বিশ্বের প্রথম প্রাইভেট স্পেস টেলিস্কোপ খুঁজবে ২৭টি রহস্যময় গ্রহ
· Prothom Alo

মহাকাশের নিকষ কালো অন্ধকারে লুকিয়ে থাকা কোটি কোটি বুড়িয়ে যাওয়া গ্রহের বুকে কি সত্যিই কোনো ভিনগ্রহী জীবনের অস্তিত্ব অপেক্ষা করছে? গুগলের সাবেক বসের পাঠানো বিশ্বের প্রথম ব্যক্তিগত স্পেস টেলিস্কোপটি কি সেই রহস্যের সন্ধানে নামছে?
রাতের অন্ধকারে অনেক দূরে একটা শক্তিশালী টর্চ জ্বলছে। টর্চের গা ঘেঁষে উড়ছে একটা ছোট্ট পোকা। আপনি কি পোকাটা দেখতে পাবেন? সম্ভবত না। কারণ টর্চের আলোয় চোখ ধাঁধিয়ে যাবে।
Visit sweetbonanza-app.com for more information.
মহাকাশে অন্য নক্ষত্রের চারপাশে ঘোরা গ্রহ খোঁজার সমস্যাটা ঠিক এরকম। নক্ষত্র টর্চের মতো জ্বলজ্বল করে, আর গ্রহ তার পাশে ক্ষীণ আলোর একটা বিন্দুর মতো থাকে। এই সমস্যা কীভাবে সমাধান করা যায়, তা নিয়েই নতুন একটা গবেষণা হয়েছে। সেই গবেষণা ধরেই ঠিক করা হয়েছে, নতুন স্পেস টেলিস্কোপ প্রথমে কোন গ্রহগুলো খুঁজবে।
গুগলের সাবেক প্রধান নির্বাহী এরিক শ্মিট ও তাঁর স্ত্রী ওয়েন্ডি শ্মিটের দাতব্য সংস্থা শ্মিট সায়েন্সেস বানাচ্ছে এই টেলিস্কোপ। নাম রাখা হয়েছে লাজুলি স্পেস টেলিস্কোপ। ছোটবেলা থেকেই আমরা শুনে এসেছি, হাবল বা জেমস ওয়েবের মতো অতিকায় স্পেস টেলিস্কোপগুলো নাসা বা বড় কোনো সরকারি মহাকাশ গবেষণা সংস্থার সম্পত্তি। কিন্তু এবার ব্যক্তিগতভাবেই বানানো হচ্ছে এমন একটি স্পেস টেলিস্কোপ। ২০২৯ সালের মধ্যেই এটি মহাকাশে পাঠানো হবে। সবকিছু ঠিক থাকলে এটাই হবে ইতিহাসের প্রথম বেসরকারি টাকায় বানানো পূর্ণ আকারের মহাকাশ টেলিস্কোপ।
রোমান স্পেস টেলিস্কোপ বদলে দিতে পারে মহাবিশ্বের মানচিত্রগুগলের সাবেক প্রধান নির্বাহী এরিক শ্মিট ও তাঁর স্ত্রী ওয়েন্ডি শ্মিটের দাতব্য সংস্থা শ্মিট সায়েন্সেস বানাচ্ছে এই টেলিস্কোপ। নাম রাখা হয়েছে লাজুলি স্পেস টেলিস্কোপ।
এখানে একটি মজার ও গুরুত্বপূর্ণ তথ্য জানিয়ে রাখি। বিখ্যাত হাবল টেলিস্কোপের মূল আয়নাটি যেখানে ২.৪ মিটার চওড়া, সেখানে এই নতুন ব্যক্তিগত টেলিস্কোপের আয়না হবে পুরো ৩ মিটার চওড়া! হাবলের চেয়ে এই টেলিস্কোপ প্রায় ৭০ শতাংশ বেশি আলো ধরতে পারবে। আয়না যত বড়, দূরের ক্ষীণ আলো ধরার ক্ষমতাও তত বেশি।
এই শক্তিশালী টেলিস্কোপে মূলত তিনটি অত্যাধুনিক যন্ত্র থাকবে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি চমক জাগানো যন্ত্রটির নাম এক্সট্রাসোলার করোনাগ্রাফ বা সংক্ষেপে ইএসসি। ইউনিভার্সিটি অব মিশিগানের জ্যোতির্বিজ্ঞানী লোগান পিয়ার্স এবং ইউনিভার্সিটি অব অ্যারিজোনার ইউয়ান ডগলাস সম্প্রতি একটি গবেষণাপত্র প্রকাশ করেছেন।
শিল্পীর কল্পনায় লাজুলি স্পেস টেলিস্কোপসেখানে তারা এমন ২৭টি ভিনগ্রহের তালিকা দিয়েছেন, যেগুলোকে এই ইএসসি যন্ত্রের সাহায্যে সবচেয়ে নিখুঁতভাবে পর্যবেক্ষণ করা সম্ভব। কিন্তু কেন এই নতুন টেলিস্কোপ এবং এর করোনাগ্রাফ যন্ত্রটি বিজ্ঞানীদের মধ্যে এত উত্তেজনার সৃষ্টি করেছে? মহাকাশে এতকাল বিজ্ঞানীরা কীভাবে গ্রহ খুঁজতেন জানেন? মূলত তাপের সাহায্যে। বিজ্ঞানীরা নতুন বা তুলনামূলক কমবয়সী গ্রহগুলোর দিকে নজর রাখতেন, কারণ জন্মের পর সেগুলো প্রচণ্ড গরম থাকে।
অন্ধকার ঘরে একটি গনগনে লাল লোহার রড যেমন দূর থেকেই চেনা যায়, তেমনি ইনফ্রারেড বা অবলোহিত টেলিস্কোপ দিয়ে ওই গ্রহগুলোর তাপ মেপে সেগুলোর অস্তিত্ব ও বায়ুমণ্ডল সম্পর্কে জানা যেত। কিন্তু সমস্যা হলো, গ্রহের বয়স যত বাড়ে, লোহার রডের মতোই তা ধীরে ধীরে ঠান্ডা হয়ে যায়। তখন আর আগের মতো তাপ দিয়ে তাদের খুঁজে পাওয়া যায় না।
প্রায় সাড়ে ৪ কোটি গ্যালাক্সির বিশাল মানচিত্র বানিয়েছে গায়া টেলিস্কোপহাবল টেলিস্কোপের মূল আয়নাটি যেখানে ২.৪ মিটার চওড়া, সেখানে এই লাজুলি টেলিস্কোপের আয়না হবে পুরো ৩ মিটার চওড়া! হাবলের চেয়ে এই টেলিস্কোপ প্রায় ৭০ শতাংশ বেশি আলো ধরতে পারবে।
ঠিক এখানেই বাজিমাত করবে লাজুলি টেলিস্কোপের এক্সট্রাসোলার করোনাগ্রাফ। এটি গ্রহের নিজস্ব তাপের ওপর ভরসা করবে না, বরং নক্ষত্রের প্রতিফলিত আলো ব্যবহার করবে। বিষয়টা একদম সোজা, অন্ধকার রাস্তায় দাঁড়িয়ে থাকা একটি ঠান্ডা গাড়ির গায়ে আপনি যদি টর্চের আলো ফেলেন, তবে সেটি যতই ঠান্ডা হোক না কেন, প্রতিফলিত আলোতে ঠিকই জ্বলজ্বল করে উঠবে! গ্রহদের ক্ষেত্রেও ঠিক তা-ই। গ্রহটি কত পুরোনো বা ঠান্ডা, তাতে কিছুই যায় আসে না। তার কাছের নক্ষত্রের আলো গ্রহটির গায়ে পড়ে কীভাবে প্রতিফলিত হচ্ছে, লাজুলি টেলিস্কোপ সেই আলোর সংকেত ধরে ফেলবে। ফলে পুরোনো এবং বুড়িয়ে যাওয়া গ্রহগুলোর বায়ুমণ্ডলে কী কী গ্যাস আছে, কিংবা সেখানে কোনো প্রাণের চিহ্ন লুকিয়ে আছে কি না, তা এবার আরও নিখুঁতভাবে জানা যাবে। শুধু তাই নয়, নক্ষত্রের খুব কাছাকাছি থাকা গ্রহগুলোকেও এই পদ্ধতিতে পরিষ্কার দেখা সম্ভব হবে।
বিজ্ঞানীদের ওই তালিকায় থাকা ২৭টি গ্রহের প্রতিটিই বিশাল আকারের গ্যাসীয় দানব। এখন আপনার মনে হতে পারে, কোটি কোটি গ্রহ থাকতে নির্দিষ্ট করে শুধু এই ২৭টি গ্রহকে কেন টার্গেট করা হলো? কারণ মহাকাশে স্পেস টেলিস্কোপের এক সেকেন্ড সময় মানেই কাড়িকাড়ি টাকা!
সবচেয়ে শক্তিশালী টেলিস্কোপ দিয়ে মহাকাশের কতদূর দেখা যায়৫৫ ক্যানক্রি ডি গ্রহটি দেখতে অবিকল আমাদের সৌরজগতের বৃহস্পতি গ্রহের মতোই। আবার এইচডি ১৮১৪৩৩ ডি নামের অদ্ভুত গ্রহটির কক্ষপথ মারাত্মক রকমের ডিমের মতো লম্বাটে এবং তেড়াবাঁকা।
লাজুলি টেলিস্কোপে একটি গ্রহের প্রতিফলিত আলো নিখুঁতভাবে ধরতে একটানা ১০ থেকে ১০০ ঘণ্টারও বেশি সময় ধরে ক্যামেরার শাটার খোলা রাখতে হবে। অন্ধকারে ঢিল ছোঁড়ার মতো আন্দাজে টেলিস্কোপ তাক করে রাখলে এই মহামূল্যবান সময়ের পুরোটাই জলে যাবে। তাই বিজ্ঞানীরা আগে থেকেই সুনির্দিষ্ট কক্ষপথ জানা আছে, এমন গ্রহগুলোকেই বেছে নিয়েছেন।
তালিকায় থাকা গ্রহগুলোর মধ্যে বেশ কিছু মজার নাম আছে, যা মহাকাশপ্রেমীদের কাছে বেশ পরিচিত। যেমন ধরুন '৫৫ ক্যানক্রি ডি' গ্রহটি দেখতে অবিকল আমাদের সৌরজগতের বৃহস্পতি গ্রহের মতোই। আবার ‘এইচডি ১৮১৪৩৩ ডি’ নামের অদ্ভুত গ্রহটির কক্ষপথ মারাত্মক রকমের ডিমের মতো লম্বাটে এবং তেড়াবাঁকা। ‘বিটা পিকটোরিস বি’ মহাকাশ বিজ্ঞানের ইতিহাসে সরাসরি ছবি তোলা প্রথম গ্রহগুলোর একটি।
বিটা পিকটোরিস বি এক্সোপ্ল্যানেটের কাল্পনিক ছবিমহাকাশ গবেষণায় ব্যক্তিগত মালিকানা ঠিক কী ধরনের প্রভাব ফেলবে, তা এখনো পুরোপুরি নিশ্চিত নয়। এটি কি মহাকাশ গবেষণাকে আগের চেয়ে আরও দ্রুত ও নিখুঁত করবে, নাকি নতুন কোনো অপ্রত্যাশিত কারিগরি জটিলতা তৈরি করবে, তা সময়ই বলে দেবে। তবে ন্যান্সি গ্রেস রোমান স্পেস টেলিস্কোপের মতো অন্যান্য বিশ্বমানের টেলিস্কোপের সঙ্গে লাজুলি টেলিস্কোপ কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে কাজ করলে আমরা হয়তো মহাকাশের রহস্য আরও দ্রুত সমাধান করতে পারব।
সূত্র: ইউনিভার্স টুডেজেমস ওয়েব টেলিস্কোপ কীভাবে এত দূরে দেখতে পায়