বাংলাদেশ সীমান্তে বিএসএফের জন্য জমি অধিগ্রহণে গিয়ে কৃষকদের বিক্ষোভের মুখে শুভেন্দু সরকার

· Prothom Alo

পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের বিধানসভা নির্বাচনে জিতে বিজেপি ক্ষমতায় আসার পরেই মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিএসএফের জন্য বাংলাদেশ লাগোয়া সীমান্তে জমি অধিগ্রহণের ঘোষণা দিয়েছিলেন। ৫০০ একরের বেশি জমি অধিগ্রহণ করে বিএসএফের হাতে তুলে দেওয়া হবে বলে জানিয়েছিলেন তিনি। কিন্তু সেই অধিগ্রহণ প্রক্রিয়া শুরু করতে গিয়ে মুর্শিদাবাদ জেলায় কৃষকদের প্রতিরোধের মুখে পড়েছে রাজ্য প্রশাসন।

মুর্শিদাবাদ জেলায় জমি অধিগ্রহণ করতে গিয়ে কী ধরনের সমস্যার মুখে পড়েছে প্রশাসন এবং কেন এই জমি অধিগ্রহণ বন্ধ করা উচিত—তা নিয়ে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে পশ্চিমবঙ্গের প্রধান মানবাধিকার সংস্থা অ্যাসোসিয়েশন ফর প্রটেকশন অব ডেমোক্রেটিক রাইটসের (এপিডিআর) মুর্শিদাবাদ শাখা। এপিডিআরের মুর্শিদাবাদ জেলা কমিটির সম্পাদক রাহুল চক্রবর্তী প্রতিবেদনটি চিঠির আকারে মুর্শিদাবাদের জেলা প্রশাসকের কাছে পাঠিয়েছেন।

Visit mchezo.life for more information.

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ৩ জুন এপিডিআর মুর্শিদাবাদ জেলা কমিটির সদস্যরা ডোমকল ব্লকের ঘোষপাড়া সর্বপল্লী ভুতগাড়ির মাঠ পর্যবেক্ষণ করেন। এই মাঠে প্রায় ১৫ হাজার বিঘা তিন ফসলি জমি রয়েছে। এই জমির ওপর নির্ভরশীল পাঁচ গ্রামের কৃষক। এই পাঁচটি গ্রাম হলো দক্ষিণ ঘোষপাড়া, সর্বপল্লী, ফরাজীপাড়া, মুরাদপুর এবং উত্তর ঘোষপাড়া। এই জমিতে পাট, গম, কলাই, মুশুরি, রসুন, পেঁয়াজ ও বিভিন্ন সবজির চাষ এই জমিতে হয়।

কৃষকদের সঙ্গে কথা বলেছেন জেলা কমিটির ৯ জন সদস্য। কৃষকেরা এপিডিআরের প্রতিনিধি দলকে জানিয়েছে, তাদের প্রত্যেকের জমির পরিমাণ একেবারেই বেশি নয়। কৃষকদের পরিবার পিছু জমি এক, দেড় বা দুই বিঘা। অর্থাৎ তাঁরা ক্ষুদ্র কৃষক।

এপিডিআরের প্রতিবেদন বলছে, ‘বাপ ঠাকুরদার আমল থেকে এখানকার কৃষকেরা এই জমিতে চাষাবাদ করছেন। জলঙ্গী নদীর ব্যাপক ভাঙনে অনেক উর্বর জমি তলিয়ে গিয়েছে। ফলে এই জমির ওপর এলাকার কৃষকদের বেঁচে থাকা নির্ভর করছে। মাঠে যেসব কৃষি জমি আছে, তা সবই সরকারি খাতায় নথিভুক্ত। জমিও যথেষ্টই উর্বর…এই জমির ওপর নির্ভরশীল পাঁচটি গ্রামের প্রায় ৬০০ পরিবার।

ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তে দাঁড়িয়ে আছেন হিন্দুত্ববাদী বিজেপিদলীয় পশ্চিমবঙ্গের বিধায়ক চিত্ত মুখার্জি। সীমান্তে ২৭ কিলোমিটার এলাকায় কাটাতারের বেড়া নির্মাণ করতে শুভেন্দু সরকার বিএসএফকে জমি দেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছে। ২১ মে ২০২৬, মুর্শিদাবাদ

প্রতিবেদনে বলা হয়, এই জমি চলে গেলে প্রায় তিন হাজার মানুষ পথে বসবে। এই জমি তারা কিছুতেই বিক্রি করবে না। কৃষকেরা মনে করছেন, ক্ষতিপূরণের সামান্য অর্থ জমির তুলনায় কিছুই নয়। জমি বছরের পর বছর ধরে তাদের পরিবারকে খাবার জোগাচ্ছে। কিন্তু ক্ষতিপূরণের সামান্য টাকা গরিবের পরিবারে আর্থিক টানাটানিতে কিছু দিনের মধ্যেই শেষ হয়ে যাবে।

এপিডিআরের প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, গত ৩১ মে মুর্শিদাবাদের সীমান্তবর্তী ডোমকল মহকুমার এই অঞ্চলে ‘বিএসএফ লাল পতাকার সীমানা লাগিয়ে অধিগ্রহণ করতে যায় এবং কৃষকেরা এর বিরুদ্ধে বিক্ষোভ শুরু করেন। ভুতগাড়ির মাঠসংলগ্ন সড়কে বিপুলসংখ্যক কৃষক অবস্থান নিলে যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। জলঙ্গি থানার পুলিশ ও বিএসএফ এক সঙ্গে জমায়েত ছত্রভঙ্গ করতে এলে কৃষকদের সঙ্গে বচসা বেঁধে যায়।

এপিডিআরের প্রতিবেদনে বলা হয়, শেষ পর্যন্ত এলাকার পুলিশ প্রশাসন কৃষকদের চাষের জমি দখল না করার মৌখিক আশ্বাস দিলে কৃষকেরা সড়ক ছেড়ে যায়।

জামালপুরের বকশীগঞ্জ সীমান্তে পুশ ইনে ব্যর্থ হয়ে এক ব্যক্তিকে নিয়ে সীমান্তে দাঁড়িয়ে আছে বিএসএফ। বিজিবির সতর্ক অবস্থান

এই প্রতিবেদন আরও বলছে, কৃষকেরা এপিডিআরের প্রতিনিধিদলকে জানিয়েছে, বিএসএফ কৃষকদের চাষের জমি ছেড়ে দিয়ে অন্য জায়গায় নিজেদের শিবির বানালে তাদের আপত্তি নেই। ডোমকল মহাকুমার এই অঞ্চলের জমিতে হিন্দু-মুসলিম এক সঙ্গে চাষ করেন। পাশের গ্রামে হিন্দু এলাকার কৃষকেরাও এই জমি কিছুতেই দেবে না।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পাশের হিন্দু গ্রামের অনেকেই এপিডিআরের সঙ্গে কথা বলেছেন। তাঁরা জানিয়েছে, গত সরকারের অত্যাচারে অতিষ্ঠ হয়ে তাঁরা নতুন সরকার এনেছেন। অথচ নতুন সরকার আসার পর সীমান্ত এলাকার চাষিদের জমি বিএসএফ দিয়ে দখলে নেওয়ার চেষ্টা চলছে। তাঁরা এটা কিছুতেই মানবেন না। বিএসএফ, পুলিশ ক্রমশ এলাকার চাষিদের বিরুদ্ধে দাঁড়াচ্ছে। জমি রক্ষার জন্য তারা লড়াই করবেন।

কৃষকেরা এপিডিআরকে আরও বলেন, গত দুই বছরে বিএসএফ দুবার জমির মাপজোখ করে গেছে। কিন্তু সেই সময়ও কৃষকদের প্রতিরোধের কারণে তারা জমি নিতে আসেনি। এখন আবার জমি নেওয়ার তৎপরতা শুরু হয়েছে। বিষয়টি নিয়ে রাজ্য সরকার বা বিএসএফের তরফে কোনো বিবৃতি এখনো প্রকাশ্যে আসেনি।

ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের হাকিমপুর সীমান্ত পারাপার কেন্দ্রের কাছে জড়ো হওয়া কথিত অনথিভুক্ত বাংলাদেশি অভিবাসীরা

এপিডিআরের পর্যবেক্ষণ

এপিডিআর চিঠি আকারে মুর্শিদাবাদের জেলা শাসককে যে প্রতিবেদন দিয়েছে, সেখানে বলা হয়েছে রাজ্য সরকার সীমান্তবর্তী এলাকা থেকে ১৫ কিলোমিটারের মধ্যে বিএসএফকে জমি দেওয়ার যে বিজ্ঞপ্তি জারি করেছে, তারই ফল হিসেবে গ্রামের ভেতরে নথিভুক্ত চাষের জমি অধিগ্রহণের চেষ্টা শুরু হয়েছে।

তবে পশ্চিমবঙ্গের জমি অধিগ্রহণ আইন অনুযায়ী, কৃষকদের অসম্মতিতে চাষের জমি অধিগ্রহণ করার এই চেষ্টা সম্পূর্ণ বেআইনি ও অসাংবিধানিক।

এপিডিআরের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এই জমি নিতে গিয়ে যেভাবে বিএসএফ ও পুলিশ যৌথভাবে প্রতিবাদী কৃষকদের সন্ত্রস্ত করছে, তা চরম অন্যায় ও বেআইনি।

কীভাবে আসছে বাংলাদেশ প্রসঙ্গ

প্রতিবেদনে এপিডিআরের তরফে বলা হয়েছে, ‘বাংলাদেশি তকমা’ দেওয়ার ভয় দেখিয়ে এই জমি অধিগ্রহণের চেষ্টা চলছে।

ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তের হাকিমপুর সীমান্ত পারাপার কেন্দ্রের দৃশ্য

এপিডিআরের প্রতিবেদনের পর্যবেক্ষণ অংশে বলা হয়েছে, সীমান্ত থেকে ১৫ কিলোমিটার পর্যন্ত দূরবর্তী এলাকা কার্যত বিএসএফের হাতে তুলে দেওয়ার বিজ্ঞপ্তি জারির সঙ্গে সঙ্গে মালদা, মুর্শিদাবাদ, নদীয়া, উত্তর এবং দক্ষিণ ২৪ পরগনা জেলার সীমান্তে ‘হোল্ডিং’ বা ‘ডিটেনশন সেন্টার’(আটক কেন্দ্র) নির্মাণের আসল উদ্দেশ্য চাষের জমি নেওয়া। এই প্রক্রিয়ার বিরুদ্ধে কৃষকেরা যাতে মুখ খুলতে না পারেন, সেই লক্ষ্যেই ভয় দেখাতে “বাংলাদেশি তকমা”দেওয়ার ভয়ংকর জনবিরোধী পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে’।

এই পরিস্থিতিতে এপিডিআরের দাবি, কৃষকদের অসম্মতিতে কোনোভাবেই জলঙ্গীর সর্বপল্লী ভূতগাড়ি মাঠের তিন ফসলি জমি বিএসএফের হাতে তুলে দেওয়া যাবে না এবং সাধারণ মানুষকে বাংলাদেশি বলে ঠেলে পাঠানো যাবে না।

এ প্রসঙ্গে এপিডিআরের বক্তব্য, ‘সংবাদমাধ্যম সূত্রে আমরা জানতে পেরেছি, মুর্শিদাবাদ থেকে বাংলাদেশি সন্দেহে বেশ কিছু মানুষকে বিএসএফের মাধ্যমে বাংলাদেশে ঠেলে পাঠিয়েছে। মানবতাবিরোধী, বেআইনি ও অসাংবিধানিক এই ঠেলে পাঠানো অবিলম্বে বন্ধ করতে হবে। এ পর্যন্ত ঠেলে পাঠানো সব মানুষের পরিচয় প্রকাশ করতে হবে। বাংলাদেশি অনুপ্রবেশকারী বলে মানুষকে হেনস্তা বন্ধ করতে হবে। কেবল আদালতে বাংলাদেশি প্রমাণিত হলেই কাউকে বাংলাদেশ সরকারের মাধ্যমে সে দেশে পাঠানো যাবে।’

ভারতের পশ্চিমবঙ্গের উত্তর চব্বিশ পরগনা জেলায় একটি আটককেন্দ্র

একই সঙ্গে এপিডিআরের তরফে দাবি করা হয়েছে, মুর্শিদাবাদে তৈরি সব ‘আটক কেন্দ্র’ অবিলম্বে বন্ধ করতে হবে।

মানবাধিকার সংগঠনটির চিঠিতে বলা হয়েছে, দেশের আইন অনুযায়ী সন্দেহ হলেই কাউকে দিনের পর দিন আটক রাখা যায় না। হোল্ডিং সেন্টারে বাংলাদেশি সন্দেহে যে সব নাগরিকদের রাখা হয়েছে তাদের সঙ্গে মানবাধিকার সংগঠন ও সংবাদমাধ্যমকে দেখা করতে দিতে হবে। আটক কেন্দ্রে রাখা নাগরিকদের সব তথ্য জনসমক্ষে আনতে হবে এবং তাঁদের মুক্তি দিতে হবে।

Read full story at source