বিশ্ববিদ্যালয়ের ওয়েবসাইটের হোমপেজ কেন উপাচার্যদের দখলে

· Prothom Alo

বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়ের পাট চুকিয়ে উচ্চশিক্ষার জন্য প্রতিবছর কয়েক হাজার ছেলেমেয়ে দেশের বাইরে পড়াশোনা করতে যান। তাঁদের সিংহভাগ যান আবার পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলো থেকে।

স্বাভাবিকভাবে বিদেশি অধ্যাপক বা তত্ত্বাবধায়ক যাঁরা আমাদের শিক্ষার্থীদের পিএইচডি বা স্নাতকোত্তরে সুযোগ দেন, তাঁরা আমাদের দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো সম্পর্কে জানতে চান।

Visit freshyourfeel.org for more information.

আর এই জানার জন্য অধিকাংশরাই শিক্ষার্থীদের জীবনবৃত্তান্তের পাশাপাশি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ওয়েবসাইটগুলোতে যান। সেখানে গিয়ে তাঁরা জানার চেষ্টা করেন, সেই বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষা ও গবেষণায় কেমন।

কিন্তু বাংলাদেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ওয়েবসাইটের প্রবেশমুখেই প্রতিষ্ঠানগুলোর এমন পরিচয়, দর্শন, অগ্রাধিকার ও সংস্কৃতিরও প্রতিফলন ঘটে, তা দেখার পর যে কারও মনে হবে, এটি কি কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ের ওয়েবসাইট, নাকি উপাচার্যদের ব্যক্তিগত ওয়েবসাইট! সেখানে বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিচয় জানার আগেই ব্যবহারকারীকে জানতে হচ্ছে উপাচার্যদের ‘অদ্ভুত’ পরিচয়রাজ্য।

বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়: বিজ্ঞাপনী চাকচিক্য বনাম শৃঙ্খলার অভাব

ওয়েবসাইটগুলোর প্রচ্ছদে শোভা পাচ্ছে উপাচার্য ও প্রশাসনের শীর্ষ ব্যক্তিদের ছবি, বাণী, শুভেচ্ছা কিংবা কার্যক্রমের খবর। কোনো কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ের পুরো সাইটে বড় আকারের ছবি। প্রধানমন্ত্রীর কতটা কাছের মানুষ, তা বোঝাতে থাকছে উপাচার্যদের সঙ্গে তাঁর ছবি।

অথচ এই ‘শিক্ষিত’ জনগোষ্ঠীর কাঁধে দায়িত্ব রয়েছে আমাদের শিক্ষিত প্রজন্ম উপহার দেওয়ার জন্য। এই কর্তাব্যক্তিদের অনেকেই উচ্চশিক্ষায় বিদেশে কাটালেও তাঁরা নিজেদের দায়িত্ব পাওয়ার পরও নিজেদের ‘স্তুতিচর্চা’র জায়গা থেকে সরে আসতে পারেননি।

ভিনদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ওয়েবসাইটগুলোতে ঢুকলে যেখানে উপাচার্য/প্রেসিডেন্টের পরিচয় খুঁজতে গলদঘর্ম হওয়ার কথা, সেখানে আমাদের দেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ওয়েবসাইটগুলো উপাচার্যদের প্রচারমাধ্যম হয়ে উঠছে।

অথচ এই ওয়েবসাইটগুলোর মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত ছিল বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক অর্জন, গবেষণা, শিক্ষার্থী সেবা বা উদ্ভাবনের তথ্যে ভরা থাকা; কিন্তু আমাদের দেশে সেই সংস্কৃতি গড়ে উঠতে পারেনি।

উপাচার্যের ছবি এতটাই প্রাধান্য পায় যে বিশ্ববিদ্যালয়ের মূল উদ্দেশ্য শিক্ষা, গবেষণা ও জ্ঞানচর্চা টর্চলাইট জ্বালিয়ে খুঁজতে হয়।

একজন শিক্ষার্থী কী খুঁজবেন? একজন গবেষক কোন তথ্য প্রয়োজন মনে করবেন? একজন অভিভাবকের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় কী?

এ প্রশ্নগুলোর উত্তর অনুযায়ী ওয়েবসাইট সাজানোর কথা ছিল, কিন্তু ওয়েবসাইট তৈরির সময় ব্যবহারকারীর প্রয়োজনের চেয়ে প্রশাসনিক কাঠামোকে গুরুত্ব দেওয়ার ঘটনাই ঘটছে।

শুধু বিশ্ববিদ্যালয়ই নয়, বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর পরিচালনার নিয়ন্ত্রক প্রতিষ্ঠান বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (ইউজিসি) এ প্রতিযোগিতা থেকে পিছিয়ে পড়েনি। তাদের ওয়েবসাইটের প্রবেশমুখেই ‘চেয়ারম্যানের’ আত্মপরিচয় শোভা পাচ্ছে।

উপাচার্যদের এই স্তুতিবাণীগুলো আবার প্রশ্নবিদ্ধ। এই যেমন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের বর্তমান উপাচার্য নিজের পরিচয় বর্ণনা করতে গিয়ে লিখেছেন, ‘অ্যাই অ্যাম ড...’, ইংরেজির অ্যাকটিভ ভয়েসে বৃত্তান্ত লিখেছেন, আবার তাঁর সহকর্মী সহ-উপাচার্যরা প্যাসিভ ভয়েসে নিজের বৃত্তান্ত তুলে ধরেছেন।

কোনো পাঠক যখন পড়বে, তখন সহজে বুঝে ফেলবে, ওই বিশ্ববিদ্যালয়ের ওয়েবসাইটগুলোর ওজন কতটা ভারী। কোথাও লিখছে ইউনিভার্সিটি অব চিটাগং আবার কোথাও লিখছে ‘চিটাগং ইউনিভার্সিটি’। অর্থাৎ একই বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজিতে দুই নাম লিখে তালগোল পাকিয়ে ফেলছে। এতে সচেতন পাঠকের কনফিউজড হওয়া অস্বাভাবিক নয়।

প্রশ্ন হলো, বাংলাদেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের ওয়েবসাইটের প্রচ্ছদ কেন উপাচার্যদের দখলে গেল? এই দখলদারির সুবিধা ও অসুবিধাটা কী? এসব নিয়ে আলোচনার প্রয়োজন আছে।

বিশেষ করে দেশের শতবর্ষী পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় থাকার পরও আমরা যখন বিশ্ববিদ্যালয় র‍্যাঙ্কিংয়ে পিছিয়ে পড়ছি উচ্চশিক্ষার মান অবনমনে, তখন আমাদের জানতেই হবে, ‘উপাচার্যস্তুতি’র ওয়েবসাইটগুলো আমাদের কী বার্তা দেয়।

ভিনদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও গবেষকেরা যখন প্রশাসনিক শীর্ষ ব্যক্তিদের নামই জানে না, তখন আমাদের সামনে বিশ্ববিদ্যালয়ের সাইনবোর্ড কেন উপাচার্য ও তাঁর প্রশাসনিক কর্তারা হন?

উপাচার্যর নামপাঠ থেকে শিক্ষার্থীরা কোন ধরনের উপকার পান, তা অবশ্যই জানতে হবে।

দেখুন, দেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সর্বোচ্চ প্রশাসনিক ও একাডেমিক কর্তা হলেন ‘উপাচার্য’। সে হিসেবে তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিনিধিত্ব করেন এবং সরকারের সঙ্গে প্রতিষ্ঠানের সম্পর্ক রক্ষা করেন।

এ কারণে অনেক বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ মনে করে যে উপাচার্যের ছবি ও বার্তা হোমপেজে থাকা উচিত। তবে বিশ্বের বহু বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রেসিডেন্ট, চ্যান্সেলর বা ভাইস চ্যান্সেলরের একটি পরিচিতি অংশ থাকে, যা কখনোই প্রচ্ছদে নয়; বরং প্রশাসনিক পরিচিতি পেজে তাঁদের নাম ও সংক্ষিপ্ত পরিচিতি থাকে।

প্রচ্ছদে থাকে শিক্ষকদের অর্জন, শিক্ষার্থীদের অর্জন, প্রকাশনার গল্প। কিন্তু আমাদের দেশে সম্ভবত গবেষণায় পিছিয়ে থাকায় এসব তথ্য সামনে আসছে না। শিক্ষা ও গবেষণায় ভালো না হওয়ার ফলে বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্ষমতাচর্চার কেন্দ্রে তাঁরা চলে আসছেন।

কারণ, আমাদের রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোতেই ব্যক্তিকেন্দ্রিক প্রশাসনিক সংস্কৃতি দীর্ঘদিন ধরে চলে আসছে। এ সংস্কৃতি বিশ্ববিদ্যালয়েও প্রবেশ করেছে।

ফলে বিশ্ববিদ্যালয়ের ওয়েবসাইট অনেক সময় জ্ঞান ও গবেষণার প্ল্যাটফর্মের বদলে প্রশাসনিক নেতৃত্বের প্রদর্শনক্ষেত্রে পরিণত হচ্ছে। ব্যক্তির গুরুত্ব প্রতিষ্ঠানের চেয়ে বেশি হয়ে ওঠে।

অন্যদিকে ‘উপাচার্য’ নিয়োগ লেজুড়বৃত্তিক রাজনীতির ফসল হিসেবে আসছে। বিশ্ববিদ্যালয় পরিচালনা আইনের তোয়াক্কা না করে রাজনৈতিক বিবেচনায় নিয়োগপ্রাপ্ত ব্যক্তিরা যখন ক্ষমতায় বসছেন, তখনই তিনি বিশ্ববিদ্যালয়টিকে দলীয় শৃঙ্খলে বাঁধার চেষ্টা করেন, রাজনৈতিক নেতাদের তোয়াজ করার ছবি সামনে চলে আসে।

এটি কখনো সচেতনভাবে, কখনো অবচেতনভাবে ক্ষমতার প্রতীকী হিসেবে আবির্ভূত হয়।

‘উপাচার্যকেন্দ্রিক’ প্রচারণার ফলে বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্জনগুলো অনেকটাই উপাচার্যের অর্জন হিসেবে গণ্য হয়।

এই ধরুন, বিশ্ববিদ্যালয়ে নতুন কোনো ভবন উদ্বোধন হলো কিংবা চুক্তি স্বাক্ষর, সভা বা আন্তর্জাতিক প্রতিনিধিদলের সঙ্গে বৈঠক হলো, সেখানে প্রচারণার মধ্যমণি হিসেবে উপাচার্যকে বাধ্যতামূলকভাবে ব্যবহার করা হয়।

এর ফলে একটি ধারণা তৈরি হয়, এটা নিশ্চয় উপাচার্যের অর্জন। অথচ বাস্তবে বিশ্ববিদ্যালয়ের সাফল্য গড়ে ওঠে শিক্ষক, গবেষক, শিক্ষার্থী, কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের সম্মিলিত প্রচেষ্টায়। কিন্তু ওয়েবসাইটের উপস্থাপনায় এই সম্মিলিত চিত্র প্রায়ই অনুপস্থিত থাকছে।

ব্যক্তিকেন্দ্রিক প্রচারমাধ্যম হয়ে ওঠায় বিশ্ববিদ্যালয়ের মানের প্রশ্নে ব্যবহারকারীদের নেতাবাচক ধারণাই দিচ্ছে বছরের পর বছর ধরে। এটি যে বিশ্ববিদ্যালয়ের মূল পরিচয়কে দুর্বল করে তুলতে পারে, তা সম্ভবত ওই সব কর্তাব্যক্তি জানেন না। একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিচয় হওয়া উচিত তার জ্ঞান উৎপাদন, গবেষণা, শিক্ষা ও উদ্ভাবনের মাধ্যমে।

কিন্তু যদি ওয়েবসাইটে ব্যক্তির উপস্থিতি প্রতিষ্ঠানকে ছাপিয়ে যায়, তাহলে এটি বিশ্ববিদ্যালয়ের গণতান্ত্রিক ও সমষ্টিগত চরিত্রের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। বিশ্ববিদ্যালয় মূলত একটি বুদ্ধিবৃত্তিক সম্প্রদায়; এটি কোনো একক ব্যক্তির প্রতিষ্ঠান নয়।

আবার অনেকেই প্রশ্ন তুলতে পারেন, উপাচার্য ও তাঁর প্রশাসনিক কর্তাব্যক্তিরা বিশ্ববিদ্যালয়ের নীতিনির্ধারণ, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক, গবেষণা সহযোগিতা ও প্রশাসনিক নেতৃত্বে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারেন, সেই প্রচারণাকে ইতিবাচক হিসেবে দেখা উচিত।

কিন্তু প্রশ্ন হলো, সেই উপস্থিতির মাত্রা কতটুকু হওয়া উচিত? একজন উপাচার্যের পরিচিতি ও বার্তা থাকা এক বিষয় আর পুরো হোমপেজকে তাঁর উপস্থিতির কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত করা আরেক বিষয়।

বাংলাদেশ যদি সত্যি সত্যি দেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে আন্তর্জাতিক মানের ডিজিটাল উপস্থিতি গড়ে তুলতে চায়, তাহলে ওয়েবসাইটের এই স্তুতিকাব্য বন্ধ হওয়া প্রয়োজন।

উপাচার্য কখনোই বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্র্যান্ড নন; বরং শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের অর্জন বিশ্ববিদ্যালয়টির আন্তর্জাতিক মহলে পরিচয় বহন করে।

মনে রাখতে হবে, আমরা যখন কোনো প্রতিষ্ঠানকে ব্যক্তির ঊর্ধ্বে স্থান দিতে শিখব, তখন দেশটার ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে, নয়তো নয়। এখন দেখার বিষয়, সরকার এই বিষয়গুলো কীভাবে দেখে।

  • ড. নাদিম মাহমুদ গবেষক, ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়। ই–মেইল: [email protected]

    মতামত লেখকের নিজস্ব

Read full story at source