মালাক্কা: যেখানে সমুদ্র বলে সাম্রাজ্যের গল্প ২

· Prothom Alo

কখনো জাহাজডুবির ইতিহাস, কখনো প্রণালির নীল জলরাশি, কখনো নদীতীরের রঙিন নগরজীবন—মালাক্কায় কাটানো একটি দিন বারবার মনে করিয়ে দেয়, ভ্রমণ কেবল স্থান দেখা নয়; সময় ও স্মৃতির ভেতর দিয়ে হেঁটে যাওয়াও।

মিডলবার্গ ব্যাস্টিয়ন থেকে আমরা চললাম সামুদ্রিক জাদুঘরের দিকে। আদতে এটি একটি ৩৪ মিটার উঁচু এবং ৩৬ মিটার লম্বা কাঠের জাহাজ, যা কিনা ষোড়শ শতাব্দীর বিখ্যাত পর্তুগিজ জাহাজ ফ্লোর দো মারের একটি প্রতিরূপ। জাহাজের পেটের ভেতরেই জাদুঘরের অবস্থান। মালয়েশিয়ার তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী মাহাথির মোহাম্মদ ১৯৯৪ সালের জুন মাসে জাদুঘরটির উদ্বোধন করেন। সুলতানি আমলের বিভিন্ন নিদর্শন এখানে প্রদর্শিত হয়। আমরা যখন গিয়েছি, তখন বন্ধ ছিল বিধায় ভেতরে প্রবেশ করা হয়নি।

Visit newsbetsport.bond for more information.

ফ্লোর দো মার জাহাজের প্রতিরূপ, এর ভেতরেই সামুদ্রিক জাদুঘর

আলবুকার্কি যে জাহাজবহর নিয়ে মালাক্কা আক্রমণ করেছিলেন, সেই আঠারোটি জাহাজের একটি ছিল ফ্লোর দো মার। ১৫০২ সালে পর্তুগালে নির্মিত ৪০০ টন ওজনের জাহাজটি ছিল তৎকালীন সময়ের সর্ববৃহৎ জাহাজ। এর ভেতরে প্রচুর জায়গা থাকায় আলবুকার্কি এটিকে কাজে লাগিয়েছিলেন সুলতানের প্রাসাদ থেকে লুণ্ঠিত ধনসম্পদ পরিবহনের কাজে। কিন্তু বিধি বাম। ফিরতি পথে ১৫১১ সালের ২০ নভেম্বর ইন্দোনেশিয়ার আচেহ প্রদেশের কাছাকাছি ঝড়ের কবলে পতিত হয়ে জাহাজটি ডুবে যায়। আলবুকার্কি কোনোভাবে প্রাণে বেঁচে গেলেও প্রায় চার শ নাবিকের সলিলসমাধি ঘটে সমুদ্রবক্ষে। জাহাজটিকে পরবর্তী সময়ে আর খুঁজে পাওয়া যায়নি।

দুপুরের নামাজের সময় হয়ে গেছে। নামাজ আদায় সেই সঙ্গে বিখ্যাত এক স্থাপনা দেখার অভিপ্রায়ে আমরা চললাম মালাক্কার ভাসমান মসজিদে। মালাক্কা প্রণালি মসজিদ নামে পরিচিত এই মসজিদটি মালয়েশিয়ার অন্যতম আইকনিক স্থাপনা। ২০০৬ সালের নির্মাণের পর থেকেই এটি বিশ্বের মুসলিমদের নজর কেড়েছে। কৃত্রিম এক দ্বীপের ওপর নির্মিত মসজিদটিকে জোয়ারের সময় দেখলে মনে হয় যেন পানির ওপর ভাসছে। প্রায় এক শ ফুট উঁচু মিনারটি একই সঙ্গে বাতিঘর হিসেবেও কাজ করে। পূর্ণিমা রাতে মসজিদের সৌন্দর্য শুনেছি বহুগুণে বেড়ে যায়। পূর্ণিমায় তো আর দেখার সুযোগ হবে না, তাই গ্রীষ্মের খরতাপে দগ্ধ হয়েই নাহয় এর সৌন্দর্য অবলোকন করা যাক।

মসজিদের ভেতরটাও সুন্দর, কারুকার্যখচিত। তবে মুসল্লিদের সংখ্যা অনেক কম। কোনোভাবে দুই কাতার লোক হয়েছে। যাঁরা এসেছেন, তাঁদের বেশির ভাগই পর্যটক। অনেক মহিলাকেও দেখলাম পেছন দিকের কাতারে দাঁড়াতে। পুত্রা মসজিদে পুরুষ-মহিলাদের মধ্যে একটা কাঠের আচ্ছাদন ছিল, এখানে কেবল লাল রঙের ফিতা দিয়ে মহিলাদের জায়গাটা আলাদা করা হয়েছে। মসজিদের বারান্দায় দাঁড়িয়ে যেন অন্য এক জগতে চলে গেলাম। জোয়ারের জলে ভেসে থাকা এই মসজিদ একদিকে ইবাদতের স্থান, অন্যদিকে স্থাপত্যের অপূর্ব শিল্পকর্ম।

বিখ্যাত ভাসমান মসজিদে লেখক

দূরে ইন্দোনেশিয়ার আবছা রেখা, সামনে বিস্তৃত জলরাশি আর মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছি আমরা। মনে হলো পৃথিবীর এক বিশাল অংশ যেন এই সরু জলরেখার ওপর নির্ভর করে টিকে আছে। ভাবা যায়, এই প্রণালি দিয়ে বিশ্ব সমুদ্রবাণিজ্যের প্রায় ৩০ ভাগ সম্পন্ন হচ্ছে। চীন, জাপান, কোরিয়াসহ পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোর জ্বালানি সরবরাহের মূল ধমনি হিসেবে কাজ করছে মালাক্কা প্রণালি। চীনের ক্রমবর্ধমান প্রভাব ঠেকানোর জন্য আমেরিকা কি আর এমনি এমনি এই প্রণালির ওপর প্রভাব বিস্তার করতে চায়?

দুপুরের খাবারের জন্য যে রেস্টুরেন্ট ঠিক করা ছিল, আমরা সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম সেটিতে যাব না। প্রথম দিনের ইন্ডিয়ান রেস্টুরেন্টের অভিজ্ঞতা আমাদের জন্য সুখকর ছিল না। তাই পরবর্তী ভ্রমণ গন্তব্যের কাছাকাছি একটা পাকিস্তানি রেস্টুরেন্ট খুঁজে বের করলাম। ‘মাইদাহ’ নামের রেস্টুরেন্টটি বিখ্যাত কাবাবের জন্য। ধোঁয়া ওঠা কাবাব যেন শরীরের ক্লান্তি মুছে দিল।
ভ্রমণে কখনো কখনো একটি ভালো খাবারও হয়ে ওঠে স্মরণীয় অভিজ্ঞতার অংশ। ভরপেট খাওয়ার পর সবারই চোখ বুজে আসার উপক্রম হচ্ছিল। তাই দেরি না করেই ছুটলাম তামিং সারি টাওয়ারের শীর্ষে আরোহণের উদ্দেশ্যে।

তামিং সারি টাওয়ার

১১০ ফুট লম্বা টাওয়ারটি মালাক্কার অন্যতম প্রধান পর্যটন আকর্ষণ। টাওয়ারটিতে একটি ঘূর্ণমান ডেক আছে। ডেকটি ধীরে ধীরে ওপরে ওঠে, কিছুক্ষণ চক্কর দেয়, আবার ঘুরতে ঘুরতে নিচে নামে। এ ধরনের টাওয়ারকে গেইরো বা প্যানারোমিক টাওয়ার বলে। ঘূর্ণমান ডেকটি যখন টাওয়ারের শীর্ষে উঠে চারপাশ চক্কর দেয়, তখন সেখান থেকে পুরো শহর দেখা যায়। ডেকে উঠে মালাক্কাকে দেখলাম এক নতুন দৃষ্টিতে। উঁচু থেকে শহরটা যেন এক খোলা ইতিহাসের বই—যেখানে প্রতিটি পৃষ্ঠা একেকটি উপনিবেশ, একেকটি সংগ্রাম, একেকটি সংস্কৃতি।

আজকের দিনে আমাদের শেষ আকর্ষণ মালাক্কা নদীতে নৌবিহার। তামান রেম্পাহ জেটিতে পৌঁছে দেখি আমাদের দলই সবার আগে এসেছে। নির্দিষ্টসংখ্যক লোক একসঙ্গে না হলে নৌকা ছাড়ে না। এই চক্করে শেষ বিকেলের তপ্ত রোদে আধা ঘণ্টা বসে থাকতে হলো। তবে নৌকা ছাড়ার পর সেই কষ্ট উবে যেতে সময় লাগেনি। দিনের শেষ আলোয় মালাক্কা নদীতে নৌবিহার—এই একটি অভিজ্ঞতা যেন পুরো সফরকে অর্থপূর্ণ করে তুলল।

মালাক্কা নদীতে নৌবিহার

নেদারল্যান্ডসের কোনো এক লেকসিটির আদলেই বলা চলে মালাক্কা নদীর চারপাশ সাজানো হয়েছে। নদীর দুই পাশে আছে চমৎকার পায়ে চলা পথ। সেই পথের কোথাও রেলিং আছে, কোথাও নেই। বাহারি ফুলগাছের টবগুলো স্থানে স্থানে রেলিংয়ের সৌন্দর্যবর্ধন করছে। কিছু বসার জায়গাও আছে, যেখানে বই হাতে ঘণ্টার পর ঘণ্টা কাটিয়ে দেওয়া যাবে। চারপাশের ভবনগুলো শৈল্পিকভাবে রাঙানো। ৪৫ মিনিটের নৌভ্রমণে মালাক্কার গুরুত্বপূর্ণ পর্যটক আকর্ষণগুলো দেখা যায়। যে দুর্গের সামনে আমরা ছবি তুলেছি দুপুরে, নদীপথে সেটির সামনে দিয়ে যাওয়ার সময় আবারও অনুভব করলাম এর অবস্থানগত তাৎপর্য। ১৮৪৯ সালের তৈরি করা সেইন্ট ফ্রান্সিস জেভিয়ার চার্চ আমাদের আমন্ত্রণ জানায় তার ভেতরটা ঘুরে আসার জন্য। লাল, নীল, হলুদ রঙের বাড়িগুলোর বেলকনিতে বসে এক কাপ কফি পানের শখ জাগে। পানগুং থিয়েটার হলের কারুকার্যখচিত দেয়ালে ভেসে ওঠে সিনেমা দেখার আহ্বান।

ভ্রমণকালে বেশ কয়েকটি সেতুর নিচে দিয়ে যেতে হয়। প্রতিটির সঙ্গেই জড়িয়ে আছে শত বছরের ইতিহাস। পাসার সেতুটি পর্তুগিজ আমলের সাক্ষ্য বহন করে চলছে। সুদৃশ্য কাম্পাংজুয়া সেতুটি ডাচরা তৈরি করেছিল ১৭১৪ সালে। ১৮৬২ সালে ইংরেজদের তৈরি তান কিম সেং সেতুটিকে দেখে বোঝার উপায় নেই যে এটি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় ধ্বংস হয়ে গিয়েছিল, পরবর্তী সময় ১৯৫৫ সালে নতুন করে তৈরি করা হয়েছে। সেতুটির ওপর বড় করে লেখা আছে ‘ঐতিহাসিক শহর মালাক্কায় স্বাগত’। আজ যে বিশ্ব পর্যটন দিবস সেটিও বড় করে লেখা আছে। নদীর চারপাশ কেন এত ঝকঝকে তকতকে, সেটা বুঝে এল এবার। এমনিতেও  সবকিছু সুন্দরভাবেই রক্ষণাবেক্ষণ করা হয়, তবে বিশ্ব পর্যটন দিবস উপলক্ষে হয়তো একটু বাড়তি যত্ন নেওয়া হয়েছে।
এই মালাক্কা নদীই একসময় ছিল নোংরা এবং পুতিদুর্গন্ধময়। ২০০০ সালে মালয়েশিয়ার সরকার নদীটিকে কাজে লাগানোর এক বিশেষ প্রকল্প হাতে নেয়। সেটির ফলাফল চোখের সামনে দৃশ্যমান।

২০০৮ সালে মালাক্কাকে ইউনেসকোর বিশ্ব ঐতিহ্য ঘোষণার পেছনে সরকারের এই প্রকল্প পরোক্ষ ভূমিকা রেখেছে, তা নিয়ে সন্দেহের অবকাশ নেই। আফসোস হচ্ছিল ঢাকার নদীগুলোর কথা ভেবে। আমরাও তো পারতাম এমন সুন্দর করে আমাদের নদীগুলোকে সাজাতে। অন্তত দূষণের মাত্রা কমানোর চেষ্টা তো করা যেত। বুড়িগঙ্গা, শীতলক্ষ্যা, বালু কিংবা ধলেশ্বরী; ঢাকার চারপাশের সব নদ–নদীকেই আমরা গলা টিপে হত্যা করছি। অথচ এই নদীগুলোই আমাদের ইমেজকে বিশ্বের দরবারে বাড়াতে পারত। বুড়িগঙ্গাই হতে পারত আমাদের টেমস, দানিয়ুব কিংবা ভোলগা।

একশ ফুট উচুঁ থেকে মালাক্কা শহর

মালাক্কার আকাশ তখন সন্ধ্যার রঙে ধুয়ে গেছে। ইতিহাস, স্থাপত্য, নদী, মানুষ—সব মিলিয়ে একটি পূর্ণ দিনের সমাপ্তি। তবু কোথাও যেন অসম্পূর্ণতা রয়ে যায়। কারণ, ভ্রমণ শুধু দেখা নয়, অনুভবও। আর কিছু অনুভব বয়ে নিয়ে যেতে হয় নিজের ভেতরেই। বিমানবন্দরের পথে যেতে যেতে মনে হলো মালাক্কা শুধু একটি শহর নয়, এ একসময়ের সেতু; যেখানে দাঁড়িয়ে অতীত আর বর্তমান হাত মেলাচ্ছে নীরবে। (শেষ)
ছবি: লেখক

Read full story at source