লিবনিজ এবং বাইনারি দুনিয়ার জন্মকথা

· Prothom Alo

সপ্তদশ শতাব্দীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ এক চিন্তাবিদকে যখন সমাহিত করা হচ্ছিল, তখন সেখানে উপস্থিত ছিলেন মুষ্টিমেয় কয়েকজন মানুষ। যুক্তরাজ্যের রয়্যাল সোসাইটি এবং জার্মানির বার্লিন একাডেমি অব সায়েন্সেস প্রতিষ্ঠানের আজীবন সদস্য ছিলেন তিনি। অথচ তাঁর মৃত্যুতে এই দুই প্রতিষ্ঠানের কেউই ন্যূনতম শোক প্রকাশ করার প্রয়োজন বোধ করেনি। শেষ জীবনটা তাঁর কেটেছিল চরম একাকিত্বে, আইজ্যাক নিউটনের সঙ্গে ক্যালকুলাসের আবিষ্কার নিয়ে তিক্ত এবং অন্তহীন লড়াইয়ের মধ্য দিয়ে। নিউটন দাবি করেছিলেন, তাঁর আইডিয়া চুরি করা হয়েছে। ইতিহাস অবশ্য পরে প্রমাণ করেছে, দুজনের আবিষ্কারই ছিল স্বাধীন। কিন্তু আজ আমরা গণিতে নিউটনের সেই জটিল প্রতীক ব্যবহার করি না, বরং সেই নিঃসঙ্গ মানুষটির তৈরি করা সহজ ও আধুনিক প্রতীকগুলোই ব্যবহার করি।

এই দুর্ভাগা মানুষটির নাম গটফ্রিড উইলহেম লিবনিজ—আধুনিক ক্যালকুলাস ও বাইনারি গণিতের প্রকৃত জনক।

Visit grenadier.co.za for more information.

তাঁর জীবনের গল্পে যাওয়ার আগে চলুন একটু ইতিহাসের পাতায় চোখ বুলিয়ে নিই। সেটা এমন এক ইতিহাস, যার তাত্ত্বিক ভিত্তি লিবনিজ তৈরি করে গেছেন নিজের অজান্তেই।

যে গণিতের নিয়মে টিকে আছে পুরো মহাবিশ্ব
শেষ জীবনটা লিবনিজের কেটেছিল চরম একাকিত্বে, নিউটনের সঙ্গে ক্যালকুলাসের আবিষ্কার নিয়ে তিক্ত এবং অন্তহীন লড়াইয়ের মধ্য দিয়ে। নিউটন দাবি করেছিলেন, তাঁর আইডিয়া চুরি করা হয়েছে।

দুই

১৯৪৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি। নিউইয়র্ক টাইমস পত্রিকার প্রথম পাতায় একটি চমকপ্রদ খবর ছাপা হলো। সেখানে বলা হলো, ‘এমন এক বিস্ময়কর যন্ত্র তৈরি হয়েছে, যা ইলেকট্রনিক গতি ব্যবহার করে এমন সব গাণিতিক কাজ করতে পারে, যা আগে সমাধান করা অত্যন্ত কঠিন ও সময়সাপেক্ষ ছিল।’

যন্ত্রটির নাম ছিল এনিয়াক। এটিই ছিল প্রথম দিককার সাধারণ ব্যবহারের কম্পিউটারগুলোর একটি। এই যন্ত্রটিকেই এখন কম্পিউটারের ইতিহাসে একটি বিশাল মাইলফলক হিসেবে ধরা হয়। পেনসিলভানিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় এটি তৈরি করা হয়েছিল।

এর আকার ছিল রীতিমতো দানবীয়! ওজন ২৫ টনেরও বেশি। ১৫০ বর্গমিটারের বেশি জায়গা দখল করে রাখত। রিলে, রেজিস্টর বা ক্যাপাসিটরের মতো অন্যান্য মৌলিক ইলেকট্রনিক উপাদানের পাশাপাশি এতে ২০ হাজারটি ভ্যাকুয়াম টিউব ছিল। এগুলো মাইলের পর মাইল তার এবং প্রায় ৫০ লাখ হাতে ঝালাই করা জয়েন্টের মাধ্যমে যুক্ত ছিল।

পেনসিলভানিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় এনিয়াক তৈরি করা হয়েছিল

যন্ত্রটি চালাতে প্রয়োজন হতো ১ লাখ ৫০ হাজার ওয়াট বিদ্যুৎ। একটু তুলনা করলে বুঝতে পারবেন, আধুনিক একটি ডেস্কটপ কম্পিউটারে মাত্র ২০০ ওয়াট বিদ্যুতের প্রয়োজন হয়। বিদ্যুতের এই বিপুল চাহিদার কারণে তখন একটা গুজব ছড়িয়ে পড়েছিল—যখনই এনিয়াক চালু করা হতো, ফিলাডেলফিয়া শহরের সব রাস্তার আলো নাকি ম্লান হয়ে যেত!

আসলে এনিয়াক ছিল অনেকগুলো ইলেকট্রনিক যোগ করার যন্ত্র এবং অন্যান্য গাণিতিক ইউনিটের একটি বিশাল সংগ্রহ। এতে আধুনিক কম্পিউটারের মতো কোনো সংরক্ষিত প্রোগ্রাম বা অপারেটিং সিস্টেম ছিল না। আমাদের দশমিক পদ্ধতির দশটি অঙ্কের জন্য এতে ১০-পজিশন রিং কাউন্টার ব্যবহার করে সংখ্যা সংরক্ষণ করা হতো। প্রতিটি অঙ্কের জন্য প্রয়োজন হতো ৩৬টি ভ্যাকুয়াম টিউব। কোনো নির্দিষ্ট সমস্যা সমাধানের জন্য মেশিনটিকে প্রোগ্রাম করতে এর সুইচ এবং কেবলগুলো হাত দিয়ে পরিবর্তন করতে হতো। একটি সমস্যার সমাধান বের করতে লেগে যেত কয়েক সপ্তাহ!

গণিতের হিসাবে আর কতদিন টিকবে মানবজাতি
এনিয়াক ১৫০ বর্গমিটারের বেশি জায়গা দখল করে রাখত। রিলে, রেজিস্টর বা ক্যাপাসিটরের মতো অন্যান্য মৌলিক ইলেকট্রনিক উপাদানের পাশাপাশি এতে ২০ হাজারটি ভ্যাকিউম টিউব ছিল।

সবচেয়ে বড় সমস্যা ছিল, ভ্যাকুয়াম টিউবগুলোর আয়ু ছিল খুবই সীমিত। কোনো প্রোগ্রাম যদি ঠিকমতো কাজ না করত, তাহলে খারাপ টিউব বা ত্রুটিপূর্ণ জয়েন্ট খুঁজে বের করতে প্রোগ্রামারদের ওই বিশাল কাঠামোর ভেতরে হামাগুড়ি দিয়ে ঢুকতে হতো। মজার ব্যাপার হলো, এনিয়াকের প্রথম প্রোগ্রামাররা সবাই ছিলেন নারী। যেমন, কে ম্যাকনাল্টি, বেটি জেনিংস, বেটি স্নাইডার, মার্লিন মেল্টজার, ফ্র্যান বিলাস এবং রুথ লিচটারম্যান। পঞ্চাশ বছরেরও বেশি সময় ধরে তাঁদের এই কাজের কোনো স্বীকৃতি দেওয়া হয়নি। এমনকি প্রথম দিকে ইতিহাসবিদরা তাঁদের ভুল করে মেশিনের সামনে পোজ দেওয়া মডেল বলে মনে করেছিলেন!

এনিয়াক এবং সমসাময়িক অন্যান্য মেশিনের বিশাল আকার ও বিপুল বিদ্যুৎ খরচের প্রধান কারণ ছিল ওই ভ্যাকুয়াম টিউব, যা সুইচ এবং অ্যাম্পলিফায়ার হিসেবে কাজ করত। আজকের দিনের ফিলামেন্ট লাইট বাল্বের মতো, ভ্যাকুয়াম টিউবগুলো ছিল বিশাল আকারের। আবার সেগুলো প্রচুর তাপ উৎপন্ন করত। নষ্টও হয়ে যেত ঘন ঘন।

বেল ল্যাবরেটরিজের জন বারডিন, ওয়াল্টার ব্র্যাটেইন এবং উইলিয়াম শকলি প্রথম ট্রানজিস্টর উদ্ভাবন করেন

এই সমস্যার সমাধান আসে ১৯৪৭ সালে। বেল ল্যাবরেটরিজের উইলিয়াম শকলি, জন বারডিন এবং ওয়াল্টার ব্র্যাটেইন প্রথম ট্রানজিস্টর উদ্ভাবন করেন। এটি তাঁদের কঠিন পদার্থ দিয়ে তৈরি একটি বৈদ্যুতিক সুইচ (ট্রানজিস্টর) তৈরির পথ দেখায়। ফলে ভ্যাকুয়াম টিউবের আর কোনো প্রয়োজন রইল না। এই যুগান্তকারী আবিষ্কারের জন্য ১৯৫৬ সালে তাঁরা পদার্থবিজ্ঞানে নোবেল পুরস্কার পান। ট্রানজিস্টরের আবিষ্কারকে এখনো প্রযুক্তির ইতিহাসে অন্যতম শ্রেষ্ঠ যুগান্তকারী ঘটনা হিসেবে বিবেচনা করা হয়।

ট্রানজিস্টরগুলো ভ্যাকুয়াম টিউবের চেয়ে অনেক ছোট, দ্রুতগতির, বেশি নির্ভরযোগ্য এবং শক্তিশালী ছিল। ১৯৫০-এর দশকের শেষ দিকে এবং ১৯৬০-এর দশকে, বিশাল ভ্যাকুয়াম টিউব দিয়ে তৈরি প্রথম প্রজন্মের কম্পিউটারগুলোর জায়গা দখল করে নেয় ট্রানজিস্টর দিয়ে তৈরি দ্বিতীয় প্রজন্মের কম্পিউটার। ট্রানজিস্টরের এই আবিষ্কারই বিংশ শতাব্দীর দ্বিতীয়ার্ধে শুরু হওয়া ডিজিটাল বিপ্লবের ভিত্তি স্থাপন করেছিল, যা আজও চলমান।

সৌন্দর্যের মহাজাগতিক ব্যাকরণ
১৯৫০-এর দশকের শেষ দিকে এবং ১৯৬০-এর দশকে, বিশাল ভ্যাকিউম টিউব দিয়ে তৈরি প্রথম প্রজন্মের কম্পিউটারগুলোর জায়গা দখল করে নেয় ট্রানজিস্টর দিয়ে তৈরি দ্বিতীয় প্রজন্মের কম্পিউটার।

তিন

ট্রানজিস্টর হলো মাইক্রোপ্রসেসরের মূল গাঠনিক উপাদান। আপনার কম্পিউটারের সেন্ট্রাল প্রসেসিং ইউনিট বা সিপিইউতে কোটি কোটি ট্রানজিস্টর থাকে। সেগুলো ঠাসাঠাসি করে বসানো থাকে মাত্র এক বর্গ ইঞ্চি জায়গায়। ট্রানজিস্টর হলো একটি ইলেকট্রনিক সুইচ, যা অন বা অফ করা যায়।

এই দুটি সম্ভাব্য অবস্থা বুলিয়ান বীজগণিতকে সংজ্ঞায়িত করে। এটি এমন একটি বীজগণিত, যেখানে চলকের মান হলো সত্য বা মিথ্যা। একে সাধারণত 1 এবং 0 দিয়ে প্রকাশ করা হয়। আধুনিক কম্পিউটারের ভাষাও শুধু এই দুটি প্রতীক নিয়ে গঠিত—০ ও ১।

তথ্যের এই মৌলিক একককে বলা হয় বাইনারি ডিজিট বা বিট। ৮ বিটের একটি সিকোয়েন্সকে বলা হয় এক বাইট। এক হাজার বাইট মিলে হয় এক কিলোবাইট; এক হাজার কিলোবাইটে এক মেগাবাইট এবং এভাবেই চলতে থাকে।

বিটের একটি সিকোয়েন্সকে ২-এর ধারাবাহিক ঘাতের স্থানিক মান হিসেবে হিসাব করলে আমরা একটি বাইনারি সংখ্যা পাই। উদাহরণস্বরূপ, ১০০০১০০১ বাইনারি সংখ্যাটি দশমিক সংখ্যায় কত হবে?

মন্টি হল প্যারাডক্স: যে গাণিতিক ধাঁধা বিজ্ঞানীদেরও বোকা বানিয়েছিল
বুলিয়ান বীজগণিত এমন একটি বীজগণিত, যেখানে চলকের মান হলো সত্য বা মিথ্যা। একে সাধারণত 1 এবং 0 দিয়ে প্রকাশ করা হয়। আধুনিক কম্পিউটারের ভাষাও এই দুটি প্রতীক নিয়ে গঠিত—০ ও ১।

হিসাবটা হলো: ২৭ + ২৩ + ২০ = ১৩৭। একইভাবে, বাইনারি সংখ্যা ১১১১১১১১ মানে ২৭ + ২৬ + ২৫ + ২৪ + ২৩ + ২২ + ২১+ ২০ = ২৫৫।

অর্থাৎ, এক বাইট তথ্য দিয়ে আমরা ২৫৬টি ভিন্ন ভিন্ন ক্যারেক্টার বা অক্ষর এনকোড করতে পারি। আধুনিক কম্পিউটারের আর্কিটেকচারগুলো সাধারণত ৩২ বা ৬৪ বিটের ওয়ার্ড ব্যবহার করে, যা ৪ বা ৮ বাইট দিয়ে তৈরি হয়।

সবচেয়ে অবাক করা ব্যাপার হলো, ১৮০০ সালে আলেসান্দ্রো ভোল্টা প্রথম ব্যাটারি উদ্ভাবণ করার এবং ইলেকট্রিক্যাল সার্কিট তৈরি করার অনেক আগে, সেই ১৭০০ শতকের আগেই জার্মান দার্শনিক এবং গণিতবিদ লিবনিজ এই বাইনারি সংখ্যা নিয়ে ব্যাপকভাবে গবেষণা করেছিলেন। লিবনিজ বাইনারি পাটিগণিত আবিষ্কার করেছিলেন। কার্যত সেটাই আজকের সব আধুনিক কম্পিউটারে ব্যবহৃত হয়।

জার্মান দার্শনিক এবং গণিতবিদ লিবনিজ

তিনি শুধু ইলেকট্রনিক কম্পিউটারের তাত্ত্বিক ভিত্তিই স্থাপন করেননি, বরং এমন সব যন্ত্রের বর্ণনা দিয়েছিলেন যা নীতিগতভাবে জটিল গাণিতিক সমস্যা সমাধান করতে সক্ষম। পাশাপাশি আইজ্যাক নিউটনের সঙ্গে যৌথভাবে তাঁকে ডিফারেনশিয়াল এবং ইন্টিগ্রাল ক্যালকুলাস আবিষ্কারের কৃতিত্বও দেওয়া হয়। চলুন, এই বিস্ময়কর মানুষটির জীবনের গল্পে এবার একটু শোনা যাক।

যে সহজ ধাঁধাগুলো আমাদের মগজ ধোলাই করে দেয়
১৬৬৩ সালের গ্রীষ্মকালীন সেমিস্টার লিবনিজ জার্মানির জেনায় কাটান। সেখানকার গণিতের অধ্যাপক ছিলেন এরহার্ড ওয়েগেল। তিনি শুধু গণিতবিদই ছিলেন না, তিনি একজন দার্শনিকও ছিলেন।

চার

১৬৪৬ সালের ১ জুলাই জার্মানির লিপজিগ শহরে জন্মগ্রহণ করেন লিবনিজ। তাঁর বাবা ফ্রেডরিখ লিবনিজ ছিলেন লিপজিগ বিশ্ববিদ্যালয়ের নৈতিক দর্শনের অধ্যাপক এবং মা ক্যাথারিনা শ্মুক ছিলেন ফ্রেডরিখের তৃতীয় স্ত্রী।

লিবনিজের বয়স যখন মাত্র ছয় বছর, তখন তাঁর বাবা মারা যান। সাত বছর বয়সে লিবনিজ লিপজিগের নিকোলাই স্কুলে ভর্তি হন। তখন থেকেই তাঁকে তাঁর বাবার ব্যক্তিগত লাইব্রেরিতে অবাধে প্রবেশের সুযোগ দেওয়া হয়, যা তিনি পরে উত্তরাধিকার সূত্রে পেয়েছিলেন। স্কুলে তাঁকে যে সিলেবাস পড়ানো হতো, তার তাঁর শিক্ষাজীবনে অনেক বেশি প্রভাব ফেলেছিল চেয়ে বাবার লাইব্রেরি।

লিবনিজের বাবা ফ্রেডরিখ লিবনিজ

বাবার বইগুলো পড়ার তীব্র আকাঙ্ক্ষা থেকে নিজে নিজেই ল্যাটিন ভাষা শেখেন লিবনিজ। সেসব বইয়ের ল্যাটিন এবং জার্মান ভাষার বর্ণনার তুলনা করে তিনি ল্যাটিন শব্দের অর্থ উদ্ধার করতেন। দুটো ভিন্ন বইয়ে একই ছবির বর্ণনা মিলিয়ে মিলিয়ে তিনি ল্যাটিন ভাষার রহস্য ভেদ করেছিলেন। মাত্র ১২ বছর বয়সেই তিনি ল্যাটিন ভাষায় পারদর্শী হয়ে ওঠেন। বাবার লাইব্রেরির সুবাদে তিনি দর্শন এবং ধর্মতত্ত্বের জটিল ও উন্নত বইগুলোতে প্রবেশের সুযোগ পান। তাঁকে এই বইগুলো অনায়াসে পড়তে সাহায্য করেছিল তাঁর ল্যাটিন ভাষার দক্ষতা।

১৬৬১ সালে, মাত্র চৌদ্দ বছর বয়সে তিনি তাঁর বাবার পুরোনো বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হন। ১৬৬২ সালের ডিসেম্বরে সেখান থেকে দর্শনে স্নাতক ডিগ্রি সম্পন্ন করেন। এরপর ১৬৬৩ সালের গ্রীষ্মকালীন সেমিস্টার তিনি জার্মানির জেনায় কাটান। সেখানকার গণিতের অধ্যাপক ছিলেন এরহার্ড ওয়েগেল। তিনি শুধু গণিতবিদই ছিলেন না, দার্শনিকও ছিলেন। তাঁর বিশ্বাস ছিল, সংখ্যাই মহাবিশ্বের মৌলিক ধারণা।

অ্যালান টুরিং: দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ জয়ী এক ট্র্যাজিক হিরো
বাবার বইগুলো পড়ার তীব্র আকাঙ্ক্ষা থেকে লিবনিজ নিজেই ল্যাটিন ভাষা শিখেছিলেন। সেসব বইয়ের ল্যাটিন এবং জার্মান ভাষার বর্ণনার তুলনা করে তিনি ল্যাটিন শব্দের অর্থ উদ্ধার করতেন।

লিপজিগে ফিরে লিবনিজ ওয়েগেলের কাছে শেখা গাণিতিক ধারণাগুলো তাঁর দর্শন এবং আইনের পড়াশোনায় প্রয়োগ করতে শুরু করেন। বিশেষ করে, তিনি আইনের শর্তগুলোতে অসম্ভব, প্রয়োজনীয় বা শর্তসাপেক্ষ অবস্থার জন্য যথাক্রমে ০, ১ এবং ১/২ মান নির্ধারণ করেছিলেন!

১৬৬৫ সালে, মায়ের মৃত্যুর পরের বছর লিবনিজ আইনে স্নাতক ডিগ্রি লাভ করেন। এরপর দর্শনে তাঁর উচ্চতর ডক্টরেট থিসিসের কাজ শুরু করেন। পরে এই থিসিস তিনি ডিসের্তাতিও দে আর্তে কোম্বিনাতোরিয়া নামে বইয়ে অন্তর্ভুক্ত করেছিলেন। এটাই ছিল তাঁর লেখা প্রথম বই।

১৬৬৬ সালে লিবনিজের ডক্টরেট আবেদন প্রত্যাখ্যান করে লিপজিগ বিশ্ববিদ্যালয়। এর সম্ভাব্য কারণ ছিল, অন্যান্য প্রার্থীর তুলনায় তাঁর বয়স ছিল অনেক কম। তাছাড়া বিশ্ববিদ্যালয়ে তখন পর্যাপ্ত সুযোগও ছিল না। কিন্তু লিবনিজ আরেক বছর অপেক্ষা করতে রাজি ছিলেন না। তাই তিনি আল্টডর্ফ বিশ্ববিদ্যালয়ে চলে যান। সেখানে ১৬৬৭ সালে তাঁর ‘দে কাসিবুস পেরপ্লেক্সিস গবেষণাপত্রের জন্য আইনে ডক্টরেট ডিগ্রি অর্জন করেন।

লিবনিজের লেখা ডিসের্তাতিও দে আর্তে কোম্বিনাতোরিয়া বইয়ের প্রচ্ছদ

ডিগ্রি পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই তাঁকে আল্টডর্ফ বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতার প্রস্তাব দেওয়া হয়। কিন্তু তিনি তা প্রত্যাখ্যান করেন এবং জার্মানির নুরেমবার্গে একটি আলকেমিক্যাল সোসাইটির সেক্রেটারি হিসেবে যোগ দেন। সেখানেই তাঁর পরিচয় হয় ব্যারন জোহান ক্রিশ্চিয়ান ফন বয়নেবার্গের সঙ্গে। তিনি লিবনিজকে তাঁর সহকারী, লাইব্রেরিয়ান, আইনজীবী এবং উপদেষ্টা হিসেবে নিয়োগ দেন। ফন বয়নেবার্গের হয়ে বিভিন্ন প্রজেক্টে কাজ করার পাশাপাশি লিবনিজ রাজনৈতিক প্রবন্ধ প্রকাশ করেন এবং তাঁর আইন পেশাও চালিয়ে যান। ব্যারন তাঁর ব্যক্তিগত যোগাযোগ ব্যবহার করে লিবনিজের ক্যারিয়ারকে অনেকটা এগিয়ে দিয়েছিলেন।

প্যারাডক্স লস্ট
১৬৬৫ সালে, মায়ের মৃত্যুর পরের বছর লিবনিজ আইনে স্নাতক ডিগ্রি লাভ করেন। এরপর দর্শনে তাঁর উচ্চতর ডক্টরেট থিসিসের কাজ শুরু করেন।

পাঁচ

১৬৭২ সালে জার্মান কর্তৃপক্ষের উপদেষ্টা হিসেবে একটি কূটনৈতিক মিশনে লিবনিজ প্যারিসে যান। সেখানেই তাঁর সঙ্গে দেখা হয় ডাচ পদার্থবিদ ও গণিতবিদ ক্রিশ্চিয়ান হাইগেনসের। হাইগেনস লিবনিজকে সে সময়ের বিখ্যাত গণিতবিদদের কাজের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেন। পাশাপাশি গণিতের নতুন সব আবিষ্কার নিজে নিজে শেখার জন্য লিবনিজকে নির্দেশনা দিতে থাকেন।

ডাচ পদার্থবিদ ও গণিতবিদ ক্রিশ্চিয়ান হাইগেনস

১৭০৩ সালে তাঁর বন্ধু সুইস গণিতবিদ জোহান বার্নোলিকে লেখা একটি চিঠিতে লিবনিজ লিখেছিলেন, ‘১৬৭২ সালে আমি যখন প্যারিসে পৌঁছাই, তখন জ্যামিতি আমি নিজে নিজেই শিখছিলাম। সত্যি বলতে, এই বিষয়ে আমার জ্ঞান খুব কম ছিল, কারণ দীর্ঘ দীর্ঘ সব প্রমাণের সিরিজ পড়ার মতো ধৈর্য আমার ছিল না।’

হাইগেনস একদিন লিবনিজ একটি গাণিতিক সমস্যা সমাধান করতে বলেন। তখনই তিনি তাঁর গাণিতিক প্রতিভার পরিচয় দেন। হাইগেনস নিজে অবশ্য আগেই সেটার সমাধান বের করেছিলেন। সমস্যাটি ছিল উল্টানো ত্রিভুজাকার সংখ্যার অসীম ধারার যোগফল নির্ণয় করা। যেসব সংখ্যাকে একটি সমবাহু ত্রিভুজের আকারে সাজানো যায়, সেগুলো ত্রিভুজাকার সংখ্যা।

মরিয়ম মির্জাখানি: ফিল্ডস পদকজয়ী প্রথম নারী
১৬৭৫ সালের ২১ নভেম্বরের একটি পাণ্ডুলিপিতে লিবনিজ প্রথম কোনো ফাংশনের ইন্টিগ্রাল বোঝাতে তাঁর বিখ্যাত নোটেশন বা প্রতীক ∫f(x)dx ব্যবহার করেন।

লিবনিজ খুব দ্রুতই তাঁর প্রজন্মের গাণিতিক অর্জনগুলোর সঙ্গে পরিচিত হয়ে ওঠেন এবং নিজের আইডিয়া নিয়ে কাজ করতে শুরু করেন। এই কাজগুলোই তাঁকে গণিতের জগতে বড় অবদানের দিকে নিয়ে যায়। তিনি পরের চার বছর প্যারিসেই কাটান, এর মধ্যে শুধু একবার লন্ডনে গিয়েছিলেন। লন্ডনে তিনি রয়্যাল সোসাইটি পরিদর্শন করেন এবং একটি অসম্পূর্ণ গণনাকারী যন্ত্র প্রদর্শন করেন। তাঁর ডিজাইন করা এই যন্ত্রটিই ছিল প্রথম যন্ত্র, যা যোগ, বিয়োগ, গুণ এবং ভাগ—এই চারটি মৌলিক গাণিতিক কাজ করতে সক্ষম ছিল। রয়্যাল সোসাইটির সদস্যরা অত্যন্ত মুগ্ধ হন এবং দ্রুত তাঁকে একজন এক্সটার্নাল ফেলো হিসেবে নির্বাচিত করেন।

প্যারিসে থাকার সময় তিনি ডিফারেনশিয়াল ব্যবহার করে ইনফিনিটেসিমাল ক্যালকুলাসের নিজস্ব একটি রূপ তৈরি করেন। পাশাপাশি গণিতের অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ কাজগুলোও তিনি এখানেই করেন। ১৬৭৫ সালের ২১ নভেম্বরের একটি পাণ্ডুলিপিতে তিনি প্রথম কোনো ফাংশনের ইন্টিগ্রাল বোঝাতে তাঁর বিখ্যাত নোটেশন বা প্রতীক ∫ f(x) dxব্যবহার করেন।

লিবনিজ তৈরি অসম্পূর্ণ গণনাকারী যন্ত্রের রেপ্লিকা

এরপর তিনি নিউটনকে লেখা একটি চিঠিতে তাঁর ডিফারেনশিয়াল পদ্ধতিটি ব্যবহার করেন। নিউটন দেখেই বুঝতে পারেন, এটি তাঁর নিজের ফ্লাক্সিয়ন পদ্ধতিরই সমতুল্য। নিউটন এর আগে লিবনিজকে লেখা একটি চিঠিতে তাঁর কিছু ফলাফলের বর্ণনা দিয়েছিলেন, তবে পদ্ধতিটি বিস্তারিত বলেননি। নিউটন বিশ্বাস করতে শুরু করলেন, লিবনিজ তাঁর আইডিয়া চুরি করেছেন।

ছক্কার সাহায্যে মিলল ১৫০ বছরের পুরোনো গাণিতিক রহস্যের সমাধান
১৬৭৫ সালের ২১ নভেম্বরের একটি পাণ্ডুলিপিতে লিবনিজ প্রথম কোনো ফাংশনের ইন্টিগ্রাল বোঝাতে তাঁর বিখ্যাত নোটেশন বা প্রতীক ∫ f(x) dxব্যবহার করেন।

সত্যি বলতে, নিউটন ১৬৬৬ সালের দিকেই ফ্লাক্সিয়ন ব্যবহার করে ক্যালকুলাসের তাঁর সমতুল্য সূত্রগুলো তৈরি করেছিলেন, কিন্তু ১৬৯৩ সালের আগে তা প্রকাশ করেননি। নিউটনের দাবি ছিল, আগে সমাধান করা যায়নি এমন একটি সমস্যাও লিবনিজের ক্যালকুলাস পদ্ধতি দিয়ে সমাধান করা যায় না। তাঁর এই দাবি সত্য হলেও, লিবনিজকে একটি আধুনিক গাণিতিক নোটেশন তৈরি করার কৃতিত্ব দিতেই হবে, যা আজ ক্যালকুলাসের আদর্শ প্রতীক হিসেবে ব্যবহৃত হয়। অন্যদিকে নিউটনের অবাস্তব নোটেশন একসময় বাতিল হয়ে যায়।

প্যারিসে থাকার সময় লিবনিজ সমসাময়িক সব গণিত আয়ত্ত করেছিলেন এবং সেগুলোকে একটি উন্নত নোটেশন সিস্টেমে নতুনভাবে সাজিয়েছিলেন। ফলে গাণিতিক হিসাবগুলো অনেক সহজ হয়ে যায় এবং অন্যান্য গণিতবিদ ও পদার্থবিদদের কাছে ক্যালকুলাসের ব্যবহার অনেক সহজলভ্য হয়ে উঠে। লিবনিজ প্যারিসেই থেকে যেতে চেয়েছিলেন এবং ফরাসি একাডেমি অব সায়েন্সেসের সম্মানসূচক সদস্য হওয়ার চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু তাঁর কোনো ডাক আসেনি। তাঁর পৃষ্ঠপোষক ফন বয়নেবার্গও মারা গিয়েছিলেন। প্যারিসে কোনো পেশাগত ভবিষ্যৎ দেখতে না পেয়ে, ১৬৭৬ সালের অক্টোবরে তিনি হাউস অফ হ্যানোভারে লাইব্রেরিয়ান এবং কোর্ট কাউন্সিলর হিসেবে একটি পদ গ্রহণ করেন।

জন নেপিয়ার এবং তাঁর জাদুকরী হাড়ের গল্প
লিবনিজ মুগ্ধ হয়ে খেয়াল করেছিলেন, চীনের প্রাচীন ভবিষ্যদ্বাণীর বই আই চিং হেক্সাগ্রামগুলো ০০০০০০ থেকে ১১১১১১ পর্যন্ত বাইনারি সংখ্যার সঙ্গে একদম মিলে যায়!

ছয়

লিবনিজের বাকি জীবন হ্যানোভারেই কেটেছিল। তবে তিনি ইউরোপজুড়ে প্রচুর ভ্রমণ করেছিলেন। রাজদরবারের দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি তিনি গণিত, যুক্তিবিদ্যা, পদার্থবিদ্যা এবং দর্শন নিয়ে লেখালেখি চালিয়ে যান। সে সময়ের অনেক বড় পণ্ডিতদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখতেন তিনি। লিবনিজ মূলত ল্যাটিন, ফরাসি এবং জার্মান ভাষায় লিখতেন।

লিবনিজ ছিলেন প্রথম কোনো বড় ইউরোপীয় বুদ্ধিজীবী, যিনি চীনা সভ্যতার প্রতি গভীর আগ্রহ দেখিয়েছিলেন। তিনি মুগ্ধ হয়ে খেয়াল করেছিলেন, চীনের প্রাচীন ভবিষ্যদ্বাণীর বই আই চিং হেক্সাগ্রামগুলো ০০০০০০ থেকে ১১১১১১ পর্যন্ত বাইনারি সংখ্যার সঙ্গে একদম মিলে যায়!

গণিতের বাইরে তিনি একজন বড় মাপের দার্শনিক এবং যুক্তিবিদ হিসেবেও স্মরণীয় হয়ে আছেন। ১৬৯৪ সালে তিনি একটি স্টেপ-ক্যালকুলেটর এবং একটি ডিজিটাল মেকানিক্যাল ক্যালকুলেটর তৈরি করেছিলেন। রেনে দেকার্ত এবং বারুখ স্পিনোজার সঙ্গে লিবনিজকে সপ্তদশ শতাব্দীর তিনজন মহান যুক্তিবাদীর একজন ধরা হয়।

চীনের প্রাচীন ভবিষ্যদ্বাণীর বই আই চিং সংস্করণের শিরোনাম পৃষ্ঠা

তিনি ছিলেন ইতিহাসের শেষ বহুবিদ্যাবিশারদদের একজন। দর্শন থেকে গণিত, আইন থেকে পদার্থবিজ্ঞান—সবকিছু নিয়ে তিনি প্রায় ২ লাখ পৃষ্ঠার লিখিত পাণ্ডুলিপি রেখে গেছেন। তাঁর এত বিচিত্র আগ্রহ ও মস্তিষ্কে ঘুরতে থাকা অগণিত ধারণা যে কখনো কখনো তাঁর জন্য বিশাল বোঝার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছিল, তা তাঁর লেখা একটি চিঠি থেকে বোঝা যায়:

‘আমি আপনাকে বলে বোঝাতে পারব না যে আমি কতটা বিক্ষিপ্ত এবং ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছি। আমি আর্কাইভে নানা জিনিস খোঁজার চেষ্টা করছি; পুরোনো কাগজপত্র দেখছি এবং অপ্রকাশিত নথিপত্র ঘাঁটছি। এর মাধ্যমে আমি হাউস অফ ব্রান্সউইকের ইতিহাসে নতুন আলো ফেলতে চাই। আমি প্রচুর চিঠি পাই এবং সেগুলোর উত্তর দিই। একই সঙ্গে, আমার মাথায় এত গাণিতিক ফলাফল, দার্শনিক চিন্তাভাবনা এবং সাহিত্যের নতুন নতুন আইডিয়া ঘুরছে যে, আমি এগুলোকে কিছুতেই হারিয়ে যেতে দিতে পারি না। অথচ আমি প্রায়ই বুঝতে পারি না, কোথা থেকে কাজ শুরু করব!’

গণিত শিক্ষায় মস্তিষ্কের প্যাটার্ন কীভাবে সাহায্য করে
লিবনিজ ছিলেন ইতিহাসের শেষ বহুবিদ্যাবিশারদদের একজন। দর্শন থেকে গণিত, আইন থেকে পদার্থবিজ্ঞান—সবকিছু নিয়ে তিনি প্রায় ২ লাখ পৃষ্ঠার লিখিত পাণ্ডুলিপি রেখে গেছেন।

লিবনিজের জীবনের শেষ বছরগুলো নিউটনের সঙ্গে সেই তিক্ত বিরোধের কারণে দুর্বিষহ হয়ে উঠেছিল। বেঁচে থাকতে তিনি তাঁর গাণিতিক কাজগুলোর জন্য তেমন কোনো স্বীকৃতি পাননি। বিয়ে না করার কারণে ১৭১৬ সালে হ্যানোভারে একাকী অবস্থায় তাঁর মৃত্যু হয়।

রয়্যাল সোসাইটি এবং বার্লিন একাডেমি অফ সায়েন্সেসে কোথাও তাঁকে স্মরণ করা হয়নি। কিন্তু সময় বড় অদ্ভুত বিচারক। যে মানুষটিকে তাঁর সমসাময়িকরা অবহেলা করেছিল, আধুনিক পৃথিবী তাঁকে ঠিকই মনে রেখেছে। ১৯৮৫ সালে জার্মান সরকার বিজ্ঞানীদের জন্য লিবনিজ প্রাইজ চালু করে, যা আজ বিশ্বের অন্যতম বড় বৈজ্ঞানিক পুরস্কার।

আর আপনি এখন যে স্ক্রিনে এই লেখাটি পড়ছেন, তার পেছনের প্রতিটা পিক্সেল, প্রতিটা বিট, ট্রানজিস্টরের প্রতিটা স্পন্দনে কিন্তু ওই মানুষটার আবিষ্কার করা শূন্য ও একের কারসাজি!

সূত্র: ম্যাথ মেকারস: দ্য লাইভস অ্যান্ড ওয়ার্কস অব ফিফটি ফেমাস ম্যাথেমেটিশিয়ানভিঞ্চির ৫০০ বছরের পুরোনো রহস্যের জট খুললেন এক ডেন্টিস্ট

Read full story at source