আর্জেন্টিনা দলের নাড়িনক্ষত্র: কারও পায়ে ক্লান্তি, কেউ মরিয়া খিদেয়

· Prothom Alo

বিশ্বকাপ তো চলেই এল। মহাযজ্ঞ শুরু হতে বাকি আর মাত্র ৬ দিন। আলজেরিয়ার বিপক্ষে ম্যাচ দিয়ে শিরোপা ধরে রাখার অভিযানে নামবে আর্জেন্টিনা। কিন্তু মাঠের যুদ্ধটা শুরু হওয়ার আগে আর্জেন্টিনার কোচ লিওনেল স্কালোনির মাথায় চলছে নানা হিসাব–নিকাশ। চূড়ান্ত দল সাজানোর আগে স্কালোনির টেবিলের ওপর ছড়ানো কেবল ফুটবলারদের নামের তালিকা নয়, সঙ্গে অনেক গাণিতিক খতিয়ানও। কার পায়ে লেগেছে জং, আর কার শরীর নিংড়ে নিয়েছে ইউরোপীয় ফুটবলের নির্মম ক্লান্তি?

বিশ্বকাপের মঞ্চে নামার আগে কার নামের পাশে কত মিনিটের ক্লান্তি জমেছে, সেই খতিয়ানই এখন আর্জেন্টিনার ডাগআউটের সবচেয়ে বড় থিসিস।

Visit freshyourfeel.com for more information.

চোটের ধাক্কা সামলানো, শুরুর একাদশ চূড়ান্ত করা কিংবা শেষ মুহূর্তের ট্যাকটিক্যাল রদবদল—সব সিদ্ধান্তের পেছনেই একটা বড় ভূমিকা থাকবে ফুটবলারদের ‘প্লেয়িং টাইম’ বা মাঠে কাটানো মিনিটের হিসাব। এই সমীকরণে আলবিসেলেস্তে শিবিরকে স্পষ্ট দুটি ভাগে ভাগ করে ফেলা যায়। একদল মাঠে দৌড়াতে দৌড়াতে ক্লান্তির শেষ সীমায়, অন্য দল চোট কিংবা ডাগআউটের অবহেলায় মাঠে নামার তীব্র ক্ষুধায় ছটফট করছে।  

সদ্য শেষ হওয়া মৌসুমে যাঁদের অনেক বেশি ধকল নিতে হয়েছে, সেই তালিকায় সবার ওপরে জ্বলজ্বল করছে একটি নাম—এনজো ফার্নান্দেজ। চেলসির এই ২৫ বছর বয়সী মিডফিল্ডার সম্ভবত ক্যারিয়ারের সেরা বসন্তটি পেরিয়ে বিশ্বকাপে পা রাখছেন।

আর্জেন্টিনার মিডফিল্ডার এনজো ফার্নান্দেজ

স্ট্যামফোর্ড ব্রিজে নীল জার্সিতে মৌসুমজুড়ে তিনি ছিলেন যেন তুমুল ব্যস্ত। প্রিমিয়ার লিগ, চ্যাম্পিয়নস লিগ কিংবা এফএ কাপ—যেখানেই চেলসি নেমেছে, এনজো ফার্নান্দেজ ছিলেন অবধারিতভাবে। পুরো মৌসুমে ৫৪টি ম্যাচ খেলেছেন, জাল কাঁপিয়েছেন ১৫ বার। আর মাঠের সবুজ ঘাসে কাটিয়েছেন ঠিক ৪,৩৭৯ মিনিট! এই পরিসংখ্যানই বুঝিয়ে দেয় স্কালোনির বোর্ডে কেন তিনি অনিবার্য দাবার ঘুঁটি। তবে এই অতি-ব্যবহার যেন ক্লান্তি হয়ে না নামে, সেই আশঙ্কাই এখন আর্জেন্টাইন সমর্থকদের মনে।

বিশ্বকাপে খেলতে ইরানের ফুটবলারদের ভিসা দিল যুক্তরাষ্ট্র

এই তালিকায় দ্বিতীয় নামটির পাশে বয়স কেবলই একটা সংখ্যা মাত্র। নিকোলাস ওতামেন্দি। বয়স ৩৮ ছুঁয়েছে তো কী হয়েছে? রক্তে এখনো সেই তারুণ্যের তেজ। সদ্যই রিভার প্লেটের সঙ্গে চুক্তি সেরেছেন, খেলবেন বিশ্বকাপের পর। পর্তুগিজ ক্লাব বেনফিকার হয়ে বিদায়ী মৌসুমেও ছিলেন রক্ষণভাগের অতন্দ্রপ্রহরী। চ্যাম্পিয়নস লিগসহ মোট ৪৯টি ম্যাচে মাঠে ছিলেন ৪,৩১৪ মিনিট। কাতার বিশ্বকাপের সেই চেনা ওতামেন্দি এবারও স্কালোনির দুর্গ সামলাতে কি ততটাই ধারালো ও সতেজ থাকবেন?

লাতিন আমেরিকার তীব্র ও ঠাসা সূচির ফুটবল থেকে উঠে আসা হোসে ম্যানুয়েল লোপেজের কথা না বললে এই তালিকা অপূর্ণ থেকে যাবে। পালমেইরাসের শুধু এই বছরেই তিনি এরই মধ্যে ৩৫টি ম্যাচ খেলে ফেলেছেন। ইন্টারে খেলা লাওতারো মার্তিনেজ পুরো মৌসুমে যা খেলেছেন, তার চেয়ে মাত্র ৭ ম্যাচ কম খেলা লোপেজ বিশ্বকাপে স্ট্রাইকার পজিশনের বড় দাবিদার।

অনুশীলনে আর্জেন্টাইন স্ট্রাইকার হোসে ম্যানুয়েল লোপেজ

ক্লান্তির অপর পিঠেই মরচে ধরার গল্প। আতলেতিকো মাদ্রিদের রিজার্ভ বেঞ্চে কাটানো গোলরক্ষক হুয়ান মুসোকে বা দিলে আর্জেন্টিনার স্কোয়াডে সবচেয়ে কম মিনিট খেলে বিশ্বকাপে নামছেন লিসান্দ্রো মার্তিনেজ। ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের এই সেন্ট্রাল ব্যাক স্কালোনির পছন্দের ডিফেন্ডার। কিন্তু গত মৌসুমে বাঁ হাঁটুর অ্যান্টিরিয়র ক্রুসিয়েট লিগামেন্ট ছিঁড়ে যাওয়ায় অনেকটা সময় খেলার বাইরে ছিলেন। সুস্থ হয়ে মাঠে ফিরে মোটে ১৯টি ম্যাচে ১,৩১০ মিনিট খেলার সুযোগ পেয়েছেন। বিশ্বকাপের তীব্র গতির সঙ্গে মানিয়ে নিতে লিসান্দ্রোর এই ম্যাচ-প্র্যাকটিসের অভাব কতটা ভোগাবে, সেটাই চিন্তার বিষয়।

বিশ্বকাপে ভেঙে যেতে পারে যে ৫টি রেকর্ড

এ রকমই আরেকজন জিওভান্নি লো সেলসো। রিয়াল বেতিসের এই ৩০ বছর বয়সী মিডফিল্ডার পেশির চোটের কারণে পুরো ফেব্রুয়ারি ও মার্চ মাস মাঠের বাইরে কাটিয়েছেন। রোজারিও থেকে উঠে আসা এই ফুটবলার এবার বিশ্বকাপে আসছেন ৩২ ম্যাচে মাত্র ১,৭৭৭ মিনিট খেলার অভিজ্ঞতা নিয়ে। কাতার বিশ্বকাপের ঠিক আগে চোটের কারণে ছিটকে যাওয়ার সেই দুঃসহ স্মৃতি ভুলে এবার তাঁর রাজকীয় প্রত্যাবর্তনের পালা।

সবচেয়ে রহস্যময় গল্পটা থিয়াগো আলমাদার। চোট তেমন বড় ছিল না, কিন্তু আতলেতিকো মাদ্রিদে দিয়েগো সিমিওনে তাঁকে কেবলই একজন ‘সুপার সাব’ বা বিকল্প হিসেবে ব্যবহার করেছেন। ৪০ ম্যাচে মাঠে নামলেও নামের পাশে জমেছে মাত্র ১,৭০৪ মিনিট। তবে স্বস্তির কথা হলো, আকাশি-সাদা জার্সিতে যখনই সুযোগ পেয়েছেন, আলমাদা আলো ছড়িয়েছেন। তাই বিশ্বকাপের মঞ্চে শুরুর একাদশের জন্য তিনি জোর লড়াই চালাবেন।

মেসিদের চোখে শিরোপা ধরে রাখার চ্যালেঞ্জ। সময় হলেই বোঝা যাবে সেটা তাঁরা পারবেন কি না

বড় টুর্নামেন্টে নামার আগে কখনো কখনো অতি-ক্লান্তির চেয়ে না খেলার জেদটা বেশি ভয়ংকর হয়ে ওঠে। আর্জেন্টিনার ডাগআউটেও এখন সেই আবহাওয়া। এনজো ফার্নান্দেজের অতি-ব্যবহারের ক্লান্তি বনাম লিসান্দ্রো-লো সেলসোদের মাঠে নামার তীব্র ক্ষুধা—এই দুই বৈপরীত্যের মেলবন্ধন ঘটানোই এখন লিওনেল স্কালোনির আসল পরীক্ষা। আলজেরিয়ার বিপক্ষে প্রথম ম্যাচের বাঁশি বাজার আগে ডাগআউটের এই দাবার চালগুলোই ঠিক করে দেবে আর্জেন্টিনার ভাগ্য।

Read full story at source