মাইগ্রেন: মাথাব্যথার সীমা ছাড়িয়ে মস্তিষ্কের এক ভয়ংকর স্নায়বিক ঝড়
· Prothom Alo

মাথাব্যথা আমাদের সবার পরিচিত একটি সমস্যা। কিন্তু মাইগ্রেন এই পরিচিত অভিজ্ঞতার চেয়ে সম্পূর্ণ ভিন্ন, অনেক বেশি তীব্র ও জটিল একটি রূপ। এটি শুধু সাধারণ কোনো মাথাব্যথা নয়, এটি একটি স্নায়বিক রোগ; যা মানুষের দৈনন্দিন জীবন, কাজ, সম্পর্ক এবং মানসিক স্বাস্থ্যে গভীর প্রভাব ফেলতে পারে। অনেকেই মনে করেন, মাইগ্রেন মানে মারাত্মক মাথাব্যথা। বাস্তবে এটি একটি বহুস্তরবিশিষ্ট শারীরিক ও স্নায়বিক আক্রমণ। এই আক্রমণ কয়েক ঘণ্টা থেকে কয়েক দিন পর্যন্ত স্থায়ী হতে পারে এবং রোগীকে সম্পূর্ণ অক্ষম করে দিতে পারে।
মাইগ্রেন নির্ণয়ের জন্য আন্তর্জাতিক হেডেক সোসাইটির নির্ধারিত একটি বৈজ্ঞানিক মানদণ্ড আছে। একজন ব্যক্তিকে কখন মাইগ্রেনের রোগী বলা যাবে, তা এই মানদণ্ড দিয়ে নির্ধারণ করা হয়। এই মানদণ্ড অনুযায়ী, অন্তত পাঁচটি মাথাব্যথার আক্রমণ হলে তাকে মাইগ্রেন বলা যাবে, যা প্রতিবার ৪-৭২ ঘণ্টা পর্যন্ত স্থায়ী হয়। এই আক্রমণগুলোর অন্তত দুটি বৈশিষ্ট্য থাকতে হয়। মাথার এক পাশে ব্যথা হওয়া, মাঝারি থেকে তীব্র মাত্রার ব্যথা অথবা দৈনন্দিন কাজ করলে ব্যথা বেড়ে যাওয়া। পাশাপাশি মাথাব্যথার সময় বমিভাব বা বমি, অথবা আলো ও শব্দের প্রতি অতিসংবেদনশীলতা থাকা আবশ্যক।
Visit lej.life for more information.
মানুষের মাথাব্যথা ও মাইগ্রেন হয় কেনআন্তর্জাতিক হেডেক সোসাইটির নির্ধারিত বৈজ্ঞানিক মানদণ্ড অনুযায়ী, অন্তত পাঁচটি মাথাব্যথার আক্রমণ হলে তাকে মাইগ্রেন বলা যাবে, যা প্রতিবার ৪-৭২ ঘণ্টা পর্যন্ত স্থায়ী হয়।
কারা মাইগ্রেনে আক্রান্ত হন
বিশ্বব্যাপী মাইগ্রেন একটি সাধারণ স্নায়বিক সমস্যা। গবেষণায় দেখা গেছে, যুক্তরাষ্ট্রের প্রায় ১২ শতাংশ মানুষ মাইগ্রেনে আক্রান্ত। পুরুষদের তুলনায় নারীরা এই রোগে বেশি আক্রান্ত হন। গবেষকদের মতে, এর প্রধান কারণ হরমোনের তারতম্য। বিশেষ করে ইস্ট্রোজেন হরমোনের ওঠানামা মাইগ্রেন ব্যথার অন্যতম বড় ট্রিগার হিসেবে কাজ করে। অনেক সময় পারিবারিক ইতিহাসও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। প্রায় ৮০ শতাংশ রোগীর পরিবারেই মাইগ্রেনের ইতিহাস পাওয়া যায়।
তবে সব মাইগ্রেন একরকম নয়। এর বিভিন্ন ধরন রয়েছে। সবচেয়ে সাধারণ দুটি ধরন হলো অরা’সহ মাইগ্রেন এবং অরাহীন মাইগ্রেন। অরা কী? এটি মাইগ্রেনের ধাপগুলোর অন্যতম একটি পর্যায়। ভীষণ বিরক্তিকর এই ধাপটিকে মাইগ্রেন ব্যথা শুরু হওয়ার আগের একটি সতর্কবার্তাও বলা যেতে পারে।
গবেষণায় দেখা গেছে, পুরুষদের তুলনায় নারীরা মাইগ্রেনে বেশি আক্রান্ত হনএ ছাড়া শিশুদের ক্ষেত্রে অ্যাবডোমিনাল মাইগ্রেন দেখা যায়, যেখানে মাথাব্যথার বদলে পেটব্যথা হয়। এর বাইরেও দীর্ঘমেয়াদি মাইগ্রেন, শরীরের এক পাশ দুর্বল হয়ে যাওয়ার সঙ্গে যুক্ত হেমিপ্লেজিক মাইগ্রেন, মাথাব্যথা ছাড়াই হওয়া সাইলেন্ট মাইগ্রেন, চোখের দৃষ্টিকে প্রভাবিত করা রেটিনাল মাইগ্রেন এবং দীর্ঘস্থায়ী তীব্র আক্রমণকে বলা হয় স্ট্যাটাস মাইগ্রেনোসাস।
বিশ্বজুড়ে গড়ে প্রায় ১৫ শতাংশ মানুষ মাইগ্রেনে আক্রান্ত। তবে লিঙ্গভেদে এর হার ভিন্ন হয়। প্রায় ১৮ থেকে ২০ শতাংশ নারী মাইগ্রেনে ভোগেন। অর্থাৎ প্রতি ৫ জন নারীর মধ্যে ১ জন। অন্যদিকে ৬ থেকে ৯ শতাংশ পুরুষ মাইগ্রেনে আক্রান্ত হন; মানে প্রতি ১৫ জন পুরুষের মধ্যে ১ জন।
সাইনোসাইটিস কীভাবে হয়গবেষণায় দেখা গেছে, যুক্তরাষ্ট্রের প্রায় ১২ শতাংশ মানুষ মাইগ্রেনে আক্রান্ত। পুরুষদের তুলনায় নারীরা এই রোগে বেশি আক্রান্ত হন। গবেষকদের মতে, এর প্রধান কারণ হরমোনের তারতম্য।
মাইগ্রেনের কারণ
মাইগ্রেনের সুনির্দিষ্ট কোনো কারণ এখনো পুরোপুরি জানা যায়নি এবং এর একক কোনো কারণও নেই। তবে ধারণা করা হয়, মস্তিষ্কের স্নায়ু ও রক্তনালিতে প্রদাহজনিত রাসায়নিক নিঃসরণই ব্যথার এই সংকেত তৈরি করে। অর্থাৎ, মস্তিষ্কের অতিসংবেদনশীলতাই এর জন্য দায়ী। জেনেটিকস বা বংশগতি এখানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। পরিবারের কারও মাইগ্রেন থাকলে আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা অনেক বেড়ে যায়। তাই অনেক ক্ষেত্রে এটি জিনগতভাবেই মানুষের মধ্যে ছড়ায়।
মাইগ্রেন সাধারণত কোনো না কোনো ট্রিগারের ফলে শুরু হয়। মানসিক চাপ, হরমোনের পরিবর্তন, ঘুমের অভাব, আবহাওয়ার পরিবর্তন, অতিরিক্ত পরিশ্রম, ক্যাফেইন বা তামাক গ্রহণ, সময়মতো খাবার না খাওয়া, উজ্জ্বল আলো, উচ্চ শব্দ বা তীব্র গন্ধ—এর যেকোনোটিই ট্রিগার হতে পারে। এগুলো মাইগ্রেন আক্রমণের সূচক হিসেবে কাজ করে।
পরিবারের কারও মাইগ্রেন থাকলে আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা অনেক বেড়ে যায়এ ছাড়া কিছু খাবারের রাসায়নিক উপাদানও মাইগ্রেনের আশঙ্কা বাড়ায়। পুরোনো পনির বা চিজ, অ্যালকোহল, চকলেট, নাইট্রেট ও এমএসজিসমৃদ্ধ খাবার, প্রক্রিয়াজাত বা প্রসেসড মাংস এবং গাজন প্রক্রিয়ায় তৈরি খাবার অনেকের ক্ষেত্রে ট্রিগার হিসেবে কাজ করতে পারে।
মাইগ্রেনের ব্যথা কেন হয়জেনেটিকস বা বংশগতি এখানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। পরিবারের কারও মাইগ্রেন থাকলে আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা অনেক বেড়ে যায়। তাই অনেক ক্ষেত্রে এটি জিনগতভাবেই মানুষের মধ্যে ছড়ায়।
মাইগ্রেন কীভাবে নির্ণয় করা হয়
চিকিৎসকেরা সাধারণত শারীরিক ও স্নায়বিক পরীক্ষা, রোগের ইতিহাস এবং প্রয়োজনে সিটি স্ক্যান, এমআরআই, ইইজি ও রক্ত পরীক্ষার মাধ্যমে নিশ্চিত হন যে মাথাব্যথার পেছনে অন্য কোনো কারণ লুকিয়ে আছে কি না। ক্যানসার বা সুনির্দিষ্ট অন্য কোনো নিউরোলজিক্যাল রোগ ধরা না পড়লেই মোটামুটি ধরে নেওয়া হয় যে এটি মাইগ্রেন।
দুঃখজনক হলেও সত্য, মাইগ্রেন মানুষের জীবনে আজীবন থেকে যেতে পারেদুঃখজনক হলেও সত্য, মাইগ্রেন মানুষের জীবনে আজীবন থেকে যেতে পারে। তবে সঠিক চিকিৎসা ও স্বাস্থ্যকর জীবনযাপনের মাধ্যমে এর তীব্রতা ও আক্রমণের হার কমানো সম্ভব। মনে রাখা জরুরি, হঠাৎ ভয়ংকর মাথাব্যথা বা মাথায় আঘাতজনিত কারণে ব্যথা হলে অবিলম্বে চিকিৎসকের শরণাপন্ন হওয়া উচিত। অবহেলা করলে এবং সেটি মাইগ্রেন না হয়ে অন্য কোনো গুরুতর রোগ হলে পরে আফসোসের আর শেষ থাকবে না।
লেখক: ফ্যাক্ট-চেকার, সত্যিফাইসূত্র: মাইগ্রেন ডিসঅর্ডারস, ক্লিভল্যান্ড ক্লিনিক, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা, হার্ভার্ড মেডিকেল স্কুল ও নিউ সায়েন্টিস্টমানুষের মস্তিষ্ক কি কখনো বুড়ো হয়