সাতক্ষীরার গাজী নজরুল ইসলাম এখন কোন দলের এমপি
· Prothom Alo

জামায়াত থেকে বহিষ্কৃত গাজী নজরুলের দাবি, তিনি এখনো দলের এমপি। তবে এমপি পদের কী হবে, তা এখনো স্পষ্ট নয়।
Visit een-wit.pl for more information.
সাতক্ষীরা-৪ আসনের সংসদ সদস্য (এমপি) গাজী নজরুল ইসলামকে দল থেকে বহিষ্কারের পর তাঁর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে স্পিকার ও নির্বাচন কমিশনে চিঠি দিয়েছিল জামায়াতে ইসলামী। কিন্তু এখন পর্যন্ত তাঁর এমপি পদ বহাল আছে। এর ফলে প্রশ্ন উঠেছে, গাজী নজরুল এখন কোন দলের এমপি, নাকি তিনি স্বতন্ত্র হিসেবে সংসদে আছেন?
গাজী নজরুল ইসলাম অবশ্য নিজেকে এখনো জামায়াতের এমপি মনে করেন। গতকাল মঙ্গলবার তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমাকে দল থেকে বহিষ্কার করেছে, সদস্যপদ আমার আল্লাহর রহমতে এখনো আছে। আমি জামায়াতের সদস্য হিসেবেই তো এখনো আছি খাতা–কলমে, সব জায়গায়। এটা আমার যদ্দুর জানা। আর জামায়াত কী বলছে না বলছে, এটা আমার জানা নাই।’
সংসদ সদস্য গাজী নজরুল ইসলামকে বহিষ্কার করল জামায়াততবে জামায়াতের নেতাদের বক্তব্য ভিন্ন। তাঁদের ভাষ্য, বহিষ্কারের পর গাজী নজরুল আর দলের কেউ নন। তাঁকে বহিষ্কারের সিদ্ধান্ত জানিয়ে সংসদ সচিবালয় ও নির্বাচন কমিশনে (ইসি) চিঠি দেওয়া হয়েছে।
জামায়াতের কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদের সদস্য ও সাতক্ষীরা-১ আসনের এমপি মো. ইজ্জত উল্লাহ গতকাল প্রথম আলোকে বলেন, গাজী নজরুলকে বহিষ্কারের চিঠি সংসদ সচিবালয় ও নির্বাচন কমিশনে পাঠানো হয়েছে। এখন তিনি কী বলছেন, সে বিষয়ে জানা নেই। তাঁর সঙ্গে কোনো যোগাযোগও নেই।
একই বিষয়ে প্রথম আলো কথা বলেছে জামায়াতের দলীয় হুইপ রফিকুল ইসলাম খানের সঙ্গেও। দলের এই সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল বলেন, ‘এটা তো ওনাকেই (গাজী নজরুল ইসলাম) জিজ্ঞাসা করতে হবে।’
পরে গাজী নজরুল ইসলাম এ বিষয়ে কী বলেছেন, তা জানালে রফিকুল ইসলাম খান বলেন, ‘উনি ওনার কথা বলছেন, আর আমরা আমাদের কথা বললাম। …আমরা তো দল থেকে বহিষ্কার, তারপর স্পিকার, ইলেকশন কমিশনে সব জায়গায় চিঠি দেওয়া হয়েছে। আমাদের যতটুকু করার, আমরা তো সবই করেছি।’
জামায়াত থেকে বহিষ্কৃত গাজী নজরুল সংসদীয় কমিটির বৈঠকে আমন্ত্রণ পাননিসংসদে টানাপোড়েন
গাজী নজরুল ইসলামকে বহিষ্কারের পর সংসদে তাঁর অবস্থান নিয়েও একাধিক ঘটনা ঘটেছে। গত ১৮ আগস্ট মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির বৈঠকে তাঁকে আমন্ত্রণ জানানো হয়নি। ১০ সদস্যের ওই কমিটির সদস্য তিনি। কমিটির সভাপতি ও বিএনপিদলীয় এমপি মনিরুল ইসলাম চৌধুরী সে সময় প্রথম আলোকে জানিয়েছিলেন, জামায়াত না চাওয়ায় তাঁকে আমন্ত্রণ জানানো হয়নি।
এরপর সরকারি প্রতিশ্রুতি কমিটিতে গাজী নজরুলকে রাখার বিষয় নিয়েও সংসদে বিতর্ক হয়। বিরোধী দলের আপত্তির পর শেষ পর্যন্ত ওই কমিটি থেকে তাঁর নাম বাদ দেওয়া হয়।
এসব ঘটনায় সংসদে তাঁর দলীয় পরিচয় নিয়েও প্রশ্ন সামনে আসে। কিন্তু সংসদ সদস্য হিসেবে তাঁর আসন এখনো বহাল রয়েছে।
জামায়াত থেকে বহিষ্কৃত গাজী নজরুলের সংসদ সদস্য পদের কী হবেজামায়াতে ফেরার চেষ্টা গাজী নজরুলের
জামায়াত-সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্রের ভাষ্য, বহিষ্কারের পর গাজী নজরুলকে দল থেকে পদত্যাগের পরামর্শ দেওয়া হয়েছিল। তাঁকে বলা হয়েছিল, অতীতে এমন নজির রয়েছে যে বহিষ্কারের পর কেউ ভুল স্বীকার করে সংশোধিত হলে দীর্ঘ সময় পর হলেও দলে ফেরার সুযোগ পেয়েছেন। কিন্তু গাজী নজরুল সে পথে না গিয়ে দলের কেন্দ্রীয় নেতাদের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করছেন। উদ্দেশ্য, যেকোনো উপায়ে দলে ফেরা।
এসব সূত্র জানায়, গত ২০ আগস্ট রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের দিন বিরোধী দলের একাধিক এমপির সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করেন গাজী নজরুল। ওই নির্বাচনে বিরোধী দলের হয়ে ভোট দেওয়ার সুযোগ পাওয়াই তাঁর উদ্দেশ্য ছিল। তবে তিনি জামায়াত নেতাদের সাড়া পাননি। জামায়াতের কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদের আরও কয়েকজন নেতার সঙ্গেও গাজী নজরুল যোগাযোগের চেষ্টা করেছেন বলে দলীয় সূত্রগুলো জানিয়েছে।
প্রসঙ্গ জামায়াতের এমপি: মাননীয় স্পিকার, বলটা কিন্তু আপনার কোর্টেজামায়াতের নেতারা বলছেন, গাজী নজরুল যা–ই করুন, তাঁকে বহিষ্কারের সিদ্ধান্ত পরিবর্তনের কোনো সুযোগ নেই। তাঁর আসনে বিকল্প প্রার্থী তৈরির কাজও শুরু হয়েছে।
জামায়াতের কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদের একজন সদস্য নাম প্রকাশ না করার শর্তে প্রথম আলোকে বলেন, গাজী নজরুল যেভাবে দলে ফেরার চেষ্টা করছেন, তা গ্রহণযোগ্য নয়। তাঁর বহিষ্কারের বিষয়ে জামায়াত তার অবস্থান বদলাবে না।
গাজী নজরুলের বিষয়ে ব্যবস্থা নিতে স্পিকার ও ইসিকে চিঠি জামায়াতেরএমপি পদের কী হবে
গাজী নজরুলের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো সংবিধানে সংসদ সদস্য পদে অযোগ্যতার ক্ষেত্রে নৈতিক স্খলনের সঙ্গে ফৌজদারি অপরাধে দোষী সাব্যস্ত হয়ে কমপক্ষে দুই বছরের কারাদণ্ডের কথা বলা হয়েছে। শুধু কোনো রাজনৈতিক দল ‘নৈতিক স্খলনের’ অভিযোগে একজন সংসদ সদস্যকে বহিষ্কার করলে তাঁর সংসদ সদস্য পদ স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাতিল হবে—এমন বিধান সংবিধানে নেই।
বর্তমানে গাজী নজরুলের সংসদ সদস্য পদ থাকা না–থাকার বিষয়টি স্পিকার ও ইসির সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করছে। তবে জামায়াতের চিঠির পরিপ্রেক্ষিতে স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ এখনো কোনো সিদ্ধান্ত দেননি। নির্বাচন কমিশনের পক্ষ থেকেও এ বিষয়ে কোনো সিদ্ধান্ত পাওয়া যায়নি।
ভিডিও ভাইরাল: গাজী নজরুলের সংসদ সদস্য পদে থাকা নিয়ে যা জানাল ইসিসংসদ সচিবালয় সূত্র জানায়, দল থেকে বহিষ্কারের পর সংসদ সদস্য পদ নিয়ে একই ধরনের প্রশ্ন উঠেছিল দশম সংসদে আওয়ামী লীগের তৎকালীন এমপি আবদুল লতিফ সিদ্দিকীকে ঘিরে। ২০১৪ সালে বিতর্কিত মন্তব্যের জেরে আওয়ামী লীগ লতিফ সিদ্দিকীকে দল থেকে বহিষ্কার ও দলে তাঁর প্রাথমিক সদস্যপদ বাতিল করে। পরে তাঁর সংসদ সদস্য পদ বাতিলের সুপারিশ করে স্পিকারকে চিঠি দেয় দলটি। এর পরিপ্রেক্ষিতে তৎকালীন স্পিকার বিষয়টি নিষ্পত্তির জন্য প্রধান নির্বাচন কমিশনারকে চিঠি দেন।
তবে শেষ পর্যন্ত ইসিকে এই বিতর্কের কোনো সিদ্ধান্ত দিতে হয়নি। ২০১৫ সালের ১ সেপ্টেম্বর লতিফ সিদ্দিকী সংসদ অধিবেশনে যোগ দিয়ে বক্তৃতা দেওয়ার পর স্পিকারের কাছে পদত্যাগপত্র দেন। এরপর ৩ সেপ্টেম্বর লতিফ সিদ্দিকীর আসনটি শূন্য হওয়ার বিষয়টি সংসদকে অবহিত করেন তখনকার স্পিকার শিরীন শারমিন চৌধুরী।
সেই গাজী নজরুলকে সংসদীয় কমিটিতে রাখা নিয়ে সংসদে বিতর্কগাজী নজরুল ইসলামের বিষয়ে এমপি পদের বিষয়ে জানতে গতকাল জাতীয় সংসদের চিফ হুইপ নূরুল ইসলাম মনির হোয়াটসঅ্যাপে মেসেজ দেওয়া হয়। তিনি বর্তমানে ওমরাহ করতে মদিনায় অবস্থান করছেন। সেখান থেকে তিনি মেসেজে প্রথম আলোকে বলেন, তাঁকে (গাজী নজরুল) দল থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে। বর্তমানে তিনি কোনো দলের সঙ্গে যুক্ত নন। তবে সংবিধান অনুযায়ী তাঁর সংসদ সদস্য পদ হারানোর বাধ্যবাধকতা নেই।
৭৫ বছর বয়সী গাজী নজরুল ইসলাম সাতক্ষীরা–৪ আসন থেকে তৃতীয়বারের মতো এমপি নির্বাচিত হয়েছেন। সম্প্রতি তাঁর ব্যক্তিগত মুহূর্তের একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। সেখানে এক তরুণীর সঙ্গে তাঁকে দেখা যায়। এরপর গাজী নজরুলের বিরুদ্ধে ‘নৈতিক স্খলন’–এর প্রমাণ পাওয়া গেছে জানিয়ে গত ২২ জুলাই জামায়াত তাঁকে দল থেকে বহিষ্কার করে।
এরপর জামায়াতের পক্ষ থেকে গাজী নজরুল ইসলামের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য স্পিকার, নির্বাচন কমিশনসহ সংশ্লিষ্ট সব জায়গায় চিঠি পাঠানো হয়েছে। তাঁর সংসদ সদস্য পদ থাকবে কি না, সে প্রশ্নের নিষ্পত্তি এখনো স্পিকার ও ইসির সিদ্ধান্তের অপেক্ষায়।