গ্রামীণ বাণিজ্যের ঐতিহ্য টিকে আছে যে হাটে 

· Prothom Alo

কৃষিপণ্য, গবাদিপশু, বাঁশ-বেতের কুটিরশিল্প থেকে শুরু করে নিত্যপ্রয়োজনীয় সব পণ্যের সমারোহ  চাটমোহর বাজারে।

Visit biznow.biz for more information.

চলনবিল অঞ্চল, এখন ভোরের বাতাসে মিলছে শীতের আগাম বার্তা। হিম হিম এক স্নিগ্ধ আমেজ। তবে বেলা গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গেই বাড়তে থাকে রোদের প্রখরতা। তাই রোদের তাপ এড়াতে অন্য সব গ্রামীণ হাটের মতোই পাবনার চাটমোহর রেলওয়ে স্টেশনসংলগ্ন হাটের (অমৃতকুণ্ডা) ক্রেতা-বিক্রেতারাও কাকডাকা ভোর থেকেই নির্দিষ্ট জায়গায় জড়ো হতে শুরু করেন।

ভোরবেলায় হাটের চৌহদ্দিতে পা রাখতেই কানে ভেসে আসে হাজারো মানুষের ব্যস্ত কোলাহল। বাতাসে তখন মিশে আছে তাজা শাকসবজি, সদ্য কাটা কাঁচা পাট আর মচমচে গরম জিলাপির মিষ্টি সুবাস। দূর থেকে ভেসে আসা ট্রেনের তীক্ষ্ণ হুইসেলের শব্দের সঙ্গে যেন রীতিমতো পাল্লা দিয়ে চলে ক্রেতা-বিক্রেতাদের হাঁকডাক আর দর–কষাকষি। সপ্তাহে কেবল এক দিন, প্রতি রোববার ৫০০ ব্যবসায়ীর অস্থায়ী দোকান বসে মুখর আর প্রাণবন্ত হয়ে ওঠে বৃহত্তর চলনবিল অঞ্চলের অন্যতম বৃহৎ গ্রামীণ ঐতিহ্যবাহী বাণিজ্যকেন্দ্র—চাটমোহরের রেলবাজার হাট (অমৃতকুণ্ডা)। এই হাটে বার্ষিক ইজারা থেকে আয় প্রায় দেড় কোটি টাকা।   

১৯১৫-১৬ সালের দিকে ব্রিটিশ আমলে ঈশ্বরদী-সিরাজগঞ্জ ব্রডগেজ রেললাইন চালু হওয়ার পর স্টেশনকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠে এই রেলবাজার। সময়ের পরিক্রমায় পাশের ঐতিহ্যবাহী অমৃতকুণ্ডা হাটের সঙ্গে এটি একীভূত হয়ে আজকের এই বিশাল বাজারে রূপ নিয়েছে বলে জানান স্থানীয় মানুষেরা।

কৃষকের ঘর থেকে ভ্যানে করে বিক্রির জন্য আনা বিশাল কাঁচা পাটের স্তূপ। রাস্তার ধারে সারিবদ্ধভাবে সাজানো ধানের সবুজ চারা আর দেয়ালে হেলান দিয়ে রাখা তাজা আখ। হাটের গবাদিপশুর অংশটি বেশ প্রসিদ্ধ। সারি সারি বিশাল কালো মহিষ, দেশি জাতের গাভি ও ষাঁড় নিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন ব্যাপারীরা। চলনবিল অঞ্চলের কৃষিজীবী ও খামারিদের অর্থনীতির এক বড় চাকা ঘোরে এই গবাদিপশুর বাজারকে কেন্দ্র করেই।

বাজারের আরেক দিকে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের ছড়াছড়ি। বস্তায় বস্তায় সাজিয়ে রাখা হয়েছে জিরা, এলাচি, লবঙ্গসহ নানা মসলাপাতি, ডাল ও শস্যদানা। তাজা কচুর লতি কেটে বিক্রির জন্য প্রস্তুত করছেন কয়েকজন বিক্রেতা। অ্যালুমিনিয়ামের বড় ডেকচিতে চকচক করছে চলনবিলের তাজা পুঁটি আর কাচকি মাছসহ নানা প্রজাতির দেশীয় মাছ।

হাঁটতে হাঁটতে কথা হলো হাটের এক প্রবীণ ব্যবসায়ী বিশ্বনাথের সঙ্গে। একমনে মিষ্টিজাতীয় খাবার বিক্রি করছিলেন তিনি। কত দিন ধরে এই হাটে আসছেন, জানতে চাইলে একগাল হেসে তিনি প্রথম আলোকে  বলেন, ‘আমি মোটামুটি হারিকেন ধরার বয়স থেইকা, মানে একাত্তর সালের আগে থেইকাই এই হাটে আসি। এত বছর ধইরা এই হাটের বহুরূপ দেখলাম।’

বিশ্বনাথের পাশেই পলিথিনে ধবধবে সাদা লবণের পসরা সাজিয়ে বসেছেন বিক্রেতা
মো. আনিস। বেচাকেনার ফাঁকেই তিনি বলেন, ‘আমার বাপ-দাদারাও এই হাটে লবণ বেচতেন। তখন বর্তমান সময়ের মতো কোম্পানির চকচকে প্যাকেট ছিল না। চলনবিলের ভরা বর্ষায় দক্ষিণাঞ্চল থেকে বড় বড় পালতোলা মহাজনি নৌকায় আসত পাটের বস্তায় লালচে মোটা লবণ।’ 

অমৃতকুণ্ডা রেলবাজার হাটের একটি বিশাল অংশজুড়ে বসে কাঠের আসবাবের জমজমাট পসরা। প্রকাণ্ড ছায়াবৃক্ষের নিচে সারিবদ্ধভাবে সাজানো রয়েছে মজবুত কাঠের টেবিল, চেয়ার, আলমারি, চৌকি ও খাট। দৈনন্দিন গৃহস্থালির দরকারি আসবাব ছাড়াও এখানে অত্যন্ত সুলভ মূল্যে পাওয়া যায় পশুপাখির জন্য তৈরি নান্দনিক কাঠের ঘর।

কাঠের কারিগর প্রবীণ বিশ্বনাথ মুরারি বলেন, ৪৫ বছর ধরে এই হাটে ব্যবসা করেন! সময়ের সঙ্গে সঙ্গে মানুষের রুচি আর চাহিদায় কিছুটা বদল এসেছে। তবে এখনো পুরোনো এই হাটের ঐতিহ্য ধরে রেখেছে।   

চলনবিলের বুকে বর্ষার পানি নামতেই এই হাটে খলসুনি, ধুন্দি, বিত্তি আর খাদুনের বিশাল বাজার বসে। বাঁশ আর পাটের সুতলি দিয়ে এসব তৈরি করেন স্থানীয় কারিগরেরা। কারিগরদের লাভ খুবই প্রান্তিক হলেও, পৈতৃক পেশা হিসেবে এবং চলনবিলের সংস্কৃতির অংশ হিসেবে তাঁরা আজও এই কুটিরশিল্প বাঁচিয়ে রেখেছেন।

বাঁশের তৈরি মাছ ধরার সরঞ্জামের কারিগর নিমাই দাস বলেন, ‘অভিজ্ঞতার এই কাজ ছাইড়া তো অন্য কিছু করবার পারি না। এখন বাঁশ আর সুতলির যে দাম, সারা দিন খাইট্যা যা লাভ হয়, তা দিয়া সংসার চালানো বড় কঠিন। তবু চলনবিলে পানি নামলে এর কদর বাড়ে।’  

সাদা, নীল, গোলাপি রঙের নানা ধরনের মাছ ধরার জালের পসরা সাজিয়ে বসেছেন ব্যবসায়ী সাহেদ সরদার। নিজের বেচাকেনার কথা জানাতে গিয়ে বলেন, ‘বিলের পানি কমার এই সময়ে সুতার জালের চাহিদা সবচেয়ে বেশি থাকে। ক্রেতারা এখন বাঁশের ফাঁদের পাশাপাশি মাছ ধরার জন্য এসব টেকসই জালের দিকেও বেশ ঝুঁকছেন। হাটে মানুষের ভিড় থাকলেও আগের দিনের মতো সেই রমরমা বেচাকেনা এখন আর নেই।

হাটের ভিড়ে নাকে এল তাজা জিলাপির ঘ্রাণ। ঐতিহ্যবাহী মুড়কি, নিমকি, চানাচুরের দোকানের পাশেই বসেছে বড় ভাতের হোটেল। সেখানে বড় ডেকচিতে ধোঁয়া ওঠা ভাত, দেশি মাছের ঝোল আর ডিমের তরকারি সাজানো। 

অন্যদিকে বড় ত্রিপল বা শামিয়ানার নিচে কাপড়ের বাজার। থান কাপড়, লুঙ্গি, শাড়ি থেকে শুরু করে টি-শার্ট—সবই মিলছে এখানে। মাটিতে পলিথিন বিছিয়ে চলছে স্যান্ডেল-জুতার বেচাকেনা। প্রচণ্ড গরমের মধ্যে স্বস্তি দিতে বিক্রি হচ্ছে তালপাতার রঙিন হাতপাখাও।

Read full story at source