নেতানিয়াহু যেভাবে আমেরিকাকে হারিয়ে ফেললেন
· Prothom Alo

যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ইসরায়েলের ‘অপরিহার্য’ যে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক, তা পুনর্নবায়নের তাগিদে বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু যখন তাঁর সাম্প্রতিক ওয়াশিংটন সফর শুরু করেন, ঠিক তখনই প্রকাশিত এক জনমত জরিপ তুলে ধরল সম্পর্কের ভিত্তিটা ঠিক কতটা নাটকীয়ভাবে বদলে গেছে।
Visit grenadier.co.za for more information.
গত ২৮ জুলাই প্রকাশিত দ্য ইকোনমিস্ট/ইউগভ-এর সেই জরিপে দেখা গেছে, ৪৯ শতাংশ আমেরিকান মনে করেন, আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের (আইসিসি) জারি করা গ্রেপ্তারি পরোয়ানা অনুযায়ী ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রীকে গ্রেপ্তার করা উচিত।
আরও আতঙ্কের বিষয় হলো, ৪৭ শতাংশ আমেরিকান বিশ্বাস করেন, নেতানিয়াহু গাজায় যুদ্ধাপরাধ ঘটিয়েছেন। মাত্র এক দশক আগেও এই ধরনের জনমত চিন্তার বাইরে ছিল। আজ এটাই সবচেয়ে স্পষ্ট প্রমাণ যে যা এড়াতে আগের প্রজন্মগুলোর ইসরায়েলের নেতারা জীবনভর চেষ্টা করে গেছেন, নেতানিয়াহু তা-ই বাস্তবে রূপ দিয়েছেন। ডেমোক্র্যাট-রিপাবলিকান উভয় দলের সমর্থনের জায়গা থেকে ইসরায়েলকে টেনে নামিয়ে তিনি পরিণত করেছেন মার্কিন পররাষ্ট্রনীতির সবচেয়ে বিতর্কিত ও মেরুকৃত এক উপাদানে।
ট্রাম্প ও নেতানিয়াহু মূলত ‘জেনোসাইড পুরস্কারের’ যোগ্যএই নাটকীয় মোড় কিন্তু ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবরের হামলা বা গাজার বর্তমান ভয়াবহ ধ্বংসস্তূপ দিয়ে শুরু হয়নি। সেই ঘটনাগুলো স্রেফ নেতানিয়াহুর বহু বছর আগে শুরু করা এক প্রক্রিয়ার গতি বাড়িয়ে দিয়েছে মাত্র।
তাঁর সবচেয়ে বড় কৌশলগত ব্যর্থতাটি ছিল রাজনৈতিক। যুক্তরাষ্ট্রের কেবল একটি দলের (রিপাবলিকান) কাঁধে ভর দিয়ে এবং অন্য দলকে (ডেমোক্র্যাট) তোয়াক্কা না করে নেতানিয়াহু সেই ঐতিহাসিক দ্বিপক্ষীয় ঐক্য ভেঙেচুরে দিয়েছেন, যা দশকের পর দশক ধরে দুই দেশের সম্পর্ককে টিকিয়ে রেখেছিল।
জন্মের পর থেকেই ইসরায়েলের নেতারা বুঝেছিলেন, ইসরায়েলকে কোনো নির্দিষ্ট দলের এজেন্ডা বানিয়ে ফেলা যাবে না। দুই দলের কাছেই ইসরায়েল ছিল এক কৌশলগত অংশীদার, যার নিরাপত্তা দলীয় রাজনীতির ঊর্ধ্বে। মার্কিন সামরিক সহায়তা প্যাকেজের চেয়েও এই রাজনৈতিক ঐক্যটি ছিল বহুগুণ মূল্যবান। নেতানিয়াহু উত্তরাধিকার সূত্রে সেই অমূল্য সম্পদটি পেয়েছিলেন, আর আজ তিনি নিজ হাতে তা বিনষ্টের দ্বারে নিয়ে গেছেন।
ইসরায়েলি হামলায় গাজা পরিণত হয়েছে এক ধ্বংসস্তূপেবিদ্রূপের বিষয় হলো, নেতানিয়াহুর চেয়ে আমেরিকাকে ভালো চেনা রাজনৈতিক নেতা খুব কমই আছেন। যুক্তরাষ্ট্রে পড়াশোনা, মার্কিন রাজনৈতিক মারপ্যাঁচে দক্ষতা আর ওয়াশিংটনের ক্ষমতার অলিগলিতে তাঁর অবাধ বিচরণ ছিল। কিন্তু এই অতিরিক্ত জানাশোনাই তাঁর জন্য কাল হয়ে দাঁড়াল।
আমেরিকায় জনসংখ্যা ও আদর্শিক পরিবর্তনের হাওয়া চিরতরে রিপাবলিকানদের ক্ষমতায় রাখবে—এমন ভুল সমীকরণে বসে নেতানিয়াহু আগের প্রধানমন্ত্রীদের তৈরি ভারসাম্য ত্যাগ করলেন এবং রিপাবলিকান ডেরায় পুরোপুরি বাজি ধরলেন।
ফাটলটা স্পষ্ট হয়ে ওঠে ২০১৫ সালে। ডেমোক্র্যাট প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামাকে একরকম বুড়ো আঙুল দেখিয়ে রিপাবলিকানদের আমন্ত্রণে মার্কিন কংগ্রেসে ইরান পারমাণবিক চুক্তি নিয়ে বক্তব্য দিতে ছোটেন নেতানিয়াহু। কনজারভেটিভরা এটিকে ‘সাহসিকতা’ বলে তালি দিলেও, কৌশলগতভাবে এটি ছিল এক আত্মঘাতী মোড়।
ইতিহাসে কোনো ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী মার্কিন প্রেসিডেন্টের নীতিকে এভাবে সরাসরি চ্যালেঞ্জ করেননি। ফলে কোটি কোটি ডেমোক্র্যাট নিশ্চিত হন—ইসরায়েল দল বেছে নিয়েছে। আর সেই ধাক্কা ইরান চুক্তির মেয়াদ শেষ হওয়ার পরও থেকে গেছে।
জনমত জরিপের এই ফল কেবল নেতানিয়াহুর ব্যক্তিস্বার্থের বিষয় নয়। প্রায় অর্ধেক আমেরিকান যখন নিজের দেশের সবচেয়ে পুরোনো বন্ধুরাষ্ট্রের প্রধানকে গ্রেপ্তারের যোগ্য বা ‘যুদ্ধাপরাধী’ মনে করেন, তখন বুঝতে হবে জনমানসে কতটা গভীর পরিবর্তন এসে গেছে। জরিপের হিসাব সাময়িক হতে পারে, কিন্তু প্রজন্মের পরিবর্তনের সঙ্গে ভাবমূর্তির যে পরিবর্তন হয়, তা সহজে বদলায় না।
ডোনাল্ড ট্রাম্পের মেয়াদে নেতানিয়াহুর মনে হয়েছিল, তাঁর চাল বুঝি সফল। ট্রাম্প জেরুজালেমকে স্বীকৃতি দিলেন, মার্কিন দূতাবাস সরালেন, গোলান মালভূমিতে ইসরায়েলের সার্বভৌমত্ব মেনে নিলেন, ইরান চুক্তি ছুড়ে ফেললেন এবং ফিলিস্তিন রাষ্ট্র গঠনের দাবি একদম ধামাচাপা দিলেন। নেতানিয়াহু এই সাফল্যগুলোকে স্থায়ী ভেবে ভুল করলেন। তিনি ভাবলেন, রিপাবলিকানদের আনুগত্য পেলেই বুঝি ডেমোক্র্যাটদের সমর্থন আর লাগে না।
কিন্তু কৌশলগতভাবে এটি ছিল ভীষণ সংকীর্ণ চিন্তা। কোনো আন্তর্জাতিক জোট টিকিয়ে রাখতে হলে প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তি ও বহুদলীয় গ্রহণযোগ্যতা লাগে—কোনো এক মেয়াদি প্রশাসনের ওপর ভর করে তা বাঁচে না। ইসরায়েলকে কেবল রিপাবলিকান পার্টির ব্র্যান্ড বানিয়ে নেতানিয়াহু জোটটিকে এমন সময়ে দুর্বল করলেন, যখন এটি অক্ষুণ্ণ রাখা সবচেয়ে জরুরি ছিল।
গাজায় ইসরায়েলের নির্বিচার হামলা সেই দুর্বলতার আসল রূপটি উন্মোচিত করে দিল। ৭ অক্টোবরের পর নিজের দল ডেমোক্র্যাটদের তীব্র চাপ সত্ত্বেও প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন ইসরায়েলকে নজিরবিহীন সামরিক, কূটনৈতিক ও রাজনৈতিক সুরক্ষা দিয়েছিলেন।
বিশ্বজুড়ে জোরালো প্রতিবাদের পরও গাজায় গণহত্যা অব্যাহত রাখে ইসরায়েলযুদ্ধের মধ্যে তিনি ইসরায়েল সফর করেন, অস্ত্র পাঠাতে তর সইছিল না তাঁর, জাতিসংঘেও ইসরায়েলের ঢাল হয়ে দাঁড়ান। কিন্তু নেতানিয়াহু এই উপকারের জবাব দিলেন বারবার হোয়াইট হাউসকে প্রকাশ্যে অপদস্থ করে।
ওয়াশিংটন অস্ত্র আটকে রাখছে বলে অভিযোগ তোলা, যুদ্ধপরবর্তী গাজার পরিকল্পনা প্রত্যাখ্যান করা এবং মানবিক সহায়তা আটকে দেওয়া—সবই করলেন তিনি। বাইডেন যখন নিজ দেশে রাজনৈতিক পুঁজি জলাঞ্জলি দিচ্ছিলেন, নেতানিয়াহু তখন আমেরিকার বিশ্বাস ধরে রাখার চেয়ে নিজের দেশের সমর্থকদের কাছে বীরত্ব দেখাতে বেশি ব্যস্ত ছিলেন।
এদিকে এই যুদ্ধের নির্মম রূপ বিশ্বমঞ্চে ইসরায়েলের প্রতিচ্ছবি পুরোপুরি বদলে দিয়েছে। হাসপাতাল, স্কুল, বিশ্ববিদ্যালয়সহ গোটা গাজাকে ধ্বংসস্তূপে পরিণত করা এবং চরম মানবিক সংকট তৈরি করার ফলে বিশ্বজুড়ে প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। তাঁর সরকারের কট্টরপন্থী মন্ত্রীরা প্রকাশ্যে ফিলিস্তিনিদের উচ্ছেদ ও স্থায়ী সামরিক দখলের সাফাই গাইছেন। এটি আইনি বিচারে যুদ্ধাপরাধ কি না, তা আদালত ঠিক করবেন, কিন্তু রাজনৈতিকভাবে রায় আগেই হয়ে গেছে—শুধু বিশ্বজুড়ে নয়, স্বয়ং আমেরিকার ভেতরেও।
গাজা দখল করে ‘বৃহত্তর ইসরায়েল’ গড়তে চান নেতানিয়াহুনেতানিয়াহু নির্মমভাবে হেরে গেছেন, এখন তাঁকে সরে দাঁড়াতেই হবেজনমত জরিপের এই ফল কেবল নেতানিয়াহুর ব্যক্তিস্বার্থের বিষয় নয়। প্রায় অর্ধেক আমেরিকান যখন নিজের দেশের সবচেয়ে পুরোনো বন্ধুরাষ্ট্রের প্রধানকে গ্রেপ্তারের যোগ্য বা ‘যুদ্ধাপরাধী’ মনে করেন, তখন বুঝতে হবে জনমানসে কতটা গভীর পরিবর্তন এসে গেছে। জরিপের হিসাব সাময়িক হতে পারে, কিন্তু প্রজন্মের পরিবর্তনের সঙ্গে ভাবমূর্তির যে পরিবর্তন হয়, তা সহজে বদলায় না।
এর মাশুল এখন রাজনীতিতে স্পষ্ট। ডেমোক্র্যাটদের ভেতরে আগের সেই অন্ধ সমর্থন আর নেই; তারা এখন আন্তর্জাতিক আইন মেনে সামরিক সহায়তা দেওয়ার শর্ত চাপাচ্ছে। তরুণ আমেরিকানরা এখন এই সংকটকে আর ‘ঐতিহাসিক মিত্রতা’র চশমায় দেখে না, বরং দেখে ‘দখলদারি’, ‘বর্ণবাদ’ ও ‘মানবাধিকারের’ দৃষ্টিকোণ থেকে। এমনকি রিপাবলিকানদের ভেতরের নতুন প্রজন্মের ডানপন্থীরাও এখন চিরতরে অন্য দেশে সাহায্য পাঠানোর বিপক্ষে কথা বলতে শুরু করেছে।
নেতানিয়াহুর বর্তমান চরমপন্থী কোয়ালিশন সরকার সংকটকে আরও ঘনীভূত করেছে। উগ্র জাতীয়তাবাদী মন্ত্রীদের সরকারের অংশ বানিয়ে, যাঁরা প্রকাশ্যে ফিলিস্তিন ভূখণ্ড দখলের কথা বলেন, তিনি রাষ্ট্রীয় নীতি ও উগ্রবাদী মতাদর্শের মাঝের সীমান্ত মুছে দিয়েছেন।
সবচেয়ে গুরুতর বিষয় হচ্ছে, এই সংঘাতের অবসান ঘটানোর জন্য কোনো রকম আন্তরিক বা গভীর রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গির সম্পূর্ণ অনুপস্থিতি। নেতানিয়াহু ক্রমাগত ফিলিস্তিন রাষ্ট্র গঠনের যেকোনো অর্থপূর্ণ আলোচনা নাকচ করেছেন, গাজায় ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষের প্রত্যাবর্তনের বিরোধিতা করেছেন এবং দীর্ঘমেয়াদি সামরিক নিয়ন্ত্রণ ছাড়া গাজা পুনর্গঠনের কোনো গ্রহণযোগ্য রূপরেখা দিতে পারেননি।
সামরিক শক্তি দিয়ে হয়তো অবকাঠামো ধ্বংস করা যায় কিংবা সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোকে দুর্বল করে ফেলা যায়; কিন্তু জমি, সার্বভৌমত্ব ও আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকারের মতো মৌলিক দাবির ওপর গড়ে ওঠা একটি জাতীয় সংঘাতকে কেবল শক্তি প্রয়োগ করে কখনোই সমাধান করা সম্ভব নয়।
ইতিহাস হয়তো সাময়িক কৌশলগত জয়গুলোকে ক্ষমা করে দেয়, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত ব্যর্থতাকে ক্ষমা করে না। সুবিধাজনক মার্কিন সরকারের আমলে নেতানিয়াহু হয়তো অনেক কিছু আদায় করে নিয়েছেন, কিন্তু সেই সবকিছু দাঁড়িয়ে ছিল দশকের পর দশক ধরে গড়ে ওঠা এক অটল ভিত্তির ওপর—যেখানে উভয় দলই ইসরায়েলকে একটি ‘গণতান্ত্রিক মিত্র’ মনে করত। সেই ভিত্তিটিই এখন ভেঙে চুরমার হয়ে যাচ্ছে।
ওয়াশিংটনে নেতানিয়াহু যখন আবার গেছেন সম্পর্ক জোড়া লাগাতে, তখন আমেরিকার অর্ধেক মানুষ তাঁকে বন্ধু হিসেবে নয়, একজন সম্ভাব্য অপরাধী হিসেবে দেখছে—এর চেয়ে বড় রূপক আর কী হতে পারে?
সামরিক শক্তি দিয়ে শত্রু ঠেকানো যায়, কিন্তু হারানো রাজনৈতিক গ্রহণযোগ্যতা শক্তি দিয়ে ফিরিয়ে আনা যায় না। বিশ্বাস ও সর্বদলীয় সমর্থন হলো এমন এক কৌশলগত সম্পদ, যা অর্জনে কয়েক প্রজন্ম লাগে, কিন্তু ধ্বংস করতে কয়েক মুহূর্তই যথেষ্ট।
ভবিষ্যৎ ইতিহাসবিদেরা যদি কখনো খোঁজেন—কোন বিন্দু থেকে ওয়াশিংটনে ইসরায়েলের ধরাছোঁয়ার বাইরের অবস্থানের পতন শুরু হয়েছিল, তবে তাঁরা তেহরান, গাজা কিংবা বৈরুতের দিকে তাকাবেন না। তাঁরা তাকাবেন ওয়াশিংটনের দিকে এবং আঙুল তুলবেন নেতানিয়াহুর নেওয়া সিদ্ধান্তগুলোর দিকেই।
সৈয়দ আরিকাত ওয়াশিংটনভিত্তিক সাংবাদিক। আল–জাজিরা থেকে অনূদিত