মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সেই ‘দাবার ছক’ ব্যর্থ, এখন উপায় কী

· Prothom Alo

৪ জুলাই যুক্তরাষ্ট্রের ২৫০তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী পূর্ণ হলো। যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠাতারা এমন এক প্রজাতন্ত্রের স্বপ্ন দেখেছিলেন, যা বিশ্ববাসীর ওপর ছড়ি ঘোরাবে না, বরং ‘মানবজাতির মতামতের প্রতি যথাযথ সম্মান’ দেখাবে।

তবে বর্তমান সময়ের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ গল্পের শুরু কিন্তু ১৭৭৬ সালে নয়। এর শুরু মাত্র ৩৫ বছর আগে, সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের মধ্য দিয়ে। সেই মুহূর্তে মার্কিন প্রশাসন তাদের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বীর বিলুপ্তিকে বিশ্বকে নিজের ছাঁচে ঢেলে সাজানোর এক ম্যান্ডেট পেয়ে গেছে বলে মস্ত বড় ভুল করেছিল।

Visit newsbetting.club for more information.

এরপর যা ঘটেছিল, তা হলো চরম দম্ভের বহিঃপ্রকাশ। বিশ্বের প্রতিটি অঞ্চলে নিজেদের আধিপত্য স্থায়ী করার উন্মত্ত প্রতিযোগিতায় মেতে ওঠে তারা।

মার্কিন প্রশাসনের এই মনোভাবের এক অকপট চিত্র ফুটে উঠেছিল রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ও সাবেক মার্কিন জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা জিবিগনিউ ব্রজেজিনস্কির ১৯৯৭ সালের ‘দ্য গ্র্যান্ড চেসবোর্ড’ গ্রন্থে। সেখানে তিনি বিশদ আলোচনা করেছিলেন কীভাবে ইউরেশীয় ভূখণ্ডে মার্কিন আধিপত্য কায়েম করা যায় এবং যুক্তরাষ্ট্রের কর্তৃত্বকে চ্যালেঞ্জ করতে পারে—এমন যেকোনো শক্তির উত্থানকে অঙ্কুরেই বিনষ্ট করা সম্ভব।

মার্কিন ঘাঁটির নিরাপত্তাচাদর ফালাফালা, বাদশাহ-আমিরদের কী হবে

সেখান থেকেই ‘একক আধিপত্য’ কেবল সাময়িক কোনো বাস্তবতা না থেকে মার্কিন নীতিনির্ধারকদের মজ্জাগত তত্ত্বে পরিণত হয়।

আশ্চর্যের বিষয় হলো, আরব বিশ্বের বড় একটি অংশও এই মার্কিন আধিপত্যকে মেনে নিয়েছিল। একের পর এক আরব সরকার যুক্তরাষ্ট্রের নানামুখী এজেন্ডায় সায় দিয়েছিল।

চুক্তিটি আপাতদৃষ্টিতে বিচক্ষণ মনে হয়েছিল। আরব বিশ্ব মার্কিন নেতৃত্ব মেনে নেবে, আর বিনিময়ে পাবে যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তাবলয়। পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলে মার্কিন ঘাঁটির যে বিশাল নেটওয়ার্ক, তার চেয়ে বড় প্রমাণ আর কী হতে পারে?

কিন্তু এসব ঘাঁটির উপস্থিতির পরও একটি মৌলিক প্রশ্ন বরাবরই থেকে গেছে: এই ঘাঁটিগুলো আসলে কার স্বার্থ রক্ষা করছিল?

মোহভঙ্গ

কোনো কোনো আরব রাষ্ট্র তো আরও এক ধাপ এগিয়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে একধরনের কৌশলগত জোট গড়ে তোলে। তাদের মূল ভাবনাটাই ছিল—সব সময় সবচেয়ে শক্তিশালী পক্ষের পক্ষ নেওয়া উচিত। এই ‘অপরিহার্য রক্ষাকর্তা’র মোহটিই দীর্ঘদিন ধরে আরব অঞ্চলের কূটনীতির মূল চালিকা শক্তি হয়ে উঠেছিল।

তবে ইরান যুদ্ধ সেই মোহকে ধূলিসাৎ করে দিয়েছে। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি জাতিসংঘ সনদের তোয়াক্কা না করে এবং প্রকাশ্য শাসনব্যবস্থা পরিবর্তনের ঘোষণা দিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল যৌথভাবে ইরানে হামলা চালায়। তারা ইরানের সর্বোচ্চ নেতা ও বেশ কয়েকজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাকে হত্যা করে।

কিন্তু এরপরই বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী সামরিক বাহিনীটি তার রাজনৈতিক ও সামরিক ক্ষমতার চূড়ান্ত সীমানার মুখোমুখি হয়। ইরান ভেঙে পড়েনি। তারা দ্রুত নতুন সর্বোচ্চ নেতার নাম ঘোষণা করে, পুরো অঞ্চল জুড়ে পাল্টা আঘাত হানে এবং হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দেয়। এর ফলে বিশ্বজুড়ে জ্বালানিসংকট তৈরি হয় এবং বৈশ্বিক অর্থনীতি স্থবির হয়ে পড়ে।

আরব দেশগুলো এখন ইরান নাকি ইসরায়েল—কাকে বেছে নেবে

যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের কয়েক মাসের অবিরাম বোমাবর্ষণ, শতকোটি ডলারের অপচয়, হাজার হাজার মানুষের প্রাণহানি এবং লেবানন থেকে উপসাগর পর্যন্ত পুরো অঞ্চলকে যুদ্ধের আগুনে জ্বালানোর পর—ওয়াশিংটন শেষ পর্যন্ত তাদের কাঙ্ক্ষিত ‘রেজিম চেঞ্জ’ করতে পারেনি। বাধ্য হয়ে তারা এক ভঙ্গুর ও বারবার লঙ্ঘিত হতে থাকা যুদ্ধবিরতি মেনে নিতে বাধ্য হয়।

আমেরিকান-ইসরায়েলি এই যুদ্ধ চূড়ান্তভাবে ব্যর্থ হয়েছে। যেসব উপসাগরীয় দেশ মার্কিন ছত্রচ্ছায়ায় নিজেদের নিরাপদ ভাবত, যুদ্ধ শেষে তারা নিজেদের আরও বেশি অরক্ষিত ও ঝুঁকির মুখে আবিষ্কার করেছে।

এই ব্যর্থতা মূলত দুটি বড় শিক্ষা দিয়ে গেল। প্রথমত, মার্কিন ক্ষমতার সীমাবদ্ধতা কতখানি; আর দ্বিতীয়ত, যুক্তরাষ্ট্রের ওপর নিজেদের জাতীয় নিরাপত্তা সঁপে দেওয়াটা আরব রাষ্ট্রগুলোর জন্য কত বড় বোকামি ছিল। মার্কিন আধিপত্য চিরস্থায়ী, এই ধারণার ওপর ভিত্তি করে যারা নিজেদের কৌশল সাজিয়েছিল, তাদের সবারই এখন নতুন করে ভাবার সময় এসেছে।

যুক্তরাষ্ট্রের এই ২৫০তম জন্মবার্ষিকীতে ওয়াশিংটন ও তাদের অন্ধভাবে বিশ্বাস করা আরবদের, উভয় পক্ষেরই ঘুম ভাঙা জরুরি।

ওয়াশিংটনের জন্য শিক্ষা হলো, এই অঞ্চলে মার্কিন ও ইসরায়েলি সমাধান জোরপূর্বক চাপিয়ে দেওয়ার দিন শেষ।

যুক্তরাষ্ট্রের জন্য এখন একমাত্র সৎ পথ হবে আন্তর্জাতিক আইন ও ন্যায়বিচারের নীতি মেনে ফিলিস্তিন–সংকটের একটি স্থায়ী ও প্রকৃত সমাধান করা।

যেটাই হোক না কেন, একে অবশ্যই ‘বৃহত্তর ইসরায়েল’ প্রকল্পের অবসান ঘটাতে হবে। এই ‘বৃহত্তর ইসরায়েল’ ভাবনাই মূলত এ অঞ্চলের চিরস্থায়ী যুদ্ধের মূল উৎস।

২০২৭ সালে ডোনাল্ড ট্রাম্প সৌদি আরব সফরে গেলে তাঁকে অভ্যর্থনা জানান যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান

সামনের পথ

আরব বিশ্বের জন্যও এখন মার্কিন ক্ষমতার দাসত্ব থেকে বেরিয়ে আসার সময় এসেছে। এভাবে নিজেদের নিরাপত্তা ইজারা দেওয়ার কোনো যৌক্তিক কারণ আরব দেশগুলোর নেই।

সামনের পথটি হলো ওয়াশিংটনের সুনজরে পড়ার প্রতিযোগিতা বন্ধ করে আরব ঐক্যের দিকে নজর দেওয়া। ইরানের সঙ্গে শান্তি বজায় রাখা এবং এটি মেনে নেওয়া যে আরব ও ইরান পরস্পরের স্থায়ী প্রতিবেশী, অন্য কারও ভূরাজনৈতিক লড়াইয়ের প্রক্সি বা প্রতিনিধি নয়।

একই সঙ্গে একটি বহুমুখী বিশ্বে নিজেদের প্রকৃত কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন গড়ে তোলা; যেখানে যুক্তরাষ্ট্র, চীন, রাশিয়া এবং অন্য সব পরাশক্তির সঙ্গে নিজেদের স্বার্থ অনুযায়ী সমান শর্তে যোগাযোগ রক্ষা করা সম্ভব হবে। এই অঞ্চলের নিজস্ব উদ্যোগে গড়ে তোলা একটি আঞ্চলিক নিরাপত্তাকাঠামো এখন সময়ের দাবি এবং অত্যন্ত জরুরি।

আরব দেশগুলো নিরাপত্তার নামে যেভাবে প্রতারিত হলো

ইরান যুদ্ধ অত্যন্ত চড়া মূল্যে প্রমাণ করে দিল যে বিশ্বের মোড়লগিরি সব সময় যুক্তরাষ্ট্রের সাধ্যের অতীত ছিল। ওয়াশিংটন যে একক বিশ্বব্যবস্থাকে চিরস্থায়ী মনে করেছিল, তার অবসান ঘটেছে। যুক্তরাষ্ট্রের সামনে এখন একমাত্র পথ খোলা রয়েছে: তারা কি এমন একটি বিশ্বের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেবে যাকে তারা প্রভাবিত করতে পারলেও শাসন করতে পারবে না, নাকি নিজের অবশিষ্ট শক্তিটুকু দিয়ে এই অনিবার্য পরিবর্তনকে ঠেকানোর ব্যর্থ চেষ্টা করে যাবে?

২৫০তম বছরে এসে যুক্তরাষ্ট্রের নিজের জন্য সবচেয়ে বুদ্ধিমানের মতো উপহার হবে, বহুমুখী বিশ্বের বাস্তবতাকে মেনে নেওয়া এবং সমতা ও সহযোগিতার ভিত্তিতে বিশ্ব সম্প্রদায়ে পুনরায় শামিল হওয়া।

আর আরব বিশ্বের উচিত হবে কোনো বিদেশি রক্ষাকর্তার জন্য অপেক্ষা না করে অবশেষে নিজেদের পায়ে ঐক্যবদ্ধভাবে দাঁড়ানো।

  • জেফ্রি ডি স্যাক্স কলাম্বিয়া ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক; সিবিল ফারেস জাতিসংঘ টেকসই উন্নয়ন সমাধান নেটওয়ার্কের মধ্যপ্রাচ্য ও আফ্রিকাবিষয়ক জ্যেষ্ঠ উপদেষ্টা। মিডল ইস্ট আই থেকে অনূদিত।

Read full story at source