা যায়।

শীতের পরিযায়ী
১৯ সেপ্টেম্বর শনিবার সবচেয়ে বেশি পাখির দেখা মিলতে পারে যুক্তরাষ্ট্রের পূর্বাঞ্চলের মিনেসোটা ও মিশিগানে। এরপর এরা ইলিনয় ও ইন্ডিয়ানা হয়ে দক্ষিণের অঙ্গরাজ্যগুলোর দিকে যেতে পারে।

এ বছরের শরতের পরিযায়ী পাখির চলাচল শুরু হয়েছে আগস্টের মাঝামাঝি সময়ে। আগামী দুই সপ্তাহে এর তীব্রতা সবচেয়ে বেশি হতে পারে। পার্ডু ইউনিভার্সিটির পোস্টডক্টরাল গবেষণা সহকারী ডিলান অস্টারহাউসের ধারণা, এ সময় উত্তর গোলার্ধের আকাশে ৫০ কোটির বেশি পাখি উড়তে পারে। সাধারণত নভেম্বরের মাঝামাঝি গিয়ে শরতের পরিযায়ী পাখির যাত্রা শেষ হয়।

কখন উড়তে হবে, সেটি ঠিক করতে পাখিরা আবহাওয়ার ওপর অনেকটা নির্ভর করে। কোনো এলাকায় ঝড় শুরু হলে এরা ওড়া থামিয়ে দিতে পারে। পারডু ও কর্নেল ইউনিভার্সিটির গবেষকেরা আবহাওয়ার রাডার থেকে পাওয়া তথ্য ব্যবহার করে পাখির চলাচলের পূর্বাভাস দেন। বাতাসের অনুকূল পরিবর্তনের মতো কিছু আবহাওয়াগত পরিস্থিতির সঙ্গে বড় ঝাঁক বেঁধে পাখির উড়ে যাওয়ার সম্পর্ক খুঁজে পেয়েছেন তাঁরা। কয়েক দশকের আবহাওয়ার তথ্য বিশ্লেষণ করে গবেষকেরা এমন একটি মডেল তৈরি করেছেন, যার মাধ্যমে আবহাওয়ার পরিবর্তনের ভিত্তিতে কত পাখি আকাশে উড়তে পারে তার পূর্বাভাস দেওয়া যায়।

তবে সব প্রজাতির পাখির পরিযানের ধরন এক না। যেমন ডার্ক-আইড জুনকো পাখি গ্রীষ্মকালে কানাডায় বাসা বাঁধে। শীত এলে এরা যুক্তরাষ্ট্রের দিকে চলে যায়। গবেষক ডিলান অস্টারহস বলেছেন, বেঁচে থাকা ও নিজেদের বংশধর টিকিয়ে রাখার সম্ভাবনা বাড়াতেই পাখিরা এভাবে এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় যায়।

কিছু পাখি কেন মানুষের মতো কথা বলে
কয়েক দশকের আবহাওয়ার তথ্য বিশ্লেষণ করে গবেষকেরা এমন একটি মডেল তৈরি করেছেন, যার মাধ্যমে আবহাওয়ার পরিবর্তনের ভিত্তিতে কত পাখি আকাশে উড়তে পারে তার পূর্বাভাস দেওয়া যায়।

শরতের এই উড়ালে পাখির সংখ্যা বেশি থাকে। কারণ, গ্রীষ্মের প্রজনন মৌসুম শেষ হয়ে যাওয়ার পর অনেক নতুন পাখি দলে যোগ দেয়। আহত বা অসুস্থ পাখিদের চিকিৎসা দেওয়া যুক্তরাষ্ট্রের অলাভজনক প্রতিষ্ঠান ওয়াইল্ড বার্ড ফান্ডের যোগাযোগ পরিচালক ক্যাথরিন কুয়েল জানান, ৫ থেকে ১১ সেপ্টেম্বর শুক্রবার পর্যন্ত তাঁদের কাছে ৪৫৩টি পাখি এসেছে। এর মধ্যে ১২৪টি পাখি জানালার কাচে ধাক্কা খেয়ে আহত হয়েছিল।

পাখির জন্য কাচের জানালা একটি বড় সমস্যা। জানালায় গাছপালা বা আকাশের প্রতিবিম্ব দেখা যায়। পাখিরা একে আসল গাছ বা খোলা আকাশ মনে করে সেদিকে উড়ে যায়। ফলে কাচের সঙ্গে ধাক্কা লাগে। শুধু নিউইয়র্ক শহরেই প্রতিবছর ভবনের সঙ্গে ধাক্কা লেগে ২ লাখ ৫০ হাজারের বেশি পাখি মারা যায়।

তবে পাখিদের বাঁচাতে মানুষ কিছু সহজ কাজ করতে পারে। গবেষকদের পরামর্শ, জানালার কাচে নকশাযুক্ত বিশেষ ফিল্ম বা আবরণ লাগানো যেতে পারে। এতে কাচের স্বচ্ছতা কমে যাবে এবং পাখিরা জানালাকে বাধা হিসেবে সহজে বুঝতে পারবে।

লেখক: জ্যেষ্ঠ সহসম্পাদক, কিশোর আলোসূত্র: নিউইয়র্ক টাইমসপাখি টানা কতদিন আকাশে উড়তে পারে

Read full story at source