হাতির দাঁতের মিনার ভেঙে সত্যের অনুসন্ধান

· Prothom Alo

বিজ্ঞান কোনো অলৌকিক আদেশ বা স্থির পরম সত্য নয়। এটি প্রতিনিয়ত পরীক্ষা-নিরীক্ষা, ভুল প্রমাণ ও স্ব-সংশোধনের মাধ্যমে এগিয়ে চলা এক গতিশীল যাত্রা। অথচ কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, বিশ্বমানের ভ্যাকসিন ও জিনোম এডিটিংয়ের এই চরম উৎকর্ষের যুগে এসে মানবজাতি এক অভাবনীয় বৈপরীত্যের মুখোমুখি—একদিকে বিজ্ঞানের ঐতিহাসিক সাফল্য, অন্যদিকে সাধারণ মানুষের মধ্যে বিজ্ঞানের প্রতি দিন দিন ঘনীভূত হতে থাকা বিশ্বাসের সংকট।

Visit sport-tr.bet for more information.

নেচার বিজ্ঞান সাময়িকীর সম্পাদকীয় ‘দ্য কমপ্লেক্স ট্রুথ অ্যাবাউট ট্রাস্ট ইন সায়েন্স’ এবং গবেষক এনচাংউই মুনুংয়ের পর্যবেক্ষণ এই সংকটটিকে আলোচনার কেন্দ্রে নিয়ে এসেছে। মুনুং যথার্থই স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন, প্রাতিষ্ঠানিক অভিজাততন্ত্রের ‘হাতির দাঁতের মিনার’ থেকে বের হয়ে বিজ্ঞান তখনই সফল হয়, যখন বিজ্ঞানীরা সাধারণ মানুষের শঙ্কা শোনেন, গবেষণায় সমাজকে যুক্ত করেন এবং বিজ্ঞানের ভেতরের অনিশ্চয়তাগুলো নিয়ে খোলামেলা কথা বলেন। ভুল তথ্য ও ভুয়া সংবাদের সয়লাবে যখন সাধারণ মানুষের মন থেকে বিজ্ঞানের ভিত্তি টলে যাচ্ছে, তখন এই দূরত্বের কারণ অনুসন্ধান করা কেবল অ্যাকাডেমিক বিলাসিতা নয়, বরং সমাজ রক্ষার তাগিদেই জরুরি।

প্রশ্ন জাগে—বিজ্ঞানের প্রতি জন-আস্থা তৈরি হয় কীভাবে? বিজ্ঞানের সাফল্য কি কেবল ‘নিখুঁত ফলাফল’ উপস্থাপনের ওপর নির্ভর করে, নাকি অনুসন্ধান ও ভুল শুধরে নেওয়ার ‘স্বচ্ছ প্রক্রিয়ার’ ওপর?

এই প্রবন্ধে আমি আধুনিক যুগে বিজ্ঞানের প্রতি গণমানুষের আস্থার জটিল সমীকরণ ও সামাজিক-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট বিশ্লেষণ করেছি। একই সঙ্গে, প্রাতিষ্ঠানিক দূরত্ব ও গোপনীয়তার প্রাচীর ভেঙে উন্মুক্ত বিজ্ঞান, নাগরিক বিজ্ঞান ও সহজ বিজ্ঞান-যোগাযোগের মাধ্যমে বিজ্ঞানকে কীভাবে সাধারণ মানুষের বিশ্বস্ত ও স্বনির্ভর যৌথ সম্পদে রূপান্তর করা যায়—এখানে তারই এক সুনির্দিষ্ট রূপরেখা প্রস্তাব করছি।

বিজ্ঞানের চিরকালীন শিক্ষা
বাস্তবে বিজ্ঞানের প্রতি গণমানুষের আস্থা কোনো প্রাতিষ্ঠানিক অধিকার নয়, বরং তা সততার মাধ্যমে অর্জনের বিষয়।

আস্থার সংকট: জ্ঞান-ঘাটতি মডেল বনাম প্রাতিষ্ঠানিক অধিকার

ঐতিহাসিকভাবে বৈজ্ঞানিক সমাজ প্রায়শই সাধারণ মানুষকে একটি জ্ঞান-ঘাটতি মডেলের দৃষ্টিকোণ থেকে মূল্যায়ন করে এসেছে। এই মডেল ধরে নেয় যে সাধারণ মানুষ বিজ্ঞান বোঝে না বলেই একে সন্দেহ করে; আর তাই কেবল একমুখী তথ্যের প্রবাহ চাপিয়ে দিলেই এই বিশ্বাসের সংকট দূর হয়ে যাবে। কিন্তু আধুনিক সমাজবিজ্ঞান ও বিজ্ঞান-যোগাযোগ প্রমাণ করেছে যে, এই ধারণা কেবল ভ্রান্তই নয়, বরং অত্যন্ত ক্ষতিকর। বিজ্ঞান কোনো অলৌকিক আদেশ বা পরম ঐশ্বরিক বাণী নয় যে মানুষ তা চোখ বন্ধ করে মেনে নেবে।

বাস্তবে বিজ্ঞানের প্রতি গণমানুষের আস্থা কোনো প্রাতিষ্ঠানিক অধিকার নয়, বরং তা সততার মাধ্যমে অর্জনের বিষয়। এই আস্থা মূলত গড়ে ওঠে তিনটি মৌলিক স্তম্ভের ওপর—গবেষণার প্রক্রিয়া ও অর্থায়নের উৎস প্রকাশে শতভাগ স্বচ্ছতা, বিজ্ঞানের নিজস্ব সীমাবদ্ধতা ও অনিশ্চয়তাকে নির্দ্বিধায় স্বীকার করার বিনয় এবং সাধারণ মানুষকে কেবল নিষ্ক্রিয় সুবিধাভোগী না ভেবে গবেষণায় সক্রিয়ভাবে যুক্ত করার জনসম্পৃক্ততা। বৈজ্ঞানিক প্রতিষ্ঠানগুলো যখন নিজেদের ভুলত্রুটির ঊর্ধ্বে বলে দাবি করে, কিংবা এলিট প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর ভেতর আবদ্ধ থেকে সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনের আবেগ, সংস্কৃতি বা শঙ্কাকে অবিজ্ঞান বলে উড়িয়ে দেয়, তখনই সমাজ থেকে বিজ্ঞানের দূরত্ব তৈরি হয়। এই প্রাতিষ্ঠানিক বিচ্ছিন্নতাই মূলত সাধারণ মানুষের মনে সন্দেহের বীজ বুনে দেয় এবং ভুয়া তথ্য ও বিজ্ঞানবিরোধী মনোভাব বিস্তারে প্রধান অনুঘটক হিসেবে কাজ করে।

বিজ্ঞানচর্চা শখ নয়, অস্তিত্বের সংগ্রাম
গবেষক এনচাংউই মুনুং উল্লেখ করেছেন যে, গবেষণার প্রতিটি ধাপে জনগণের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা নিয়ে বছরের পর বছর ধরে তাত্ত্বিক আলোচনা হলেও বাস্তবে তার প্রয়োগ নগণ্য।

প্রাতিষ্ঠানিক অভিজাততন্ত্র ও দূরত্বের রাজনীতি

বিজ্ঞানচর্চা যখন কেবল নির্দিষ্ট গবেষণাগার, দামি জার্নাল এবং অ্যাকাডেমিক শব্দজালের মধ্যে সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ে, তখন তা সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন হতে শুরু করে। এই প্রাতিষ্ঠানিক অভিজাততন্ত্র বা এলিটিজম বিজ্ঞানের প্রধান শত্রু।

গবেষক এনচাংউই মুনুং উল্লেখ করেছেন যে, গবেষণার প্রতিটি ধাপে জনগণের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা নিয়ে বছরের পর বছর ধরে তাত্ত্বিক আলোচনা হলেও বাস্তবে তার প্রয়োগ নগণ্য। যখন সাধারণ মানুষ বা স্থানীয় সম্প্রদায় বুঝতে পারে না যে একটি বৈজ্ঞানিক আবিষ্কার তাদের জীবনকে কীভাবে প্রভাবিত করবে, কিংবা যখন তাদের মতামতকে আমলে নেওয়া হয় না, তখন বিজ্ঞানের উদ্দেশ্য নিয়ে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক।

উদাহরণস্বরূপ, কৃষি বায়োটেকনোলজি বা জিনোম এডিটিংয়ের মতো আধুনিক প্রযুক্তির কথাই ধরা যাক। বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিকোণ থেকে এগুলো খাদ্যনিরাপত্তা অর্জনে বিপ্লব ঘটাতে পারে। কিন্তু যতক্ষণ না পর্যন্ত কৃষকদের নিজস্ব অভিজ্ঞতা, স্থানীয় জ্ঞান এবং সামাজিক-অর্থনৈতিক শঙ্কাগুলোকে গবেষণার পরিকল্পনায় অন্তর্ভুক্ত করা হচ্ছে, ততক্ষণ পর্যন্ত সাধারণ মানুষের মধ্যে এই প্রযুক্তি নিয়ে সংশয় থেকে যাবে। বিজ্ঞানকে অবশ্যই তার হাতির দাঁতের মিনার থেকে নেমে এসে সমাজের মাটির সাথে মিশতে হবে।

শিশুদের মনে বিজ্ঞানের বিস্ময় সৃষ্টি করুন
কোনো আবিষ্কারের কতটুকু আমরা নিশ্চিতভাবে জানি এবং কতটুকু এখনো অজানা, তা স্পষ্ট করে বলাটাই হলো প্রকৃত সততা, যা দীর্ঘমেয়াদে জন-আস্থা অর্জন করে।

অনিশ্চয়তা: বিজ্ঞানের দুর্বলতা নয়, শক্তির প্রতীক

জন-আস্থা হারানোর পেছনে অন্যতম বড় কারণ হলো, বিজ্ঞান-যোগাযোগের ক্ষেত্রে অনিশ্চয়তাকে যেভাবে উপস্থাপন করা হয়। রাজনীতি বা ধর্ম যেখানে প্রায়শই পরম ও চূড়ান্ত সত্যের দাবি করে, বিজ্ঞান সেখানে ভিন্ন। বিজ্ঞান বলে, ‘আমাদের বর্তমান প্রমাণের ওপর ভিত্তি করে এটিই সেরা সিদ্ধান্ত; তবে নতুন তথ্য এলে সিদ্ধান্ত পরিমার্জিত হতে পারে।’

সাধারণ মানুষ প্রায়ই এই পরিবর্তনশীলতাকে বিজ্ঞানের ব্যর্থতা বা দ্বিধা হিসেবে ভুল বোঝে। কোভিড-১৯ মহামারির সময় আমরা দেখেছি, মাস্ক পরা বা ভ্যাকসিনের কার্যকারিতা নিয়ে সময়ের সাথে সাথে বৈজ্ঞানিক দিকনির্দেশনা পরিবর্তিত হয়েছে। বিজ্ঞানীরা যখন নতুন তথ্যের ওপর ভিত্তি করে নীতি পরিবর্তন করেছেন, সাধারণ মানুষের একাংশ তখন ভেবেছে বিজ্ঞানীদের নিজেদেরই কোনো ঠিকঠিকানা নেই।

এখানেই বিজ্ঞানের বস্তুনিষ্ঠতার মূল বার্তাটি পৌঁছাতে ব্যর্থতা দেখা যায়। এ পি জয়রামনের মতো বিজ্ঞান-যোগাযোগকারীরা যেমনটি উল্লেখ করেছেন, বিজ্ঞানের প্রতি আস্থা বিজ্ঞানের ফলাফলের অবিনশ্বরতার ওপর দাঁড়িয়ে থাকে না; বরং তা দাঁড়িয়ে থাকে এর পরীক্ষা-নিরীক্ষামূলক, স্বচ্ছ এবং স্ব-সংশোধনকারী প্রক্রিয়ার ওপর।

অনিশ্চয়তা বিজ্ঞানের ত্রুটি নয়। এটিই বিজ্ঞানের অগ্রগতির চালিকাশক্তি। বিজ্ঞান যদি সব উত্তর একবারে দিয়ে দিতে পারত, তবে নতুন অনুসন্ধানের কোনো প্রয়োজন থাকত না। বিজ্ঞানীদের উচিত সাধারণ মানুষের কাছে এই অনিশ্চয়তার গল্পটি সততার সাথে তুলে ধরা। কোনো আবিষ্কারের কতটুকু আমরা নিশ্চিতভাবে জানি এবং কতটুকু এখনো অজানা, তা স্পষ্ট করে বলাটাই হলো প্রকৃত সততা, যা দীর্ঘমেয়াদে জন-আস্থা অর্জন করে।

প্রযুক্তির বয়ঃসন্ধিকাল এবং সভ্যতার অনিশ্চিত গন্তব্য
অনিশ্চয়তা বিজ্ঞানের ত্রুটি নয়। এটিই বিজ্ঞানের অগ্রগতির চালিকাশক্তি। বিজ্ঞান যদি সব উত্তর একবারে দিয়ে দিতে পারত, তবে নতুন অনুসন্ধানের কোনো প্রয়োজন থাকত না।

উন্মুক্ত বিজ্ঞান ও তথ্যের অবাধ প্রবাহ

বিজ্ঞানের ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, বিশ্বজুড়ে যখনই কোনো প্রাকৃতিক বা স্বাস্থ্যগত দুর্যোগ দেখা দিয়েছে, উন্মুক্ত বিজ্ঞান, উন্মুক্ত উপাত্ত এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতা মানবজাতিকে সঠিক পথ দেখিয়েছে। ২০১৬ সালে বাংলাদেশে গমফসলে আকস্মিক ব্লাস্ট রোগের আক্রমণের সময় আন্তর্জাতিক গবেষকেরা খোলাখুলি উপাত্ত শেয়ার করে জীবাণুর জিনোম বিশ্লেষণ করেছিলেন এবং দ্রুত সমাধান এনেছিলেন। একইভাবে কোভিড-১৯ মহামারিতে বৈজ্ঞানিক তথ্যের অবাধ আদান-প্রদান বিশ্বজুড়ে দ্রুত প্রতিষেধক ও সমাধান উদ্ভাবনে সহায়ক হয়েছিল।

চিরাচরিতভাবে গবেষণা পেওয়ালের পেছনে বন্দি রাখা এবং উপাত্ত গোপন করার যে সংস্কৃতি ছিল, তা বিজ্ঞানকে করপোরেট বা শক্তিশালী দেশের স্বার্থের অনুগামী করে তুলেছিল। কিন্তু যখন গবেষণা ও তার উপাত্ত সবার জন্য উন্মুক্ত করে দেওয়া হয়, তখন আন্তর্জাতিক স্তরে দ্রুত সমস্যা সমাধানের পাশাপাশি গবেষণার স্বচ্ছতা বৃদ্ধি পায়। ডেটা প্রকাশ্যে এলে বিশ্বজুড়ে অন্যান্য গবেষকেরা তা পুনরায় পরীক্ষা করতে পারেন। ফলে ভুয়া গবেষণা বা ডেটা ম্যানিপুলেশনের সুযোগ কমে যায় এবং সাধারণ মানুষের কাছে বিজ্ঞানের বিশ্বাসযোগ্যতা বহুগুণ বাড়ে। উন্মুক্ত বিজ্ঞান প্রমাণ করে যে, বিজ্ঞান কোনো একক সংস্থা বা দেশের সম্পত্তি নয়—এটি সমগ্র মানবজাতির যৌথ সম্পদ।

প্রাযুক্তিক বয়োঃসন্ধিতে প্রয়োজন সচেতনতা
চিরাচরিতভাবে গবেষণা পেওয়ালের পেছনে বন্দি রাখা এবং উপাত্ত গোপন করার যে সংস্কৃতি ছিল, তা বিজ্ঞানকে করপোরেট বা শক্তিশালী দেশের স্বার্থের অনুগামী করে তুলেছিল।

ইনফোডেমিক, নাগরিক বিজ্ঞান ও মিডিয়ার ভূমিকা

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বর্তমান যুগে আমরা এক অভূতপূর্ব ইনফোডেমিক বা তথ্য-মহামারির মুখোমুখি, যেখানে মানুষের ভয় ও আবেগকে পুঁজি করে সত্যের চেয়ে ভুয়া খবর বা চক্রান্ত-তত্ত্ব অনেক বেশি দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। এই বৈরী পরিবেশে কেবল প্রথাগত প্রাতিষ্ঠানিক প্রেস রিলিজ দিয়ে সাধারণ মানুষের আস্থা অর্জন করা অসম্ভব। এই অচলাবস্থা কাটাতে প্রথমত বিজ্ঞানীদের নিজেদের ভূমিকার পরিবর্তন আনতে হবে; জটিল বৈজ্ঞানিক শব্দজাল বা পরিভাষা এড়িয়ে সহজ রূপক ও রূপকল্পের মাধ্যমে বিজ্ঞানের প্রক্রিয়াকে সাধারণ মানুষের কাছে ব্যাখ্যা করতে হবে। একই সাথে সিটিজেন সায়েন্স বা নাগরিক বিজ্ঞানের ব্যাপক প্রসার ঘটিয়ে কৃষি ও গণস্বাস্থ্যের মতো ক্ষেত্রে স্থানীয় কৃষক, স্বাস্থ্যকর্মী, শিক্ষক ও তরুণদের সরাসরি ডেটা সংগ্রহ ও সমস্যা চিহ্নিতকরণে যুক্ত করতে হবে।

একজন কৃষক যখন উপলব্ধি করেন যে তাঁর দেওয়া মাঠপর্যায়ের তথ্যের ভিত্তিতেই বিজ্ঞানীরা নতুন রোগপ্রতিরোধক জাত বা র‍্যাপিড ডায়াগনস্টিক কিট উদ্ভাবন করছেন, তখন বিজ্ঞানকে তিনি আর দূরের বিষয় মনে করেন না; বরং এতে তাঁর ও সমাজের গভীর মালিকানাবোধ ও আস্থার জন্ম হয়। বিজ্ঞান ও সমাজের সেতুবন্ধনে গণমাধ্যমের দায়িত্বশীল ভূমিকা তৈরি করতে বিশ্ববিদ্যালয় ও গবেষণা কেন্দ্রগুলোর উচিত স্থানীয় সাংবাদিকদের জন্য নিয়মিত ফেলোশিপ, সায়েন্স কমিউনিকেশন ওয়ার্কশপ এবং মিডিয়া-মিট-সায়েন্টিস্ট সংলাপের আয়োজন করা। এর মাধ্যমে সাংবাদিকেরা জিনোম এডিটিং, বায়োটেকনোলজি কিংবা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার মতো জটিল বিষয়গুলোকে প্রাঞ্জল ভাষায় জনগণের সামনে তুলে ধরার দক্ষতা অর্জন করবেন, যা সমাজে ভুল তথ্য ও অপপ্রচারের বিরুদ্ধে এক শক্তিশালী প্রতিরোধ গড়ে তুলবে।

বিজ্ঞানের সঙ্গে গড়তে হবে মানুষের সেতুবন্ধন
সিটিজেন সায়েন্স বা নাগরিক বিজ্ঞানের ব্যাপক প্রসার ঘটিয়ে কৃষি ও গণস্বাস্থ্যের মতো ক্ষেত্রে স্থানীয় কৃষক, স্বাস্থ্যকর্মী, শিক্ষক ও তরুণদের সরাসরি ডেটা সংগ্রহ ও সমস্যা চিহ্নিতকরণে যুক্ত করতে হবে।

নীতি, নৈতিকতা ও প্রথাগত কাঠামোর সংস্কার

বিজ্ঞান কখনো শূন্যে বাস করে না; এটি নীতিনির্ধারণ ও সমাজের নৈতিকতার সাথে গভীরভাবে যুক্ত। নীতিনির্ধারকেরা যখন বিজ্ঞানের নাম ভাঙিয়ে রাজনৈতিক এজেন্ডা বাস্তবায়ন করতে চান কিংবা বিজ্ঞানীরা যখন করপোরেট স্বার্থে গবেষণার সত্যকে বাঁকিয়ে উপস্থাপন করেন, তখন জন-আস্থায় সবচেয়ে বড় আঘাতটি আসে। এই প্রেক্ষাপটে পাণ্ডুলিপি প্রস্তুত থেকে শুরু করে বৈজ্ঞানিক যোগাযোগের প্রতিটি স্তরে সর্বোচ্চ মাত্রায় সততা ও স্বচ্ছ নৈতিক মানদণ্ড অক্ষুণ্ণ রাখা অপরিহার্য।

কেবল গবেষণায় স্বার্থের দ্বন্দ্ব বা অর্থায়নের উৎস প্রকাশ করাই যথেষ্ট নয়, বরং আন্তর্জাতিক মানহীন ও ভুয়া জার্নালে গবেষণা প্রকাশ করার অপসংস্কৃতি থেকেও বিজ্ঞানীদের কঠোরভাবে বিরত থাকতে হবে। ডেটা ম্যানিপুলেশন, প্লেজারিজম বা নৈতিক অনিয়মের কারণে বর্তমানে বৈজ্ঞানিক প্রবন্ধ প্রত্যাহারের ঘটনা যেভাবে বাড়ছে, তা সাধারণ মানুষের কাছে বিজ্ঞানের বিশ্বাসযোগ্যতাকে ধুলোয় মিশিয়ে দিচ্ছে। বিজ্ঞান যখন রাজনীতি, কায়েমি স্বার্থ ও অ্যাকাডেমিক অনৈতিকতা থেকে মুক্ত থেকে বস্তুনিষ্ঠ তথ্য উপস্থাপন করতে পারে এবং বিজ্ঞানীরা যখন ভুল হলে তা প্রকাশ্যে স্বীকার করার সাহস ও পেশাদার সততা দেখান, তখনই সাধারণ মানুষ বিজ্ঞানকে মানবকল্যাণের বিশ্বস্ত পথপ্রদর্শক হিসেবে পুনর্মূল্যায়ন করে।

প্রাচীন মিসরে বিজ্ঞানচর্চা
কেবল গবেষণায় স্বার্থের দ্বন্দ্ব বা অর্থায়নের উৎস প্রকাশ করাই যথেষ্ট নয়, বরং আন্তর্জাতিক মানহীন ও ভুয়া জার্নালে গবেষণা প্রকাশ করার অপসংস্কৃতি থেকেও বিজ্ঞানীদের কঠোরভাবে বিরত থাকতে হবে।

উপসংহার: আস্থার এক নতুন সামাজিক চুক্তি

বিজ্ঞানের প্রতি গণমানুষের আস্থা পুনরুদ্ধার করা কোনো ক্ষণিকের প্রক্রিয়া নয়; এটি একটি নিরবচ্ছিন্ন চর্চা ও প্রাতিষ্ঠানিক সংকল্প। নেচার সাময়িকীর সম্পাদকীয় এবং গবেষক এনচাংউই মুনুংয়ের বার্তাটি এখানে অত্যন্ত স্পষ্ট—বিজ্ঞানকে যদি সমাজে তার কার্যকর ভূমিকা পালন করতে হয়, তাহলে তাকে প্রাতিষ্ঠানিক হাতির দাঁতের মিনার ছেড়ে নম্র, উন্মুক্ত ও সমাজবান্ধব হতে হবে। সমাজের জন্য বিজ্ঞান—এই মূলনীতিকে সামনে রেখে কেবল উচ্চমানের পেওয়ালযুক্ত জার্নালে গবেষণাপত্র প্রকাশের সীমিত বৃত্তে আটকে না থেকে, সেই বৈজ্ঞানিক জ্ঞানের বাস্তব সামাজিক প্রভাব ও জনকল্যাণ নিশ্চিত করাই আজ সবচেয়ে বড় তাগিদ।

এই রূপান্তর অর্জনে নীতিনির্ধারণী পর্যায় থেকে প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয় ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানে পাণ্ডুলিপি প্রস্তুত, বৈজ্ঞানিক প্রকাশনা ও গবেষণার যোগাযোগের ক্ষেত্রে সততা, সর্বোচ্চ নৈতিক মানদণ্ড ও শতভাগ স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার জন্য মানসম্পন্ন প্রাতিষ্ঠানিক নির্দেশিকা প্রণয়ন ও প্রয়োগ করা জরুরি। গবেষণাগারের গোপনীয়তা থেকে বিজ্ঞানকে বের করে উন্মুক্ত বিজ্ঞান ও নাগরিক বিজ্ঞানের মাধ্যমে গণমানুষের বোধগম্য ভাষায় উপস্থাপন করা সম্ভব হলে বিজ্ঞান আর দূরবর্তী কোনো এলিট সত্তা থাকবে না, বরং জনগণের স্বনির্ভর ও নির্ভরযোগ্য যৌথ সম্পদে পরিণত হবে। মূলত বৈজ্ঞানিক প্রক্রিয়ার উন্মুক্ততা, সুসংহত নীতি-নৈতিকতা এবং গণমানুষের সাথে এই গভীর সামাজিক বন্ধনই ভবিষ্যতের যেকোনো সংকট মোকাবিলায় বিজ্ঞানের ওপর মানুষের ভরসাকে চিরস্থায়ী করে রাখবে।

লেখক: ডিন, গ্র্যাজুয়েট স্টাডিজ অনুষদ; প্রতিষ্ঠাতা পরিচালক ও অধ্যাপক, ইনস্টিটিউট অব বায়োটেকনোলজি অ্যান্ড জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং, গাজীপুর কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়বাংলায় বিজ্ঞানচর্চা ও রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

Read full story at source