ন্যান্সি গ্রেস রোমান স্পেস টেলিস্কোপ মহাকাশে পাঠিয়েছে নাসা
· Prothom Alo

ফ্লোরিডার নাসার কেনেডি স্পেস সেন্টার থেকে স্পেসএক্স ফ্যালকন হেভি রকেটে চড়ে মহাকাশে পাড়ি দিয়েছে ‘ন্যান্সি গ্রেস রোমান স্পেস টেলিস্কোপ’। ৩০ আগস্ট, রবিবার সকালে সফলভাবে এই ৪ দশমিক ৩ বিলিয়ন ডলারের টেলিস্কোপটি উৎক্ষেপণ করা হয়। রকেটটি আকাশে ওড়ার কিছু সময় পর এর বুস্টারগুলো আলাদা হয়ে নির্ধারিত স্থানে ফিরে আসে।
২০ হাজার পাউন্ড ওজনের মেরিল্যান্ডে অবস্থিত নাসার গডার্ড স্পেস ফ্লাইট সেন্টারের সুবিশাল ও নিয়ন্ত্রিত পরিচ্ছন্ন কক্ষে ন্যান্সি গ্রেস রোমান স্পেস টেলিস্কোপটির চূড়ান্ত প্রস্তুতি সম্পন্ন হয়। পৃথিবীর বৃহত্তম এই পরিচ্ছন্ন কক্ষে কঠোর সুরক্ষাবলয়ে শত শত প্রযুক্তিবিদ ও প্রকৌশলী বহু বছর ধরে এটি তৈরি ও পরীক্ষা-নিরীক্ষা করেছেন।
Visit betsport24.es for more information.
নাসার প্রথম প্রধান জ্যোতির্বিজ্ঞানীর নামে এই শক্তিশালী টেলিস্কোপটির নামকরণ করা হয়েছে। এটি মহাবিশ্বের শত শত কোটি গ্যালাক্সি, ব্ল্যাকহোল বা কৃষ্ণগহ্বর এবং নক্ষত্রের চারপাশের ধূলিকণার মানচিত্র তৈরি করবে। এর ক্যামেরা এত শক্তিশালী ও বিস্তৃত ছবি তুলবে যে তা পুরোপুরি দেখতে পাঁচ লাখেরও বেশি উচ্চমানের (এইচডি) টিভির প্রয়োজন হবে।
জাপানে ১৮০০ মানুষ মিলে টেনে সরাল ৩৬০ টনের হিরোসাকি দুর্গসবচেয়ে বিস্ময়কর বিষয় হলো, ন্যান্সি গ্রেস রোমান টেলিস্কোপের ৭ দশমিক ৯ ফুট ব্যাসের মূল আয়নাটির উৎপত্তি কিন্তু এই জ্যোতির্বিজ্ঞান প্রকল্পের জন্য হয়নি। এটি মূলত ছিল যুক্তরাষ্ট্রের একটি অত্যন্ত গোপনীয় সামরিক সংস্থা ‘ন্যাশনাল রিকনসাইসান্স অফিস’–এর তৈরি করা একটি সাবেক গুপ্তচর স্যাটেলাইটের আয়না। মহাকাশ নজরদারির জন্য তৈরি এই অত্যাধুনিক প্রযুক্তিটি দীর্ঘদিন নিউইয়র্কের একটি গোপন গুদামে পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে ছিল। পরবর্তী সময়ে নাসা সেই প্রকাণ্ড ও শক্তিশালী গোপন সামরিক প্রযুক্তিটি উদ্ধার করে মহাবিশ্বের প্রাচীনতম রহস্য উন্মোচন ও মহাজাগতিক মানচিত্র তৈরির কাজে নতুন রূপ দান করে।
নাসার প্রথম প্রধান জ্যোতির্বিজ্ঞানীর নামে এই শক্তিশালী টেলিস্কোপটির নামকরণ করা হয়েছেআগের হাবল বা জেমস ওয়েব টেলিস্কোপগুলো মহাবিশ্বের ছোট কোনো অংশে ফোকাস করে তথ্য সংগ্রহ করত। কিন্তু ন্যান্সি গ্রেস রোমান টেলিস্কোপটি একসঙ্গে মহাকাশের বিশাল এলাকার স্পষ্ট ও বিস্তৃত দৃশ্য ধারণ করতে পারবে। এর সাহায্যে বিজ্ঞানীরা জানতে পারবেন মহাবিশ্ব কীভাবে কাজ করে, এটি কী দিয়ে তৈরি এবং মহাকাশে অন্য কোনো প্রাণ আছে কি না।
মহাকাশে ওড়ার কিছুক্ষণ পর রকেট থেকে আলাদা হয়ে ন্যান্সি গ্রেস রোমান টেলিস্কোপটি নিজের গন্তব্যের দিকে চলতে শুরু করে। পৃথিবীর মহাকাশ গবেষণা সংস্থা নাসার বিজ্ঞানীরা জানিয়েছেন, এই টেলিস্কোপের মাধ্যমে তাঁরা প্রথমবারের মতো ভিন্ন উপায়ে পুরো মহাবিশ্ব পর্যবেক্ষণ করার সুযোগ পাবেন।
উৎক্ষেপণ সফল হওয়ার পর সংস্থাটির প্রধানের সঙ্গে টেলিফোনে কথা বলেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তিনি এই বড় সাফল্যের জন্য মহাকাশ গবেষণার পুরো দলকে অভিনন্দন জানান এবং ভবিষ্যতের জন্য শুভকামনা জানান।
গরমে পথ হারানো নারীকে সাহায্য করে স্বীকৃতি পেয়েছে ১৪ বছরের কিশোরনতুন এই টেলিস্কোপটি পৃথিবী থেকে প্রায় ১০ লাখ মাইল দূরে ‘এল২’ (L2) নামের একটি জায়গায় গিয়ে অবস্থান নেবে। এই জায়গায় সূর্য ও পৃথিবীর মধ্যাকর্ষণ শক্তি সামঞ্জস্যপূর্ণ থাকায় কম জ্বালানি খরচ করেই দীর্ঘ সময় স্থির থাকা যায়। প্রায় ১০০ দিন পর টেলিস্কোপটি তার আসল কাজ শুরু করবে এবং এটি টানা অন্তত পাঁচ বছর ধরে মহাজাগতিক তথ্য পাঠাতে থাকবে।
মহাকাশে নির্ধারিত স্থানে পৌঁছানোর পর রোমান টেলিস্কোপটি প্রতিদিন পৃথিবীতে প্রায় এক টেরাবাইট তথ্য বা ডেটা পাঠাবে। প্রতিদিন ১০ লাখ মাইল দূর থেকে এই বিপুল পরিমাণ তথ্য পাঠানোর প্রক্রিয়াটি অনেকটা প্রতিনিয়ত ১০ লাখ গান স্ট্রিম করার মতো।
মহাকাশে ওড়ার কিছুক্ষণ পর রকেট থেকে আলাদা হয়ে ন্যান্সি গ্রেস রোমান টেলিস্কোপটি নিজের গন্তব্যের দিকে চলতে শুরু করেজ্যোতির্বিজ্ঞানীরা এই বিশাল তথ্যের সাহায্যে মহাবিশ্বের অদৃশ্য পদার্থ ‘ডার্ক ম্যাটার’ এবং মহাবিশ্বকে প্রসারিত করতে থাকা রহস্যময় শক্তি ‘ডার্ক এনার্জি’ গবেষণা করবেন। পাশাপাশি, সৌরজগতের বাইরে লক্ষাধিক নতুন গ্রহ আবিষ্কার করা ও আমাদের মিল্কিওয়ে গ্যালাক্সির গ্রহের হিসাব বের করাও এর উদ্দেশ্য। বিশাল আকাশ স্ক্যান করার সুবিধা থাকায় এতে অপ্রত্যাশিত এবং বিরল অনেক মহাজাগতিক বস্তুর সন্ধান মিলবে।
হাবল টেলিস্কোপের মতো একই মানের ইনফ্রারেড রেজোল্যুশন থাকলেও, রোমানের দৃষ্টিসীমা হাবলের চেয়ে ১০০ গুণ বেশি বিস্তৃত। এটি হাবলের চেয়ে এক হাজার গুণ দ্রুত কাজ করতে পারে। যে আকাশ জরিপ করতে হাবল টেলিস্কোপের ১০০ বছর সময় লাগত, রোমান তা মাত্র এক মাসেই সম্পন্ন করতে পারবে। এই টেলিস্কোপে একটি ৩০০ মেগাপিক্সেলের ইনফ্রারেড ক্যামেরা রয়েছে, যার মাধ্যমে বিজ্ঞানীরা মহাকর্ষীয় লেন্সিংয়ের মতো আলো বেঁকে যাওয়ার প্রভাব পর্যবেক্ষণ করবেন।
এই শক্তিশালী ক্যামেরা নতুন গ্রহ খুঁজে পেতেও বিজ্ঞানীদের সাহায্য করবে। নক্ষত্রের সামনে দিয়ে গ্রহ যাওয়ার সময় আলোর তীব্রতা কমে যাওয়া এবং ‘মাইক্রোলেন্সিং’ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে এসব গ্রহ শনাক্ত করা যাবে। মাইক্রোলেন্সিং পদ্ধতিতে নক্ষত্রকে প্রদক্ষিণ করা ছোট ও শীতল গ্রহগুলোকে সহজে চেনা যায়। পৃথিবীর মতো গ্রহ আবিষ্কারের জন্য এই পদ্ধতিটি আদর্শ। রোমান টেলিস্কোপ ব্যবহার করে বিজ্ঞানীরা হাজারেরও বেশি এমন নতুন গ্রহ খুঁজে বের করার আশা করছেন, যা এক্সোপ্লানেট গবেষণায় এক নতুন দিগন্ত খুলে দেবে।
জাপানে ভেন্ডিং মেশিন এত জনপ্রিয় কেনরোমান টেলিস্কোপে ‘করোনোগ্রাফ’ নামের একটি বিশেষ যন্ত্র রয়েছে। এটি নক্ষত্রের তীব্র আলো আটকে রেখে তার চারপাশের অনুজ্জ্বল গ্রহগুলোর সরাসরি ছবি তুলতে পারে। নাসার জেমস ওয়েব টেলিস্কোপ যেখানে নক্ষত্রের চেয়ে ১০ লাখ গুণ কম উজ্জ্বল গ্রহের ছবি তুলতে পারে, সেখানে রোমানের যন্ত্রটি ১০ কোটি গুণ কম উজ্জ্বল গ্রহের স্পষ্ট ছবি তুলতে সক্ষম। এই প্রযুক্তি ভবিষ্যতের ‘হ্যাবিটেবল ওয়ার্ল্ডস অবজারভেটরি’র মতো উন্নত টেলিস্কোপ তৈরির পথ সহজ করবে, যা দূরে থাকা পৃথিবীর মতো গ্রহগুলোর ছবি তুলতে পারবে।
রোমান টেলিস্কোপটি আরও দুটি বড় মহাকাশ পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রের সঙ্গে মিলে কাজ করবে। ইউরোপের ‘ইউক্লিড’ টেলিস্কোপ এবং চিলির ‘ভেরা সি. রুবিন অবজারভেটরি’। ইউক্লিড এবং রুবিন অবজারভেটরি আকাশের বিশাল অংশের মানচিত্র তৈরি করলেও, রোমান মহাকাশের নির্দিষ্ট একটি অংশে মনোযোগ দেবে এবং হাবলের চেয়েও অনেক স্পষ্ট ছবি উপহার দেবে। নাসার বিজ্ঞানীরা মনে করেন, এই তিনটি শক্তিশালী যন্ত্রের তথ্য একসঙ্গে মেলালে মহাবিশ্ব সম্পর্কে যুগান্তকারী সব আবিষ্কার সম্ভব হবে।
নাসার প্রথম নারী নির্বাহী ও জ্যোতির্বিজ্ঞানী ন্যান্সি গ্রেস রোমানএই টেলিস্কোপটির নামকরণ করা হয়েছে নাসার প্রথম নারী নির্বাহী ও জ্যোতির্বিজ্ঞানী ন্যান্সি গ্রেস রোমানের নামে। তাঁকে ‘হাবলের জননী’ বলা হয়। ১৯৫৯ সালে তিনি মনে করেছিলেন যে মহাকাশ টেলিস্কোপ দিয়ে অন্য কোনো সৌরজগতের গ্রহ খুঁজে পাওয়া হয়তো সম্ভব হবে না। কিন্তু আজ তাঁরই নামে বানানো অত্যন্ত শক্তিশালী এই টেলিস্কোপটি হাজার হাজার নতুন গ্রহের সন্ধান পেতে সাহায্য করবে।
সূত্র: নিউইয়র্ক টাইমস ও ন্যাশনাল জিওগ্রাফিক
প্লাস্টিক দিয়ে প্লাস্টিক ধ্বংস করার উপায় বের করে দ্য আর্থ প্রাইজ পেলেন আয়ারল্যান্ডের শিক্ষার্থী