বাবা বলতেন, আমি থাকতেই জীবনটা গুছিয়ে নে

· Prothom Alo

বাবা বহুকাল আগেই আকাশের তারা হয়ে গেছেন। নির্ঘুম মধ্যরাতে এখনো মাঝেমধ্যে আকাশের দিকে তাকিয়ে তাঁকে খুঁজি! তাঁকে মনে পড়ে প্রিয় শিল্পী জেমসের ভাষায় বলা তাঁরই কথাগুলোর অনুরূপে—‘যখন আমি থাকব না...কী করবি রে বোকা!’
আসলে বাবাবিহীন পৃথিবীটা সত্যিই অন্ধকারময়। তিনি গত হয়েছেন ১৯৯৫ সালের ১১ নভেম্বর, রোজ শুক্রবার।

বাবা বিরাট গেরস্থ সম্ভ্রান্ত পরিবারের সন্তান ছিলেন। ফসল উঠানো থেকে শুরু করে পরিবারের সব দায়িত্ব তিনি একাই সামাল দিতেন। কাজের জন্য বাড়িসংলগ্ন বিশাল একটি চাতাল ছিল। সেটিকে সবাই চটান বলত! সারা বছর সেখানে কোনো না কোনো ফসল উত্তোলনের কর্মযজ্ঞ লেগেই থাকত। বাবা ছিলেন সেই বিশাল যৌথ কৃষক পরিবারের একমাত্র কর্ণধার।

Visit aportal.club for more information.

তৎকালীন আমাদের ইউনিয়নে ছিল বাবার একটি বিশাল গরুর খামার। সাভার ডেইরি ফার্ম থেকে তখন জার্মানদের সহায়তায় আনা হতো সেসব গরু। গরু পালন ছিল বাবার অন্যতম শখ। অ্যালবাম খুললে জার্মান সাহেবদের সঙ্গে তোলা সেই সাদাকালো ছবিগুলো এখনো সযত্নে দেখতে পাই।

সারা জীবন যৌথ পরিবারে কৃষিকর্মে নিরন্তর পরিশ্রমের দরুন বাবা অনেকটা অল্প বয়সেই বৃদ্ধ হয়ে যান। চিরায়ত নিয়মে চাচারাও একসময় আলাদা সংসার পাতেন। এদিকে সাত সন্তানের সংসার নিয়ে বাবা পড়েন নিদারুণ অর্থকষ্টে! অঢেল সহায়সম্পত্তি থাকলেও নিয়মিত উপার্জন না থাকায় দিনমান উদ্‌ভ্রান্তের মতো চিন্তাগ্রস্ত থাকতেন তিনি। অপ্রতুল ফসল উৎপাদনে সংসার চালানো ছিল ভীষণ কষ্টকর। এদিকে উপায়ান্তর না দেখে একদিন সিদ্ধান্ত নিলেন নিজ বাড়িতেই একটি মুদিদোকান দেবেন।

দোকানের জন্য বাবা প্রতি শনিবার সাভার নামা বাজারে মোকাম করতে যেতেন। মাঝেমধ্যে আমাকেও সঙ্গে নিতেন। সেই থেকে সাভার নামা বাজারের প্রতিটি অলিগলি আমার চেনা। কেনাকাটা শেষ করে বাবা কালিসাহার মিষ্টির দোকানে ঢুকতেন। ইয়া বড় একটি রাজভোগ মিষ্টি, দই আর চিড়ার সংমিশ্রণ সামনে দিয়ে বলতেন, ‘নে বাজান খা, মজা করে খা!’ আশ্চর্যের ব্যাপার হচ্ছে, আমি কোনোদিনই সেই খাবার শেষ করতে পারতাম না। বাকিটুকু বাবা পরমযত্নে খেয়ে নিতেন।

একসময় মুদিদোকানেও লোকসান হতে থাকল। পুনরায় সিদ্ধান্ত নিলেন, এবার পাইকারি দরে গুড় কিনে পার্শ্ববর্তী মুশুরীখোলার হাটে খুচরায় বিক্রি করবেন। তিনি যখন গুড়ের হাঁড়িগুলো মাথায় নিয়ে মাইলখানেক পথ ঘর্মাক্ত হাঁটতেন, আমার ভেতরটা দুমড়েমুচড়ে যেত! ছোট বলে কোনো সাহায্যই করতে পারতাম না।

বাবার এহেন কষ্টের জীবন থেকে তিনি সম্ভবত চরম শিক্ষাটিই নিয়েছিলেন। ফলস্বরূপ, আমাদের প্রত্যেক ভাই–বোনকেই লেখাপড়া শিখিয়েছেন। মাঝেমধ্যেই তিনি কড়া ভাষায় আমাকে শাসন করে বলতেন, ‘পড়ালেখা ছাড়া কোনো উপায় নেই রে বাপ। আমি থাকতেই জীবনটা গুছিয়ে নে! না হলে একদম পস্তাতে হবে এবং আমার মতোই গাধার খাটুনি খেটে জীবনটা শেষ করতে হবে।’

মনে পড়ে তখন ক্লাস থ্রিতে পড়ি। বার্ষিক পরীক্ষা সমাগত। কলম কিনতে হবে। ওদিকে বাবার কাছে একদমই ভাংতি টাকা নেই। চিন্তাগ্রস্ত হয়ে হঠাৎ তিনি ঘরমুখো হলেন। বিছানার নিচ থেকে একখানা লম্বা পাঁচ শ টাকার নোট বের করে বললেন, ‘চল বাপ তোর জন্য কলম কিনা নিয়া আসি।’ ভাবা যায়! সেই সময় একটি পাঁচ শ টাকার নোট ভাঙিয়ে মাত্র তিন টাকার একটি কলম! কতটা শিক্ষানুরাগী হলে এমনটা করা সম্ভব!

বয়সের মধ্যগগনে পৌঁছে গেছি। দুই সন্তানের জনকও হয়েছি। অবুঝের সেই সময়টি পার করে এখন অনেকটাই পরিণত। তবু আফসোস হয়, আহা তখন যদি বাবার সব কথা আরও গুরুত্ব দিয়ে শুনতাম! জীবন কতই–না সুন্দর হতো! তবু তাঁর প্রতি শতসহস্র কোটি সালাম। তাঁর অকৃত্রিম প্রচেষ্টাতেই আজ আমরা অন্তত মানুষ হয়েছি এবং এটুকু নিয়েই গর্ব করে যাব আজীবন।

বাবা আপনাকে বলছি, আমার ছেলেটি কিন্তু হুবহু আপনার মতোই হয়েছে। কি স্বভাব কিংবা বাহ্যিক রূপ! ওর দিকে তাকালে মাঝেমধ্যেই ফিক করে হেসে ফেলি। কী অসাধারণ মিল আপনাদের! আল্লাহর কাছে একটাই ফরিয়াদ তিনি যেন আমাকে একটু সময় দেন ওকে মানুষ করার। পরিণত বয়সে ও নিজেও যেন বলতে এবং বুঝতে পারে আসলে পৃথিবীতে বাবাই হচ্ছেন তাঁর সন্তানের জন্য একমাত্র নির্ভরতার বটবৃক্ষ!

সাভার, ঢাকা

Read full story at source