‘গরিবের ট্রেন’ একে একে সব বন্ধ, ভোগান্তিতে মানুষ

· Prothom Alo

  • ২০২০ সালের মার্চে করোনাকালে চারটি লোকাল ও একটি মেইল ট্রেন বন্ধ করে দেয় রেলওয়ে।

  • সর্বশেষ গত সোমবার বন্ধ হয়ে যায় ময়মনসিংহ মেইল; স্থানীয়ভাবে যা নাসিরাবাদ মেইল নামেও পরিচিত।

    Visit syntagm.co.za for more information.

একসময় ভৈরব-ময়মনসিংহ রেলপথে ছয়টি লোকাল ও মেইল ট্রেন চলাচল করত। ১০-২০ টাকা ভাড়া দিয়ে সেসব ট্রেনে মানুষ পৌঁছে যেতেন দূরের বাজারে, কর্মস্থলে কিংবা বাড়িতে। করোনাকালে এই পথের চারটি লোকাল ও একটি মেইল ট্রেন বন্ধ হয়ে যায়। বাকি ছিল শুধু ময়মনসিংহ মেইল। সেটিও গত সোমবার থেকে বন্ধ।

কিশোরগঞ্জের ভৈরব থেকে ময়মনসিংহের দূরত্ব ১১৬ কিলোমিটার। এই পথে লোকাল ট্রেনের ভাড়া ৪০ টাকা, মেইল ট্রেনে লাগে ৫৫ টাকা। লোকাল–মেইল সব ট্রেন বন্ধের পর এখন চলছে শুধু আন্তনগর ট্রেন, যাতে এই পথের ভাড়া ১২৭ টাকা। সেটিও আবার সব স্টেশনে থামে না। ফলে কম ভাড়ায় যাতায়াতের সুযোগ হারিয়ে এই রেলপথের দরিদ্র ও নিম্ন আয়ের মানুষকে এখন বেশি টাকা খরচ করে গন্তব্যে যেতে হচ্ছে।

লোকোমোটিভ বা রেলের ইঞ্জিনের তীব্র সংকটের কারণে নাসিরাবাদ ট্রেন আপাতত বন্ধ রাখার কথা বলছে বাংলাদেশ রেলওয়ে। আবার কবে নাগাদ ট্রেনটি চালু হবে, সে সম্পর্কে সুনির্দিষ্ট তথ্য নেই রেলওয়ের কাছে।

লোকাল ও মেইল ট্রেন না থাকায় দরিদ্র ও নিম্ন আয়ের মানুষকে এখন বেশি টাকা খরচ করে গন্তব্যে যেতে হচ্ছে।

যমুনা সেতুর পূর্ব তীরে টাঙ্গাইলের ভূঞাপুর উপজেলার ইব্রাহিমাবাদ স্টেশন থেকে ভৈরব-ময়মনসিংহ রেলপথ হয়ে চট্টগ্রামে চলাচল করে ময়মনসিংহ মেইল, যা স্থানীয়ভাবে নাসিরাবাদ মেইল নামে পরিচিত। ইব্রাহিমাবাদ থেকে চট্টগ্রাম পর্যন্ত দূরত্ব ৬৩১ কিলোমিটার। ট্রেনটি ৫০টি স্টেশনে যাত্রাবিরতি দেয়। গন্তব্যে পৌঁছানোর দাপ্তরিক সময় ১৭ ঘণ্টা ২০ মিনিট। ইব্রাহিমাবাদ থেকে ট্রেনটি ছাড়ার সময় ভোররাত ৩টা। চট্টগ্রামে পৌঁছানোর সময় রাত ৮টা ২০ মিনিট। বিপরীতে চট্টগ্রাম থেকে ছাড়ে বিকেল ৪টা ১৫ মিনিটে। ইব্রাহিমাবাদ স্টেশনে পৌঁছায় পরদিন সকাল ৯টায়।

রেলওয়ে সূত্র জানায়, তিনটি রেক (ইঞ্জিন–বগিসহ ট্রেনের সেট) দিয়ে নাসিরাবাদ ট্রেনের চলাচল স্বাভাবিক রাখা হতো। এক মাস ধরে দুই দিন চলার পর এক দিন বন্ধ রাখা হচ্ছিল। পরে কোনো ঘোষণা ছাড়াই ট্রেনটির চলাচল বন্ধ করে দেওয়া হয়।

ভৈরব-ময়মনসিংহ রেলপথটি দেশের গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি রেলপথের সঙ্গে যুক্ত। এই পথ ব্যবহার করে ঢাকা-কিশোরগঞ্জ রুটের ট্রেন চলাচল করে। একই পথ দিয়ে চট্টগ্রামের ট্রেনও যায়। ঢাকা-কিশোরগঞ্জ পথে তিনটি আন্তনগর ট্রেন চলাচল করে। জামালপুর ও চট্টগ্রামের মধ্যে চলাচল করে বিজয় এক্সপ্রেস আন্তনগর ট্রেন।

২০২০ সালের ২৪ মার্চ ভৈরব-ময়মনসিংহ পথে চলাচল করা চারটি লোকাল ট্রেন বন্ধ হয়ে যায়। একই বছরের ১২ মার্চ বন্ধ হয় ঈশা খাঁ মেইল (৩৯/৪০)। ময়মনসিংহ থেকে ভৈরব হয়ে ঢাকায় চলাচল করা এই ট্রেন ‘গরিবের ট্রেন’ নামে পরিচিত ছিল।

২৭ স্টেশনে বেশি ভোগান্তি

ইব্রাহিমাবাদ থেকে ভৈরব পর্যন্ত দূরত্ব ৩৩৩ কিলোমিটার। এই পথে নাসিরাবাদ ট্রেনটি ২৭টি স্টেশনে থামে। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ট্রেনটি বন্ধ হওয়ায় এসব স্টেশনের যাত্রীরা সবচেয়ে বেশি সমস্যায় পড়েছেন। বিশেষ করে ছোট স্টেশন, যেখানে আন্তনগর ট্রেন থামে না।

আজিজুর রহমান, ভুক্তভোগী যাত্রীআগে কুমিল্লা থাইক্কা উঠতাম, নামতাম বাড়ির ইস্টিশনে (পূর্বধলা)। খরচ ১০০ টেহা। আইজ ভৈরব পর্যন্ত আইতে খরচ হইছে পৌনে তিন শ টেহা। কুমিল্লা যাইতে লাগব আরও ৬০ টেহা।

স্থানীয় বাসিন্দারা বলেন, এলাকার দরিদ্র ও নিম্ন আয়ের মানুষের প্রধান ভরসা ছিল লোকাল ও মেইল ট্রেন। এই রেলপথ ময়মনসিংহ, কিশোরগঞ্জ, শেরপুর ও জামালপুরের মানুষের যোগাযোগের গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম। এসব এলাকার বড় অংশের মানুষের জীবিকার সঙ্গে কৃষি ও স্থানীয় ব্যবসা জড়িত। কাপড়, জুতা, কসমেটিকস, চাটাই, ধান, দুধ, ডিম, কলা, মুরগি, ফল, শাকসবজিসহ বিভিন্ন কৃষিপণ্য এক বাজার থেকে অন্য বাজারে নেওয়া হয়।

কম ভাড়ার লোকাল ও মেইল ট্রেন এসব পণ্য পরিবহনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখত। লোকাল ট্রেনে সর্বনিম্ন ভাড়া ছিল পাঁচ টাকা। মেইল ট্রেনে সর্বনিম্ন ভাড়া ১৫ টাকা। আন্তনগর ট্রেনে সর্বনিম্ন ভাড়া ৪৫ টাকা বলে রেলওয়ে সূত্রে জানা গেছে।

স্থানীয় বাসিন্দারা বলেন, ট্রেন বন্ধ হওয়ায় এসব পণ্য পরিবহনের খরচ বাড়বে। একই সঙ্গে সাধারণ মানুষের যাতায়াত ব্যয়ও বাড়বে। এর প্রভাব পড়বে প্রান্তিক মানুষের জীবনে। স্টেশনকেন্দ্রিক ক্ষুদ্র অর্থনীতিও অচল হয়ে পড়বে।

শ্রমজীবী মানুষের খরচ বেড়েছে

বৃহত্তর ময়মনসিংহের অনেক মানুষ ভৈরব, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, সিলেট, কুমিল্লা ও চট্টগ্রামে শ্রমিক হিসেবে কাজ করেন। বাড়ি ও কর্মস্থলে যাতায়াতের প্রধান বাহন ছিল নাসিরাবাদ ট্রেন। ট্রেনটিতে কখনো যাত্রীর সংকট হতো না।

মোহাম্মদ সফিকুর রহমান, বাংলাদেশ রেলওয়ের চিফ অপারেটিং সুপারিনটেনডেন্ট (পূর্ব) মূলত লোকোমোটিভ (ইঞ্জিন) সংকটের কারণে নাসিরাবাদ ট্রেনটি বন্ধ রাখা হয়েছে। এটি সাময়িক। লোকোমোটিভের সমস্যা কমে এলে ট্রেনটি আবার চালু করা হবে।

গত বুধবার দুপুর পৌনে ১২টার দিকে ভৈরব রেলওয়ে স্টেশনের ২ নম্বর প্ল্যাটফর্মে অসংখ্য শ্রমজীবী মানুষকে ট্রেনের জন্য অপেক্ষা করতে দেখা যায়। তাঁদের একটি দলে ছিলেন আজিজুর রহমান, মুর্শিদ মিয়া, আইজউদ্দিন ও জুয়েল মিয়া। তাঁদের সবার বাড়ি নেত্রকোনার পূর্বধলায়। তাঁরা কুমিল্লার বিভিন্ন গ্রামে কৃষিশ্রমিক হিসেবে কাজ করেন। বাড়ি যাতায়াত করেন মাসে একবার। এক সপ্তাহ আগে তাঁরা নাসিরাবাদ ট্রেনে বাড়ি এসেছিলেন। বুধবার কুমিল্লায় ফেরার পথে পূর্বধলা স্টেশনে গিয়ে জানতে পারেন ট্রেনটি বন্ধ। বাধ্য হয়ে কয়েকবার যানবাহন বদলে সড়কপথে ভৈরব স্টেশনে আসেন। এখান থেকে কর্ণফুলী ট্রেনে কুমিল্লা যাওয়ার অপেক্ষায় ছিলেন।

আজিজুর রহমান বলেন, ‘আগে কুমিল্লা থাইক্কা উঠতাম, নামতাম বাড়ির ইস্টিশনে (পূর্বধলা)। খরচ ১০০ টেহা। আইজ ভৈরব পর্যন্ত আইতে খরচ হইছে পৌনে তিন শ টেহা। কুমিল্লা যাইতে লাগব আরও ৬০ টেহা।’ খরচের হিসাব কষে আজিজুর জানান, বাড়ি থেকে ১০ টাকা অটোরিকশা ভাড়া দিয়ে পূর্বধলায় এসেছেন। সেখান থেকে ৪০ টাকায় সিএনজিচালিত অটোরিকশায় শ্যামগঞ্জ। তারপর আরও ৪০ টাকায় গৌরীপুর এবং ১৫ টাকায় খলতাপাড়া যান। এরপর ১৫০ টাকা বাসভাড়া দিয়ে ভৈরব পৌঁছান। স্টেশনে পর্যন্ত আসতে আরও ১৫ টাকা খরচ হয়। কুমিল্লা পর্যন্ত ট্রেনভাড়া ৬০ টাকা।

আজিজুরের কথা শেষ না হতেই দলের আরেক সদস্য আইজউদ্দিন বলেন, আগে এক মাস বা দেড় মাস পরপর বাড়ি যেতেন। নাসিরাবাদ বন্ধ হওয়ায় এখন তিন মাসের আগে বাড়ির নামও নেওয়া যাবে না।

আবার কবে চালু হবে

রেলওয়ের একজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, করোনার সময় বন্ধ হওয়া দেশের অনেক রুটের ট্রেন পরে চালু হয়েছে। কিন্তু ভৈরব-ময়মনসিংহ পথের লোকাল ট্রেনগুলো আর ফেরেনি।

বাংলাদেশ রেলওয়ের চিফ অপারেটিং সুপারিনটেনডেন্ট (পূর্ব) মোহাম্মদ সফিকুর রহমান বলেন, মূলত লোকোমোটিভ (ইঞ্জিন) সংকটের কারণে নাসিরাবাদ ট্রেনটি বন্ধ রাখা হয়েছে। এটি সাময়িক। লোকোমোটিভের সমস্যা কমে এলে ট্রেনটি আবার চালু করা হবে। মালামাল পরিবহনের সমস্যা কিছুটা কমাতে বিজয় এক্সপ্রেসের সঙ্গে আপাতত একটি লাগেজ বগি যুক্ত করা হয়েছে। কবে নাগাদ ট্রেনটি চালু হবে, জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘অপেক্ষা করতে হবে।’

Read full story at source