গণিতে আঠারো শতকের পুরস্কারের ইতিহাস
· Prothom Alo

সমস্যাই গণিতের প্রাণ। একটি ভালো সমস্যা দেখিয়ে দেয়, গণিতে এখনো কী জানা বাকি। তাই যুগে যুগে কঠিন সব গাণিতিক সমস্যাকে ঘিরে ছিল প্রবল আগ্রহ। সেই আগ্রহ আরও বাড়িয়ে দিতে নানা সময়ে ঘোষণা করা হয়েছে নানা লোভনীয় পুরস্কার। এসব পুরস্কারকে ঘিরেই জন্ম নিয়েছে গণিতের ইতিহাসের অনেক রোমাঞ্চকর অধ্যায়। আজ ১৮ শতকের পুরস্কারের ইতিহাস জানা যাক।
Visit asg-reflektory.pl for more information.
আগের পর্বঅষ্টাদশ শতাব্দী ছিল জ্ঞান-বিজ্ঞানের বিকাশে অ্যাকাডেমিগুলোর স্বর্ণযুগ। এর মধ্যে সবচেয়ে বিখ্যাত ছিল বার্লিন, প্যারিস এবং সেন্ট পিটার্সবার্গের অ্যাকাডেমিগুলো। সে যুগে এসব অ্যাকাডেমিতে ডাক পাওয়াটা যেকোনো গবেষকের জন্য ছিল স্বপ্নের মতো। সেখানে ডাক পাওয়া মানেই যুগের শ্রেষ্ঠ ও প্রাজ্ঞ বিজ্ঞানীদের সঙ্গে মিলেমিশে কাজ করা এবং নিজের স্বাধীন গবেষণাকে এগিয়ে নেওয়ার এক অনন্য সুযোগ।
এই অ্যাকাডেমিগুলো শুধু জ্ঞানচর্চার জায়গাই ছিল না, বরং বিজ্ঞানীদের গবেষণার দিকনির্দেশনা দেওয়ার ক্ষেত্রেও এগুলো বিশাল ভূমিকা রেখেছিল। অ্যাকাডেমিগুলো গুরুত্বপূর্ণ সমস্যাগুলো সবার সামনে তুলে ধরত এবং সেগুলো সমাধানের জন্য বিশাল অঙ্কের পুরস্কার ঘোষণা করত। এভাবেই তারা বিজ্ঞান গবেষণার মোড় ঘুরিয়ে দিত।
অ্যাকাডেমিগুলোর পুরস্কার প্রতিযোগিতা পরিচালনার একটা নির্দিষ্ট নিয়ম ছিল। প্রথমে নির্দিষ্ট বিষয়ের ওপর একটি সমস্যা ঠিক করা হতো। সমস্যা সমাধানের জন্য সাধারণত ১৮ মাস থেকে দুই বছর পর্যন্ত সময় দেওয়া হতো। পুরস্কার হিসেবে বিজয়ীকে নগদ অর্থ বা মেডেল দেওয়া হতো এবং তাঁর সমাধানটি প্রকাশিত হতো অ্যাকাডেমির নিজস্ব জার্নালে।
প্রতিযোগিতায় নাম গোপন রাখার জন্য প্রায়ই খাম ও ছদ্মনামের ব্যবস্থা থাকত, যাতে বিচারকেরা কারও নাম বা পদবি দেখে প্রভাবিত না হন। এই প্রতিযোগিতায় জেতা মানেই সমসাময়িক বিজ্ঞানী সমাজের ছোট্ট দুনিয়ায় রাতারাতি তারকা বনে যাওয়া!
১১ সংখ্যার ম্যাজিকঅ্যাকাডেমিগুলো গুরুত্বপূর্ণ সমস্যাগুলো সবার সামনে তুলে ধরত এবং সেগুলো সমাধানের জন্য বিশাল অঙ্কের পুরস্কার ঘোষণা করত। এভাবেই তারা বিজ্ঞান গবেষণার মোড় ঘুরিয়ে দিত।
তবে এই বিজ্ঞানী সমাজের পরিধি খুব বেশি বড় ছিল না। গুটিকয়েক গণিতবিদের মধ্যেই এটি সীমাবদ্ধ ছিল। বিখ্যাত ইতিহাসবিদ আডলফ হারনাক বার্লিন অ্যাকাডেমি অব সায়েন্সেসের ইতিহাসে তৎকালীন পরিস্থিতিটা খুব চমৎকারভাবে তুলে ধরেছিলেন। তিনি লিখেছেন, তখনকার দিনে জ্যোতির্বিজ্ঞান ছাড়া বড় বড় বৈজ্ঞানিক উদ্যোগ নেওয়ার মতো সংগঠন ছিল না। তাই ইউরোপের অ্যাকাডেমিগুলো প্রতিবছর যে পুরস্কারের ঘোষণা দিত, সেগুলোই হয়ে দাঁড়াত বিজ্ঞানীদের মধ্যে প্রতিযোগিতার প্রধান জায়গা। একই সঙ্গে এগুলো বৈজ্ঞানিক সমিতিগুলোর সম্মান ও বুদ্ধিমত্তার মানদণ্ড হিসেবেও কাজ করত... কারণ তখন নির্দিষ্ট বিষয়ের চেয়ে এমন সমস্যাগুলোকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হতো, যার জন্য পুরো বৈজ্ঞানিক ক্ষেত্রের ওপর গভীর জ্ঞান ও দূরদৃষ্টির প্রয়োজন হতো। অ্যাকাডেমির এই পুরস্কার প্রতিযোগিতাগুলোই মূলত বিজ্ঞানের বিভিন্ন শাখাকে বছরের পর বছর উন্নতির শিখরে তুলেছিল এবং বিজ্ঞানকে সবার জন্য একীভূত করার কাজ করেছিল। প্রশ্নগুলো পুরো ইউরোপের জ্ঞানপিপাসুদের উদ্দেশ্যে ছুড়ে দেওয়া হতো...। মজার ব্যাপার হলো, উত্তরের চেয়ে প্রশ্নটি কেমন হবে, তা নিয়েই বেশি কৌতূহল কাজ করত। কারণ, ওই প্রশ্ন তৈরির মধ্যেই লুকিয়ে থাকত আসল মুন্সিয়ানা!’
বিখ্যাত ইতিহাসবিদ আডলফ হারনাকহারনাক আরও লিখেছেন, ‘এই প্রতিযোগিতাগুলো বিজ্ঞানের নতুন বা তরুণ গবেষকদের জন্য ছিল না, বরং এগুলো ছিল বিজ্ঞানজগতের নেতাদের জন্য, যাঁরা এই চ্যালেঞ্জ নেওয়ার জন্য মুখিয়ে থাকতেন। তখনকার সময়ের সেরা চিন্তাবিদ ও পণ্ডিতেরা, যেমন অয়লার, ল্যাগ্রাঞ্জ, ডি'আলেম্বার্ট, কন্ডরসেট, কান্ট, রুশোরা এই বুদ্ধিবৃত্তিক যুদ্ধে নেমেছিলেন! আজকের দিনে এই ব্যাপারটা হয়তো বেশ অদ্ভুত মনে হতে পারে। কিন্তু অষ্টাদশ শতাব্দীর পণ্ডিতেরা ছিলেন একেকজন সর্বজ্ঞানী। তাঁরা বিজ্ঞানের বিভিন্ন শাখার অগুনতি সমস্যা বুঝতে পারতেন এবং সবগুলোই তাঁদের কাছে সমান আকর্ষণীয় মনে হতো। কিন্তু তাঁরা ঠিক কোন সমস্যাটা নিয়ে কাজ করবেন? ঠিক তখনই অ্যাকাডেমিগুলো তাদের পুরস্কার প্রতিযোগিতা নিয়ে এগিয়ে আসত। তারা পণ্ডিতদের সামনে একটি নির্দিষ্ট বিষয় তুলে ধরত এবং গ্যারান্টি দিত, তাঁদের কাজ দেখার জন্য আগ্রহী দর্শক থাকবে।’
এক কদমও এগোতে না পারার গোলকধাঁধাহারনাক আরও লিখেছেন, ‘এই প্রতিযোগিতাগুলো বিজ্ঞানের নতুন বা তরুণ গবেষকদের জন্য ছিল না, বরং এগুলো ছিল বিজ্ঞানজগতের নেতাদের জন্য, যাঁরা এই চ্যালেঞ্জ নেওয়ার জন্য মুখিয়ে থাকতেন।'
এ ধরনের পুরস্কারের প্রথম তহবিল গড়ে তুলেছিলেন কাউন্ট জিন রুইয়ে দে মেসলে নামে এক ধনী ফরাসি আইনজীবী। তিনি ১৭১৪ সালে তাঁর উইলে প্যারিসের একাডেমি ডেস সায়েন্সেস-এর জন্য ১ লাখ ২৫ হাজার লিভর (তৎকালীন ফরাসি মুদ্রা) দান করে যান। বলে রাখা ভালো, সেই যুগে ১ লাখ ২৫ হাজার লিভর ছিল বিশাল অঙ্ক! তখনকার একজন দক্ষ কারিগরও সারা বছর হাড়ভাঙা খাটুনি খেটে বড়জোর ৩০০ লিভর আয় করার আশা করতে পারতেন।
একাডেমি ডেস সায়েন্সেস এই বিশাল তহবিল লুফে নেয় এবং ১৭১৯ সাল থেকে প্রতি দুই বছর অন্তর পুরস্কার দেওয়ার রীতি শুরু করে। প্রথম দুটি প্রতিযোগিতার বিষয় ছিল গ্রহ ও জ্যোতিষ্কগুলোর গতিবিধি বোঝা এবং সমুদ্রে জাহাজের দ্রাঘিমাংশ নির্ণয় করা।
প্রিন্সিপিয়া ম্যাথমেটিকাএগুলো ছিল তখনকার সময়ের সবচেয়ে জটিল ও গুরুত্বপূর্ণ সমস্যা। আইজ্যাক নিউটন তাঁর প্রিন্সিপিয়া বইয়ে মহাকর্ষের যে নতুন তত্ত্ব দিয়েছিলেন, তা ইউরোপের মূল ভূখণ্ডের বিজ্ঞানীরা তখনো সেভাবে মেনে নিতে পারছিলেন না। নিউটনের তত্ত্বটি তখনকার চেনা ঘূর্ণন তত্ত্বকে সরিয়ে দিয়ে দূর থেকে কোনো বস্তুর প্রভাব ফেলার ধারণাকে সামনে এনেছিল। এই বিষয়টা তখনকার বিজ্ঞানীদের কাছে বেশ গোলমেলে মনে হতো। তা ছাড়া নিউটনের তত্ত্বে অনেক সাফল্যের মাঝেও একটি বড় সমস্যা ছিল, এটি চাঁদের গতিবিধিকে ঠিকমতো মেলাতে পারছিল না! আর চাঁদের এই গতিবিধি বুঝতে পারাটাই ছিল সমুদ্রে দ্রাঘিমাংশ নির্ণয়ের চাবিকাঠি।
গড়ের গোলকধাঁধা: লটারি, কয়েন ও মহাকাশে হারিয়ে যাওয়ানিউটনের তত্ত্বটি তখনকার চেনা ঘূর্ণন তত্ত্বকে সরিয়ে দিয়ে দূর থেকে কোনো বস্তুর প্রভাব ফেলার ধারণাকে সামনে এনেছিল। এই বিষয়টা তখনকার বিজ্ঞানীদের কাছে বেশ গোলমেলে মনে হতো।
প্যারিস অ্যাকাডেমির প্রতিযোগিতায় সবচেয়ে বিখ্যাত বিজয়ীদের একজন ছিলেন ড্যানিয়েল বার্নোলি। তিনি একাই মোট দশটি পুরস্কার জিতেছিলেন! তাঁর কাজের বেশির ভাগ জুড়েই ছিল সমুদ্রে জাহাজের গতিপথ ও নেভিগেশন ঠিক রাখার চেষ্টা। ১৭২৫ সালে তিনি বালি বা পানি দিয়ে ঘড়ি বানানোর সবচেয়ে ভালো আকার কী হতে পারে, তা নিয়ে একটি প্রবন্ধ লিখে প্রথমবারের মতো পুরস্কার জেতেন।
১৭৩৪ সালে তিনি তাঁর বাবা জোহান বার্নোলির সঙ্গে যৌথভাবে পুরস্কার জেতেন। সেবার বিষয় ছিল, গ্রহের কক্ষপথের ওপর সৌর বায়ুমণ্ডলের প্রভাব। মজার ব্যাপার হলো, ছেলের এই সাফল্যে বাবা জোহান মোটেও খুশি হতে পারেননি; তিনি রীতিমতো ঈর্ষান্বিত হয়েছিলেন! এরপর ড্যানিয়েল তাঁর ভাই জোহানের সঙ্গে চুম্বকত্ব এবং দিগন্ত দেখা না গেলে সমুদ্রে জাহাজের অবস্থান কীভাবে বের করা যায়, তা নিয়ে কাজ করে আরও পুরস্কার জেতেন। পেন্ডুলাম ঘড়িকে কীভাবে আরও উন্নত করা যায়, তা নিয়েও তিনি গবেষণা করেছিলেন।
প্যারিস অ্যাকাডেমির প্রতিযোগিতায় সবচেয়ে বিখ্যাত বিজয়ীদের একজন ছিলেন ড্যানিয়েল বার্নোলিঅন্যদিকে, ১৭১৪ সালের ২৮ জানুয়ারি রাশিয়ার সম্রাট পিটার দ্য গ্রেটের নির্দেশে সেন্ট পিটার্সবার্গ অ্যাকাডেমি অব সায়েন্সেস প্রতিষ্ঠিত হয়। তবে এর আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু হয় ১৭২৫ সালের ডিসেম্বরে, পিটারের মৃত্যুর ঠিক পরপরই। অ্যাকাডেমিটি যেন সে যুগের সর্বোচ্চ মান ধরে রাখতে পারে, সে জন্য পিটার আগে থেকেই বেশ কয়েকজন শীর্ষস্থানীয় গণিতবিদ ও বিজ্ঞানীকে নিয়োগ দিয়ে রেখেছিলেন। তাঁদের মধ্যে ছিলেন লিওনার্দো অয়লার, নিকোলাস বার্নোলি, ড্যানিয়েল বার্নোলি এবং ক্রিস্টিয়ান গোল্ডবাক। অয়লার যখন সেখানে যোগ দেন, তখন তাঁর বয়স মাত্র ২০ বছর! জীবনের বেশির ভাগ সময় তিনি এই অ্যাকাডেমির সঙ্গেই যুক্ত ছিলেন এবং এর জার্নালে অসংখ্য গবেষণাপত্র প্রকাশ করেছেন।
৩৫০ বছরের পুরোনো যে গাণিতক রহস্য আজও মুগ্ধ করে১৭২৫ সালে ড্যানিয়েল বার্নোলি বালি বা পানি দিয়ে ঘড়ি বানানোর সবচেয়ে ভালো আকার কী হতে পারে, তা নিয়ে একটি প্রবন্ধ লিখে প্রথমবারের মতো পুরস্কার জেতেন।
জার্মানির বার্লিন অ্যাকাডেমি অব সায়েন্সেস প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল ১৭০০ সালে। কিন্তু ফ্রেডরিক দ্য গ্রেট ১৭৪৩ সালে এটিকে প্যারিস অ্যাকাডেমির আদলে নতুন করে সাজানোর আগপর্যন্ত সেভাবে প্রভাব ফেলতে পারেনি। ফ্রেডরিক চেয়েছিলেন অ্যাকাডেমিটি যেন রাষ্ট্রের কল্যাণে কাজ করে। তাই তিনি নতুন বিজ্ঞানীদের প্যারিসের চেয়ে বেশি, কিন্তু সেন্ট পিটার্সবার্গের চেয়ে একটু কম বেতনে নিয়োগ দেন। তিনি পিয়েরে-লুই ডি মপার্টিউসকে অ্যাকাডেমির পরিচালক এবং অয়লারকে গণিত বিভাগের পরিচালক হিসেবে নিয়োগ দেন।
বার্লিন অ্যাকাডেমির প্রথম পুরস্কার প্রতিযোগিতার বিষয় ছিল বিদ্যুৎ। এই পুরস্কার জিতেছিলেন কাসেল শহরের অর্থমন্ত্রী ওয়েটজ! প্রথম দিকে পুরস্কার হিসেবে ৫০ স্বর্ণমুদ্রা দেওয়া হতো। পরে ১৭৪৭ সাল থেকে একটি করে সোনার মেডেল দেওয়ার রেওয়াজ শুরু হয়।
ফরাসি গণিতবিদ ডি'আলেম্বার্ট১৭৪৬ সালে ফরাসি গণিতবিদ ডি'আলেম্বার্ট তাঁর ‘বাতাসের সাধারণ কারণ নিয়ে ভাবনা’ প্রবন্ধের জন্য পুরস্কার জেতেন। অ্যাকাডেমির চ্যালেঞ্জটি ছিল বেশ অদ্ভুত—পৃথিবী সব দিক থেকে যদি শুধু মহাসাগর দিয়ে ঘেরা থাকত, তবে বাতাস সব সময় এবং সব জায়গায় কোন নিয়ম ও গতিতে চলত, তা নির্ধারণ করো!’
এই প্রতিযোগিতায় মোট ১১টি প্রবন্ধ জমা পড়েছিল। ডি'আলেম্বার্টের প্রবন্ধটি ছিল পদার্থবিজ্ঞানে আংশিক অন্তরক সমীকরণের প্রথম ব্যবহার। পরের বছর, ১৭৪৭ সালে বার্লিন অ্যাকাডেমির জার্নালে ডি'আলেম্বার্টের বিখ্যাত ওয়েভ ইকুয়েশন প্রকাশিত হয়।
অ্যাকিলিস ও কচ্ছপের দৌড়অ্যাকাডেমির চ্যালেঞ্জটি ছিল বেশ অদ্ভুত—পৃথিবী সব দিক থেকে যদি শুধু মহাসাগর দিয়ে ঘেরা থাকত, তবে বাতাস সব সময় এবং সব জায়গায় কোন নিয়ম ও গতিতে চলত, তা নির্ধারণ করো!
বার্লিন অ্যাকাডেমির প্রতিযোগিতাগুলো কতটা জনপ্রিয় ছিল, তা বোঝাতে গিয়ে ইতিহাসবিদ হারনাক বলেছিলেন, প্রতিটি সমস্যার জন্য অনেক সময় ডজনখানেক সমাধান জমা পড়ত। তবে বিজয়ীর নাম ঘোষণার আগপর্যন্ত কেউ জানত না কে কে এতে অংশ নিয়েছেন। নিয়ম ছিল, পয়েন্ট সমান হলে বিদেশি প্রতিযোগীকে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে। অষ্টাদশ শতাব্দীতে বার্লিন অ্যাকাডেমির পুরস্কার বিজয়ীদের মধ্যে ২৬ জন ছিলেন জার্মানি, ১০ জন ফরাসি, ২ জন সুইস এবং ইতালি ও ট্রান্সিলভেনিয়া থেকে ছিলেন একজন করে।
অ্যাকাডেমিগুলোর মধ্যে অনেক সময় একই বিষয়ের পুনরাবৃত্তি দেখা যেত। যেমন অয়লার একাই বিভিন্ন অ্যাকাডেমি থেকে মোট ১২টি পুরস্কার জিতেছিলেন! এতগুলো প্রতিযোগিতার বিচারকাজ সামলানোটা নেপথ্যে বেশ ঝামেলার ছিল। বিচারকদের রায়ই চূড়ান্ত বলে গণ্য হতো, তবে সবাই যে সেটা হাসিমুখে মেনে নিতেন তা-ও নয়!
যেমন, ১৭৫০-এর দশকের শুরুর দিকে ডি'আলেম্বার্ট অভিযোগ করেছিলেন, বার্লিন অ্যাকাডেমির একটি দল চক্রান্ত করে তাঁকে ফ্লুইড মেকানিকসবিষয়ক একটি পুরস্কার থেকে বঞ্চিত করেছে। সে বছর অবশ্য কেউই ওই পুরস্কারটি পায়নি। অভিমানে ডি'আলেম্বার্ট ১৭৫২ সালে নিজেই তাঁর প্রবন্ধটি প্রকাশ করেন। এতে তিনি একটি অদ্ভুত প্যারাডক্স দাঁড় করিয়ে দাবি করেন, ডিম্বাকার বস্তুর ওপর দিয়ে তরলের প্রবাহ বস্তুর সামনে ও পেছনে একই রকম হওয়া উচিত। অর্থাৎ তরলটির কোনো বাধাই থাকার কথা নয়!
যে গণিতের নিয়মে টিকে আছে পুরো মহাবিশ্ব১৭৫০-এর দশকের শুরুর দিকে ডি'আলেম্বার্ট অভিযোগ করেছিলেন, বার্লিন অ্যাকাডেমির একটি দল চক্রান্ত করে তাঁকে ফ্লুইড মেকানিকসবিষয়ক একটি পুরস্কার থেকে বঞ্চিত করেছে।
পরে অন্যরা তাঁর যুক্তির ভুল বের করেন। এর ফাঁকে অয়লারের সঙ্গে ডি'আলেম্বার্টের সম্পর্ক আরও খারাপ হতে থাকে। সমস্যাটা মূলত তাঁদের স্বভাবে ছিল। ডি'আলেম্বার্ট দারুণ আড্ডাবাজ হলেও লেখার ক্ষেত্রে ছিলেন বেশ ধীর এবং নিজের ধারণাগুলো পরিষ্কার করে বোঝাতে পারতেন না। অন্যদিকে অয়লার ছিলেন লেখার জাদুকর; তিনি খুব সহজেই যেকোনো কঠিন বিষয় পরিষ্কারভাবে লিখতে পারতেন। হয়তো ডি'আলেম্বার্ট এই ভেবে ঈর্ষান্বিত হতেন যে, তাঁর ধারণাগুলো প্রকাশিত হওয়ার পর অয়লার সেগুলো নিয়ে আরও ভালোভাবে কাজ করে ফেলছেন! ১৭৬৪ সালে যখন ডি'আলেম্বার্ট ফ্রেডরিক দ্য গ্রেটের কাছে অয়লারের পক্ষে কথা বলার চেষ্টা করেন, শুধু তখনই তাঁদের সম্পর্কের কিছুটা উন্নতি হয়। তবে তাঁর সেই চেষ্টা সফল হয়নি এবং অয়লার ১৭৬৬ সালে চিরতরে বার্লিন ছেড়ে সেন্ট পিটার্সবার্গে চলে যান।
অয়লার ছিলেন লেখার জাদুকর; তিনি খুব সহজেই যেকোনো কঠিন বিষয় পরিষ্কারভাবে লিখতে পারতেনবছরের পর বছর ধরে কিছু সমস্যা বারবার ফিরে আসত, যার বেশির ভাগই ছিল জ্যোতির্বিজ্ঞান এবং নেভিগেশন সংক্রান্ত। ১৭৪৮ সালে অয়লার প্যারিস অ্যাকাডেমির থ্রি-বডি প্রবলেম সমাধান করে পুরস্কার জেতেন। থ্রি-বডি প্রবলেম বলতে এখানে বৃহস্পতি, শনি এবং সূর্য সম্পর্কিত সমস্যাকে বোঝানো হয়েছে। পরে ফরাসি গণিতবিদ অ্যালেক্সিস ক্ল্যারট যখন নিউটনের মহাকর্ষের বিপরীত-বর্গীয় সূত্র নিয়ে হাবুডুবু খাচ্ছিলেন এবং সূত্রটিতে পরিবর্তন আনার কথা ভাবছিলেন, তখন অয়লার ১৭৫১ সালে সেন্ট পিটার্সবার্গ অ্যাকাডেমির জন্য চাঁদের গতিবিধিকে প্রতিযোগিতার বিষয় হিসেবে প্রস্তাব করেন।
গণিতের হিসাবে আর কতদিন টিকবে মানবজাতি১৭৪৮ সালে অয়লার প্যারিস অ্যাকাডেমির থ্রি-বডি প্রবলেম সমাধান করে পুরস্কার জেতেন। থ্রি-বডি প্রবলেম বলতে এখানে বৃহস্পতি, শনি এবং সূর্য সম্পর্কিত সমস্যাকে বোঝানো হয়েছে।
ক্ল্যারট এই চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করেন এবং হঠাৎ করেই আবিষ্কার করেন, নিউটনের সূত্র বাতিল করার কোনো দরকার নেই! বরং সমস্যাটিকে একটু অন্যভাবে বিশ্লেষণ করলেই নিউটনের সূত্র একদম নিখুঁত ফলাফল দেয়। চাঁদের গতিবিধির এই সফল সমাধানের কারণেই মহাকর্ষের বিপরীত-বর্গীয় সূত্রটি প্রতিষ্ঠিত হয় এবং অন্যান্য তত্ত্ব বাতিল হয়ে যায়। ক্ল্যারটের আরেকটি বড় সাফল্য ছিল ১৭৫৯ সালে হ্যালির ধূমকেতুর ফিরে আসার সময় নিখুঁতভাবে বলে দেওয়া।
প্যারিস অ্যাকাডেমি ১৭৬৪ সালে চাঁদের লাইব্রেশন বা দোলন নিয়ে একটি প্রতিযোগিতার আয়োজন করে। প্রশ্ন ছিল, চাঁদ কেন সব সময় আমাদের দিকে মোটামুটি একই মুখ করে থাকে এবং এর হালকা দোলনের কারণ কী? পরের বছর তারা বৃহস্পতির উপগ্রহগুলোর গতিবিধি নিয়ে আরেকটি প্রতিযোগিতা দেয়, যা জিতে নেন মাত্র ২৯ বছর বয়সী গণিতবিদ ল্যাগ্রাঞ্জ।
এই দুটি বিষয়ের পেছনেই মূল উদ্দেশ্য ছিল মহাকাশের গ্রহ-নক্ষত্রের গতিবিধিকে বিশাল এক ঘড়ি হিসেবে ব্যবহার করে সমুদ্রে জাহাজের দ্রাঘিমাংশ বের করা। ১৭৭০ সালে অয়লার এবং তাঁর ছেলে আলব্রেখট থ্রি-বডি প্রবলেমের ওপর কাজ করে যৌথভাবে পুরস্কার জেতেন। ১৭৭২ সালে একই বিষয়ে আবার পুরস্কার জেতেন অয়লার এবং ল্যাগ্রাঞ্জ!
সৌন্দর্যের মহাজাগতিক ব্যাকরণ১৭৯৭ সালে ল্যাগ্রাঞ্জ নিজেই তাঁর ফনকশনস অ্যানালিটিকস বইয়ে এর একটা গাণিতিক ব্যাখ্যা দাঁড় করান, যা ১৮২০-এর দশকে অগাস্টিন-লুই কশির নতুন ব্যাখ্যার আগ পর্যন্ত টিকে ছিল।
বিজ্ঞান ও গণিতের পদ্ধতিগত ঘাটতিগুলো দূর করার জন্যও অনেক সময় পুরস্কার ঘোষণা করা হতো। ১৭৮৪ সালে ল্যাগ্রাঞ্জ বার্লিন অ্যাকাডেমিকে ক্যালকুলাসের ভিত্তি মজবুত করার জন্য একটি প্রতিযোগিতার আয়োজন করতে রাজি করান। অ্যাকাডেমির ঘোষণাপত্রে বলা হয়েছিল, ‘উচ্চতর গণিতে অসীম বড় এবং অসীম ছোট পরিমাণগুলোর ব্যবহার আপাতদৃষ্টিতে স্ববিরোধী মনে হলেও এটি দারুণ কাজ করে। এখন এমন একটি নতুন নীতির প্রয়োজন, যা খুব বেশি কঠিন বা ক্লান্তিকর হবে না এবং যাকে সম্ভাব্য সব রকম কঠোরতা, পরিচ্ছন্নতা এবং সরলতার সঙ্গে উপস্থাপন করা যাবে।’
১৭৮৪ সালে ল্যাগ্রাঞ্জ বার্লিন অ্যাকাডেমিকে ক্যালকুলাসের ভিত্তি মজবুত করার জন্য একটি প্রতিযোগিতার আয়োজন করতে রাজি করানএই প্রতিযোগিতাটি জিতেছিলেন সাইমন এল’হুইলিয়ার। তবে বিচারকেরা তাঁর বা অন্য কারও সমাধান নিয়েই পুরোপুরি সন্তুষ্ট হতে পারেননি। শেষে ১৭৯৭ সালে ল্যাগ্রাঞ্জ নিজেই তাঁর ফনকশনস অ্যানালিটিকস বইয়ে এর একটা গাণিতিক ব্যাখ্যা দাঁড় করান, যা ১৮২০-এর দশকে অগাস্টিন-লুই কশির নতুন ব্যাখ্যার আগ পর্যন্ত টিকে ছিল।
সূত্র:১. কিথ ডেভলিন, দ্য মিলেনিয়াম প্রবলেমস (বেসিক বুকস)২. জাফে, আর্থার এবং অ্যান্ড্রু ওয়াইলস (সম্পা.); দ্য মিলেনিয়াম প্রাইজ প্রবলেমস (আমেরিকান ম্যাথমেটিক্যাল সোসাইটি)৩. ক্লে ম্যাথ ডটঅর্গ/মিলেনিয়াম প্রবলেমস৪. ম্যাথ সোসাইটি ডটকম৫. ওয়ার্ল্ড অব ম্যাথমেটিকস ডটকমমন্টি হল প্যারাডক্স: যে গাণিতিক ধাঁধা বিজ্ঞানীদেরও বোকা বানিয়েছিল