রাতে আলো জ্বেলে ঘুমাচ্ছেন, বাড়ছে হৃদ্রোগের ঝুঁকি
· Prothom Alo

রাতে ঘুমানোর সময় ঘরে সামান্য আলো জ্বললেও তা শরীরের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে। নতুন এক গবেষণায় দেখা গেছে, রাতে আলোর সংস্পর্শের সঙ্গে হৃদ্যন্ত্রের গঠনে সূক্ষ্ম কিন্তু পরিমাপযোগ্য কিছু পরিবর্তনের সম্পর্ক রয়েছে।
১০ হাজারের বেশি প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের তথ্য বিশ্লেষণ করে গবেষকেরা দেখেছেন, যাঁরা প্রায় অন্ধকার ঘরে ঘুমান, তাঁদের তুলনায় রাতে সামান্য আলোতেও যাঁরা ঘুমান, তাঁদের হৃদ্যন্ত্রের প্রকোষ্ঠ কিছুটা বড় এবং দেয়াল কিছুটা মোটা হওয়ার প্রবণতা বেশি।
Visit afnews.co.za for more information.
গবেষণায় দেখা গেছে, আলোর পরিমাণ যত বেড়েছে, হৃদ্যন্ত্রের পরিবর্তনের ঝুঁকিও তত বেড়েছে। গবেষণাটি প্রকাশিত হয়েছে ইউরোপিয়ান হার্ট জার্নালে।
বেশি রাত জাগলে হৃদ্যন্ত্র কি ঝুঁকিতে থাকেগবেষকেরা দেখেছেন, যাঁরা প্রায় অন্ধকার ঘরে ঘুমান, তাঁদের তুলনায় রাতে সামান্য আলোতেও যাঁরা ঘুমান, তাঁদের হৃদ্যন্ত্রের প্রকোষ্ঠ কিছুটা বড় এবং দেয়াল কিছুটা মোটা হওয়ার প্রবণতা বেশি।
সামান্য আলোতেও কি ক্ষতি হয়
গবেষণায় সবচেয়ে বেশি আলোর সংস্পর্শে থাকা ব্যক্তিরা প্রতিরাতে গড়ে প্রায় ৩৪ মিনিট ৩ লাক্সের বেশি আলোতে ছিলেন। এর মানে হলো, বিছানা থেকে এক মিটার দূরে তিনটি মোমবাতি জ্বালিয়ে রাখার মতো আলো। লাক্স হলো আলোর তীব্রতা মাপার একক।
এই সামান্য আলোও যে হৃদ্যন্ত্রের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে, গবেষণায় তার ইঙ্গিত পাওয়া গেছে। যাঁরা রাতে সবচেয়ে বেশি আলোতে ঘুমিয়েছেন, তাঁদের হৃদ্যন্ত্রের দেয়াল প্রায় ১ দশমিক ৫ শতাংশ বেশি মোটা ছিল। তাঁদের বাঁ নিলয় বা ভেন্ট্রিকলের ভর ছিল প্রায় ২ দশমিক ৪ শতাংশ বেশি। একই সঙ্গে হৃদ্যন্ত্রের সংকোচনক্ষমতা প্রায় ১ দশমিক ৯ শতাংশ কম ছিল।
যুক্তরাষ্ট্রের টিউলেন বিশ্ববিদ্যালয়ের রোগতত্ত্ববিদ লু চি বলেন, রাতে বেশি মাত্রায় আলোর সংস্পর্শের সঙ্গে হৃদ্যন্ত্রের গঠন ও কার্যকারিতার পরিবর্তনের সম্পর্ক পাওয়া গেছে। সাধারণত দীর্ঘদিনের মানসিক চাপ বা হৃদ্যন্ত্রের ক্ষতির প্রতিক্রিয়াজনিত কারণে এ ধরনের পরিবর্তন দেখা যেতে পারে।
যে চার ঝুঁকির কারণে ৯৯ শতাংশ হৃদরোগ ও স্ট্রোক হয়যাঁরা রাতে সবচেয়ে বেশি আলোতে ঘুমিয়েছেন, তাঁদের হৃদ্যন্ত্রের দেয়াল প্রায় ১ দশমিক ৫ শতাংশ বেশি মোটা ছিল। তাঁদের বাঁ নিলয় বা ভেন্ট্রিকলের ভর ছিল প্রায় ২ দশমিক ৪ শতাংশ বেশি।
হৃদ্যন্ত্রের রিমডেলিং কী
হৃদ্যন্ত্রের গঠন ও কার্যকারিতায় দীর্ঘমেয়াদি পরিবর্তনকে চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় কার্ডিয়াক রিমডেলিং বলা হয়। কোনো ধরনের দীর্ঘস্থায়ী চাপ বা ক্ষতির সঙ্গে মানিয়ে নিতে গিয়ে হৃদ্যন্ত্রের পেশি মোটা হওয়া বা এর গঠনে পরিবর্তন আসতে পারে।
শুরুতে এসব পরিবর্তন বাইরে থেকে বোঝা নাও যেতে পারে। গবেষকেরা এগুলোকে সাবক্লিনিক্যাল বা উপসর্গ প্রকাশের আগের পরিবর্তন হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তবে দীর্ঘমেয়াদে এগুলো হৃদ্যন্ত্রের স্বাস্থ্যের জন্য বড় ধরনের ঝুঁকির কারণ হতে পারে।
৭৩ হাজার মানুষের তথ্যেও মিলেছে প্রমাণ
গবেষকেরা আরও বড় একটি বিশ্লেষণে ৭৩ হাজার ২৮৬ জনের তথ্য পরীক্ষা করেছেন। এতে দেখা গেছে, রাতে সবচেয়ে বেশি আলোর সংস্পর্শে থাকা ব্যক্তিদের কয়েক বছর পর হৃদ্যন্ত্র ও রক্তনালির নানা সমস্যার ঝুঁকি তুলনামূলক বেশি ছিল।
আট থেকে দশ বছরের পর্যবেক্ষণে দেখা যায়, তাঁদের হৃদ্যন্ত্রের দুর্বলতা বা হার্ট ফেইলিউরের ঝুঁকি ২৯ শতাংশ বেশি, অ্যাট্রিয়াল ফাইব্রিলেশনের ঝুঁকি ১৫ শতাংশ বেশি। মায়োকার্ডিয়াল ইনফার্কশনের ঝুঁকি বেশি ২৪ শতাংশ। স্ট্রোকের ঝুঁকি ৩৩ শতাংশ বেশি এবং হৃদ্যন্ত্র ও রক্তনালিসংক্রান্ত রোগে মৃত্যুর ঝুঁকি ২৬ শতাংশ বেশি ছিল।
অন্যদিকে দিনে ১ হাজার লাক্সের বেশি উজ্জ্বল আলোর সংস্পর্শের সঙ্গে হৃদ্যন্ত্রের এসব সমস্যা বা মৃত্যুর ঝুঁকির উল্লেখযোগ্য কোনো সম্পর্ক পাওয়া যায়নি।
হার্টবিট অনিয়মিত হওয়া কেন আপনার জন্য ভালোআট থেকে দশ বছরের পর্যবেক্ষণে দেখা যায়, তাঁদের হৃদ্যন্ত্রের দুর্বলতা বা হার্ট ফেইলিউরের ঝুঁকি ২৯ শতাংশ বেশি, অ্যাট্রিয়াল ফাইব্রিলেশনের ঝুঁকি ১৫ শতাংশ বেশি।
ঘুম কমে যাওয়াও একটি কারণ হতে পারে
গবেষণাটি যুক্তরাজ্যের ইউকে বায়োব্যাংকের তথ্যের ওপর ভিত্তি করে করা হয়েছে। অংশগ্রহণকারীদের এক সপ্তাহ ধরে হাতে পরা আলোকসংবেদী যন্ত্রের মাধ্যমে রাতে কতটা আলোতে ছিলেন, তা মাপা হয়। পাশাপাশি কার্ডিওভাসকুলার ম্যাগনেটিক রেজোন্যান্স বা সিএমআর প্রযুক্তির সাহায্যে হৃদ্যন্ত্রের গঠন ও কার্যকারিতা পরীক্ষা করা হয়।
গবেষকেরা মনে করছেন, রাতে আলো হৃদ্যন্ত্রে প্রভাব ফেলার পেছনে ঘুম কমে যাওয়ার ভূমিকা থাকতে পারে। পরবর্তী বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ঘুমের সময় কমে যাওয়া গবেষণায় পাওয়া পরিবর্তনের প্রায় ২৫ থেকে ৫০ শতাংশ ব্যাখ্যা করতে পারে।
রাতে আলো মস্তিষ্কে মেলাটোনিন নামে হরমোনের নিঃসরণ কমিয়ে দেয়। এই হরমোন ঘুমের সময় ও ঘুম-জাগরণের চক্র নিয়ন্ত্রণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। ফলে রাতে আলো ঘুমে ব্যাঘাত ঘটিয়ে পরোক্ষভাবে হৃদ্যন্ত্রের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি করতে পারে বলে ধারণা করছেন গবেষকেরা।
সুস্থ মানুষের হৃৎপিণ্ড প্রতিদিন কতবার স্পন্দিত হয়যুক্তরাষ্ট্রের টিউলেন বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক লু চির মতে, রাতে অতিরিক্ত আলো এখন হৃদ্রোগের সম্ভাব্য নতুন ঝুঁকি হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
ঘুমের ঘর অন্ধকার রাখার পরামর্শ
গবেষণাটি মূলত পর্যবেক্ষণভিত্তিক। তাই রাতে আলোই হৃদ্যন্ত্রের এসব সমস্যার সরাসরি বা একমাত্র কারণ, এমন সিদ্ধান্ত এখনই দেওয়া যায় না। তবে বিপুলসংখ্যক মানুষের তথ্য বিশ্লেষণে আলোর সংস্পর্শ, ঘুম ও হৃদ্যন্ত্রের স্বাস্থ্যের মধ্যে একটি শক্তিশালী সম্পর্ক পাওয়া গেছে।
গবেষকেরা তাই রাতে পর্যাপ্ত ঘুম এবং যতটা সম্ভব অন্ধকার পরিবেশ নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন। ঘরে বাইরের আলো ঢুকলে ব্ল্যাকআউট পর্দা ব্যবহার করা বা প্রয়োজন হলে চোখ ঢাকার মাস্ক ব্যবহার করা যেতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রের টিউলেন বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক লু চির মতে, রাতে অতিরিক্ত আলো এখন হৃদ্রোগের সম্ভাব্য নতুন ঝুঁকি হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। তবে এ বিষয়ে কারণ-প্রভাব নিশ্চিত করতে আরও সরাসরি গবেষণা প্রয়োজন।
সূত্র: সায়েন্স অ্যালার্ট, ইউরোপিয়ান হার্ট জার্নালহার্ট সুস্থ রাখার জন্য কতটা ব্যায়াম দরকার?