পৃথিবীর সর্বোচ্চ স্থান কোনটি, কীভাবে বাস করছে সেখানকার মানুষ

· Prothom Alo

পৃথিবীতে বর্তমানে ৮৩০ কোটি মানুষের বাস। এই বিশাল সংখ্যাক মানুষের মাত্র ৮ কোটির কিছু বেশি মানুষ সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে অন্তত ৮ হাজার ২০২ ফুট উঁচুতে বসবাস করেন। এই উচ্চতায় বসবাসকারী মানুষের বেশির ভাগেরই বাস দক্ষিণ আমেরিকা, মধ্য এশিয়া এবং পূর্ব আফ্রিকায়। বাকিরা বাস করেন সমতলে। পাহাড়ি এলাকায় ঘুরতে গেলে অনেকেরই বুক ধড়ফড়, অল্পতে হাঁপিয়ে ওঠেন কিংবা শ্বাস নিতে কষ্ট হয়। কারণ, সমতলের তুলনায় পাহাড়ি অঞ্চলের বাতাসে অক্সিজেনের পরিমাণ থাকে বেশ কম। সাধারণ মানুষের যেখানে কয়েক দিন থাকতেই দম আটকে আসে, সেখানে বছরের পর বছর ধরে মানুষ কীভাবে এত উঁচুতে বেঁচে আছেন? কেমন তাদের দৈনন্দিন জীবন?

পৃথিবীর সর্বোচ্চ স্থায়ী বসতিগুলোর তালিকা করলে প্রথম দিকে থাকবে চীনের চিংহাই প্রদেশের ওয়েনকুয়ান শহরের নাম। এটি সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ১৫ হাজার ৯৮০ ফুট উঁচুতে অবস্থিত। এর পরেই রয়েছে ভারতের করজোক গ্রাম। এই গ্রামের উচ্চতা সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ১৫ হাজার ফুট।

Visit raccoongame.org for more information.

চীনের চিংহাই প্রদেশের ওয়েনকুয়ান শহর সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ১৫ হাজার ৯৮০ ফুট উঁচুতে অবস্থিত

তবে উচ্চতার দিক থেকে অন্য সব জায়গাকে ছাড়িয়ে গেছে পেরুর আন্দিজ পর্বতমালায় অবস্থিত একটি শহর। দুর্গম ও চরম আবহাওয়ার কারণে একে ডেভিলস প্যারাডাইস নামেও ডাকা হয়। তবে শহরটির আসল নাম লা রিনকোনাদা। এই শহরের প্রায় ৫০ হাজার বাসিন্দা সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ১৬ হাজার ৪০৪ ফুট থেকে ১৭ হাজার ৩৮৮ ফুট উচ্চতার মধ্যে বসবাস করেন। এত উঁচুতে পৃথিবীর আর কোথাও কোনো শহর নেই।

পৃথিবীর শীতলতম স্থান কোনটি?
পৃথিবীর সর্বোচ্চ স্থায়ী বসতিগুলোর তালিকা করলে প্রথম দিকে থাকবে চীনের চিংহাই প্রদেশের ওয়েনকুয়ান শহরের নাম। এটি সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ১৫ হাজার ৯৮০ ফুট উঁচুতে অবস্থিত।

লা রিনকোনাদার জীবনযাত্রা

লা রিনকোনাদা শহরের জীবনযাত্রা অত্যন্ত কঠিন। এখানে ঘরের ভেতরে ব্যবহারের জন্য সুপেয় পানির কোনো লাইন নেই। নেই কোনো আধুনিক পয়োনিষ্কাশন বা ময়লা ফেলার ভালো ব্যবস্থা। পাহাড়ের নিচের অঞ্চল থেকে এখানে প্রতিদিন খাবার নিয়ে আসা হয়। এই দুর্গম পাহাড়ি শহরে ২০০০ সালের পর প্রথম বিদ্যুৎ-সংযোগ দেওয়া হয়েছিল।

বর্তমানে লা রিনকোনাদার বাসিন্দারা সোনার খোঁজেই এই চরম প্রতিকূল পরিবেশে বছরের পর বছর কাটিয়ে দিচ্ছেন

আসলে প্রায় ৬০ বছর আগে এই শহরটি গড়ে উঠেছিল সোনা তোলার একটি অস্থায়ী খনি অঞ্চল হিসেবে। বর্তমানে এখানকার বাসিন্দারা সোনার খোঁজেই এই চরম প্রতিকূল পরিবেশে বছরের পর বছর কাটিয়ে দিচ্ছেন। তবে সোনার খোঁজের এই মূল্য দিতে হচ্ছে জীবন দিয়ে। কারণ, এখানকার বাতাসে অক্সিজেনের চাপ সমতলের চেয়ে প্রায় অর্ধেক।

পৃথিবীর যে জায়গা দেখতে হুবহু মঙ্গল গ্রহের মতো
পাহাড়ের নিচের অঞ্চল থেকে লা রিনকোনাদা শহরে প্রতিদিন খাবার নিয়ে আসা হয়। এই দুর্গম পাহাড়ি শহরে ২০০০ সালের পর প্রথম বিদ্যুৎ-সংযোগ দেওয়া হয়েছিল।

উচ্চতায় শরীর যেভাবে সাড়া দেয়

সমতলে বসবাসকারী কোনো মানুষ যদি হঠাৎ করে লা রিনকোনাদার মতো এত উঁচুতে যান, তবে তার শরীরে প্রথম পরিবর্তন আসবে শ্বাসপ্রশ্বাস ও হৃৎস্পন্দনে। বাতাসে অক্সিজেনের পরিমাণ কম থাকায় সেখানে যাওয়া মাত্র বুক ধড়ফড় করতে শুরু করবে এবং দ্রুত শ্বাস নিতে হবে। কারণ, শরীরের বিভিন্ন অঙ্গে ও কোষে পর্যাপ্ত অক্সিজেন পৌঁছে দিতে তখন ফুসফুস ও হৃৎপিণ্ডকে স্বাভাবিকের চেয়ে অনেক বেশি পরিশ্রম করতে হয়।

যুক্তরাষ্ট্রের ওহাইওতে অবস্থিত কেস ওয়েস্টার্ন রিজার্ভ ইউনিভার্সিটির নৃবিজ্ঞানের অধ্যাপক সিনথিয়া বিল জানান, আপনি যখন সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ১৪ হাজার ৭৬৩ ফুট উঁচুতে পৌঁছাবেন, তখন সমতলের তুলনায় প্রতিবারের নিঃশ্বাসে বাতাসে মাত্র ৬০ শতাংশ অক্সিজেনের অণু পাবেন। বাতাসে অক্সিজেনের এই বড় ঘাটতি মানবদেহের ওপর প্রচণ্ড মানসিক ও শারীরিক চাপ তৈরি করে।

এত উঁচুতে ওঠার পর শুরুতেই রক্তের লোহিত কণিকায় থাকা হিমোগ্লোবিন প্রোটিনের পরিমাণ দ্রুত কমতে শুরু করে। এই হিমোগ্লোবিনের কাজই হলো সারা শরীরে অক্সিজেন বহন করে নিয়ে যাওয়া। উচ্চতা যত বাড়তে থাকে, শরীরের এই সংকট ও নেতিবাচক প্রতিক্রিয়াগুলো তত তীব্র হতে থাকে।

বাতাসে অক্সিজেনের এই কম মাত্রার সঙ্গে শরীর যখন হুট করে মানিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করে, তখন অনেক মানুষের মধ্যেই ‘অ্যাকিউট মাউন্টেন সিকনেস’ বা উচ্চতাজনিত শারীরিক অসুস্থতা দেখা দেয়। হঠাৎ করে বেশি উঁচুতে উঠলে এই সমস্যার কারণে তীব্র মাথাব্যথা, শরীর ছেড়ে দেওয়া বা ক্লান্তি, বমি বমি ভাব এবং খাওয়ার রুচি চলে যাওয়ার মতো নানাবিধ উপসর্গ দেখা দিতে পারে। মূলত কম অক্সিজেনের কারণে ফুসফুস ও মস্তিষ্কে চাপ পড়ায় এমনটি ঘটে।

ভূপৃষ্ঠের সবচেয়ে নিচু জায়গা কোনটি
বাতাসে অক্সিজেনের কম মাত্রার সঙ্গে শরীর যখন হুট করে মানিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করে, তখন অনেক মানুষের মধ্যেই অ্যাকিউট মাউন্টেন সিকনেস বা উচ্চতাজনিত শারীরিক অসুস্থতা দেখা দেয়।

চরম পরিবেশে শারীরিক অভিযোজন

লা রিনকোনাদার মতো চরম উচ্চতায় যাঁরা স্থায়ীভাবে বসবাস করছেন, তাঁদের শরীর এই কম অক্সিজেনের সঙ্গে দারুণভাবে মানিয়ে নিয়েছে। বিশ্বজুড়ে হওয়া বিভিন্ন গবেষণা থেকে স্পষ্ট প্রমাণ মিলেছে, যাঁরা একদম ছোটবেলায় বা বয়ঃসন্ধির আগে থেকেই এমন উঁচুতে বাস করেন, বড় হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তাঁদের ফুসফুসের আকার বা ধারণক্ষমতা সাধারণ মানুষের চেয়ে অনেক বড় হয়ে যায়।

আন্দিজ পর্বতমালায় বসবাসকারী মানুষদের রক্তে সাধারণ মানুষের তুলনায় হিমোগ্লোবিনের ঘনত্ব অনেক বেশি থাকে। এই বাড়তি হিমোগ্লোবিন তাঁদের রক্তকে সমতলের মানুষের চেয়ে বেশ ঘন করে তোলে, যা কম অক্সিজেনযুক্ত পরিবেশেও শরীরকে সচল রাখতে সাহায্য করে।

আন্দিজ পর্বতমালায় বসবাসকারী মানুষদের রক্তে সাধারণ মানুষের তুলনায় হিমোগ্লোবিনের ঘনত্ব অনেক বেশি থাকে

তবে এই বাড়তি সুবিধার একটি বড় নেতিবাচক দিকও রয়েছে। রক্ত অতিরিক্ত ঘন হয়ে যাওয়ার কারণে এখানকার বাসিন্দারা ‘ক্রনিক মাউন্টেন সিকনেস’ নামক একধরনের দীর্ঘমেয়াদি পাহাড়ি রোগে আক্রান্ত হন।

যাঁরা সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ১০ হাজার ফুট বা এর চেয়ে বেশি উঁচুতে বছরের পর বছর বসবাস করেন, তাঁদের শরীরে অতিরিক্ত লোহিত কণিকা তৈরির কারণেই এই রোগটি দেখা দেয়। এর ফলে সারাক্ষণ তীব্র ক্লান্তি, শ্বাসকষ্ট এবং সারা শরীরে প্রচণ্ড ব্যথা-বেদনার মতো সমস্যা হতে থাকে। ধারণা করা হয়, খনি শহর লা রিনকোনাদার প্রতি চারজন বাসিন্দার মধ্যে একজন এই রোগে ভুগছেন।

এভারেস্ট বিশ্বের সবচেয়ে উঁচু পর্বত নয়!
যাঁরা সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ১০ হাজার ফুট বা এর চেয়ে বেশি উঁচুতে বছরের পর বছর বসবাস করেন, তাঁদের শরীরে অতিরিক্ত লোহিত কণিকা তৈরির কারণেই ক্রনিক মাউন্টেন সিকনেস রোগটি দেখা দেয়।

আন্দিজ পর্বতমালার বাসিন্দাদের মতো তিব্বতের পাহাড়ি অঞ্চলের মানুষেরাও তীব্র উচ্চতায় বাস করেন, কিন্তু এক অদ্ভুত কারণে তাঁরা সুরক্ষিত থাকেন। উঁচুতে থাকলেও তিব্বতিদের রক্তে হিমোগ্লোবিনের মাত্রা খুব একটা বাড়ে না, যার ফলে তাঁদের ক্রনিক মাউন্টেন সিকনেস রোগে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকিও থাকে না। অতিরিক্ত লোহিত কণিকা তৈরির বদলে তিব্বতিদের শরীর রক্তনালির ভেতর রক্তের প্রবাহ বা গতি বাড়িয়ে দিয়ে এই কম অক্সিজেনের সঙ্গে চমৎকারভাবে মানিয়ে নিয়েছে।

বিজ্ঞানীরা গবেষণা করে দেখেছেন, তিব্বতিদের এই বিশেষ শারীরিক ক্ষমতার পেছনে রয়েছে ‘ইপিএএস১’ (EPAS1) নামের একটি জিনের মিউটেশন। এই জিনটি মূলত তাঁদের রক্তে হিমোগ্লোবিনের পরিমাণকে প্রয়োজনের চেয়ে বেশি বাড়তে দেয় না। ফলে রক্ত ঘন হয়ে যাওয়ার ভয় থাকে না।

সূত্র: লাইভ সায়েন্সসৌরজগতের শীতলতম স্থান

Read full story at source