প্রশাসন ক্যাডারের ২৩ কর্মকর্তা কি জ্যেষ্ঠতাও হারাবেন 

· Prothom Alo

সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান পিএসসি (পাবলিক সার্ভিস কমিশন) দেশের গুরুত্বপূর্ণ অনেক চাকরির পরীক্ষা গ্রহণপূর্বক নিয়োগের সুপারিশ করে থাকে। পিএসসির অধীন আমার দুবার চাকরি হয়েছিল। আমি নিজেও বিসিএস ক্যাডার কর্মকর্তা ছিলাম। ফলে আমি কাছে থেকে দেখেছি এখানে কী হয়। অনেক সময় পিএসসির সুপারিশের পর মন্ত্রণালয় ভেরিফিকেশনের নামে অযৌক্তিকভাবে অনেককে চাকরি থেকে বঞ্চিত করেছে।

২৮তম থেকে ৪১তম বিসিএস পর্যন্ত পুলিশ ভেরিফিকেশনের নামে ২৬৫ জনকে নিয়োগপত্র দেওয়া হয়নি। পিএসসি এই ২৬৫ জনকে নিয়োগের জন্য সুপারিশ করলেও সরকার তাঁদের বিরুদ্ধে হয়রানিমূলক  সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছিল। রাষ্ট্রীয় পক্ষপাতমূলক এসব সিদ্ধান্ত ছিল নিয়মবহির্ভূত। যেসব কারণে একজন ব্যক্তি সরকারি চাকরিতে অযোগ্য হিসেবে বিবেচিত হন, তাঁদের ক্ষেত্রে সে রকম কোনো কারণ ছিল না। অনেকটা অকারণে এই ২৬৫ জনের নিয়োগ বাতিল করা হয়। তাঁদের মধ্যে প্রশাসন ক্যাডারের ২৩ জন।

Visit mchezo.co.za for more information.

আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন সরকারের সময় তাঁদের নিয়োগ বাতিল করা হয়েছিল। অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব গ্রহণ করার পরপরই নিয়োগবঞ্চিত এই ২৬৫ জন প্রার্থীকে চাকরিতে যোগদানের ব্যবস্থা করে। তাঁদের প্রজ্ঞাপন এবং তাঁদের নিয়োগপত্রে চাকরিতে জ্যেষ্ঠতা পাওয়ার শর্ত উল্লেখ করা হয়েছে। সেই শর্ত লঙ্ঘনের আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।

জনপ্রশাসন থেকে সরকারের পক্ষে এসব প্রার্থীর কাছে লিখিত ক্ষমাপ্রার্থনা কিংবা দুঃখ প্রকাশ করা উচিত। এই প্রার্থীদের মা–বাবা, স্বামী-স্ত্রী–সন্তান, স্বজনের মানসিক অবস্থা কীরূপ ছিল, এটি রাষ্ট্র একবারও ভেবে দেখেছে?

প্রশাসন ক্যাডারের ২৮তম বিসিএস থেকে ৪১তম বিসিএস পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েও যাঁরা নিয়োগবঞ্চিত ছিলেন এবং অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে যোগদান করেছেন, সেই ২৩ জন কর্মকর্তা জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সচিব বরাবর একটি আবেদন করেছেন।

অতীতে বাদ পড়া কর্মকর্তাদের জন্য ২০২৪ সালের ১৪ আগস্ট জারিকৃত প্রজ্ঞাপনের শর্তের কথা উল্লেখপূর্বক আবেদনপত্রে লেখা হয়েছে, ‘প্রজ্ঞাপনের অনুচ্ছেদ ২ অনুযায়ী ০১ সেপ্টেম্বর ২০২৪ আমরা বিসিএস (প্রশাসন) ক্যাডারে যোগদান করি। এই প্রজ্ঞাপনের (ছ) উপানুচ্ছেদে উল্লেখ রয়েছে “সরকারি কর্ম কমিশন এর মেধাক্রম অনুযায়ী জ্যেষ্ঠতা নির্ধারিত হয় বিধায় এ নিয়োগের ক্ষেত্রে নিয়োগপ্রাপ্তগণের জ্যেষ্ঠতা অক্ষুণ্ন রাখার স্বার্থে তাঁদের ব্যাচের নিয়োগপ্রাপ্তদের প্রথম যে তারিখে নিয়োগ প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়েছিল, সেই তারিখ হতে ভূতাপেক্ষিকভাবে নিয়োগ আদেশ কার্যকর হবে। তাঁদের মূল ব্যাচের যোগদানের তারিখ থেকে তাঁদের ধারণাগত জ্যেষ্ঠতা বজায় থাকবে। তবে তার ফলে তাঁরা কোন বকেয়া আর্থিক সুবিধাদি প্রাপ্য হবেন না।”’

এই আবেদনে তাঁরা উল্লেখ করেছেন, প্রজ্ঞাপনে উল্লেখ করা তারিখ থেকে যেন তাঁদের চাকরি স্থায়ী করা এবং চাকরিকাল গণনা করা হয়। তাঁরা ভূতাপেক্ষ জ্যেষ্ঠতা হারানোর আশঙ্কা করছেন।

বিসিএসের ক্ষেত্রে দেখেছি, কোনো কারণে কোনো প্রার্থী যদি পরেও যোগদান করেন, তবু তিনি যে ব্যাচের সঙ্গে পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েছেন, সেই ব্যাচের সঙ্গে তাঁর ব্যাচ গণনা করা হয়। আগে বিজ্ঞপ্তি হয়েছে কিন্তু নিয়োগ পরে—এমন যোগদান করা কর্মকর্তারাও জ্যেষ্ঠতা লাভ করেন। যেমন ২৫তম বিসিএস পরীক্ষার বিজ্ঞপ্তি আগে প্রকাশিত হয়। ২৬তম বিসিএসের বিজ্ঞপ্তি প্রকাশিত হয় পরে। ২৬তম বিশেষ বিসিএসের নিয়োগ কার্যক্রম শেষ হয় আগে। পরে যোগদান করেও ২৫তম বিসিএস ব্যাচের কর্মকর্তারা জ্যেষ্ঠতা পাচ্ছেন। এটাই নিয়ম, এটাই যৌক্তিক।

২৮তম থেকে ৪১তম পর্যন্ত বিসিএস পরীক্ষায় যাঁরা নিয়োগবঞ্চিত ছিলেন, তাঁদের অবশ্যই ব্যাচভিত্তিক জ্যেষ্ঠতা দেওয়া উচিত। নয়তো নতুন নতুন সমস্যা সৃষ্টি হবে। ২০১০ সালে যোগদান করেছেন ২৮তম বিসিএস পরীক্ষার্থীরা। ১৫ বছর আগের কথা। ওই বিসিএসে নিয়োগবঞ্চিত প্রার্থীর চাকরিকাল যদি ২০২৪ সাল
থেকে গণনা করা হয়, তাহলে নিয়ম লঙ্ঘন হবে।
২০২৪ সাল থেকে চাকরি গণনা করা হলে তাঁদের অনেকের চাকরি ২৫ বছর পূর্ণ হবে না। তখন অবসরজীবনে গিয়েও খেসারত দেবেন? ভূতাপেক্ষ অভিজ্ঞতা না দিলে এসব কর্মকর্তা খুব বেশি পদোন্নতিও পাবেন না। সচিব তো দূরের কথা, অনেককে উপসচিব পদ থেকেই চলে যেতে হবে।

ব্যাচভিত্তিক জ্যেষ্ঠতা পাওয়া একজন ক্যাডারভুক্ত কর্মকর্তার অধিকার। এই বিধিসম্মত বিষয়টি ২৮ থেকে ৪১তম বিসিএস পর্যন্ত প্রশাসন ক্যাডারের ২৩ জনের জন্য প্রযোজ্য হবে না? যদি না হয়, তাহলে তাঁদের ওপর আরেকবার অবিচার করা হবে। কেবল ওই ২৩ জনের জন্য নয়, ২৬৫ জনের জন্য অভিন্ন ভূতাপেক্ষ চাকরিকাল গণনা করতে হবে।

দীর্ঘদিন ধরে এসব কর্মকর্তাকে সীমাহীন কষ্ট সহ্য করতে হয়েছে। তাঁরা কখনো আদালতে, কখনো মন্ত্রণালয়ে দ্বারে দ্বারে ঘুরেছেন। তাঁরা কেউ দুর্নীতি করে চাকরি নেননি, তাঁরা কেউ প্রশ্নপত্র ফাঁসের সঙ্গে জড়িত নন, কেউ করুণা চাইতে আসেননি। নিজের মেধা ও অধ্যবসায় দিয়ে এই চাকরি অর্জন করেছেন। তাঁদের প্রতি আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন সরকার অবিচার করেছে, অন্যায় করেছে।

বর্তমান সরকারের উচিত যথাসম্ভব সেই ক্ষতি পূরণ করে দেওয়া। আমি মনে করি, এসব কর্মকর্তার মূল ব্যাচের প্রার্থীরা যে তারিখ থেকে চাকরিতে যোগদান করেছেন, ওই দিন থেকে তাঁদেরও বেতন-ভাতা পরিশোধ করা উচিত। জনপ্রশাসন থেকে সরকারের পক্ষে এসব প্রার্থীর কাছে লিখিত ক্ষমাপ্রার্থনা কিংবা দুঃখ প্রকাশ করা উচিত। এই প্রার্থীদের মা–বাবা, স্বামী-স্ত্রী-সন্তান, স্বজনের মানসিক অবস্থা কীরূপ ছিল, এটি রাষ্ট্র একবারও ভেবে দেখেছে?

যাঁরা চাকরিতে যোগদানের পর পদোন্নতিবঞ্চিত হয়েছেন, এমন বিসিএস কর্মকর্তাদের ক্ষেত্রে আমরা বিগত অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে দেখেছি, পদোন্নতিবঞ্চিত ব্যক্তিরা তিনটি পর্যন্ত পদোন্নতি নিয়েছেন কয়েক দিনের ব্যবধানে। কেবল তা–ই নয়, ওই কর্মকর্তাদের কেউ কেউ মৃত্যুবরণও করলেও তাঁরা পদোন্নতি ও আর্থিক সুবিধা পেয়েছেন। এই পদোন্নতি হওয়া ঠিক আছে। তাহলে ভেরিফিকেশনের নামে যাঁদের বঞ্চিত করা হয়েছে, তাঁদের ভূতাপেক্ষ সুবিধা পেতে অসুবিধা কোথায়?

  • তুহিন ওয়াদুদ বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের অধ্যাপক এবং নদী রক্ষাবিষয়ক সংগঠন রিভারাইন পিপলের পরিচালক

    মতামত লেখকের নিজস্ব

Read full story at source