স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানে ই-গভর্ন্যান্সের পূর্ণ সুফল পাচ্ছেন না নাগরিকেরা
· Prothom Alo
স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানে ই-গভর্ন্যান্সের প্রসার ঘটলেও নাগরিকেরা তার পূর্ণ সুফল পাচ্ছেন না। সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) এক গবেষণায় এই তথ্য উঠে এসেছে।
‘স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোর সুশাসনের বর্তমান অবস্থা ও করণীয়’ শীর্ষক এক সংলাপে এই গবেষণার তথ্য উপস্থাপন করা হয়। আজ সোমবার রাজধানীর গুলশানের একটি হোটেলে এই সংলাপের আয়োজন করে সিপিডি।
Visit turconews.click for more information.
সংলাপে জানানো হয়, গবেষণায় দেশের ৮ বিভাগের ২ হাজার ৬১১ জন নাগরিক (নারী, তরুণ ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠী) অংশ নেন। এ ছাড়া ২৯৭টি স্থানীয় সরকারি অফিসের ওপর গবেষণাটি করা হয়।
গবেষণার তথ্য সংলাপে উপস্থাপন করেন সিপিডির গবেষণা ফেলো তামিম আহমেদ ও গবেষণা সহযোগী সাবিহা শারমিন। গবেষণার বরাতে তাঁরা বলেন, মাত্র ৩১ শতাংশ নারী পুরোপুরি অনলাইনে সরকারি সেবা পাওয়ার কথা জানিয়েছেন। অনলাইনে আবেদনের পরও বাকিদের তথ্য সরবরাহ, সই, তদবিরসহ বিভিন্ন কারণে সশরীর সেবা প্রদানকারীদের কাছে যেতে হয়েছে। আর তরুণদের ক্ষেত্রে ৪৩ শতাংশ জানিয়েছেন, তাঁরা অনলাইনে সেবা পেয়েছেন।
গবেষণার বরাতে সিপিডির পক্ষ থেকে জানানো হয়, ডিজিটাল সেবার প্রস্তুতি ও সচেতনতায় দেশের অন্য অঞ্চলের তুলনায় রংপুর বিভাগ সবচেয়ে পিছিয়ে। অন্যদিকে, ডিজিটাল প্রশিক্ষণ ও সচেতনতা ক্যাটাগরিতে তুলনামূলকভাবে এগিয়ে আছে ঢাকা, চট্টগ্রাম ও দক্ষিণাঞ্চলের নারীরা। উত্তরাঞ্চলের নারীরা ডিজিটাল প্রশিক্ষণ ও সচেতনতামূলক কার্যক্রমে অন্য অঞ্চলের তুলনায় পিছিয়ে থাকায় তাঁরা অনলাইনে সেবা গ্রহণের ক্ষেত্রেও পিছিয়ে। এ ছাড়া তাঁদের পিছিয়ে থাকার অন্য কারণগুলোর মধ্যে আছে—ইউনিয়ন পর্যায়ের অফিসগুলোতে কম্পিউটার ও ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেটের ঘাটতি, অনলাইনে তথ্য ফাঁসের ভয় ও আস্থার ঘাটতি।
গবেষণায় উঠে এসেছে, অনলাইনে সেবা গ্রহণের হার বাড়াতে হলে সেবাকে শতভাগ স্বয়ংক্রিয় করতে হবে। প্রতিটি দপ্তরে আইসিটি ফোকাল পয়েন্ট রাখার পাশাপাশি অভিযোগ প্রতিকারের ব্যবস্থা জোরদার করতে হবে।
সবাইকে সেবার আওতায় আনা
সংলাপে স্বাগত বক্তব্যে সুশাসন নিশ্চিত করতে স্থানীয় পর্যায়ের তদারকিতে নারী জনপ্রতিনিধি ও নারী সংগঠন যুক্ত করতে হবে বলে উল্লেখ করেন সিপিডির সম্মাননীয় ফেলো ফাহমিদা খাতুন। তিনি বলেন, অনলাইনে সেবা প্রদানের উদ্যোগকে সফল করতে হলে সব স্তরের, সব রকমের মানুষকে সেবার আওতায় নিয়ে আসতে হবে। প্রতিবন্ধী ব্যক্তি, সংখ্যালঘু, নিম্ন আয়ের পরিবার, প্রত্যন্ত এলাকার বাসিন্দা ও সীমিত শিক্ষার মানুষকেও সেবার বাইরে রাখা যাবে না। এ ছাড়া বাংলা ভাষার পাশাপাশি প্রয়োজনে স্থানীয় ভাষাতেও সেবা দিতে হবে। কণ্ঠনির্ভর ও প্রতিবন্ধীবান্ধব ব্যবস্থা রাখতে হবে।
জবাবদিহি বাড়াতে বাজেট, প্রকল্প ব্যয়, সুবিধাভোগীর তালিকা ও সেবার সময়সীমা প্রকাশ করার তাগিদ দেন ফাহমিদা খাতুন। তিনি বলেন, অভিযোগ জানানো, অগ্রগতি দেখা ও আপিলের কার্যকর ডিজিটাল ব্যবস্থাও থাকতে হবে। তবে শুধু প্রযুক্তি নয়, নির্ভরযোগ্য ইন্টারনেট, প্রশিক্ষিত কর্মকর্তা, সাইবার নিরাপত্তা ও তথ্যের সুরক্ষা নিশ্চিতে সরকারকে গুরুত্ব দিতে হবে।
সংলাপে বেসরকারি সংগঠন নাগরিকতা সিভিক এনগেজমেন্ট ফান্ডের ডেপুটি টিম লিডার ক্যাথরিনা কোনিগ বলেন, কেবল ডিজিটাল সেবা চালু করলেই সেটা নাগরিকবান্ধব হয় না। সেবা ব্যবহারে নারী, তরুণ, প্রতিবন্ধী ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর বাধাগুলো চিহ্নিত করতে হবে। নাগরিকের প্রয়োজন, মতামতকে গুরুত্ব দিয়ে সেবার নকশা ও উন্নয়ন করতে হবে। এ জন্য সরকার, নাগরিক সমাজ ও জনগণের অংশগ্রহণমূলক সহযোগিতা জরুরি।
গুণগত গবেষণা দরকার
স্থানীয় সরকারের কতগুলো সেবা ডিজিটাল হয়েছে, সেটা নিয়ে তথ্য উপস্থাপনের ক্ষেত্রে কেন্দ্রীয় ও স্থানীয় সেবার পার্থক্য স্পষ্ট করা প্রয়োজন বলে সংলাপে উল্লেখ করেন সামাজিক উদ্যোক্তা ও আই সোশ্যালের চেয়ারপারসন অনন্য রায়হান। তিনি বলেন, একই সঙ্গে দুর্নীতি, হয়রানি ও অভিযোগ ব্যবস্থার প্রকৃত চিত্র জানতে পরিমাণগত জরিপের পাশাপাশি গুণগত গবেষণা দরকার।
সরকারি সেবার নকশা যাতে নাগরিকদের প্রয়োজন বুঝে করা হয়, সেই পরামর্শ দেন এসপায়ার টু ইনোভেটের (এটুআই) জ্যেষ্ঠ পরামর্শক ফজলুল জাহিদ। তিনি বলেন, বিভিন্ন দপ্তরের তথ্য ও সেবাকে একটি নির্দিষ্ট কাঠামোয় নিয়ে আসা জরুরি, যাতে নাগরিকদের বারবার একই তথ্য বা কাগজপত্র দিতে না হয়।
সরকারি আর্থিক খাতের ডিজিটাল ব্যবস্থাপনা ও তথ্যপ্রযুক্তি বিশেষজ্ঞ আমিনুল মোহাইমেন বলেন, সরকারি সেবার প্রকৃত চিত্র বুঝতে সুবিধাবঞ্চিত ও শহরের ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীকেও গবেষণায় অন্তর্ভুক্ত করা দরকার। সেবার মান বাড়াতে কার্যকর অভিযোগ প্রতিকারব্যবস্থা জরুরি। একই সঙ্গে স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোর বাজেট ও কার্যক্রমে স্বচ্ছতা আনতে হবে।
সংলাপে উন্মুক্ত আলোচনায় অংশ নেন বিভিন্ন সংস্থার প্রতিনিধি, নাগরিক প্রতিনিধি ও বিশেষজ্ঞরা। আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থা সাইটসেভার্সের বাংলাদেশ কার্যালয়ের অ্যাডভোকেসি অ্যান্ড কমিউনিকেশন কো–অর্ডিনেটর খন্দকার সোহেল রানা বলেন, সেবা-সুশাসনের বিষয়গুলো আলাদাভাবে বিশ্লেষণ করা জরুরি। এর সঙ্গে আন্তমন্ত্রণালয় সমন্বয়, মনিটরিং ও সম্পদের সঠিক বরাদ্দ নিশ্চিত করতে হবে।
এটুআই-এর পরামর্শক (এক্সেসিবিলিটি) ভাস্কর ভট্টাচার্য, বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব প্রফেশনালসের (বিইউপি) সহকারী অধ্যাপক মোহাম্মদ নুরুল্লাহ প্রমুখ আলোচনায় অংশ নেন।