জিমি হেনড্রিক্স কি আগেই বুঝেছিলেন, বাবার সঙ্গে এটাই শেষ দেখা

· Prothom Alo

২৬ জুলাই ১৯৭০। যুক্তরাষ্ট্রের সিয়াটল। সকাল থেকেই আকাশজুড়ে কালো মেঘ। অবিরাম বৃষ্টি। খোলা আকাশের নিচে বেসবল স্টেডিয়াম পরিণত হয়েছে কাদামাখা জলাভূমিতে। চারদিকে জমে আছে পানি, ভেজা বিদ্যুতের তার, দুর্ঘটনার আশঙ্কা। অথচ সেই প্রতিকূলতার মধ্যেই মঞ্চে উঠলেন গিটার জাদুকর জিমি হেনড্রিক্স। সেদিনের সেই পরিবেশনাই হয়ে থাকে তাঁর জীবনের শেষ পূর্ণাঙ্গ কনসার্ট।

Visit h-doctor.club for more information.

কনসার্টের পোস্টার

বেসবল মাঠে রকের মহাযজ্ঞ
সিয়াটলের সিকস স্টেডিয়াম আসলে সংগীত অনুষ্ঠানের জন্য উপযুক্ত কোনো জায়গা ছিল না। অনেকেরই জানা ছিল না, শহরে এমন কোনো বেসবল মাঠ আছে, যেখানে বড় কোনো রক কনসার্ট হতে পারে। ম্যাকক্লেলান ও রেইনিয়ার এলাকার পেছনে থাকা এই স্টেডিয়াম ছিল একেবারেই সাধারণ। কিন্তু ১৯৭০ সালের ২৬ জুলাই সেই মাঠে ব্যাট-বলের বদলে তৈরি হয়েছিল সংগীত ইতিহাসের এক স্মরণীয় অধ্যায়।

জিমি হেনড্রিক্সের এ কনসার্টের বেশির ভাগ টিকিট বিক্রি হয়ে যায় ছাড়ার পরপরই। কিছু টিকিট রাখা হয় অনুষ্ঠানের দিনের জন্য। সেগুলোর আশায়ও সকাল থেকে স্টেডিয়ামের বাইরে ভিড় বাড়তে থাকে। টানা বৃষ্টির মাঝেও লাইন থেকে কেউ সরে যাননি সেদিন।

জেমস বললেন, ‘আত্মজীবনী? একদমই না, নেভার’

তবে অনুষ্ঠানের আগে স্টেডিয়ামের দিকে তাকিয়ে জিমির নিজের মনেও প্রশ্ন জেগেছিল—এমন আবহাওয়ায় কনসার্ট করা কতটা ঠিক হবে?

অনুষ্ঠানের আয়োজক ছিলেন কনসার্টস ওয়েস্টের টম হিউলেট। তিনি পরে বলেন, সিয়াটল সব সময়ই তাঁদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ বাজার ছিল এবং জিমি এই চ্যালেঞ্জ নিতে প্রস্তুত ছিলেন।

সান ডিয়েগোর আগের অনুষ্ঠান শেষে একই বিমানে জিমির সঙ্গে সিয়াটলে এসেছিলেন হিউলেট। বিমানে তিনি জিমিকে আবহাওয়ার পূর্বাভাসের কথা জানান। তিনি বলেন, ‘আমি চিন্তিত ছিলাম। টানা বৃষ্টির কারণে সেদিন টিকিট কিনতে কে আসবে। মনে হচ্ছিল বড় ক্ষতির মুখে পড়ব। এমনকি অনুষ্ঠান বাতিল করার কথাও ভাবছিলাম। কিন্তু জিমি রাজি হননি। তিনি শুধু বলেছিলেন, “না।”’

বৃষ্টিতে ভিজেই অপেক্ষা করছে কানায় কানায় পূর্ণ দর্শক; মঞ্চে পরিবেশন করছে ব্যান্ড 'ক্যাকটাস'

জিমির অপেক্ষায়
বেলা তিনটায় দর্শকদের জন্য স্টেডিয়ামের দরজা খুলে দেওয়া হয়। কিন্তু তখনো বৃষ্টি থামেনি। সেদিনের কনসার্টে উপস্থিত ছিলেন শেলি জারমো নামের এক দর্শক। তখন তাঁর বয়স ছিল মাত্র ১৪ বছর। এর আগে তিনি হলিউড বোলের একটি অনুষ্ঠানে জিমির গান শুনেছিলেন।

সেই দিনের কথা স্মরণ করে শেলি বলেন, ‘তখন প্রচণ্ড বৃষ্টি হচ্ছিল। অনেকের কাছে ছাতা ছিল, কেউ পরেছিল রেইনকোট। আমার কাছে শুধু একটি হুডযুক্ত সোয়েটশার্ট ছিল। কিন্তু জিমির জন্য অপেক্ষা ছাড়া আর কিছু মাথায় ছিল না কারও।’

প্রথমে মঞ্চে ওঠে ব্যান্ড রুব টিউবেন অ্যান্ড দ্য রোন্ডোনাস। এরপর মঞ্চে আসে ক্যাকটাস। ভ্যানিলা ফাজ ব্যান্ডের সাবেক সদস্য টিম বোগার্ট ও কারমাইন অ্যাপিস-এর নেতৃত্বাধীন এই ব্যান্ডটির জন্য দিনটি ছিল বিশেষ। কারণ, তাদের প্রথম অ্যালবাম তখনই সেরা ২০০ অ্যালবামের তালিকায় ঢুকেছিল। এরপর পরিবেশন করে ক্যাট মাদার অ্যান্ড দ্য অল নাইট নিউজবয়েজ। সব ব্যান্ডই ভালো সাড়া পেলেও দর্শকদের চোখ ছিল এক জায়গায়—কখন মঞ্চে উঠবেন জিমি হেনড্রিক্স।

যুক্তরাষ্ট্রের সিয়াটলে অবস্থিত ‘জিমি হ্যান্ড্রিক্স পার্ক’-এ বিখ্যাত পার্পল হেজ গানের অনুপ্রেরণায় নির্মিত বেগুনি স্ট্যাটো কাস্টার গিটার স্থাপত্য

পরিবারসহ এলেন জিমি
গাড়িবহর নিয়ে স্টেডিয়ামে আসেন জিমি হেনড্রিক্স। সেদিন সেখানে তাঁর সঙ্গে ছিলেন বাবা আল হেনড্রিক্স, সৎমা আর বোনেরা। তাঁরা এসেছিলেন জিমির মালিবু গাড়িতে। গাড়িটি যখন স্টেডিয়ামের গেটে থামে, তখন এক নিরাপত্তারক্ষী এসে বললেন, ‘দুঃখিত, অনুষ্ঠানটির সব টিকিট বিক্রি হয়ে গেছে।’ জিমি হাসলেন। বললেন, ‘আমি জানি। সে কারণেই তো এখানে এসেছি। আমাদের ঢুকতে দিন, না হলে অনেক মানুষ হতাশ হবে।’ এরপর পেছনের গাড়িগুলোর দিকে ইঙ্গিত করে বললেন, ‘এরা আমার পরিবার। হলুদ ফক্সভাগেন পর্যন্ত সবাইকে ঢুকতে দিন।’

সিয়াটলের গ্রিনউড মেমোরিয়াল পার্কে জিমি হ্যান্ড্রিক্সের স্মৃতিস্তম্ভ

এক অমর পরিবেশনা
সন্ধ্যা ৬টা ১৫ মিনিটে উপস্থাপক এসে জানালেন, আর কয়েক মিনিটের মধ্যেই মঞ্চে আসবেন জিমি। কিন্তু সেই কয়েক মিনিট এক ঘণ্টায় পরিণত হয়। শেলি জারমো বলেন, ‘এ কথা শোনার পর আমরা সবাই সামনের দিকে চলে আসি। এরপর এক ঘণ্টা সেখানেই দাঁড়িয়ে থাকি।’

অবশেষে সন্ধ্যা ৭টা ১৫ মিনিটের কিছু পরে মঞ্চে ওঠেন জিমি হেনড্রিক্স। সিয়াটল তাঁকে স্বাগত জানাতে প্রস্তুত ছিল। কিন্তু জিমির মনে ছিল পুরোনো কিছু অভিমান। গানের ফাঁকে তিনি শহরটির প্রতি ক্ষোভ প্রকাশ করেন। বলেন, গারফিল্ড হাইস্কুলে পড়ার সময়কার কথা। জানান, নিজের প্রতিভার স্বীকৃতি পেতে তাঁকে কীভাবে উত্তর-পশ্চিমাঞ্চল ছেড়ে দূরে যেতে হয়েছিল। জিমির গলা ধরে আসছিল, দর্শকেরা সেদিন কেঁদেছিলেন তাঁর সঙ্গে।

পারফরম্যান্সের শুরুতে একজন নারী দর্শককে একটি গান উৎসর্গ করেন জিমি। এরপর নিজের ৯ বছর বয়সী বোন জেনিকে দেন জীবনের অন্যতম স্মরণীয় মুহূর্ত। ‘পার্পল হেইজ’ গান গাওয়ার সময় জিমি তাঁর দিকে ইশারা করে গেয়ে ওঠেন—‘ওই মেয়েটি আমার ওপর জাদু করেছে।’

জেনি পরে বলেন, ‘ভাইয়া আমার দিকেই ইশারা করছিল। আর পুরো দর্শক বোঝার চেষ্টা করছিল, সে কাকে দেখাচ্ছে।’

ওয়াশিংটনের রেন্টনে অবস্থিত ‘জিমি হ্যান্ড্রিক্স মেমোরিয়াল’, যা এই কিংবদন্তি সংগীতশিল্পীর চূড়ান্ত সমাধিস্তম্ভ

বৃষ্টি থামাতে পারেনি জিমিকে
মঞ্চের পরিস্থিতি ছিল ভয়াবহ। মঞ্চের ওপর বড় ত্রিপল টানানো হলেও অতিরিক্ত পানির ভারে সেটি নিচের দিকে ঝুলে পড়ে। কখনো কখনো সেটি এসে জিমির মাথাও ছুঁয়ে যাচ্ছিল। শেষ পর্যন্ত জিমি ত্রিপলের নিচে যাওয়া বন্ধ করে দেন।

সে মুহূর্ত স্মরণ করে দর্শক শেলি জারমো বলেন, ‘সে সম্পূর্ণ ভিজে গিয়েছিল। আঙুল, কপাল, গিটার—সবকিছু থেকে পানি পড়ছিল। আমি ভয় পাচ্ছিলাম, সে বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে যাবে।’

সিয়াটলে বাবা আল হ্যান্ড্রিক্সের সঙ্গে জিমি হ্যান্ড্রিক্স (১৯৬৮) ছবি: জেমস ‘আল’ হ্যান্ড্রিক্স কালেকশন / অথেনটিক হ্যান্ড্রিক্স, এলএলসি

শেষ রাতের গান
সেদিনের প্রায় এক ঘণ্টার পরিবেশনায় জিমি গেয়েছিলেন—‘ফায়ার’, ‘মেসেজ টু লাভ’, ‘লাভার ম্যান’, ‘মেশিন গান’, ‘স্টার স্প্যাংলড ব্যানার’, ‘পার্পল হেইজ’, ‘ফ্রিডম’, ‘রেড হাউস’ন এর মতো তাঁর জনপ্রিয় সব গান। এর সঙ্গে চমক হিসেবে গান—‘মিডনাইট লাইটনিং’ এবং ‘হে বেবি’।

‘মিডনাইট লাইটনিং’ গানটি জিমি ওই বছরের মার্চে লিখেছিলেন। একই সময়ে এটি রেকর্ডও করেছিলেন। এরপর খুব কমই মঞ্চে গানটি পরিবেশন করেন।

বৃষ্টির কারণে অনেক দর্শক অনুষ্ঠান শেষ হওয়ার আগেই চলে যেতে শুরু করেন। তবে তা জিমির গানের কারণে নয়। কেউ অসুস্থ হওয়ার ভয়ে, কেউ নিউমোনিয়ার আশঙ্কায় মাঠ ছেড়েছিলেন।

১৯৬৮ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি সিয়াটল সেন্টার অ্যারেনার ব্যাকস্টেজে বোন জেনি হ্যান্ড্রিক্সের সঙ্গে জিমি হ্যান্ড্রিক্স

শেষবিদায়
পরদিনও সেই বৃষ্টিতে ভেজার ধকল সামলাচ্ছিলেন জিমি। পরবর্তী অনুষ্ঠান ছিল হাওয়াইয়ে। তাঁকে নিতে বাড়িতে পৌঁছান সড়ক ব্যবস্থাপক জেরি স্টিকেলস। কিন্তু জিমির বাবা আল হেনড্রিক্স জানান, ছেলে ভালো অনুভব করছে না, এখনো ঘুমাচ্ছে। তাই তাঁকে না জাগানোর সিদ্ধান্ত হয়।

পরদিন জিমি হাওয়াইয়ের উদ্দেশে রওনা হন। পরিবারের সদস্যরা তাঁকে বিমানবন্দরে পৌঁছে দেন। জিমির বোন জেনি বলেন, ‘বিমানবন্দরে দৃশ্যটা অদ্ভুত ছিল। জিমি আর বাবা দুজনেই এদিক-ওদিক হাঁটছিলেন, একে অপরের দিকে তাকাচ্ছিলেন। কেউ কিছু বলেননি। কিন্তু মনে হচ্ছিল, তাঁরা বুঝতে পারছেন—হয়তো আর কখনো দেখা হবে না।’
এর সাত সপ্তাহেরও কম সময় পর, ১৯৭০ সালের ১৮ সেপ্টেম্বর মাত্র ২৭ বছর বয়সে মারা যান জিমি হেনড্রিক্স।

আর সিয়াটলের সেই বৃষ্টিভেজা রাতটি থেকে যায় তাঁর শেষ পূর্ণাঙ্গ কনসার্ট হিসেবে—যেখানে ঝড়, পানি আর মৃত্যুঝুঁকির মধ্যেও একজন শিল্পী শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত বাজিয়ে গেছেন তাঁর গিটার।


জিমি হেনড্রিক্স ডটকম অবলম্বনে

Read full story at source