প্রদর্শনীতে মুজিব আছে, জিয়া নেই—জামায়াত আমিরের ব্যাখ্যা, তারপরও প্রশ্ন
· Prothom Alo
জামায়াতে ইসলামী আয়োজিত ‘জুলাই এখনো শেষ হয়নি’ শীর্ষক স্থিরচিত্র প্রদর্শনীতে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ৭ মার্চের ভাষণের ছবি আছে। তবে সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের কোনো ছবি নেই। এমনকি তাঁর স্বাধীনতার ঘোষণার কথাও বলা হয়নি কোথাও।
Visit casino-promo.biz for more information.
বিষয়টি নিয়ে আলোচনা–সমালোচনা চলছে। এর মধ্যে আজ শনিবার বিষয়টি নিয়ে ব্যাখ্যা দিয়েছেন বিরোধীদলীয় নেতা ও জামায়াতে ইসলামীর আমির শফিকুর রহমান। তাঁর ব্যাখ্যার পরও প্রশ্ন রয়ে গেছে।
জুলাই গণ–অভ্যুত্থানের দ্বিতীয় বর্ষপূর্তিতে রাজধানীর মিন্টো রোডে বিরোধীদলীয় নেতার সরকারি বাসভবনে জামায়াত এই চিত্র প্রদর্শনীর আয়োজন করে। এটি শুরু হয় ৫ আগস্ট। শনিবার এই প্রদর্শনী শেষ হয়েছে।
কী আছে প্রদর্শনীতে
সরেজমিনে শনিবার বিকেলে দেখা যায়, প্রদর্শনীর আলাদা আলাদা অংশে ১৯৪৭ সালের দেশভাগ থেকে ২০২৪ সালের জুলাই গণ–অভ্যুত্থান পর্যন্ত ইতিহাসের বিভিন্ন পর্ব স্থান পেয়েছে।
১৯৪৭ সালে দেশভাগ থেকে ১৯৭০ সালের নির্বাচন অংশের নাম দেওয়া হয়েছে ‘আজাদী, অতঃপর স্বপ্নভঙ্গ’। এই অংশে আইয়ুব খান ও ইয়াহিয়া খানকে একনায়ক হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
দ্বিতীয় অংশের নাম দেওয়া হয়েছে ‘মুক্তিযুদ্ধ’। এই অংশের প্রথম ছবিটিই শেখ মুজিবুর রহমানের।
বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী আয়োজিত প্রদর্শনীতে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ৭ মার্চের ভাষণের ছবি রয়েছে। ঢাকা, ৮ আগস্ট ২০২৬এই অংশে জেনারেল নিয়াজির রাজাকার ক্যাম্প পরিদর্শন, বাংলাদেশিদের ওপর হানাদার বাহিনীর আক্রমণ এবং সর্বশেষ বিজয় অর্জনের চিত্র উঠে এসেছে।
তৃতীয় অংশের নাম দেওয়া হয়েছে ‘একনায়কতন্ত্র’। এই অংশে শেখ মুজিবুর রহমানকে স্বৈরশাসক হিসেবে উল্লেখ করেছে জামায়াত। এতে শেখ মুজিবুর রহমানের দেশে ফেরা, তাঁর পারিবারিক ভোজ, ১৯৭২ সালে ভারতীয় বাহিনীর বিদায়ী প্যারেডে শেষ মুজিবের অংশগ্রহণ, ১৯৭৪ সালে রক্ষীবাহিনীর তাণ্ডব, একই বছরের দুর্ভিক্ষ, ১৯৭৫ সালে একদলীয় বাকশাল প্রতিষ্ঠা, শেখ মুজিবুর রহমানের নিহতের খবর এবং জিয়াউর রহমানের নেতৃত্বে সিপাহি বিপ্লব সফল হওয়ার চিত্র দেখানো হয়েছে।
চতুর্থ অংশের নাম দেওয়া হয়েছে ‘সামরিক স্বৈরশাসন’। যেখানে বিএনপির সাবেক চেয়ারপারসন প্রয়াত বেগম খালেদা জিয়া ও জামায়াতের বর্তমান নায়েবে আমির সৈয়দ আবদুল্লাহ মোহাম্মদ তাহেরের স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে অংশ নেওয়ার তথ্য ও ছবি তুলে ধরা হয়েছে। এই অংশে হুসেইন মুহম্মদ এরশাদকে স্বৈরশাসক হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
পঞ্চম অংশের নাম দেওয়া হয়েছে ‘ফ্যাসিবাদ’। এই অংশে ২০০৬ সালে বিএনপির ক্ষমতা ছেড়ে দেওয়া পরবর্তী পরিস্থিতি, ২০০৯ সালে শেখ হাসিনার ক্ষমতা গ্রহণ থেকে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট সরকার পতনের আগ পর্যন্ত বিভিন্ন ঘটনাপ্রবাহ উল্লেখ করা হয়েছে।
জুলাই গণ–অভ্যুত্থানের দ্বিতীয় বর্ষপূর্তিতে মিন্টো রোডে বিরোধীদলীয় নেতার সরকারি বাসভবনে জামায়াত এই চিত্র প্রদর্শনীর আয়োজন করেছে। ঢাকা, ৮ আগস্ট ২০২৬ষষ্ঠ অংশের নাম ‘জুলাই গণ–অভ্যুত্থান’। এই অংশে শহীদ আবু সাঈদ, মীর মাহফুজুর রহমান মুগ্ধ ও ওয়াসিম আকরামের ছবির পাশাপাশি নাহিদ ইসলাম, আসিফ মাহমুদসহ সমন্বয়কদের ছবি, আন্দোলন চলাকালীন জামায়াত–শিবির নিষিদ্ধের খবর, আহত, গুলিবিদ্ধ শিক্ষার্থী–সাধারণ মানুষসহ আন্দোলনকালীন বিভিন্ন ছবি স্থান পেয়েছে।
বিতর্ক ও আমিরের ব্যাখ্যা
জামায়াতের আমিরের বাসায় প্রদর্শনীতে শেখ মুজিবুর রহমানের একাধিক ছবি থাকলেও জিয়াউর রহমানের একটি ছবিও নেই। এ নিয়ে কয়েক দিন ধরে আলোচনা–সমালোচনা চলছে।
বিষয়টি নিয়ে শনিবার কথা বলেন জামায়াতের আমির। বিভিন্ন দেশের কূটনীতিকদের সঙ্গে প্রদর্শনী পরিদর্শন শেষে সাংবাদিকদের তিনি বলেন, ‘কেউ কেউ প্রশ্ন তুলেছেন এখানে শেখ মুজিবের ৭ মার্চের ভাষণ আছে, জিয়াউর রহমান সাহেবের ২৬ মার্চের স্বাধীনতার ঘোষণা নেই কেন? উনি (জিয়াউর রহমান) তো অটোক্র্যাট শাসক ছিলেন না। তো ওনারটা এই জন্যই তো আমরা আনিনি।’
শফিকুর রহমান বলেন, ‘যারা কর্তৃত্ববাদী ছিল, যারা আগ্রাসী ছিল, জুলুমবাজ ছিল, আমরা তাদের এখানে তুলে এনেছি। এখানে দেখবেন আইয়ুব খান, ইয়াহিয়া খান সবাই আছে; কিন্তু কেউ বাদ পড়েনি। ইতিহাসের ধারাবাহিকতা তুলে আনা হয়েছে।’
জামায়াতের আমির বলেন, ‘বেগম জিয়া যে মুক্তি পেয়েছেন ন্যায্যতার ভিত্তিতে, সেটিও এখানে আমাদের ডকুমেন্টারিতে তুলে আনা হয়েছে। ইতিহাসে যার যে কল্যাণকর অবদান আছে, সবগুলোর প্রতি আমরা গভীর শ্রদ্ধাশীল। আমরা নির্মোহ, এ ব্যাপারে আমরা অবশ্যই বাস্তববাদী।’
প্রদর্শনীর উদ্দেশ্য ব্যাখ্যা করতে গিয়ে শফিকুর রহমান বলেন, কোনো সরকারের সফলতা দেখানোর জন্য এই আয়োজন করা হয়নি। যুগে যুগে যারা স্বৈরাচারী ছিল, তাদের চিত্র তুলে ধরা হয়েছে। জনগণ তখন কীভাবে নিগৃহীত হয়েছিল, সেটা তুলে ধরা হয়েছে। দেশের জনগণ, শহীদ ও শহীদ পরিবারের প্রত্যাশা তুলে ধরাই ছিল এই প্রদর্শনীর মূল উদ্দেশ্য।
তারপরও প্রশ্ন
জামায়াতের আমিরের ব্যাখ্যার পরও প্রশ্ন রয়ে গেছে। কেউ কেউ বলছেন, জামায়াত প্রদর্শনীতে স্বাধীনতার আগে ও পরে শেখ মুজিবুর রহমানের ‘ইতিবাচক ও নেতিবাচক’—দুই ধরনের ভূমিকাই তুলে ধরেছে।
যেমন শেখ মুজিবুর রহমানের ৭ মার্চের ভাষণের ছবির ওপরে জামায়াত লিখেছে, ‘৭ মার্চ ১৯৭১; রেসকোর্স ময়দানে ঐতিহাসিক ভাষণ দিচ্ছেন শেখ মুজিবুর রহমান’। আবার আরেকটি ছবিতে তাঁকে উল্লেখ করা হয়েছে স্বৈরশাসক হিসেবে।
প্রদর্শনীতে শুধু স্বৈরশাসকদের তুলে ধরা হয়েছে, বিষয়টি তা নয়। কারণ, খালেদা জিয়ার ছবি আছে। জুলাই গণ–অভ্যুত্থানের ছাত্রনেতাদের ছবি আছে; কিন্তু জিয়াউর রহমানের একটি ছবিও নেই।
এদিকে শনিবার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে সাদা দল ও ইউনিভার্সিটি টিচার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ইউট্যাব) যৌথ উদ্যোগে আয়োজিত ‘ফ্যাসিস্ট সরকার পতনে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকদের ভূমিকা’ শীর্ষক আলোচনা সভায় জামায়াতের চিত্র প্রদর্শনী নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন বিএনপির জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী।
রিজভী বলেন, জামায়াত আমিরের সরকারি বাসভবনে আয়োজিত চিত্র প্রদর্শনীতে শেখ মুজিবুর রহমানের ৭ মার্চের ভাষণ, মুক্তিযুদ্ধের বিভিন্ন চিত্র এবং জুলাই আন্দোলনের ছবি রয়েছে; কিন্তু সেখানে স্বাধীনতার ঘোষক জিয়াউর রহমানের কোনো ছবি, কথা বা পোস্টার রাখা হয়নি। বিষয়টি খুবই রহস্যজনক।