ঢাবির শহীদুল্লাহ হল মাঠে বিশ্বকাপ দেখতে গিয়ে হেনস্তার শিকার হওয়ার অভিযোগ নারীসহ সাবেক ছয় শিক্ষার্থীর

· Prothom Alo

বিশ্বকাপ ফুটবলের ম্যাচ দেখতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ হলের মাঠে গিয়ে হেনস্তার শিকার হওয়ার অভিযোগ করেছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ছয় শিক্ষার্থী।

অভিযোগকারীদের একজন মুহতাসিন বিল্লাহ ইমন। তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের ২০১৮-১৯ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী ছিলেন। তাঁর ভাষ্য, গত শুক্রবার রাতে নরওয়ে-ফ্রান্সের খেলা দেখতে তিনিসহ সাবেক ছয় শিক্ষার্থী হলের রেজিস্টার খাতায় নাম লিখে বৈধভাবে মাঠে গিয়েছিলেন। তারপরও হলের একদল শিক্ষার্থী তাঁদের ঘিরে ধরেন। মাঠ ছাড়তে চাপ দেন। সঙ্গে থাকা নারীকে হেনস্তা করেন। হেনস্তাকারীদের মধ্যে আছেন হল সংসদের সমাজসেবা সম্পাদক মো. সাজু মিয়া।

Visit freshyourfeel.org for more information.

হেনস্তার অভিযোগ অস্বীকার করেছেন সাজু মিয়া। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ২০২০-২১ শিক্ষাবর্ষের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের এই শিক্ষার্থী প্রথম আলোর কাছে দাবি করেন, তিনিসহ কয়েকজন মিলে ওই ছয়জনকে ভদ্রভাবেই চলে যেতে বলেছিলেন। এ কথা বলার পর উল্টো তাঁদের ওপর চোটপাট দেখানো হয়। আর হল মাঠে আসা নারীর সঙ্গে তিনি কোনো কথাই বলেননি।

ঘটনার বিষয়ে গতকাল শনিবার বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর বরাবর অভিযোগ দিয়েছে ভুক্তভোগীরা। এ ছাড়া এই ঘটনায় গতকাল হল প্রাধ্যক্ষ বরাবর স্মারকলিপি দিয়েছে হল শাখা ছাত্রদল। ঘটনার নিন্দা জানিয়ে বিবৃতি দিয়েছে বিপ্লবী ছাত্র মৈত্রী।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর ইসরাফিল রতন প্রথম আলোকে বলেন, লিখিত অভিযোগ পাওয়ার পর বিষয়টি তদন্ত করতে একজন সহকারী প্রক্টরকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। তদন্ত শেষে পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়া হবে।

শহীদুল্লাহ হল মাঠে বড় পর্দায় বিশ্বকাপ ফুটবলের খেলা দেখানো হচ্ছে। আজ রোববার সকালে

হেনস্তার অভিযোগ

ঘটনার বর্ণনা দিয়ে গতকাল সকালে বিশ্ববিদ্যালয় প্রাক্তন-বর্তমান শিক্ষার্থীদের একটি ফেসবুক গ্রুপে (ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থী সংসদ-২) পোস্ট দেন মুহতাসিন। তিনি লিখেছেন, খেলা দেখা জন্য তাঁরা ছয়জন শহীদুল্লাহ হলে যান। নিয়মানুযায়ী হলের রেজিস্টার খাতায় নাম লিখে প্রবেশ করেন। খেলা শুরুর আগেই তাঁরা গিয়েছিলেন। তাই তাঁরা মাঠে বসে আড্ডা দিচ্ছিল। হঠাৎ চারজন শিক্ষার্থী আসেন। তাঁদের জিজ্ঞেস করেন, তাঁরা ক্যাম্পাসের কি না। প্রাক্তন শিক্ষার্থী পরিচয় দেন তাঁরা। শিক্ষার্থীদের একজন বলে ওঠেন, ‘আপনারা কোন লজিকে একটা মেয়ে নিয়ে ছেলেদের হলে খেলা দেখতে আসছেন?’ পরে আরও ৮-৯ জন এসে তাঁদের ঘিরে ধরেন। হল থেকে বেরিয়ে যাওয়ার জন্য চাপ দেন। তাঁদের মধ্যে একজন নিজেকে হল সংসদের সমাজসেবা সম্পাদক (সাজু মিয়া) বলে পরিচয় দেন। তাঁদের চলে যেতে বলেন। সে সময় একজন সবার ছবি তুলে হলের ফেসবুক গ্রুপে পোস্ট করে দেওয়ার হুমকি দেন। তখন কথা বলতে গেলে সাজু উচ্চ স্বরে, খুবই উগ্রভাবে বলেন, ‘আপনাদের আর ব্যাখ্যা দেওয়ার প্রয়োজন মনে করি না। আপনারা এখন উঠেন আর বের হয়ে যান, এখানে মেয়ে নিয়ে থাকা যাবে না।’ তাঁদের সঙ্গে থাকা একজন বলেন, ‘ভাইয়া, তুমি যাকে মেয়ে মেয়ে বলছ, সে আমার স্ত্রী।’ বিষয়টি নিয়ে তাঁরা হল সংসদের সিনিয়রদের সঙ্গে কথা বলতে চান। তখন সাজু বলেন, ‘আপনাদের সাথে কোনো কথা নাই, আপনারা উঠেন আর বের হয়ে যান।’ তাঁদের বের করে দিলে হল গেটে তাঁরা অপেক্ষা করেন। পরে হল সংসদের সাধারণ সম্পাদক (জিএস) তৌকির হাসান ঘটনার মধ্যস্থতা করার চেষ্টা করেন। সাজুকে ঘটনাস্থলে আনার চেষ্টা করে ব্যর্থ হন। হল সংসদের জিএস প্রকাশ্যে দুঃখ প্রকাশ করেন। প্রভোস্ট বরাবর লিখিত অভিযোগ দেওয়ার পরামর্শ দেন।

অভিযোগ অস্বীকার

অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য জানতে গতকাল রাতে সাজু মিয়ার সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়। তিনি হেনস্তার অভিযোগ অস্বীকার করেন।

সাজু মিয়া প্রথম আলোকে বলেন, হলে আগের রাতেও এ রকম একটা ঘটনা ঘটেছিল। রাত ১১টা ৪০ মিনিটে দুজন ছেলে একজন মেয়ে নিয়ে মাঠে বসে ছিল। শুক্রবারও রাত ১২টার পর হল মাঠে পাঁচজন ছেলে ও একজন মেয়ে ছিল। যেহেতু তিনি হল সংসদের দায়িত্বে আছেন, স্বাভাবিকভাবেই তাঁর ওপর এগুলো নিয়ে সব সময় প্রেশার থাকে। শিক্ষার্থীরা জানানোর পর তিনি প্রথমে হলের স্টাফ পাঠান। স্টাফ গিয়ে তাঁদের চলে যেতে বলেন। কিন্তু তাঁরা স্টাফের কথায় কোনো কর্ণপাত না করে বসে থাকেন। কিছুক্ষণ পর তিনিসহ কয়েকজন মিলে সেখানে যান। তাঁদের ভদ্রভাবেই চলে যেতে বলেন। তিনি এ কথা বলার সঙ্গে সঙ্গে তাঁরা একদম চটে যান। তখন তিনি বলেন, এত রাতে মেয়ে নিয়ে ছেলেদের আবাসিক হলে অবস্থান করা ঠিক নয়। এরপর তাঁরা নানা তর্ক করেন। একপর্যায়ে বড় বড় নেতার নাম নিয়ে হুমকি দেন। দেখে নেওয়ার কথা বলেন।

নারীকে হেনস্তার বিষয়ে সাজু মিয়া বলেন, ‘আমি একদম চ্যালেঞ্জ করতে পারি, যদি ওই আপু বলতে পারেন যে তাঁর সাথে একটা সিঙ্গেল ওয়ার্ড আমার বিনিময় হইছে, তাহলে অবশ্যই আমি আপুর কাছে ক্ষমা চাইব।’

ঘটনার বিষয়ে গতকাল শনিবার ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ হলের প্রাধ্যক্ষের কাছে স্মারকলিপি দেয় হল শাখা ছাত্রদল

ঘটনাটি নিয়ে ছাত্রদলের তৎপরতাকে সংগঠনটির ‘ইচ্ছাকৃত নোংরামি’ বলে বর্ণনা করেন সাজু মিয়া।

ছাত্রদলের ভাষ্য, সাজু মিয়া ছাত্রশিবিরের সমর্থনে হল সংসদে জয়ী হয়েছেন। তবে হল সংসদের জিএস তৌকির হাসান প্রথম আলোকে বলেন, হল সংসদে শিবিরের কোনো প্যানেল ছিল না। সাজু মিয়া স্বতন্ত্রভাবে নির্বাচন করে জয়ী হন।

‘বের করে দেওয়ার এখতিয়ার হল সংসদের নেই’

সাবেক শিক্ষার্থীকে হল সংসদের কোনো নেতা এভাবে বের করে দিতে পারেন কি না, জানতে চাইলে শহীদুল্লাহ হলের প্রাধ্যক্ষ অধ্যাপক মো. আমিনুল ইসলাম ভূঁইয়া প্রথম আলোকে বলেন, ‘না। হল সংসদের এমনটা করার কোনো এখতিয়ার নেই। হল সংসদকে আমরা এটা জানিয়ে দিয়েছি যে এমনটা তারা করতে পারবে না। যা করতে হয়, হল প্রশাসন করবে। এটা তো স্বাভাবিক কথা, না হলে হল প্রশাসন কেন আছে?’

হলের প্রাধ্যক্ষ আরও বলেন, তাঁরা বর্তমান-প্রাক্তন শিক্ষার্থীদের হলে প্রবেশের বিষয় নিয়ে কোনো নির্দেশনা তৈরি করে দেননি। যাঁরা আসবেন, তাঁরা নিজ দায়িত্বে আসবেন। নিজেদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করেই তাঁদের আসতে হবে।

এ ঘটনায় হল সংসদ থেকে কোনো প্রকার পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে কি না জানতে চাইলে শহীদুল্লাহ হল সংসদের জিএস তৌকির হাসান প্রথম আলোকে বলেন, হল সংসদে এ বিষয়ে এখনো কোনো লিখিত অভিযোগ আসেনি। তাই কোনো পদক্ষেপ নেয়নি হল সংসদ। লিখিত অভিযোগ এলে তখন পদক্ষেপ নেওয়া হবে।

প্রতিবাদের অংশ হিসেবে একদল নারী শিক্ষার্থী আজ সকালে শহীদুল্লাহ হল মাঠে গিয়ে খেলা দেখেন

নারী শিক্ষার্থীদের প্রতিবাদ

শহীদুল্লাহ হলের এই ঘটনায় প্রতিবাদ জানিয়েছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের কিছু নারী শিক্ষার্থী। তাঁদের মধ্যে আছেন কবি সুফিয়া কামাল হল সংসদের সহসভাপতি (ভিপি) সানজানা চৌধুরী রাত্রী। তিনি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে একটি পোস্ট দিয়ে প্রতিবাদী কর্মসূচির ঘোষণা দেন।

কর্মসূচিতে বলা হয়, বিশ্ববিদ্যালয়ের নারী শিক্ষার্থীরা রোববার সকাল আটটার আর্জেন্টিনা-জর্ডান ম্যাচ একসঙ্গে শহীদুল্লাহ হল মাঠে বসে দেখবেন। ম্যাচ শেষে তাঁরা প্রক্টর অফিসে স্মারকলিপি দেবেন।

বিপ্লবী ছাত্র মৈত্রীর নিন্দা

এ ঘটনার নিন্দা জানিয়ে বিপ্লবী ছাত্র মৈত্রীর বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সভাপতি সামি আব্দুল্লাহ্ ও সাধারণ সম্পাদক জাহিদুল ইসলাম রিয়াদ গতকাল একটি বিবৃতি দেন। তাঁরা অবিলম্বে এ ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্তসহ দায়ী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে যথাযথ সাংগঠনিক-প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানান। ক্যাম্পাসে নারী-পুরুষনির্বিশেষে সবার নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বলেন। বিশ্ববিদ্যালয়ে মব সংস্কৃতি ও হয়রানিমূলক আচরণের বিরুদ্ধে সুস্পষ্ট নীতিমালা প্রণয়নের দাবি জানান।

Read full story at source