বাংলার বর্ষা ঋতু ইংরেজদের কাছে কেন বিভীষিকাময় স্মৃতি
· Prothom Alo

‘আজি ঝরো ঝরো মুখর বাদর দিনে...’—বাংলার মানুষের কাছে বর্ষার নাম উচ্চারিত হলেই যেন এমনই কোনো সুর ভেসে আসে। কালিদাসের মেঘদূত থেকে রবীন্দ্রনাথ, জীবনানন্দ, নজরুল—বাংলা সাহিত্য বর্ষাকে দেখেছে প্রেম, প্রতীক্ষা, উর্বরতা আর জীবনের নবজাগরণের প্রতীক হিসেবে। কদমফুল ফোটা, টিনের চালে বৃষ্টির টুপটাপ শব্দ, নদীতে ফুলে ওঠা ঢেউ কিংবা নৌকার পাল—এসবই বাঙালির কল্পনায় বর্ষার অবিচ্ছেদ্য অনুষঙ্গ।
Visit freshyourfeel.org for more information.
কিন্তু একই বর্ষা একদিন অন্য এক জনগোষ্ঠীর কাছে ছিল বিভীষিকার প্রতিশব্দ। যে কালো মেঘ দেখে বাঙালি কৃষকের মুখে হাসি ফুটত, সেই মেঘই বহু ইউরোপীয়র মনে জাগিয়ে তুলত মৃত্যুভয়। যে বৃষ্টিকে ঘিরে বাঙালি রচনা করেছে অসংখ্য গান-কবিতা, সেই বৃষ্টির মৌসুম শেষ হওয়াই ছিল ব্রিটিশদের কাছে বেঁচে থাকার উৎসব।
১৮০০ সালের নভেম্বর। কয়েক মাসের টানা বর্ষার পর কলকাতায় নেমেছে হালকা শীত। এই সময় শহরের ইউরোপীয় অধিবাসীরা আয়োজন করলেন এক জাঁকজমকপূর্ণ থ্যাঙ্কসগিভিং ভোজের। টেবিলভর্তি খাবার-পানীয়, ঝলমলে পোশাকে সজ্জিত নারী-পুরুষ—সব মিলিয়ে যেন উৎসবের আবহ। তবে এই আনন্দের কারণ ছিল বিলাসিতা নয়; বরং তারা বিশ্বাস করতেন, ভয়ংকর বর্ষা অতিক্রম করে এখনো জীবিত থাকার জন্য সৃষ্টিকর্তাকে ধন্যবাদ জানানো প্রয়োজন।
এমন বিশ্বাস হঠাৎ গড়ে ওঠেনি। ইংরেজদের মধ্যে তখন একটি বহুল প্রচলিত কথা ছিল—‘টু মনসুনস’। অর্থাৎ ভারতবর্ষে আসা একজন ইউরোপীয় বড়জোর দুটি বর্ষা পার করতে পারবেন। এই ধারণার পেছনে ছিল নির্মম বাস্তবতা।
১৬৯০ সালে ইংরেজ ধর্মযাজক অভিংটন ছয় মাসের সমুদ্রযাত্রা শেষে বোম্বেতে পৌঁছান। বর্ষা তখন সবে শুরু হয়েছে। কিন্তু বর্ষা শেষ হওয়ার আগেই তাঁর সঙ্গে আসা ২৪ জন সফরসঙ্গীর মধ্যে ২০ জন নানা রোগে মারা যান। মাত্র দুই বছর পর পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে ওঠে। বছরের শুরুতে বোম্বেতে প্রায় ৮০০ ইউরোপীয় থাকলেও বছর শেষে জীবিত ছিলেন মাত্র ১০০ জন। মহামারি, অজানা জ্বর, বজ্রপাত, পানিতে ডুবে মৃত্যু কিংবা বন্য প্রাণীর আক্রমণ—সব মিলিয়ে বর্ষা ছিল ভয়ংকর এক ঋতু।
তবু ইংরেজরা ভারত ছাড়েননি। কারণ, এই উপমহাদেশ ছিল দ্রুত ধনী হওয়ার স্বপ্নের দেশ। ঔপনিবেশিক শাসনের সুযোগ নিয়ে অল্প সময়ে বিপুল সম্পদ অর্জনের লোভ মৃত্যুভয়কেও হার মানিয়েছিল। তাই ঝুঁকি জেনেও তারা বারবার এসেছে এই ভূখণ্ডে।
বাংলার বর্ষা তাদের কাছে ছিল সম্পূর্ণ নতুন এক অভিজ্ঞতা। ইংল্যান্ডে সারা বছরই কমবেশি বৃষ্টি হয়, কিন্তু সেখানে বর্ষা নামে আলাদা কোনো ঋতু নেই। অন্যদিকে বাংলায় গ্রীষ্মের শেষে বর্ষার আগমন ঘটে এক নাটকীয় পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে। কালো মেঘ, দমকা হাওয়া, প্রবল বর্ষণ—প্রকৃতির এই আকস্মিক রূপান্তর ইউরোপীয়দের বিস্মিত করেছিল।
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ইংল্যান্ডে গিয়ে উপলব্ধি করেছিলেন, বিলেতের বৃষ্টি বাংলার বর্ষার মতো প্রাণবন্ত নয়। শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায় রসিকতা করে বলেছিলেন, বিলেতে যেন মাত্র দুটি ঋতু—‘হাড়ভাঙা শীত’ আর ‘পচা বর্ষা’। প্রমথ চৌধুরী বাংলার বর্ষাকে তুলনা করেছিলেন রাজকীয় আগমনের সঙ্গে; তাঁর মতে, বাংলার বর্ষা ঢাকঢোল পিটিয়ে আসে, অথচ বিলেতের বৃষ্টি নিস্তেজ, প্রাণহীন ও একঘেয়ে।
ভারতে আসা প্রায় প্রতিটি ইংরেজই ডায়েরি, চিঠি কিংবা স্মৃতিকথায় এখানকার আবহাওয়া সম্পর্কে লিখে গেছেন। ব্রিটিশ লাইব্রেরির ইন্ডিয়া অফিস রেকর্ডস অ্যান্ড প্রাইভেট পেপার্সে সংরক্ষিত এসব নথির বড় একটি অংশজুড়ে রয়েছে ভারতীয় বর্ষার বিবরণ। তাঁদের লেখায় বারবার ফিরে এসেছে দুর্ভোগ, রোগব্যাধি, ঝড়, জলাবদ্ধতা ও আতঙ্কের গল্প।
ব্রাজিলের ভাষা পর্তুগিজ হলো কীভাবে১৮৯২ সালে প্রকাশিত ‘দ্য ল্যান্ড সিস্টেমস অব ব্রিটিশ ইন্ডিয়া’ গ্রন্থে উল্লেখ করা হয়, বাংলার বর্ষা কেবল আষাঢ়-শ্রাবণে সীমাবদ্ধ নয়; মে মাসের শেষ দিক থেকে শুরু হয়ে অক্টোবরের মাঝামাঝি পর্যন্ত এর প্রভাব টিকে থাকে।
এই বর্ষার এক জীবন্ত চিত্র পাওয়া যায় উইলিয়াম টেইলরের স্মৃতিকথায়। ১৮৫৯ সালে তিনি শাস্তিমূলক বদলির আদেশে ময়মনসিংহের সিভিল ও সেশন জজ হিসেবে যোগ দেন। এপ্রিলেই পৌঁছে তিনি বৃষ্টির মুখোমুখি হন। সেই বৃষ্টি থামে না মে মাসের শেষ পর্যন্ত। বাংলোর জানালা দিয়ে তিনি দেখেন দুকূলভরা ব্রহ্মপুত্র, জেলেদের নৌকা আর দূরে গারো পাহাড়ের ওপর জমে থাকা কালো মেঘ। কিন্তু কিছুক্ষণের মধ্যেই সেই মনোরম দৃশ্য ভয়ংকর রূপ নেয়। তাঁর ভাষায়, কালির মতো কালো মেঘ যেন সমস্ত শক্তি নিয়ে পৃথিবীর ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে; বজ্রপাতের শব্দে কানে তালা লেগে যায়। তিনি লিখেছিলেন, ময়মনসিংহের ঝড়ের তুলনায় অন্য অঞ্চলের ঝড় যেন ফুলবাগানের ওপর দিয়ে বয়ে যাওয়া মৃদু বাতাস।
বজ্রপাত ছিল ইউরোপীয়দের অন্যতম প্রধান আতঙ্ক। ১৮৪৩ সালে কলকাতায় ঘোড়ার পিঠে বসা অবস্থায় বজ্রাঘাতে মারা যান ২৬ বছর বয়সী জি সি অ্যালবার্ট। আবার ১৮৬৫ সালে বিহারের নওয়াদায় হাতির পিঠে থাকা অবস্থায় বজ্রাহত হন এইচ কলিস। তাঁর রেইনকোটে আগুন ধরে শরীর ঝলসে যায়। এমন অসংখ্য ঘটনা সমাধিফলক, ডায়েরি ও সরকারি নথিতে লিপিবদ্ধ রয়েছে। বর্ষাকালে শুধু বজ্রপাত নয়, আকস্মিক বন্যাও ছিল মৃত্যুর কারণ। অনেক ইউরোপীয় নদীর স্রোতে কিংবা প্লাবনের পানিতে প্রাণ হারিয়েছেন।
বর্ষা এলে ইংরেজ কর্মকর্তাদের জীবন হয়ে উঠত আরও একঘেয়ে। বাইরে বের হওয়ার সুযোগ কম থাকায় তাঁরা সময় কাটাতেন বই পড়ে, চিঠি লিখে কিংবা ছবি এঁকে। বর্ষা শুরুর আগেই রেইনকোট, মশারি এবং প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম সংগ্রহ করে রাখতেন।
তবু ঘরের ভেতরেও ছিল না নিরাপত্তা। প্রত্যন্ত অঞ্চলের বাংলোতে প্রায়ই সাপ ঢুকে পড়ত। ১৮৭৫ সালে কুমিল্লায় কর্মরত সিভিলিয়ান হারম্যান মাইকেল কিশ্চ পরিবারকে লেখা এক চিঠিতে জানান, তাঁর শোবার ঘরে বিষধর সাপ দেখা যাওয়ায় তিনি মাত্র ছয় সপ্তাহ বয়সী একটি বেজি পুষেছেন, যাতে সাপ আর ঘেঁষতে না পারে।
বর্ষার শেষভাগে জলাবদ্ধতার সঙ্গে দেখা দিত কলেরা। ১৯০৬ সালের বর্ষায় এক সেনানিবাসেই ৫০ জন সদস্য এই রোগে মারা যান। কোথাও কোথাও মাত্র ৪৮ ঘণ্টার ব্যবধানে প্রায় ২০০ জনের মৃত্যুর ঘটনাও ঘটেছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছিল ম্যালেরিয়া। বিশ শতকের শুরুতে প্রকাশিত ‘রেকর্ডস অব ম্যালেরিয়া সার্ভে অব ইন্ডিয়া’ অনুযায়ী, সে সময় রোগজনিত মৃত্যুর অন্তত অর্ধেকের জন্য দায়ী ছিল ম্যালেরিয়া। জলাভূমিতে কাজ করা ইংরেজ সেনারা ছিলেন সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে। মশারি, দরজা-জানালায় জাল, কুইনাইনের ব্যবহার—সবই ছিল তাঁদের দৈনন্দিন জীবনের অংশ। তারপরও অনেকেই দুর্বল শরীর নিয়ে দেশে ফিরতে পারেননি।
কলকাতাও বর্ষার হাত থেকে রেহাই পায়নি। জলাবদ্ধতার কারণে শহরের রাস্তায় নৌকা চলত। ১৭৩৭ সালের এক ভয়াবহ ঝড়ের বর্ণনা দিয়েছেন সুপ্রিম কাউন্সিলের সদস্য স্যার ফ্রান্সিস রাসেল। তিনি লিখেছিলেন, এত প্রবল বাতাস ও বৃষ্টি হচ্ছিল যে সবচেয়ে শক্তপোক্ত বাড়িটিও ভেঙে পড়বে বলে মনে হচ্ছিল। আতঙ্কে সবাই নিচতলায় আশ্রয় নিয়েছিল। সেই রাতে হুগলি নদীর পানি উপচে শহরের বহু স্থাপনা ভাসিয়ে নিয়ে যায়।
তবে সবাই ঘরে বসে থাকতে পারেননি। কাজের প্রয়োজনেই অনেককে বর্ষার মধ্যে দুর্গম পথে বের হতে হয়েছে। উদ্ভিদবিজ্ঞানী জোসেফ ডাল্টন হুকার ১৮৫০ সালে পূর্ব বাংলায় উদ্ভিদের নমুনা সংগ্রহ করতে এসে খাসিয়া পাহাড় পেরিয়ে চেরাপুঞ্জি পর্যন্ত যান। বাবাকে লেখা এক চিঠিতে তিনি বিস্ময় প্রকাশ করে লিখেছিলেন, এখানে দুই দিনের বৃষ্টি যেন ইংল্যান্ডের পুরো বছরের বৃষ্টির সমান। অতিবৃষ্টিতে তাঁর সংগ্রহ করা বহু নমুনাই নষ্ট হওয়ার উপক্রম হয়েছিল।
একইভাবে বাংলার সার্ভেয়ার জেনারেল জেমস রেনেলও বর্ষাকে বেছে নিয়েছিলেন জরিপকাজের জন্য। ১৭৬৪ সালে তিনি কলকাতা থেকে পূর্ব বাংলার নদীপথ জরিপে বের হন। নদীর প্রকৃত প্রবাহ বোঝার জন্য বর্ষার বিকল্প ছিল না। টানা ১৩ বছর নানা প্রতিকূলতা সামলেও কাজ চালিয়ে যান তিনি। কিন্তু একমাত্র কন্যা জেনের মৃত্যু তাঁকে ভেঙে দেয়। অবসর নেওয়ার আগে ঢাকার নারিন্দার খ্রিষ্টান কবরস্থানে সমাধিস্থ কন্যার স্মৃতিচিহ্ন হিসেবে সমাধিফলকের একটি রুপার অনুকৃতি তৈরি করান। পরে জন্ম নেওয়া দ্বিতীয় কন্যার নামও রাখেন জেন।
ঔপনিবেশিক আমলের ইংরেজদের ডায়েরি, চিঠি আর স্মৃতিকথা পড়লে স্পষ্ট বোঝা যায়, বাংলার বর্ষা তাদের কাছে কেবল একটি ঋতু ছিল না; ছিল প্রকৃতির সঙ্গে প্রতিনিয়ত লড়াইয়ের আরেক নাম। অথচ একই বর্ষা বাঙালির সাহিত্য, সংগীত ও সংস্কৃতিতে চিরকাল সৌন্দর্য, প্রেম আর জীবনের প্রতীক হয়ে আছে।
সম্ভবত এটাই বাংলার বর্ষার সবচেয়ে বড় বৈপরীত্য—একই আকাশ থেকে ঝরে পড়া বৃষ্টি কারও কাছে কবিতা, আবার কারও কাছে মৃত্যুর পূর্বাভাস। সম্ভবত এ কারণেই ঔপনিবেশিক আমলের অসংখ্য চিঠি, দিনলিপি ও স্মৃতিকথা ঘাঁটলে দেখা যায়—বাংলার বর্ষাকে তাঁরা মনে রেখেছেন বিভীষিকাময় স্মৃতি হিসেবে।
বন্ধু, ভৈরব বন্ধুসভা