ইসরায়েলের ক্ষোভের মাঝেই প্রাডার ইতিহাস: ফিলিস্তিনি র্যাপার সঁ লেভঁর বিশ্বজয়
· Prothom Alo

বিশ্বকাপের উন্মাদনায় চাপা পড়ে গেছে আরেকটি আলোচিত খবর। ফ্যাশন দুনিয়ায় ইতিহাস গড়ে প্রাদার প্রথম ব্র্যান্ড অ্যাম্বাসেডর হয়েছেন ফিলিস্তিনে জন্ম নেওয়া সঁ লেভঁ। আর তাতেই নতুন বিতর্কে জড়িয়েছে ইসরায়েল।
View this post on InstagramVisit freshyourfeel.org for more information.
বিশ্বকাপ ফুটবলের উত্তেজনায় সংবাদমাধ্যমের বড় অংশ জুড়ে আছে মাঠের লড়াই। কিন্তু মাঠের বাইরেও নীরবে ঘটে গেছে এমন এক ঘটনা, যা ফ্যাশন, সংস্কৃতি ও রাজনীতিকে একই সুতোয় গেঁথেছে। ইতালির বিলাসবহুল ফ্যাশন হাউস প্রাদা তাদের নতুন ব্র্যান্ড অ্যাম্বাসেডর হিসেবে ঘোষণা করেছে ফিলিস্তিনে জন্ম নেওয়া সংগীতশিল্পী সঁ লেভঁকে। এদিকে এই ঘোষণার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শুরু হয় তুমুল বিতর্ক।
প্রাদার নতুন ব্র্যান্ড অ্যাম্বাসেডর সঁ লেভঁ ওরফে মারওয়ান আবদেলহামিদ২৫ বছর বয়সী সঁ লেভঁর আসল নাম মারওয়ান আবদেলহামিদ। জেরুজালেমে জন্ম, শৈশবের একটি বড় অংশ কেটেছে গাজায়। পরে পরিবারসহ জর্ডানে চলে যান। ইংরেজি, আরবি ও ফরাসি—তিন ভাষার মিশেলে তাঁর গান যেমন বিশ্বজুড়ে শ্রোতাপ্রিয়তা পেয়েছে, তেমনি ফিলিস্তিনি পরিচয়কেও তিনি নিজের শিল্পচর্চার অবিচ্ছেদ্য অংশ করে তুলেছেন। ২০২৪ সালে কোচেলায় তাঁর পারফরম্যান্স তাঁকে বৈশ্বিক পরিচিতি এনে দেয়।
প্রাদার স্প্রিং/সামার ২০২৭ মেনসওয়্যার শোর পর প্রতিষ্ঠানটি আনুষ্ঠানিকভাবে তাঁকে ব্র্যান্ড অ্যাম্বাসেডর ঘোষণা করে। এর মধ্য দিয়ে তিনি প্রাদার ইতিহাসে ফিলিস্তিনে জন্ম নেওয়া প্রথম অ্যাম্বাসেডর হিসেবে জায়গা করে নেন। এর আগে মধ্যপ্রাচ্যে ডিওর পারফিউমেন জন্য প্রথম সৌরভদূত হওয়া এবং সাঁ লোঁর বিভিন্ন ক্যাম্পেইনে অংশ নেওয়ার মাধ্যমে ফ্যাশন অঙ্গনেও নিজের অবস্থান শক্ত করেছিলেন তিনি।
বেশি আলোচনায় রয়েছে তাঁ গলায় ঝুলানো ফিলিস্তিনি মানচিত্রের আদলে পেনপ্যান্ডতবে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু শুধু তাঁর নিয়োগ ছিল না। প্রাদার প্রচারণামূলক ভিডিওতে তাঁর গলায় দেখা যায় একটি পেনড্যান্ট, যা ঐতিহাসিক ফিলিস্তিনের মানচিত্রের আদলে তৈরি। অনেক ফিলিস্তিনপন্থীর কাছে এটি জাতীয় পরিচয়, স্মৃতি ও শেকড়ের প্রতীক। কিন্তু ইসরায়েলপন্থী অনেক ব্যক্তি ও গোষ্ঠী এটিকে রাজনৈতিক বার্তা হিসেবে ব্যাখ্যা করে সামাজিক মাধ্যমে তীব্র সমালোচনা শুরু করে। কেউ কেউ প্রাদা বয়কটের আহ্বানও জানান।
অন্যদিকে বহু বিশ্লেষক ও ভক্তের মতে, ফ্যাশন কখনোই কেবল পোশাক নয়; এটি পরিচয়, সংস্কৃতি ও প্রতিনিধিত্বেরও ভাষা। তাঁদের বক্তব্য, আন্তর্জাতিক বিলাসবহুল ব্র্যান্ডের এমন একটি প্রচারণায় ফিলিস্তিনি পরিচয়কে দৃশ্যমান করা নিজেই একটি গুরুত্বপূর্ণ সাংস্কৃতিক ঘটনা।
ফিলিস্তিনিদের অধিকার নিয়ে সব সময়ে সোচ্চার সঁ লেভঁসঁ লেভঁ বরাবরই গাজার মানবিক সংকট, যুদ্ধবিরতি এবং ফিলিস্তিনিদের অধিকার নিয়ে প্রকাশ্যে কথা বলেছেন। তাঁর গানেও বারবার ফিরে আসে নির্বাসন, স্মৃতি, ঘর হারানোর বেদনা এবং পরিচয়ের প্রশ্ন। ফলে তাঁর শিল্পীসত্তা ও রাজনৈতিক অবস্থানকে আলাদা করে দেখা প্রায় অসম্ভব।
প্রাদার এই সিদ্ধান্তের আরেকটি তাৎপর্যও রয়েছে। কয়েক মাস আগেই ফিলিস্তিনি বংশোদ্ভূত মার্কিন সুপারমডেল বেলা হাদিদকে গ্লোবাল বিউটি অ্যাম্বাসেডর হিসেবে নিয়োগ দেয় প্রতিষ্ঠানটি। সেই ধারাবাহিকতায় এবার ফিলিস্তিনে জন্ম নেওয়া একজন শিল্পীকে সামনে নিয়ে আসা অনেকের চোখে মধ্যপ্রাচ্যের নতুন সাংস্কৃতিক প্রতিনিধিত্বের ইঙ্গিত।
তাঁর সঙ্গীতে এভাবেই মোহিত করেন অগণিত শ্রোতাকেফ্যাশন দুনিয়ায় প্রায়ই পোশাক, অলংকার কিংবা একটি ছোট প্রতীকও বড় রাজনৈতিক বিতর্কের জন্ম দেয়। সঁ লেভঁর গলায় ঝুলে থাকা সেই মানচিত্র-আকৃতির পেনড্যান্ট আবারও মনে করিয়ে দিল—র্যাম্পের আলো কখনো কখনো কূটনীতির আলোচনাকেও ছাপিয়ে যেতে পারে। আর বিশ্বকাপের গোলউৎসবের ভিড়েও এই ঘটনা প্রমাণ করেছে, পরিচয়ের লড়াই কেবল রাজনীতির মঞ্চেই নয়, ফ্যাশনের মঞ্চেও সমানভাবে চলমান।
ছবি: ইন্সটাগ্রাম