আর্জেন্টাইনরা কেন স্প্যানিশ ভাষায় কথা বলে
· Prothom Alo

বিশ্ব ফুটবলে স্পেন ও আর্জেন্টিনা—দুই দেশই নিজেদের স্বতন্ত্র পরিচয়ে প্রতিষ্ঠিত। ভাষা এক হলেও ইতিহাস, সংস্কৃতি ও জাতীয় চরিত্রে তাদের মধ্যে রয়েছে স্পষ্ট পার্থক্য। অথচ কয়েক শতাব্দী আগে এই দুই দেশের সম্পর্ক ছিল উপনিবেশ আর শাসনের।
Visit sportbet.rodeo for more information.
পঞ্চদশ শতকের শেষ ভাগ ছিল ইউরোপীয় সমুদ্র অভিযানের যুগ। নতুন ভূখণ্ডের সন্ধানে তখন স্পেন ও পর্তুগালের নাবিকেরা মহাসাগর চষে বেড়াচ্ছেন। ১৪৯৪ সালের টরডেসিলাস চুক্তির মাধ্যমে দুই শক্তিধর দেশ একটি কাল্পনিক রেখা টেনে দক্ষিণ আমেরিকাকে নিজেদের প্রভাববলয়ে ভাগ করে নেয়। এর ফলে বর্তমান ব্রাজিলের অধিকাংশ অঞ্চল পর্তুগালের অধীনে গেলেও দক্ষিণ আমেরিকার বিস্তীর্ণ পশ্চিম ও দক্ষিণাঞ্চল স্পেনের নিয়ন্ত্রণে চলে আসে। এ ভূরাজনৈতিক সিদ্ধান্তই ভবিষ্যতের আর্জেন্টিনার ইতিহাসে গভীর প্রভাব ফেলে।
ষোড়শ শতকের শুরুতে স্প্যানিশ অভিযাত্রীরা দক্ষিণ আমেরিকার দক্ষিণ-পূর্ব উপকূলে পৌঁছাতে শুরু করেন। ১৫১৬ সালে হুয়ান দিয়াস দে সোলিস একটি বিশাল নদীমোহনায় প্রবেশ করলেও স্থানীয় আদিবাসীদের আক্রমণে প্রাণ হারান। পরে সেবাস্তিয়ান ক্যাবট একই অঞ্চলে এসে স্থানীয় অধিবাসীদের কাছে রুপার অলংকার এবং অভ্যন্তরে বিশাল রুপার খনির গল্প শোনেন। সে কাহিনির সূত্র ধরেই নদীটির নাম হয় রিও দে লা প্লাতা, অর্থাৎ ‘রুপার নদী’। যদিও বাস্তবে সেই কল্পিত রুপার পাহাড় কখনোই খুঁজে পাওয়া যায়নি; তবু লাতিন শব্দ আর্জেন্টাম (রুপা) থেকেই পরবর্তীকালে দেশটির নাম হয় আর্জেন্টিনা।
দীর্ঘ স্বাধীনতাসংগ্রামের পর ৯ জুলাই ১৮১৬ সালে আর্জেন্টিনা আনুষ্ঠানিকভাবে স্পেনের কাছ থেকে স্বাধীনতা ঘোষণা করে।স্প্যানিশদের বসতি স্থাপনের পথ মোটেও সহজ ছিল না। ১৫৩৬ সালে প্রথম বুয়েনস এইরেস প্রতিষ্ঠার পর স্থানীয় কুয়েরান্দি জনগোষ্ঠী প্রবল প্রতিরোধ গড়ে তোলে। খাদ্যসংকট ও ধারাবাহিক সংঘর্ষের কারণে কয়েক বছরের মধ্যেই স্প্যানিশদের সেই বসতি ছেড়ে যেতে হয়। পরবর্তী সময়ে ডায়াগুইটা, মাপুচে ও অন্যান্য আদিবাসী গোষ্ঠীও দীর্ঘদিন প্রতিরোধ অব্যাহত রাখে। শেষ পর্যন্ত আগ্নেয়াস্ত্র, ঘোড়সওয়ার বাহিনী ও উন্নত সামরিক কৌশলের জোরে স্প্যানিশরা অঞ্চলটির ওপর কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করে।
তবে যুদ্ধের চেয়ে ভয়াবহ ছিল ইউরোপ থেকে আসা সংক্রামক রোগের প্রভাব। গুটিবসন্ত, ইনফ্লুয়েঞ্জাসহ নানা রোগে বিপুলসংখ্যক আদিবাসীর মৃত্যু ঘটে। এসব রোগের বিরুদ্ধে তাদের স্বাভাবিক প্রতিরোধক্ষমতা ছিল না। যুদ্ধ, রোগ এবং ভূমি দখলের সম্মিলিত আঘাতে আদিবাসী সমাজ ব্যাপকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে।
১৭৭৬ সালে স্পেন ভাইসরয়্যালটি অব দ্য রিও দে লা প্লাতা প্রতিষ্ঠা করে। এরপর বুয়েনস এইরেস দ্রুত একটি গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক বন্দরে পরিণত হয়। গবাদিপশু, চামড়া ও কৃষিপণ্য ইউরোপে রপ্তানি হতে থাকে। একই সময়ে বিশাল খামার বা এস্তানসিয়া গড়ে ওঠে, বিস্তার লাভ করে ক্যাথলিক ধর্ম ও স্প্যানিশ ভাষা। ইউরোপীয় ও স্থানীয় জনগোষ্ঠীর মিশ্রণে জন্ম নেয় নতুন সামাজিক পরিচয়—মেস্টিজো সমাজ। পাশাপাশি পাম্পাস অঞ্চলে বিকশিত হয় গাউচো সংস্কৃতি, যা আজও আর্জেন্টিনার জাতীয় ঐতিহ্যের অন্যতম প্রতীক।
কোকো, কফি আর ফুটবলের বাইরেও আইভরিকোস্ট কেন বিখ্যাত২০২২ সালের বিশ্বকাপ জয়ের পর বুয়েন্স এইরেসের দৃশ্য১৮১০ সালের মে বিপ্লব স্প্যানিশ শাসনের অবসানের সূচনা করে এবং দীর্ঘ সংগ্রামের পর ১৮১৬ সালের ৯ জুলাই, আর্জেন্টিনা স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। এরপর উনিশ ও বিশ শতকের শুরুতে ইতালি, স্পেনসহ ইউরোপের বিভিন্ন দেশ থেকে ব্যাপক অভিবাসন দেশটির জনসংখ্যা ও সংস্কৃতিকে নতুন রূপ দেয়। আজ আর্জেন্টিনার অধিকাংশ মানুষ নিজেদের ইউরোপীয় বংশোদ্ভূত হিসেবে পরিচয় দিলেও আধুনিক জিনগত গবেষণায় দেখা যায়, তাদের উল্লেখযোগ্য অংশের মধ্যেই আদিবাসী পূর্বপুরুষের উত্তরাধিকার এখনো বহমান।
এ দীর্ঘ ইতিহাসই আজকের আর্জেন্টিনাকে গড়ে তুলেছে। স্প্যানিশ ভাষা, ইউরোপীয় অভিবাসনের প্রভাব ও আদিবাসী ঐতিহ্যের অনন্য মিশ্রণে দেশটি সৃষ্টি করেছে নিজস্ব সাংস্কৃতিক পরিচয়। সেই পরিচয়ের প্রকাশ দেখা যায় ট্যাঙ্গো সংগীত, গাউচো ঐতিহ্য এবং সবচেয়ে বেশি ফুটবলে।
বিশ্বকাপের মঞ্চে যখন স্পেন ও আর্জেন্টিনা মুখোমুখি হয়েছিল, তখন তা শুধু দুটি ফুটবল দলের লড়াই ছিল না; এটি ইতিহাসেরও এক প্রতীকী অধ্যায়। একসময়ের উপনিবেশ আজ স্বাধীন জাতি হিসেবে নিজের শক্তি, আত্মবিশ্বাস ও স্বকীয়তা নিয়ে সাবেক শাসকের বিপক্ষে দাঁড়ায়। তাই ফুটবলের এই নব্বই মিনিটে ইতিহাস, সংস্কৃতি ও জাতীয় আত্মপরিচয়ের দীর্ঘ যাত্রাও যেন নতুন করে প্রাণ ফিরে পায়।
উপদেষ্টা, ময়মনসিংহ বন্ধুসভা