আলী ভাই সঙ্গে সঙ্গে আমার গালে একটা চড় বসিয়ে দেন...
· Prothom Alo

‘কিছু স্মৃতি জীবনে অম্লান হয়ে রয়। সালটা ১৯৮২! জীবনের প্রথম সিনেমার গান গাই “ইন্সপেক্টর” সিনেমায়। গানটির সুর করেছিলেন প্রখ্যাত সুরকার ও সংগীত পরিচালক আলাউদ্দীন আলী।’ কিংবদন্তি সুরকার আলাউদ্দীন আলীর প্রয়াণবার্ষিকীতে এভাবেই তাঁকে স্মরণ করেছেন কুমার বিশ্বজিৎ। আজ রোববার সকালে নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে দেওয়া এক পোস্টে ক্যারিয়ারের শুরুর দিকের আবেগঘন একটি স্মৃতি তুলে ধরেন এই সংগীতশিল্পী।
Visit newssport.cv for more information.
আলাউদ্দীন আলীসেদিনের ঘটনা স্মরণ করে কুমার বিশ্বজিৎ লিখেছেন, ‘শ্রুতি স্টুডিওতে মহরত অনুষ্ঠানে সংগীতভুবনের সব রথী–মহারথীকে দেখে ভয়ে স্টুডিও থেকে বের হয়ে যাই। আলাউদ্দীন আলী ভাই পেছন পেছন এসে জিজ্ঞেস করলে আমি বলি, “আর গান গাইব না! চিটাগাং চলে যাব!” আলাউদ্দীন আলী ভাই সঙ্গে সঙ্গে আমার গালে একটা চড় বসিয়ে দেন! চড় দিয়ে বলেছিলেন, “যখন মাইক্রোফোনের সামনে দাঁড়াবে, তখন ভাববে তুমিই সেরা। আর যদি চিটাগাং চলে যাও, তাহলে তুমি শেষ।” ওনার মতো একজন সংগীতের মহাজনের আশীর্বাদের ছোঁয়া পাওয়া যে কারও জন্যই বড় প্রাপ্তি!’
যেসব গানে অমর থাকবেন আলাউদ্দীন আলীআলাউদ্দীন আলীর সেই শাসন ও উৎসাহই তাঁকে ঢাকায় থেকে সংগীতচর্চা চালিয়ে যাওয়ার সাহস দিয়েছিল বলে জানিয়েছেন কুমার বিশ্বজিৎ। তিনি লিখেছেন, ‘তবে এটা শাশ্বত সত্য, ওই দিন সন্তানতুল্য স্নেহ দানকারী আলাউদ্দীন আলী ভাই সেই চড় এবং উৎসাহ না দিলে ঢাকায় থাকার সাহসটা পেতাম না। জীবনের প্রতিটি ধাপে আপনাকে মিস করি আলী ভাই। জানি, এখনো আপনার আশীর্বাদ আমার মাথার ওপর আছে, থাকবে আমৃত্যু।’
আলাউদ্দীন আলী। ছবি: প্রথম আলোআজ ৯ আগস্ট আলাউদ্দীন আলীর ষষ্ঠ প্রয়াণবার্ষিকী। অসংখ্য জনপ্রিয় গানের স্রষ্টা এই সুরকার চলচ্চিত্রের গানকে স্বতন্ত্র শিল্পসুষমায় ভিন্ন উচ্চতায় নিয়ে গিয়েছিলেন। উচ্চাঙ্গসংগীত ও লোকসংগীতের নানা উপাদানের সঙ্গে আধুনিক আঙ্গিকের সূক্ষ্ম সংমিশ্রণে তিনি বাংলা চলচ্চিত্রের গানে তৈরি করেছিলেন নিজস্ব ঘরানা।
আলাউদ্দীন আলীর জন্ম ১৯৫২ সালের ২৪ ডিসেম্বর মুন্সিগঞ্জের টঙ্গিবাড়ী উপজেলার বাঁশবাড়ি গ্রামে। তাঁর বাবা ওস্তাদ জাদব আলী, মা জোহরা খাতুন। বাবা ও ছোট চাচা ওস্তাদ সাদেক আলীর কাছে তাঁর সংগীতে হাতেখড়ি। ছেলেবেলায় বেহালা বাজিয়ে অল পাকিস্তান চিলড্রেনস প্রতিযোগিতায় পুরস্কার পেয়েছিলেন তিনি।
আলাউদ্দীন আলীসংগীত পরিবারে বেড়ে ওঠা আলাউদ্দীন আলী পরিবারের গুণীজনদের কাছেই উচ্চাঙ্গসংগীতে তালিম নেন। কিশোর বয়সে ঢাকা অর্কেস্ট্রায় বেহালা বাজাতেন। সেই সুবাদে সুবল দাস, আলী হোসেন, শহীদ আলতাফ মাহমুদ, খান আতাউর রহমান, খন্দকার নুরুল আলম, সত্য সাহা ও আনোয়ার পারভেজের মতো সংগীতজ্ঞদের সংস্পর্শে আসেন। আনোয়ার পারভেজের সহকারী হিসেবেও কাজ করেছেন তিনি।
ষাটের দশকে বেহালাবাদক হিসেবে চলচ্চিত্রে কাজ শুরু করেন আলাউদ্দীন আলী। সংগীত পরিচালক হিসেবে তাঁর প্রথম চলচ্চিত্র মীর মোহাম্মদ হালিম পরিচালিত ‘সন্ধিক্ষণ’। ১৯৭৪ সালে ছবিটির কাজ করলেও এটি মুক্তি পায় ১৯৭৬ সালে। ছবিটি ব্যবসায়িক সাফল্য না পাওয়ায় শুরুতেই আলোচনায় আসতে পারেননি তিনি।
তাঁর ক্যারিয়ারের মোড় ঘুরিয়ে দেয় আমজাদ হোসেন পরিচালিত ‘গোলাপী এখন ট্রেনে’। ১৯৭৮ সালে মুক্তি পাওয়া ছবিটির ‘আছেন আমার মোক্তার’ এবং ‘হায় রে কপাল মন্দ, চোখ থাকিতে অন্ধ’ গান দুটি ব্যাপক জনপ্রিয়তা পায়। একই বছর মুক্তি পাওয়া ‘ফকির মজনু শাহ’ ছবির ‘প্রেমের আগুনে’, ‘সবাই বলে বয়স বাড়ে’ ও ‘চোখের নজর এমনি কইরা’ গানগুলোও শ্রোতাদের মধ্যে সাড়া ফেলে।
আলাউদ্দীন আলীপ্রথম আলোকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে আলাউদ্দীন আলী বলেছিলেন, ‘প্রথম ছবির সংগীত পরিচালনার পর দর্শকের সাড়া খুব একটা ভালো ছিল না। ছবিটি ব্যবসায়িক দিক থেকে তেমন সুবিধা করতে পারেনি। তাতে দুঃখ পাইনি। কিন্তু “গোলাপী এখন ট্রেনে” ছবির মাধ্যমেই আমি যেন সাফল্যের ট্রেনে চড়ে বসি। এরপর থেকে যা–ই করেছি, শ্রোতা–দর্শক আমাকে দুই হাত ভরে দিয়েছেন, আমাকে ভালোবেসেছেন।’
পুরো সত্তরের দশক তাঁর সম্মোহনী সুরের মায়ায় আচ্ছন্ন ছিল বাংলা গানের শ্রোতারা। চলচ্চিত্রের পাশাপাশি বাংলাদেশ বেতার ও বাংলাদেশ টেলিভিশনের জন্য নিয়মিত সুর করেছেন তিনি। ‘ও আমার বাংলা মা তোর’ ছিল টেলিভিশনের জন্য তাঁর সুর করা প্রথম গান। চলচ্চিত্র, বেতার ও টেলিভিশন মিলিয়ে প্রায় পাঁচ হাজার গানের সুর সৃষ্টি করেছেন আলাউদ্দীন আলী।
তাঁর সুরে চলচ্চিত্রের গানে যাত্রা শুরু হয়েছিল কনকচাঁপা, মাকসুদ, মিতালী মুখার্জি, কুমার বিশ্বজিৎ, সামিনা চৌধুরী, তপন চৌধুরী, আইয়ুব বাচ্চু ও হাসানের মতো শিল্পীদের। আলাউদ্দীন আলীর প্রয়াত স্ত্রী সালমা সুলতানা ছিলেন নজরুলসংগীতশিল্পী। তাঁর দ্বিতীয় স্ত্রী মিমি আলাউদ্দীনও আধুনিক গানের শিল্পী।
আলাউদ্দীন আলী প্রসঙ্গে গীতিকার গাজী মাজহারুল আনোয়ার বলেছিলেন, ‘আলাউদ্দীন আলী এত এত ভালো গান সুর করেছেন, নাম বলতে গেলেই কিছুদিন হারিয়ে যাবে। বাংলা চলচ্চিত্রের গান বলতেই একটা সময় তিনি। জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার পেয়েছেন সংগীত পরিচালক হিসেবে একাধিকবার, পেয়েছেন গীতিকার হয়েও। তাঁর ভাষায় বলতে গেলে, আশাজি ও লতাজি ছাড়া এ উপমহাদেশে এমন কোনো শিল্পী নেই, যিনি আমার গান গাননি।’
আলাউদ্দীন আলীসৈয়দ আব্দুল হাদীর মতে, আলাউদ্দীন আলী সুরের রং দিয়ে অন্তরের বিমূর্ত ভাবনাকে মূর্ত করে তুলতে পারতেন। তিনি বলেছিলেন, ‘“ও আমার বাংলা মা তোর আকুল করা রূপের সুধায়” বা “সূর্যোদয়ে তুমি সূর্যাস্তেও তুমি” গানের মধ্যে স্বদেশ ও প্রকৃতির প্রতি যে বিমুগ্ধতা–তন্ময়তা অথবা “আমায় গেঁথে দাও না মাগো” গানের মধ্যে যে স্বজন হারানোর বেদনাবোধ, তা যেন সুরের রংতুলিতে আঁকা একেকটি ছবি। বাংলা দেশাত্মবোধক গানের ভান্ডারে এসব গান ভাস্বর হয়ে থাকবে।’
সাবিনা ইয়াসমীন তাঁকে মনে করতেন ভারতীয় উপমহাদেশের শ্রেষ্ঠ সংগীত পরিচালকদের একজন। তাঁর ভাষায়, ‘তাঁরা যুগে যুগে আসেন না। এলে হয়তো এত দিনে চোখে পড়ত, জানতে পারতাম।’
‘এই দুনিয়া এখন তো আর সেই দুনিয়া নাই’, ‘আছেন আমার মোক্তার, আছেন আমার ব্যারিস্টার’, ‘আমায় গেঁথে দাও না মাগো একটা পলাশ ফুলের মালা’, ‘শত জনমের স্বপ্ন তুমি আমার জীবনে এলে’, ‘কী করে বলিব আমি আমার মনে বড় জ্বালা’, ‘ভালোবাসা যত বড় জীবন তত বড় নয়’, ‘চোখের নজর এমনি কইরা’, ‘যেটুকু সময় তুমি থাকো কাছে’, ‘যে ছিল দৃষ্টির সীমানায়’, ‘একবার যদি কেউ ভালোবাসত’, ‘সূর্যোদয়ে তুমি সূর্যাস্তেও তুমি’, ‘বন্ধু তিন দিন তোর বাড়িত গেলাম’, ‘জন্ম থেকে জ্বলছি মাগো’, ‘সুখে থাকো ও আমার নন্দিনী’ ও ‘একা একা কেন ভালো লাগে না’—তাঁর সুর করা বহু গান এখনো শ্রোতাদের মুখে মুখে ফেরে।
সুরস্রষ্টা আলাউদ্দীন আলী। ছবি: প্রথম আলোদীর্ঘদিন ধরে ফুসফুসের প্রদাহ, রক্তে সংক্রমণসহ নানা শারীরিক সমস্যায় ভুগছিলেন আলাউদ্দীন আলী। ২০১৫ সালে চিকিৎসার জন্য ব্যাংককে নেওয়ার পর তাঁর ফুসফুসে টিউমার ধরা পড়ে। পরে ক্যানসারের চিকিৎসাও চলে। বাংলাদেশ ও ব্যাংককে চিকিৎসা নেওয়ার পাশাপাশি সাভারের পক্ষাঘাতগ্রস্তদের পুনর্বাসন কেন্দ্রে দীর্ঘদিন ছিলেন তিনি।
শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে ২০২০ সালের ৮ আগস্ট ভোরে তাঁকে রাজধানীর একটি হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। সেখানে লাইফ সাপোর্টে রাখা হয়েছিল তাঁকে। পরদিন ৯ আগস্ট শেষনিশ্বাস ত্যাগ করেন বাংলা গানের এই কিংবদন্তি সুরকার। আজ আলাউদ্দীন আলীর চলে যাওয়ার ছয় বছর পূর্ণ হলো। কুমার বিশ্বজিতের মতো তাঁর সান্নিধ্য পাওয়া অনেক শিল্পীই এ দিনে স্মৃতির ঝাঁপি খুলে বসেছেন। কেউ মনে করছেন তাঁর স্নেহ ও শাসনের কথা, কেউবা ফিরে যাচ্ছেন সুর তৈরির দিনগুলোয়। আর শ্রোতাদের কাছে তিনি ফিরে আসছেন তাঁরই অমর সব গানে—যে সুরের মায়াজালে তিনি ফিরে আসবেন বছরের পর বছর।