ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় ‘বনলতা এক্সপ্রেস’–এর প্রদর্শনী না করতে প্রচার, ক্ষুব্ধ নির্মাতা, সংগঠনের নিন্দা
· Prothom Alo

ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় আগামীকাল শনিবার ‘বনলতা এক্সপ্রেস’ ছবিটির প্রদর্শনী না করতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি পক্ষ প্রচার চালাচ্ছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। বিষয়টি নিয়ে ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন সিনেমাটির নির্মাতা ও প্রযোজক তানিম নূর। এ ছাড়া এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে পুরো ঘটনায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছে চলচ্চিত্র সংস্কার রোডম্যাপ।
Visit saltysenoritaaz.org for more information.
কী হয়েছে
পবিত্র ঈদুল আজহা উপলক্ষে ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় ছবিটির প্রদর্শনীর আয়োজন করে ব্রাহ্মণবাড়িয়া ফিল্ম সোসাইটি। জেলার কওমি ছাত্র ঐক্য পরিষদের শিক্ষার্থীরা সিনেমাটি প্রদর্শন না করার বিষয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে নানা পোস্ট করছেন। এ নিয়ে ফেসবুকে চলছে আলোচনা–সমালোচনা। ব্রাহ্মণবাড়িয়ার শিক্ষার্থীদের সামাজিক সংগঠন ব্রাহ্মণবাড়িয়া ফিল্ম সোসাইটি। সংগঠনটি তানিম নূর পরিচালিত চলচ্চিত্রটির প্রদর্শনীর আয়োজন করে। জেলার বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের স্নাতক শ্রেণিতে অধ্যয়নরত শিক্ষার্থীরা এই সংগঠনের সদস্য। এক বছর ধরে ‘ভাতঘুমের সিনেমা আড্ডা’ শিরোনামে চলচ্চিত্র প্রদর্শন করে আসছিলেন তাঁরা।
কী বললেন নির্মাতা
পুরো বিষয়টি নিয়ে প্রথম আলোর সঙ্গে কথা বলেছেন ‘বনলতা এক্সপ্রেস’ সিনেমার নির্মাতা ও প্রযোজক তানিম নূর। আজ বেলা তিনটার দিকে প্রথম আলোকে বলেন, পুরো ঘটনায় তিনি ক্ষুব্ধ। ঘটনার বিস্তারিত জানিয়ে তিনি বলছিলেন, ‘চার–পাঁচ দিন আগেই আমার ব্রাহ্মণবাড়িয়া ফিল্ম সোসাইটি থেকে আমার সঙ্গে যোগাযোগ করে জানায়, তাঁর সিনেমাটি দেখাতে চায়। আমি খুব খুশি হয়েছিলাম। তারা পোস্টার তৈরি করে আমাকে পাঠিয়েছিল। তাদের বলেছিলাম অন্য কোনো সহযোগিতা লাগলে আমাকে জানাতে। কিন্তু গতকাল ফেসবুকে দেখলাম, বেশ কয়েকজন পোস্ট দিচ্ছে, একটি পক্ষ নাকি বলছে সেখানে সিনেমা নিষিদ্ধ, চালানো যাবে না। বাংলাদেশের আইন অনুযায়ী সেন্সর পাওয়া কোনো ছবি যেকোনো জায়গায় দেখানো যাবে। শুধু সেটাই নয়, সেই সিনেমার প্রদর্শনীতে প্রশাসনও সহায়তা করবে।’
নিজের ক্ষোভ জানিয়ে নির্মাতা আরও বলেন, ‘তারা আমার ছবির পোস্টারে ক্রস চিহ্ন দিয়ে প্রচার করছে, উগ্রবাদী কথাবার্তা বলছে। এটা তো তারা করতে পারে না। ভয়ংকর ব্যাপার, এটা পুরোপুরি বেআইনি। কেউ যদি চলচ্চিত্র সার্টিফিকেশন বোর্ডের সনদ পাওয়া কোনো ছবি নিষিদ্ধের কথা বলে, তার বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া উচিত।’
নির্মাতা তানিম নূরের গ্রামের বাড়িও ব্রাহ্মণবাড়িয়া। তাঁর মা–বাবা দুজনই সেখানকার। সে জন্য এ ঘটনায় গতকাল থেকে তাঁর মন আরও বেশি খারাপ।
আগামীকাল যেন ঠিকভাবে সিনেমাটির প্রদর্শনী হয়, সে জন্য প্রশাসানকে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ারও আহ্বান জানান তিনি। একই সঙ্গে তিনি আশা প্রকাশ করেন, যারা সিনেমাটি প্রদর্শনী না করতে প্রচার চালাচ্ছে, তাদেরও শুভ বুদ্ধির উদয় হবে।
‘বাংলাদেশে তো সিনেমার প্রদর্শনী নিষিদ্ধ নয়। কেবল আমার সিনেমা বলে বলছি না, এসব ঘটনা উদ্বেগজনক। আমি আশা করব, যারা এ রকম বলছে, তাদের শুভ বুদ্ধি উদয় হবে। তারাও তো বাংলাদেশে বসবাস করে তাই না, বাংলাদেশে আইন মেনেই আমাদের সবাইকে বসবাস করতে হবে।’
চলচ্চিত্র সংস্কার রোডম্যাপের উদ্বেগ
আজ দুপুরে চলচ্চিত্র সংস্কার রোডম্যাপ পুরো ঘটনায় তাদের উদ্বেগ জানিয়ে গণমাধ্যমে বিজ্ঞপ্তি দিয়েছে। ‘“বনলতা এক্সপ্রেস” প্রদর্শনী নিষিদ্ধের দাবির তীব্র নিন্দা এবং উগ্র গোষ্ঠী-নিয়ন্ত্রিত সাংস্কৃতিক সেন্সরশিপের বিপজ্জনক নজির প্রসঙ্গে চলচ্চিত্র সংস্কার রোডম্যাপের সতর্কতা’ শিরোনামের বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, ‘সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়া একটি পোস্টে ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় একটি চলচ্চিত্র সংসদের পূর্বনির্ধারিত প্রদর্শনীকে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে উসকানিমূলক হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে। একটি আইনসম্মত ও সনদপ্রাপ্ত শিল্পকর্মের বিরুদ্ধে জনমত গঠন করতে সেখানে সুকৌশলে ধর্মীয় ও সাম্প্রদায়িক আবেগকে ব্যবহার করা হয়েছে। এটি কোনোভাবেই চলচ্চিত্রের সমালোচনা নয়; বরং এটি ভীতি প্রদর্শন, ধর্মীয় অপব্যাখ্যা এবং কৃত্রিম ক্ষোভ সৃষ্টির মাধ্যমে রাষ্ট্রের নিজস্ব প্রাতিষ্ঠানিক প্রক্রিয়াকে পাশ কাটিয়ে বাংলাদেশের জনজীবনে একটি সমান্তরাল ও উগ্র গোষ্ঠী-নিয়ন্ত্রিত সাংস্কৃতিক আচরণবিধি চাপিয়ে দেওয়ার এক নগ্ন অপচেষ্টা।’
বিবৃতিতে আরও বলা হয়, ‘চলচ্চিত্র সংস্কার রোডম্যাপ দীর্ঘদিন ধরে এই মত পোষণ করে আসছে যে একটি সুস্থ জাতীয় চলচ্চিত্র ব্যবস্থা এবং একটি সুস্থ গণতান্ত্রিক সমাজ একে অপরের অবিচ্ছেদ্য অংশ। বাংলাদেশ চলচ্চিত্র সার্টিফিকেশন বোর্ডের প্রক্রিয়া পার হওয়া একটি চলচ্চিত্র এমন একটি আইনি ও প্রাতিষ্ঠানিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে যাচাই ও অনুমোদিত হয়, যা মূলত জনসাধারণের জন্য কী প্রদর্শনযোগ্য তা নির্ধারণ করার জন্যই প্রতিষ্ঠিত। কোনো গোষ্ঠী যখন আইনি বা সংসদীয় বিতর্কের পথে না হেঁটে সামাজিক চাপ, ধর্মীয় বয়ান এবং বিশৃঙ্খলার হুমকির মাধ্যমে এই প্রক্রিয়াকে বাধাগ্রস্ত করে, তখন তারা কেবল একটি চলচ্চিত্রের ওপরই আক্রমণ করে না; বরং তারা সাংস্কৃতিক জীবন পরিচালনায় রাষ্ট্রের আইনি কর্তৃপক্ষের বৈধতাকেই সরাসরি চ্যালেঞ্জ করে। চলচ্চিত্র সংস্কার রোডম্যাপ তার এই অবস্থানে অনড়—যেকোনো চলচ্চিত্রের বিষয়বস্তু নিয়ে গঠনমূলক সমালোচনা, তাত্ত্বিক বিতর্ক বা তীব্র জন-অসন্তোষ কেবল গ্রহণযোগ্যই নয়, বরং তা একটি সচেতন নাগরিক সমাজের স্বাভাবিক ও স্বাস্থ্যকর প্রতিক্রিয়া। কিন্তু দমনের দাবি, নিশ্চিহ্ন করার অপচেষ্টা এবং উগ্র গোষ্ঠী কর্তৃক চাপিয়ে দেওয়া নীরবতা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।’
‘বনলতা এক্সপ্রেস’ সিনেমার পোস্টারচলচ্চিত্রের প্রদর্শনী যেন বাধাগ্রস্ত না হয়, সে জন্য প্রশাসনের প্রতি আহ্বান জানিয়ে বিবৃতিতে আরও বলা হয়, ‘চলচ্চিত্র সংস্কার রোডম্যাপ তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়, বাংলাদেশ চলচ্চিত্র সার্টিফিকেশন বোর্ড এবং ব্রাহ্মণবাড়িয়ার জেলা প্রশাসনের প্রতি আহ্বান জানাচ্ছে—তারা যেন তাদের প্রাতিষ্ঠানিক কর্তৃত্ব নিশ্চিত করে এবং আইনবহির্ভূত কোনো চাপে কোনো সনদপ্রাপ্ত চলচ্চিত্রের প্রদর্শনী যেন বাধাগ্রস্ত না হয়, তা সক্রিয়ভাবে নিশ্চিত করে। এ ধরনের অপতৎপরতার মুখে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর নীরবতা কোনো নিরপেক্ষতা নয়, বরং তা এক প্রকারের নীরব সম্মতি বা যোগসাজশ।’