তিন ঘটনা থেকে যেভাবে ভৈরবে স্থানীয় দ্বন্দ্ব হয়ে গেল ‘জাতীয়’ দুর্ভোগ

· Prothom Alo

স্থানীয় বিরোধ কীভাবে ‘জাতীয়’ দুর্ভোগের কারণ হয়ে উঠতে পারে, তার উদাহরণ ভৈরবের সাম্প্রতিক তিনটি ঘটনা। ফুটবল খেলা দেখতে গিয়ে স্থানীয় দুটি এলাকার মানুষের মধ্যে কথা-কাটাকাটি থেকে প্রথম ঘটনার সূত্রপাত। দ্বিতীয় ঘটনার নেপথ্যে মাইক্রোবাসস্ট্যান্ডের নিয়ন্ত্রণ। আর তৃতীয় ঘটনার পেছনে কাজ করেছে একটি বাজারের নামকরণ নিয়ে বিরোধ।

গত দেড় মাসের এই তিন ঘটনাকে কেন্দ্র করে ঢাকা-চট্টগ্রাম, ঢাকা-সিলেটসহ রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের বিভিন্ন রুটে এক দিন টানা ছয় ঘণ্টা ট্রেন চলাচল বন্ধ ছিল। আরেক দিন সাড়ে পাঁচ ঘণ্টা ঢাকা–সিলেট মহাসড়ক অবরুদ্ধ করে রাখা হয়েছিল। আর তৃতীয় ঘটনায় মানুষের বাড়ি–ঘরে আগুন দেওয়া হয়। সম্পদের ক্ষতির পাশাপাশি প্রাণ যায় দুজনের।

Visit chickenroadslot.pro for more information.

ভৈরবে ব্যক্তিগত ও বংশগত বিরোধ, এলাকায় প্রভাব ধরে রাখা নিয়ে মারামারি, ফেসবুকে করা মন্তব্য কিংবা খেলা নিয়ে কথা–কাটাকাটি থেকে সংঘর্ষের প্রভাব এখন আর স্থানীয় পর্যায়ে সীমাবদ্ধ থাকছে না। পাড়াভিত্তিক সংঘর্ষের প্রভাব ছড়িয়ে পড়ছে মহাসড়কে–রেললাইনে। এতে হাজারো মানুষের ভোগান্তির পাশাপাশি রাষ্ট্রীয় সম্পদের ক্ষতি হচ্ছে।

ফুটবল খেলা দেখতে গিয়ে স্থানীয় দুটি এলাকার মানুষের মধ্যে কথা-কাটাকাটি থেকে প্রথম ঘটনার সূত্রপাত। দ্বিতীয় ঘটনার নেপথ্যে মাইক্রোবাসস্ট্যান্ডের নিয়ন্ত্রণ। আর তৃতীয় ঘটনার পেছনে কাজ করেছে একটি বাজারের নামকরণ নিয়ে বিরোধ।

ভৈরব সার্কেলের সহকারী পুলিশ সুপার আবু মুসা শেখ প্রথম আলোকে বলেন, এসব সংঘর্ষের বেশির ভাগই আকস্মিকভাবে শুরু হয়। আগাম কোনো তথ্য থাকে না। মুহূর্তেই পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়। ফলে পরিস্থিতি দ্রুত নিয়ন্ত্রণে আনা অনেক সময় কঠিন হয়ে পড়ে।

ভৈরব পৌরসভার দুটি এলাকা পঞ্চবটি ও জগন্নাথপুর। এই দুই এলাকার তরুণেরা ফুটবল খেলার আয়োজন করেছিলেন। খেলা চলার সময় দুই পক্ষের সমর্থকদের মধ্যে কথা-কাটাকাটি হয়। সেই বিরোধ থেকে শুরু হওয়া সংঘর্ষ গত ৪ জুন রাতে ভৈরব রেলস্টেশনে ছড়িয়ে পড়ে।

সেদিন স্থানীয় এ সংঘর্ষের ‘মঞ্চ’ হয় রেলস্টেশনের দুটি প্ল্যাটফর্ম। পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছায় প্রায় ছয় ঘণ্টা ঢাকা-চট্টগ্রাম, ঢাকা-সিলেট, ঢাকা-নোয়াখালীসহ পূর্বাঞ্চলের বিভিন্ন রুটে ট্রেন চলাচল বন্ধ রাখতে হয়। পরিস্থিতি মোকাবিলা করতে গিয়ে আহত হন পুলিশের ছয় সদস্য।

স্টেশনের বিভিন্ন স্থাপনা ও রেলওয়ে থানার গাড়িও সেদিন ভাঙচুর করা হয়। লুটপাট করা হয় রেলস্টেশন এলাকার অন্তত ১৫টি দোকানে। ব্যবসায়ীদের দাবি, লুট হওয়া পণ্যের মূল্যই প্রায় ১০ লাখ টাকা।

ফুটবলা খেলা দেখাকে কেন্দ্র করে দুই পক্ষের সমর্থকদের ওই সংঘর্ষে সেদিন ভৈরবসহ আশপাশের স্টেশনে আটকা পড়েছিলেন মহানগর গোধূলী, পারাবত এক্সপ্রেস, এগারসিন্ধুর এক্সপ্রেসসহ ১০ থেকে ১২টি ট্রেনের ৭–৮ হাজার যাত্রী।

সেদিন স্থানীয় এ সংঘর্ষের ‘মঞ্চ’ হয় রেলস্টেশনের দুটি প্ল্যাটফর্ম। পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছায় প্রায় ছয় ঘণ্টা ঢাকা-চট্টগ্রাম, ঢাকা-সিলেট, ঢাকা-নোয়াখালীসহ পূর্বাঞ্চলের বিভিন্ন রুটে ট্রেন চলাচল বন্ধ রাখতে হয়। পরিস্থিতি মোকাবিলা করতে গিয়ে আহত হন পুলিশের ছয় সদস্য।

স্থানীয় এই দ্বন্দ্ব ‘জাতীয়’ দুর্ভোগে পরিণত হওয়ার বিষয়ে ভৈরবের রফিকুল ইসলাম মহিলা কলেজের ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ ও সমাজকর্ম বিভাগের অধ্যাপক মোহাম্মদ শহীদুল্লাহ মনে করেন, মানুষের দুর্ভোগ হলো কী হলো না—এই চিন্তা কারও মধ্যে আসলে সেভাবে কাজ করে না। সবাই ক্ষমতার জোর দেখাতে চায়। বংশগত পরিচয়কে বড় করে দেখা, ভৌগোলিক অবস্থানের সুবিধা নিয়ে প্রতিপক্ষের ওপর দাপট দেখানো, এর বাইরে অন্য কোনো বিবেচনা কাজ করে না—সাম্প্রতিক একাধিক ঘটনায় এটিই দেখা গেছে।

ভৈরবে যা ঘটেছে, তা নিয়ন্ত্রণে জরুরি ভিত্তিতে পাড়াভিত্তিক সচেতনতা ও সামাজিক উদ্যোগ নেওয়া দরকার বলে মনে করেন অধ্যাপক মোহাম্মদ শহীদুল্লাহ। তিনি বলেন, দলীয় দৃষ্টিভঙ্গীর বাইরে গিয়ে স্থানীয় প্রশাসন ও জনপ্রতিনিধিরা একজোট হয়ে সচেতনতা তৈরির কাজটি শুরু করতে হবে। না হলে সামনে আরও খারাপ কিছু ঘটনার আশঙ্কা আছে।

অধ্যাপক মোহাম্মদ শহীদুল্লাহ, ভৈরবের রফিকুল ইসলাম মহিলা কলেজের ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষমানুষের দুর্ভোগ হলো কী হলো না—এই চিন্তা কারও মধ্যে আসলে সেভাবে কাজ করে না। সবাই ক্ষমতার জোর দেখাতে চায়। বংশগত পরিচয়কে বড় করে দেখা, ভৌগোলিক অবস্থানের সুবিধা নিয়ে প্রতিপক্ষের ওপর দাপট দেখানো, এর বাইরে অন্য কোনো বিবেচনা কাজ করে না—সাম্প্রতিক একাধিক ঘটনায় এটিই দেখা গেছে।

স্থানীয় ‘দখলে’ জাতীয় ক্ষতি

ভৈরব পৌর এলাকায় মাইক্রোবাসস্ট্যান্ডের দখলকে কেন্দ্র করে ১০ জুন সংঘর্ষ জড়ায় স্থানীয় দুটি পক্ষ। পৌর শহরের ভৈরবপুর ও কমলপুর এলাকার কিছু মানুষের মধ্যে প্রথমে সংঘর্ষ শুরু হয়। পরে এ সংঘর্ষ চলে আসে ঢাকা-সিলেট মহাসড়কে। একপর্যায়ে বন্ধ হয়ে যায় ভৈরব-ময়মনসিংহ আঞ্চলিক মহাসড়কও।

১০ জুন সন্ধ্যার পর শুরু হওয়া এই সংঘর্ষ চলে রাত দুইটা পর্যন্ত। এতে প্রায় সাড়ে পাঁচ ঘণ্টা দেশের অন্যতম ব্যস্ত দুটি সড়কে যান চলাচল বন্ধ থাকে। সেদিন রাতে দুই মহাসড়কেই কয়েক কিলোমিটার দীর্ঘ যানজট তৈরি হয়। সংঘর্ষে পুলিশের তিন সদস্যসহ অন্তত ২০ জন আহত হন। ভাঙচুর করা হয় কয়েকটি যানবাহন।

ভৈরব পৌর এলাকায় মাইক্রোবাসস্ট্যান্ডের দখলকে কেন্দ্র করে ১০ জুন সংঘর্ষ জড়ায় স্থানীয় দুটি পক্ষ। পৌর শহরের ভৈরবপুর ও কমলপুর এলাকার কিছু মানুষের মধ্যে প্রথমে সংঘর্ষ শুরু হয়। পরে এ সংঘর্ষ চলে আসে ঢাকা-সিলেট মহাসড়কে। একপর্যায়ে বন্ধ হয়ে যায় ভৈরব-ময়মনসিংহ আঞ্চলিক মহাসড়কও।

বাজারের নাম নিয়ে দ্বন্দ্ব

ভৈরব-ময়মনসিংহ আঞ্চলিক মহাসড়ক গেছে আকবরনগর ও মিরারচর গ্রামের ভেতর দিয়ে। ভৈরবের এই দুই গ্রামের ভেতর দিয়ে গেছে ভৈরব-ময়মনসিংহ রেলপথও। ২০২৩ সালের জুলাই মাসে ভৈরব-ময়মনসিংহ মহাসড়কের পাশে সড়ক ও জনপথ (সওজ) বিভাগ একটি সচেতনতামূলক সাইনবোর্ড বসানোর পর দুই গ্রামের মানুষের মধ্যে বিরোধ তৈরি হয়।

সাইনবোর্ডে লেখা ‘আকবরনগর বাজার। উল্টো পথে আর নয়, নিয়মনীতির হবে জয়।’

এই সাইনবোর্ডে কেন শুধু ‘আকবরনগর বাজার’ লেখা হলো তা নিয়ে ২৭ জুলাই দুই গ্রামের মানুষের সংঘর্ষে ২ জন নিহত ও আহত হন অন্তত ২৫ জন। সেদিন সংঘর্ষ, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের সময় সাড়ে পাঁচ ঘণ্টা বন্ধ ছিল ভৈরব-ময়মনসিংহ রেলপথে ট্রেন চলাচল। একটি ট্রেনের যাত্রাও বাতিল করা হয়।

সেদিন সংঘর্ষের পর শুরু হয় অগ্নিসংযোগ ও লুটপাট। পুড়িয়ে দেওয়া হয় ৪০টি ঘর।

ভৈরব কিশোরগঞ্জ জেলার অধীন। কিশোরগঞ্জের পুলিশ সুপার মিজানুর রহমান প্রথম আলোকে বলেন, ভৈরবের সাম্প্রতিক সংঘর্ষগুলো বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, কোনো ঘটনার মূল কারণ বড় নয়, কিন্তু পরিণতি ভয়াবহ। প্রভাব স্থানীয় এলাকা ছাড়িয়ে জাতীয় পর্যায়ে পৌঁছে যাচ্ছে। কেন এমন হচ্ছে—এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, মানুষের মধ্যে অস্থিরতা বেড়েছে।

অস্থিরতা বেড়েছে

প্রতিটি সংঘর্ষের পর মামলা হয়েছে। কিন্তু তদন্ত ও বিচারের অগ্রগতি নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। প্রথম দুটি ঘটনায় তিনটি মামলা হয়েছে। সর্বশেষ বাজারকেন্দ্রিক সংঘর্ষের ঘটনায় ভৈরব থানায় দুটি হত্যা মামলা করা হয়। এই পাঁচ মামলায় এজাহারভুক্ত আসামি করা হয়েছে ১০৬ জনকে। অজ্ঞাতনামা আসামির সংখ্যা সাড়ে তিন হাজারের বেশি।

স্থানীয় বাসিন্দারা বলছেন, এ ধরনের সংঘর্ষের ঘটনায় শেষ পর্যন্ত মীমাংসা বা সামাজিক সমঝোতা হয়।

ভৈরব কিশোরগঞ্জ জেলার অধীন। কিশোরগঞ্জের পুলিশ সুপার মিজানুর রহমান প্রথম আলোকে বলেন, ভৈরবের সাম্প্রতিক সংঘর্ষগুলো বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, কোনো ঘটনার মূল কারণ বড় নয়, কিন্তু পরিণতি ভয়াবহ। প্রভাব স্থানীয় এলাকা ছাড়িয়ে জাতীয় পর্যায়ে পৌঁছে যাচ্ছে। কেন এমন হচ্ছে—এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, মানুষের মধ্যে অস্থিরতা বেড়েছে।

Read full story at source