বাংলাভাষায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা: সম্ভাবনা, ঝুঁকি ও আমাদের করণীয়

· Prothom Alo

প্রযুক্তি তখনই সত্যিকার অর্থে গণতান্ত্রিক হয়, যখন মানুষ নিজের ভাষায় তাকে ব্যবহার করতে পারে ও প্রশ্ন করতে পারে। এই কথাটির গুরুত্ব আমরা প্রতিদিন বুঝতে পারি। কেউ ইংরেজিতে একটি জটিল প্রশ্ন লিখে কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে উত্তর পেয়ে যাচ্ছেন। অন্যদিকে একই প্রশ্ন বাংলায় করলে উত্তরটি হয়তো অস্পষ্ট, আংশিক বা ভুল হচ্ছে। কোথাও বানান ঠিক থাকলেও প্রসঙ্গ বোঝা যাচ্ছে না। কোথাও আবার বাংলা বাক্যের মধ্যে অপ্রয়োজনীয় ইংরেজি শব্দ ঢুকে যাচ্ছে। প্রযুক্তির সুবিধা তখন ভাষাজ্ঞানসম্পন্ন মানুষের হাতে কেন্দ্রীভূত হয়ে পড়ে।

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এখন শিক্ষা, চিকিৎসা, প্রশাসন, অনুবাদ, সংবাদ, ব্যবসা ও সৃজনশীল কাজের অংশ হয়ে উঠছে। এই পরিবর্তনে বাংলা ভাষা পিছিয়ে থাকলে বাংলাভাষী মানুষের একটি বড় অংশ তথ্য ও সেবার নতুন জগৎ থেকে দূরে থাকবে। ভাষা এখানে কেবল যোগাযোগের মাধ্যম নয়। ভাষার সঙ্গে যুক্ত থাকে স্মৃতি, সংস্কৃতি, সামাজিক অভিজ্ঞতা, স্থানীয় জ্ঞান এবং মানুষের নিজস্ব চিন্তার ধরন।

Visit extonnews.click for more information.

এআই হাইপ, ভবিষ্যদ্বাণী ও অদৃশ্য প্রতারণার রাজনীতি
কোথাও বানান ঠিক থাকলেও প্রসঙ্গ বোঝা যাচ্ছে না। কোথাও আবার বাংলা বাক্যের মধ্যে অপ্রয়োজনীয় ইংরেজি শব্দ ঢুকে যাচ্ছে। প্রযুক্তির সুবিধা তখন ভাষাজ্ঞানসম্পন্ন মানুষের হাতে কেন্দ্রীভূত হয়ে পড়ে।

বাংলার জন্য এআই কেন গুরুত্বপূর্ণ

বাংলা ভাষায় কথা বলেন কোটি কোটি মানুষ। তবু কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার গবেষণায় বাংলা দীর্ঘদিন তুলনামূলকভাবে কম সম্পদসম্পন্ন ভাষা হিসেবে বিবেচিত হয়েছে। এর অর্থ বাংলাভাষী মানুষের সংখ্যা কম নয়, বরং এআই প্রশিক্ষণের জন্য মানসম্মত, বৈচিত্র্যময় ও অনুমোদিত বাংলা তথ্যভান্ডার, অডিও, অনুবাদ, অভিধান এবং মূল্যায়নব্যবস্থা যথেষ্ট নয়।

সাম্প্রতিক গবেষণায় দেখা গেছে, এলএলএম (লার্জ ল্যাঙ্গুয়েজ মডেল) মডেলগুলো ইংরেজির তুলনায় বাংলায় ধারাবাহিকভাবে দুর্বল ফল দেয়, বিশেষ করে ক্ষুদ্র মডেল ও নির্দিষ্ট ধরনের প্রশ্নে। বাংলা ভাষায় এলএলএম মডেলের সক্ষমতা নিয়ে একটি সাম্প্রতিক মূল্যায়ন এই ব্যবধানের কথা উল্লেখ করেছে। ফলে বাংলায় এআই তৈরি করতে শুধু ইংরেজি মডেল অনুবাদ করে ব্যবহার করলেই কাজ শেষ হয় না।

বাংলা ভাষার নিজস্ব কিছু জটিলতাও আছে। একই শব্দের একাধিক অর্থ থাকতে পারে। অঞ্চলভেদে উচ্চারণ ও শব্দভান্ডার বদলে যায়। কথ্য ভাষা, প্রমিত ভাষা, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ভাষা ও সাহিত্যের ভাষার মধ্যে পার্থক্য রয়েছে। বাংলা ও ইংরেজির মিশ্র ব্যবহারও দৈনন্দিন জীবনে খুব সাধারণ। একটি কার্যকর বাংলা এআইকে এসব বৈচিত্র্য বুঝতে হবে।

ভালো বাংলা এআই তৈরি হলে মানুষ নিজের ভাষায় তথ্য খুঁজতে, প্রশ্ন করতে, লিখতে ও সেবা নিতে পারবে। দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী মানুষ বাংলা কণ্ঠপ্রযুক্তির সাহায্যে আরও স্বাধীনভাবে তথ্য ব্যবহার করতে পারবেন। প্রবীণ মানুষ, যাঁরা ইংরেজিতে স্বচ্ছন্দ নন, তাঁরা ডিজিটাল সেবায় অংশ নিতে পারবেন। ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী, কৃষক, শিক্ষক, রোগী ও সরকারি সেবাগ্রহীতা নিজেদের ভাষায় সহায়তা পাবেন।

৩,৫০০ বছর আগের হাতের লেখা পড়ে ফেলল এআই
সাম্প্রতিক গবেষণায় দেখা গেছে, এলএলএম বা লার্জ ল্যাঙ্গুয়েজ মডেলগুলো ইংরেজির তুলনায় বাংলায় ধারাবাহিকভাবে দুর্বল ফল দেয়, বিশেষ করে ক্ষুদ্র মডেল ও নির্দিষ্ট ধরনের প্রশ্নে।

শিক্ষায় নতুন সম্ভাবনা

বাংলাভাষী শিক্ষার্থীদের জন্য এআই ব্যক্তিগত সহকারী হিসেবে কাজ করতে পারে। একজন শিক্ষার্থী বাংলায় জিজ্ঞেস করতে পারে, ‘ভগ্নাংশের যোগ কীভাবে করতে হয়?’ এআই তার বয়স ও বোঝার ক্ষমতা অনুযায়ী উদাহরণ দিতে পারে। ইতিহাসের কোনো ঘটনা ব্যাখ্যা করতে পারে। কঠিন ইংরেজি পাঠ সহজ বাংলায় বুঝিয়ে দিতে পারে। লেখার খসড়া দেখে যুক্তির দুর্বলতা চিহ্নিত করতে পারে।

শিক্ষকেরাও এর সাহায্য নিতে পারেন। একটি পাঠের বিভিন্ন স্তরের ব্যাখ্যা, অনুশীলনী, প্রশ্নপত্র ও মূল্যায়নের খসড়া তৈরি করা সম্ভব। প্রত্যন্ত অঞ্চলের বিদ্যালয়ে বিষয়ভিত্তিক শিক্ষক কম থাকলে বাংলা এআই অতিরিক্ত সহায়তা দিতে পারে। তবে শিক্ষায় এআই ব্যবহারের সঙ্গে কিছু নীতি ঠিক করা জরুরি। এআই যেন শিক্ষার্থীর হয়ে পুরো কাজ করে না দেয়। উত্তর মুখস্থ করিয়ে দেওয়ার বদলে সে যেন প্রশ্ন করতে, যুক্তি সাজাতে ও ভুল সংশোধন করতে সাহায্য করে। শিক্ষককে বাদ দিয়ে এআই-নির্ভর শিক্ষা কখনো কার্যকর হবে না। শিক্ষকের অভিজ্ঞতা, শিক্ষার্থীর মানসিক অবস্থা ও শ্রেণিকক্ষের সামাজিক সম্পর্ক কোনো মডেল সম্পূর্ণভাবে বুঝতে পারে না।

এআই প্রায় অর্ধেক সময় ভুল স্বাস্থ্য পরামর্শ দেয়, নতুন গবেষণা
একটি পাঠের বিভিন্ন স্তরের ব্যাখ্যা, অনুশীলনী, প্রশ্নপত্র ও মূল্যায়নের খসড়া তৈরি করা সম্ভব। প্রত্যন্ত অঞ্চলের বিদ্যালয়ে বিষয়ভিত্তিক শিক্ষক কম থাকলে বাংলা এআই অতিরিক্ত সহায়তা দিতে পারে।

অনুবাদ ও জ্ঞানপ্রবাহ

বাংলা ও বিশ্বের অন্যান্য ভাষার মধ্যে অনুবাদে এআই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। কৃষি, জলবায়ু, স্বাস্থ্য, বিজ্ঞান, আইন ও প্রযুক্তি বিষয়ে বহু দরকারি তথ্য এখনো সাধারণ বাংলাভাষী পাঠকের নাগালের বাইরে রয়েছে। এআই প্রাথমিক অনুবাদ দ্রুত করতে পারে। বাংলা বই, সংবাদ, গবেষণা ও সরকারি নথি অন্য ভাষায় পৌঁছে দিতে পারে।

অনুবাদকের কাজও এতে বদলাবে। এআই হয়তো প্রথম খসড়া তৈরি করতে পারে, কিন্তু অর্থ, প্রসঙ্গ, সাংস্কৃতিক ইঙ্গিত ও ভাষার স্বাভাবিকতা যাচাই করার দায়িত্ব মানুষেরই থেকে যাবে। ‘কলম ভেঙে ফেলা’ বা ‘ঘর করা’ ধরনের বাক্য সরাসরি আক্ষরিক অনুবাদ করলে অর্থ বিকৃত হতে পারে। চিকিৎসা, আইন ও প্রশাসনিক নথিতে সামান্য ভুলও বড় ক্ষতির কারণ হতে পারে।

ইরানে যুদ্ধ চালাচ্ছে কে, মানুষ নাকি এআই
কোনো বাংলা এআই যদি ভুলভাবে বলে যে একটি উপসর্গ তেমন গুরুত্বপূর্ণ নয়, রোগী চিকিৎসা নিতে দেরি করতে পারেন। তাই এআই রোগ নির্ণয়ের চূড়ান্ত কর্তৃপক্ষ হতে পারে না।

স্বাস্থ্যসেবায় সতর্ক সম্ভাবনা

বাংলা এআই স্বাস্থ্যসেবায় কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ কাজে সহায়তা করতে পারে। রোগী বাংলায় নিজের উপসর্গ লিখতে পারেন। হাসপাতালের নির্দেশনা সহজ বাংলায় পাওয়া যেতে পারে। ওষুধ খাওয়ার সময়সূচি, পরীক্ষার প্রস্তুতি বা হাসপাতাল-পরবর্তী পরিচর্যার নির্দেশনা কণ্ঠে শোনানো যেতে পারে। চিকিৎসক রোগীর কথ্য বিবরণকে সংক্ষিপ্ত নোটে রূপান্তর করতে পারেন।

ভাষাগত বাধা কমলে রোগী ও চিকিৎসকের মধ্যে যোগাযোগ উন্নত হতে পারে। তবে স্বাস্থ্যসেবায় ভুলের মূল্য অনেক বেশি। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এআই ব্যবহারে গোপনীয়তা, পক্ষপাত, নিরাপত্তা, স্বচ্ছতা ও মানবিক তত্ত্বাবধানের ওপর গুরুত্ব দিয়েছে। ডব্লিউএইচওর স্বাস্থ্যসেবায় এআই নীতিমালা অনুযায়ী রোগীর নিরাপত্তা ও অধিকারকে প্রযুক্তির সুবিধার ওপর অগ্রাধিকার দিতে হবে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এআই ব্যবহারে গোপনীয়তা, পক্ষপাত, নিরাপত্তা, স্বচ্ছতা ও মানবিক তত্ত্বাবধানের ওপর গুরুত্ব দিয়েছে

কোনো বাংলা এআই যদি ভুলভাবে বলে যে একটি উপসর্গ তেমন গুরুত্বপূর্ণ নয়, রোগী চিকিৎসা নিতে দেরি করতে পারেন। তাই এআই রোগ নির্ণয়ের চূড়ান্ত কর্তৃপক্ষ হতে পারে না। এটি তথ্য বোঝাতে ও চিকিৎসককে সহায়তা করতে পারে, সিদ্ধান্ত নিতে নয়। স্বাস্থ্যসেবায় এআই-ভিত্তিক ভাষাপ্রযুক্তি নিয়ে সাম্প্রতিক আলোচনাতেও মানব অনুবাদক ও পেশাদার তত্ত্বাবধানের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরা হয়েছে।

এজেন্টিক এআই কীভাবে বদলাচ্ছে চিকিৎসাবিজ্ঞান
স্বাস্থ্যসেবায় ভুলের মূল্য অনেক বেশি। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এআই ব্যবহারে গোপনীয়তা, পক্ষপাত, নিরাপত্তা, স্বচ্ছতা ও মানবিক তত্ত্বাবধানের ওপর গুরুত্ব দিয়েছে।

সরকারি সেবায় সহজে প্রবেশ

সরকারি সেবা সম্পর্কে তথ্য অনেক সময় জটিল ভাষায় লেখা থাকে। নাগরিকের পক্ষে বোঝা কঠিন হয়, কোন ফর্ম কোথায় জমা দিতে হবে, কোন কাগজ লাগবে বা আবেদনের পরবর্তী ধাপ কী। বাংলা এআই এই তথ্যকে সহজ ভাষায় ব্যাখ্যা করতে পারে। নাগরিক বাংলায় প্রশ্ন করে জন্মনিবন্ধন, কর, পাসপোর্ট, ভূমি, ভাতা বা স্বাস্থ্যসেবা সম্পর্কে প্রাথমিক নির্দেশনা পেতে পারেন।

কণ্ঠভিত্তিক সেবা এখানে বিশেষ কার্যকর হতে পারে। যাঁদের পড়তে অসুবিধা হয়, তাঁরা ফোনে বাংলায় প্রশ্ন করতে পারবেন। তবে সরকারি এআইয়ের প্রতিটি উত্তরের উৎস, তারিখ ও দায়িত্বশীল দপ্তরের পরিচয় স্পষ্ট থাকা দরকার। ভুল তথ্য দিলে নাগরিকের সময়, অর্থ ও অধিকার ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।

এআই বানালো প্রথম কৃত্রিম ভাইরাস
নাগরিকের পক্ষে বোঝা কঠিন হয়, কোন ফর্ম কোথায় জমা দিতে হবে, কোন কাগজ লাগবে বা আবেদনের পরবর্তী ধাপ কী। বাংলা এআই এই তথ্যকে সহজ ভাষায় ব্যাখ্যা করতে পারে।

ঝুঁকিগুলো কোথায়

প্রথম ঝুঁকি হলো ভুল তথ্য। এআই অনেক সময় আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে এমন তথ্য দিতে পারে, যার কোনো ভিত্তি নেই। বাংলা ভাষায় এই সমস্যা আরও বাড়তে পারে, কারণ মডেল প্রশিক্ষণের জন্য মানসম্মত তথ্য কম ও যাচাইয়ের সরঞ্জাম সীমিত।

দ্বিতীয় ঝুঁকি হলো পক্ষপাত। প্রশিক্ষণ-তথ্যে যদি শহর, পুরুষ, মধ্যবিত্ত বা নির্দিষ্ট রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক গোষ্ঠীর ভাষা বেশি থাকে, তাহলে এআই অন্যদের অভিজ্ঞতাকে কম গুরুত্ব দিতে পারে। বাংলাদেশের গ্রাম, ভারতের বাংলা ভাষাভাষী অঞ্চল, প্রবাসী বাঙালি এবং বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর ভাষা ও বাস্তবতা এক নয়। একটি মডেল যদি কেবল প্রমিত শহুরে বাংলা জানে, তাহলে বহু মানুষ তার কাছে অদৃশ্য থেকে যাবেন।

তৃতীয় ঝুঁকি হলো ভাষাগত বৈষম্য। শক্তিশালী মডেলগুলো যদি বাংলায় নিম্নমানের উত্তর দেয়, প্রতিষ্ঠানগুলো আবার ইংরেজিকে বাধ্যতামূলক করে তুলতে পারে। এতে প্রযুক্তি ভাষার ব্যবধান কমানোর বদলে বাড়িয়ে দিতে পারে। বাংলা ছাড়াও চাকমা, সাঁওতালি, গারো, মণিপুরি ও অন্যান্য ভাষার জন্য একই প্রশ্ন প্রযোজ্য। ইউনেসকোর ভাষা ও এআই উদ্যোগগুলো ভাষাগত বৈচিত্র্য রক্ষার ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে। বাংলাদেশসম্পর্কিত ইউনেসকোর এক পর্যবেক্ষণে মানসম্মত ও বৈচিত্র্যময় তথ্যভান্ডার এবং দায়িত্বশীল তথ্য সংগ্রহের প্রয়োজনীয়তার কথা বলা হয়েছে।

চতুর্থ ঝুঁকি হলো কপিরাইট। বই, সংবাদ, অভিধান, গবেষণা ও লেখকদের রচনা অনুমতি ছাড়া এআই প্রশিক্ষণে ব্যবহার করা হলে সৃষ্টিশীল মানুষের অধিকার ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। বাংলা প্রকাশনাজগতের লেখক ও প্রকাশকদের জন্য এই প্রশ্ন আরও গুরুত্বপূর্ণ, কারণ তাঁদের বাজার তুলনামূলকভাবে ছোট এবং আয় সীমিত। ডব্লিউআইপিওর আলোচনায় এআই উন্নয়নের সঙ্গে কপিরাইট অবকাঠামো ও সৃষ্টিশীল মানুষের ন্যায্য সুরক্ষার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরা হয়েছে।

এআই কি বিশ্বের সবচেয়ে বড় গণিতবিদদেরও হারিয়ে দেবে
শক্তিশালী মডেলগুলো যদি বাংলায় নিম্নমানের উত্তর দেয়, প্রতিষ্ঠানগুলো আবার ইংরেজিকে বাধ্যতামূলক করে তুলতে পারে। এতে প্রযুক্তি ভাষার ব্যবধান কমানোর বদলে বাড়িয়ে দিতে পারে।

আমাদের করণীয় কী

বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে বাংলা ভাষার বড় ও বৈচিত্র্যময় তথ্যভান্ডার তৈরি করতে হবে। সংবাদ, সাহিত্য, কথ্য ভাষা, উপভাষা, সরকারি নথি, শিক্ষাসামগ্রী ও স্বাস্থ্য-তথ্য আলাদা মানদণ্ডে সংগ্রহ ও নথিভুক্ত করা দরকার। তথ্য সংগ্রহের সময় মানুষের অনুমতি, গোপনীয়তা ও পারিশ্রমিক নিশ্চিত করতে হবে।

সরকারকে বাংলা ও অন্যান্য স্থানীয় ভাষার জন্য উন্মুক্ত মান, গবেষণা তহবিল ও তথ্য-অবকাঠামো গড়ে তুলতে হবে। সরকারি সেবায় এআই ব্যবহারের আগে নিরপেক্ষ পরীক্ষা, মানবিক তদারকি ও অভিযোগ জানানোর ব্যবস্থা থাকা জরুরি।

প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোকে মডেলের সীমাবদ্ধতা প্রকাশ করতে হবে। কোন তথ্য দিয়ে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে, বাংলা সংস্করণ কতটা নির্ভুল, কোন ধরনের প্রশ্নে ভুলের সম্ভাবনা বেশি—এসব বিষয়ে ব্যবহারকারীকে জানানো দরকার। স্বাস্থ্য, আইন ও সরকারি সেবায় মানব যাচাই বাধ্যতামূলক করা যেতে পারে।

লেখক, অনুবাদক ও প্রকাশকদেরও আলোচনায় সক্রিয় হতে হবে। তাঁদের কাজ এআই প্রশিক্ষণে ব্যবহৃত হলে অনুমতি, স্বীকৃতি ও পারিশ্রমিকের কাঠামো তৈরি করা দরকার। একই সঙ্গে লেখকদের এআইকে কেবল প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে না দেখে গবেষণা, খসড়া তৈরি ও ভাষা সম্পাদনার সহায়ক হিসেবেও ব্যবহার করতে হবে।

মানুষের কণ্ঠে কথা বলবে কম্পিউটার! এআই-এর নতুন জাদুর দুনিয়া
লেখক, অনুবাদক ও প্রকাশকদেরও আলোচনায় সক্রিয় হতে হবে। তাঁদের কাজ এআই প্রশিক্ষণে ব্যবহৃত হলে অনুমতি, স্বীকৃতি ও পারিশ্রমিকের কাঠামো তৈরি করা দরকার।

মোদ্দাকথা, বাংলা ভাষায় এআইয়ের ভবিষ্যৎ নির্ভর করবে আমরা তাকে কত দ্রুত গ্রহণ করি তার ওপর নয়,  বরং কতটা সচেতনভাবে গড়ে তুলি তার ওপর। মানুষের ভাষা, স্মৃতি ও সৃষ্টিশীল শ্রমকে বাদ দিয়ে কোনো ভাষাভিত্তিক প্রযুক্তি দীর্ঘস্থায়ী আস্থা অর্জন করতে পারবে না।

ব্যক্তি এআই ব্যবহারের সময় তথ্য যাচাই করতে পারেন। প্রতিষ্ঠান বাংলা ভাষায় সেবা দেওয়ার পাশাপাশি মানবিক তদারকি রাখতে পারে। বিশ্ববিদ্যালয় গবেষণা ও তথ্যভান্ডার তৈরি করতে পারে। সরকার অধিকারভিত্তিক নীতি গ্রহণ করতে পারে। প্রযুক্তি কোম্পানি স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে পারে। লেখক ও অনুবাদক নিজেদের কাজের মূল্য ও অনুমতির প্রশ্ন সামনে রাখতে পারেন।

বাংলা ভাষা এআইয়ের যুগে টিকে থাকবে কি না, প্রশ্নটি তার চেয়ে বড়। প্রশ্ন হলো, এই নতুন প্রযুক্তির যুগে বাংলা কি নিজের কণ্ঠে কথা বলতে পারবে? সেই উত্তর নির্ভর করছে আজকের গবেষণা, নীতি, বিনিয়োগ এবং আমাদের সম্মিলিত সতর্কতার ওপর।

লেখক: সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার ও এআই বিহেভিয়োরাল রিসার্চারএআই কি এখন গণিত অলিম্পিয়াডের প্রশ্ন সমাধান করতে পারে

Read full story at source