ইরানে ফের বড় হামলা চালানো থেকে কেন পিছিয়ে এলেন ট্রাম্প
· Prothom Alo

গত সপ্তাহে হোয়াইট হাউসে উপদেষ্টাদের সঙ্গে বৈঠকের পর মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের ওপর বড় ধরনের হামলা আপাতত স্থগিত রেখেছেন বলে খবর পাওয়া গেছে। মূলত ক্রমবর্ধমান অর্থনৈতিক চাপের কারণে নিজের দেশেই তিনি ও তাঁর দল রিপাবলিকান পার্টি তীব্র রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতার মুখে পড়েছে। সাম্প্রতিক জরিপগুলো বলছে, প্রায় ৭০ শতাংশ মার্কিন নাগরিকই এ যুদ্ধের বিপক্ষে।
প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথের মতো অনেকেই দাবি করছেন, ইরানি বাহিনী তাদের ‘ইতিহাসের সবচেয়ে দুর্বল অবস্থানে’ পৌঁছেছে। তবে এসব দাবি সত্ত্বেও বিশাল পরিসরে ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালানোর মতো সক্ষমতা ইরানের এখনো রয়েছে। কিছু গোয়েন্দা তথ্যে এমন ইঙ্গিতও পাওয়া যাচ্ছে যে ইরান তাদের অস্ত্র তৈরির সক্ষমতা পুনরায় গুছিয়ে এনেছে এবং তা আরও বাড়িয়েছে।
Visit newssport.cv for more information.
এদিকে সম্ভাব্য অভিযানের প্রস্তুতি হিসেবে ইরানকে লক্ষ্যবস্তু বানাতে যুক্তরাষ্ট্র মধ্যপ্রাচ্যে আরও যুদ্ধবিমান ও ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষাব্যবস্থা পাঠিয়েছে। দুটি মেরিন এক্সপেডিশনারি ইউনিট (এমইইউ) এবং ৮২তম বা ১০১তম এয়ারবোর্নের কিছু অংশ বর্তমানে ওই অঞ্চলে মোতায়েন রয়েছে।
ট্রাম্প যে কারণে ইরান যুদ্ধ থেকে বের হতে পারছেন নাতবে যুক্তরাষ্ট্র ও তার উপসাগরীয় মিত্রদের কাছে থাকা আকাশ প্রতিরক্ষা ক্ষেপণাস্ত্র এবং টমাহক ল্যান্ড-অ্যাটাক ক্ষেপণাস্ত্রের ভাঁড়ার প্রায় ফুরিয়ে এসেছে বলে খবর বেরিয়েছে, যা ট্রাম্পের জন্য সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে একটি বড় বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে।
ট্রাম্প এখনো চূড়ান্ত কোনো সিদ্ধান্ত না নিলেও তাঁর সামনে বেশ কিছু সামরিক বিকল্প রয়েছে।
প্রথম বিকল্প হচ্ছে বিমান ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা তীব্র করা। এই কৌশলের বড় একটি চ্যালেঞ্জ হলো, ইরানে সম্ভাব্য সামরিক লক্ষ্যবস্তুর তালিকা হয়তো ইতিমধ্যেই শেষ হয়ে এসেছে। ফলে আকাশপথে হামলা বাড়াতে হলে বাধ্য হয়েই বেসামরিক অবকাঠামোর ওপর আক্রমণ চালাতে হবে, যার মধ্যে রয়েছে বিদ্যুৎ উৎপাদনকেন্দ্র, পাওয়ার গ্রিড, সেতু, সড়কপথ এবং টেলিযোগাযোগ ও সংবাদমাধ্যমের নেটওয়ার্ক। এর প্রতিটি সম্ভাব্য পরিণতিই হবে মারাত্মক।
এ ক্ষেত্রে ট্রাম্পের বিরুদ্ধে যুদ্ধাপরাধের অভিযোগ উঠবে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি ইরানি জনগণের তীব্র ক্ষোভ ও ঘৃণা ছড়িয়ে পড়বে।
মার্কিন সেনাবাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত জেনারেল ব্যারি ম্যাককাফ্রে উল্লেখ করেছেন, হরমুজ প্রণালির ইরানি উপকূলভাগ নিয়ন্ত্রণে নিতে হলে অন্তত ১ লাখ ৫০ হাজার সেনার প্রয়োজন হতে পারে, যা বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের হাতে নেই।
অন্যদিকে ইরানের পাল্টা আঘাত হানার ক্ষমতাও খুব একটা কমবে না; উপরন্তু তারা উপসাগরীয় অঞ্চলের বিদ্যুৎ ও খাবার পানির প্ল্যান্টগুলোয় হামলা চালিয়ে বসতে পারে। এর ফল হবে এক চরম মানবিক বিপর্যয়, যা সামাল দেওয়ার মতো কোনো পূর্বপ্রস্তুতি যুক্তরাষ্ট্রের নেই। পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১৫০ থেকে ২০০ ডলারে গিয়ে ঠেকতে পারে, যা বিশ্ব অর্থনীতিতে ধস নামাবে।
দ্বিতীয় বিকল্প হচ্ছে পদাতিক বাহিনীর স্থল অভিযান। বর্তমানে মধ্যপ্রাচ্যে যে পরিমাণ মার্কিন সেনা মোতায়েন আছে, তা দিয়ে বাস্তবসম্মত কোনো সামরিক লক্ষ্য অর্জন করা সম্ভব নয়। একটি ‘এমইইউ’-তে সেনাসংখ্যা থাকে প্রায় ২ হাজার ৫০০ জন, যার মধ্যে মূল লড়াইয়ে অংশ নেওয়ার মতো পদাতিক সেনা মাত্র ৮০০ জন।
আর বিমানবাহিত এয়ারবোর্ন ইউনিটগুলো মাত্র কয়েক দিনের জন্য প্রয়োজনীয় রসদ নিয়ে মোতায়েন হয়। ফলে তাদের টিকে থাকার জন্য সার্বিক পুনঃ রসদ সরবরাহব্যবস্থা নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি।
হরমুজ প্রণালি ও ইরানের অবস্থান নির্দেশকারী মানচিত্রের ইলাস্ট্রেশনমার্কিন সেনাবাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত জেনারেল ব্যারি ম্যাককাফ্রে উল্লেখ করেছেন, হরমুজ প্রণালির ইরানি উপকূলভাগ নিয়ন্ত্রণে নিতে হলে অন্তত ১ লাখ ৫০ হাজার সেনার প্রয়োজন হতে পারে, যা বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের হাতে নেই।
তা ছাড়া খারগ দ্বীপে হামলা চালাতে হলে হরমুজ প্রণালির পশ্চিম প্রান্ত ধরে অত্যন্ত বিপজ্জনক এক দীর্ঘ জলপথ অতিক্রম করতে হবে। সেটি করতে গেলে প্রচুর মার্কিন সেনার প্রাণহানির আশঙ্কা তৈরি হবে।
তৃতীয় বিকল্প হচ্ছে পারমাণবিক অস্ত্রের সীমিত ব্যবহার। ট্রাম্পের সামনে আরেকটি বিকল্প হলো ট্রাম্প কর্তৃক পারমাণবিক অস্ত্রের একটি ‘প্রদর্শনমূলক’ ব্যবহার করা। তবে তা এক অভূতপূর্ব ও ভয়াবহ অশুভ পরিণতি ডেকে আনবে। ট্রাম্প আন্তর্জাতিকভাবে সরাসরি ‘যুদ্ধাপরাধী’ হিসেবে চিহ্নিত হবেন। শূন্যে বা ভূপৃষ্ঠে—অস্ত্রটি যেখানেই ও যেভাবেই বিস্ফোরণ ঘটানো হোক না কেন, তার ধ্বংসলীলা হবে অপূরণীয়।
বেবি শাহ থেকে আহমাদিনেজাদ: ইরান যুদ্ধ কি পশ্চিমা মিডিয়ার নতুন ‘স্ক্রিপ্ট’?যদি বায়ুমণ্ডলের বাইরে (এক্সো-অ্যাটমোস্ফিয়ারিক) এর বিস্ফোরণ ঘটানো হয়, তবে সেখান থেকে সৃষ্টি হওয়া ‘ইলেকট্রোম্যাগনেটিক পালস’ (ইএমপি) ইরানের সীমানা ছাড়িয়ে শত শত মাইল দূর পর্যন্ত আধুনিক সব চিপচালিত সিস্টেমকে অকেজো করে দেবে। উপসাগরীয় অঞ্চলসহ বিশ্বজুড়ে খুব কম সামরিক বাহিনীই বিপুল ব্যয়ের কারণে এই ইএমপি থেকে সুরক্ষিত। আর ভূপৃষ্ঠে বিস্ফোরণ ঘটালে যে তেজস্ক্রিয় মেঘের সৃষ্টি হবে, তা বাতাসের তোড়ে পূর্ব দিকে ভেসে গিয়ে ইরানের বাইরে বিপুলসংখ্যক মানুষকে আক্রান্ত করবে।
এর কারণে তৈরি হওয়া ভূরাজনৈতিক সংকটে সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়তে পারে ইউক্রেন যুদ্ধে। রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন হয়তো ইউক্রেনে পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহারের বিষয়টি নিয়ে নতুন করে ভাবতে উৎসাহিত হবেন।
পরস্পরবিরোধী এসব ঝুঁকিপূর্ণ সামরিক বিকল্পের মধ্যে সবচেয়ে ইতিবাচক পথ হলো যুদ্ধক্ষেত্র থেকে নিজেদের বিজয় ঘোষণা করা এবং আলোচনার টেবিলে ফিরে আসা। ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে পর্দার আড়ালে আলোচনা এখনো বন্ধ না হলেও ট্রাম্প চাইলে দাবি করতে পারেন যে তাঁর চাপের মুখেই ইরান আলোচনার টেবিলে এসেছে।
প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ইরান যুদ্ধে হেরে গেছেনকূটনৈতিক এ আলোচনার প্রথম পদক্ষেপ হওয়া উচিত হরমুজ প্রণালি ও বাব আল-মানদেবে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল পুনরায় স্বাভাবিক করা। এর ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম দ্রুত কমে আসবে এবং বিশ্ব শেয়ারবাজার চাঙা হয়ে উঠবে।
ট্রাম্প এ সাফল্যের পুরো কৃতিত্ব নিজের ঝুলিতে পুরতে পারবেন। একই সঙ্গে এক ভয়াবহ যুদ্ধ ও আসন্ন অর্থনৈতিক সংকট থেকে বিশ্ব রক্ষা পাবে। ট্রাম্পের জন্য বর্তমান পরিস্থিতিতে এটিই একমাত্র সঠিক ও বুদ্ধিদীপ্ত সিদ্ধান্ত হতে পারে।
ড. হারলান উলম্যান ওয়াশিংটন ডিসির আটলান্টিক কাউন্সিলের জ্যেষ্ঠ উপদেষ্টা। আল–জাজিরা থেকে অনূদিত।