এবারও সরকারি দামে বিক্রি হচ্ছে না চামড়া

· Prothom Alo

কোরবানির গরুর লবণযুক্ত চামড়ার প্রতি বর্গফুটের দাম গত বছরের চেয়ে এবার ২ টাকা বাড়িয়েছিল সরকার। তবে রাজধানীতে সেই দরে চামড়া বিক্রি হয়নি। উল্টো গত বছরের চেয়ে প্রতিটি ১৫০ থেকে ২০০ টাকা কম দামে বিক্রি হয়েছে। এ ছাড়া এবারও ছাগলের চামড়া কেনায় আগ্রহ দেখাচ্ছেন না ব্যবসায়ীরা।

যদিও বাংলাদেশ থেকে গত দুই বছরে চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য রপ্তানি বেড়েছে। তবু দেশে কাঁচা চামড়ার দাম বাড়েনি। চাহিদা থাকলেও মৌসুমি ও ছোট ব্যবসায়ীরা সরকার নির্ধারিত দাম পাচ্ছেন না।

Visit bettingx.bond for more information.

চামড়ার মৌসুমি ব্যবসায়ী ও আড়তদারদের দাবি, সরকার দাম বাড়ালেও তারা ট্যানারির মালিকদের কাছে বাড়তি দামে চামড়া বিক্রির আশ্বাস পাননি। ট্যানারির মালিকেরা গত বছরের তুলনায় দাম কমিয়ে বলেছেন। এ কারণে তাঁরাও কমে কিনেছেন। যদিও ট্যানারির মালিকদের দাবি, গত বছরের তুলনায় এবার দাম কমেনি, বরং প্রতিটি ৫০-৬০ টাকা বেড়েছে।

ঢাকায় ছোট আকারের কাঁচা চামড়া ৬৫০ থেকে ৮৫০ টাকা, মাঝারি আকারের কাঁচা চামড়া ৯৫০ থেকে দেড় হাজার টাকা এবং বড় আকারের চামড়া ১ হাজার ৫৫০ থেকে ২ হাজার ৩০০ টাকায় বিক্রি হওয়ার কথা। তবে গতকাল এর চেয়ে অনেক কম দামে কাঁচা চামড়া কেনাবেচা হয়েছে।

গতকাল বৃহস্পতিবার পবিত্র ঈদুল আজহার দিন দুপুর থেকে বিকেল পর্যন্ত রাজধানীর মোহাম্মদপুর টাউন হল, ধানমন্ডি, সায়েন্স ল্যাব এবং লালবাগের পোস্তা এলাকায় ঘুরে দেখা যায়, ছোট আকারের গরুর কাঁচা চামড়া প্রতিটি কেনাবেচা হয়েছে ২৫০ থেকে ৪০০ টাকায়। মাঝারি আকারের গরুর কাঁচা চামড়া ৫০০-৬৫০ টাকা এবং বড় আকারের গরুর কাঁচা চামড়া ৭০০-৮০০ টাকা দরে বিক্রি হয়েছে। গত বছর মাঝারি আকারের চামড়ার দাম ছিল ৭০০-৮০০ টাকা। অন্যদিকে ছাগলের চামড়া প্রতিটি বিক্রি হয়েছে ৫ থেকে ১০ টাকায়। গত কয়েক বছরও ছাগলের চামড়ার এমন দাম ছিল।

বাণিজ্য মন্ত্রণালয় প্রতিবছর লবণযুক্ত চামড়ার দাম নির্ধারণ করে দেয়। ১৩ মে খাত-সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গে বৈঠক করে চামড়া দাম নির্ধারণ করেন বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আবদুল মুক্তাদির। এবার ঢাকায় গরুর প্রতি বর্গফুট লবণযুক্ত চামড়ার দাম নির্ধারণ করা হয় ৬২ থেকে ৬৭ টাকা, যা গত বছর ছিল ৬০ থেকে ৬৫ টাকা।

সাধারণত বড় আকারের গরুর চামড়া ৩১-৪০ বর্গফুট, মাঝারি আকারের গরুর চামড়া ২১-৩০ এবং ছোট আকারের গরুর চামড়া ১৬-২০ বর্গফুটের হয়ে থাকে। সে হিসাবে লবণযুক্ত ছোট আকারের একটি চামড়ার দাম ন্যূনতম ৯৯০ থেকে ১ হাজার ২০০ টাকা পর্যন্ত হতে পারে। আর মাঝারি আকারের লবণযুক্ত গরুর চামড়ার দাম হতে পারে ১ হাজার ৩০০ থেকে ১ হাজার ৮৫০ টাকা এবং বড় আকারের লবণযুক্ত গরুর চামড়া ১ হাজার ৯০০ থেকে ২ হাজার ৬০০ টাকা পর্যন্ত হতে পারে।

রাজধানীর মোহাম্মদপুর টাউন হল, ধানমন্ডি, সায়েন্স ল্যাব এবং লালবাগের পোস্তা এলাকায় ঘুরে দেখা যায়, ছোট আকারের গরুর কাঁচা চামড়া প্রতিটি কেনাবেচা হয়েছে ২৫০ থেকে ৪০০ টাকায়। মাঝারি আকারের গরুর কাঁচা চামড়া ৫০০-৬৫০ টাকা এবং বড় আকারের গরুর কাঁচা চামড়া ৭০০-৮০০ টাকা দরে বিক্রি হয়েছে।

সরকার লবণযুক্ত চামড়ার দাম নির্ধারণ করলেও কোরবানি ঈদের দু-তিন দিন ব্যবসায়ীরা সাধারণত কাঁচা চামড়া কিনে থাকেন। একেকটি কাঁচা চামড়া প্রক্রিয়াজাত করতে লবণ ও শ্রমিকের মজুরি বাবদ খরচ হয় গড়ে ৩৫০ টাকা। সে হিসাবে ঢাকায় ছোট আকারের কাঁচা চামড়া ৬৫০ থেকে ৮৫০ টাকা, মাঝারি আকারের কাঁচা চামড়া ৯৫০ থেকে দেড় হাজার টাকা এবং বড় আকারের চামড়া ১ হাজার ৫৫০ থেকে ২ হাজার ৩০০ টাকায় বিক্রি হওয়ার কথা। তবে গতকাল এর চেয়ে অনেক কম দামে কাঁচা চামড়া কেনাবেচা হয়েছে।

কাঁচা চামড়ার দাম কেন কম তা জানতে চাইলে বাণিজ্যসচিব (রুটিন দায়িত্ব) মো. আবদুর রহিম খান গতকাল রাতে প্রথম আলোকে বলেন, আমরা কোরবানির পরে দ্রুত চামড়ায় লবণ দিতে উৎসাহ দিই। লবণ ছাড়া চামড়ার দাম একটু কমেই বিক্রি হয়ে থাকে। তবে লবণযুক্ত চামড়া সরকার নির্ধারিত দামেই বিক্রি হবে বলে আশা করছি।

ফারুক হোসেন প্রথম আলোকে বলেন, গত বছর এই মানের চামড়া ৮০০-৯০০ টাকায় বিক্রি করেছিলাম। এবার দাম কম; ৭৫০ টাকা হলেও ছেড়ে দিতাম। কিন্তু ৬৫০ টাকার ওপরে কেউ দাম বলছে না।

মানা হয় না সরকারি দাম

সর্বশেষ ২০১৩ সালে কোরবানির পশুর চামড়ার দাম বেশি ছিল। সেবার গরুর চামড়ার দাম ছিল বর্গফুট প্রতি ৮৫-৯০ টাকা। এর পর থেকে বিভিন্ন কারণে চামড়ার দাম ধারাবাহিকভাবে কমতে থাকে। ২০১৯ সালে কোরবানির পশুর চামড়ার দামে বড় ধস নামে। ন্যূনতম দাম না পেয়ে দেশের অনেক এলাকায় চামড়া সড়কে ফেলে ও মাটিতে পুঁতে ফেলার ঘটনা ঘটে। তাতে প্রায় ২৪২ কোটি টাকার চামড়ার নষ্ট হয়। পরের বছর বর্গফুটপ্রতি দাম কমে ৩৫-৪০ টাকায় দাঁড়ায়। এরপর গত পাঁচ বছর সরকার নির্ধারিত দাম অল্প অল্প করে বাড়লেও কোনোবারই সেই দামে কোরবানির চামড়া বিক্রি হয়নি।

জানতে চাইলে পোস্তা এলাকায় কাঁচা চামড়ার আড়তদারদের সংগঠন বাংলাদেশ হাইড অ্যান্ড স্কিন মার্চেন্ট অ্যাসোসিয়েশনের (বিএইচএসএমএ) সভাপতি মো. টিপু সুলতান অবশ্য দাবি করেছেন, সরকারের বেঁধে দেওয়া দামের মধ্যেই বেশির ভাগ বেচাকেনা হয়েছে। তিনি বলেন, ‘আমরা তো চোখের দেখায় কাঁচা চামড়া কিনি। এ জন্য দামে ৫০ টাকা কমবেশি হতে পারে।

এ বছর কাঁচা চামড়ার দাম কমেনি বলে দাবি করেছেন বাংলাদেশ ট্যানার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিটিএ) সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান মো. সাখাওয়াত উল্লাহও। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ‘গত বছরের তুলনায় এবার ২০-৫০ টাকা বেশি রয়েছে। আমি নিজেই ৬৫০ থেকে ৯৫০ টাকা পর্যন্ত দামে চামড়া কিনেছি।’

সরেজমিন যা দেখা গেল

তবে সরেজমিন সরকার নির্ধারিত দামে চামড়া বিক্রি করতে দেখা যায়নি। আট বছর ধরে কোরবানি ঈদের সময় চামড়ার ব্যবসা করেন ফারুক হোসেন। গতকাল বৃহস্পতিবার বেলা দুইটায় কলাবাগান এলাকা থেকে ছোট ও মাঝারি মিলিয়ে গরুর ১৫টি চামড়া নিয়ে ধানমন্ডির ল্যাবএইড হাসপাতালের সামনের সড়কে আসেন ফারুক। সেখানে উপস্থিত ব্যাপারী মো. রুবেলের কাছে প্রতিটির জন্য ১ হাজার টাকা করে দাম চান তিনি। কিন্তু ব্যাপারী তাঁকে ৬৫০ টাকা করে দিতে চান। ফারুক তখন দাম কমিয়ে ৮০০ টাকা বললেও ব্যাপারী আর দাম বাড়াতে রাজি হননি। পরে সেখানে চামড়া বিক্রি না করে সামনে এগিয়ে যান ফারুক।

ওই সময় সায়েন্স ল্যাবরেটরি মোড়ে একটি ট্যানারির কর্মীরা কাঁচা চামড়া সংগ্রহ করছিলেন। ফারুক সেখানে গিয়ে প্রতিটি চামড়ার দাম ৮০০ টাকা করে চান। কিন্তু ট্যানারির কর্মীরা ৬০০ টাকা দাম বলেন। এখানেও বনাবনি না হওয়ায় ফারুক অন্যত্র চলে যান।

মো. শাহজাহানএবার চামড়ার দাম একটু কম। ট্যানারির মালিকেরা আমাদের বলেছেন, গত বছরের তুলনায় বিভিন্ন ধরনের রাসায়নিকের দাম ও উৎপাদন খরচ বেড়েছে। এ কারণে তাঁরা ৬০০-৭০০ টাকার বেশি রেট (দাম) দেবেন না। এ জন্য আমরাও গত বছরের তুলনায় ১০০-১৫০ টাকা কমে কাঁচা চামড়া কিনছি। তাতে শেষ পর্যন্ত প্রতিটিতে ৫০-৬০ টাকা করে লাভ থাকতে পারে।

জানতে চাইলে ফারুক হোসেন প্রথম আলোকে বলেন, গত বছর এই মানের চামড়া ৮০০-৯০০ টাকায় বিক্রি করেছিলাম। এবার দাম কম; ৭৫০ টাকা হলেও ছেড়ে দিতাম। কিন্তু ৬৫০ টাকার ওপরে কেউ দাম বলছে না।

রাজধানীর কলাবাগান এলাকায় গতকাল চামড়া কিনছিলেন মো. শাহজাহান। তিনি মৌসুমি ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে চামড়া কিনে তা ট্যানারিতে সরবরাহ করেন। গতকাল তিনি ৬৫০ টাকা গড় দামে বেশির ভাগ চামড়া কেনেন। প্রথম আলোকে শাহজাহান বলেন, ‘এবার চামড়ার দাম একটু কম। ট্যানারির মালিকেরা আমাদের বলেছেন, গত বছরের তুলনায় বিভিন্ন ধরনের রাসায়নিকের দাম ও উৎপাদন খরচ বেড়েছে। এ কারণে তাঁরা ৬০০-৭০০ টাকার বেশি রেট (দাম) দেবেন না। এ জন্য আমরাও গত বছরের তুলনায় ১০০-১৫০ টাকা কমে কাঁচা চামড়া কিনছি। তাতে শেষ পর্যন্ত প্রতিটিতে ৫০-৬০ টাকা করে লাভ থাকতে পারে।’

পোস্তায়ও দাম কম

পুরান ঢাকার লালবাগ বালুর মাঠ থেকে পোস্তা পর্যন্ত কাঁচা চামড়া কেনাবেচার আরেকটি এলাকা। পোস্তার আড়তগুলো কাঁচা চামড়া প্রক্রিয়াজাতকরণের বড় জায়গা। গতকাল বিকেলে এ এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, সেখানে বড় ও মাঝারি আকারের গরুর কাঁচা চামড়া সর্বোচ্চ ৫০০-৭০০ টাকায় বিক্রি হয়েছে। অর্থাৎ সায়েন্স ল্যাবরেটরি এলাকার চেয়ে কম দামে পোস্তা এলাকায় কাঁচা চামড়া বিক্রি হয়েছে। আর ছোট আকারের গরুর চামড়া পোস্তার অনেক আড়ত কিনতে চায়নি। কেউ নিলেও ২৫০-৩০০ টাকার বেশি দাম দেয়নি। গত বছর পোস্তায় মাঝারি ও বড় চামড়ার দাম ছিল ৭০০-৯০০ টাকা।

গতকাল বিকেলে লালবাগ বালুর মাঠের সামনে কথা হয় উত্তরার নুরুল কোরআন মাদ্রাসার অধ্যক্ষ আবদুল কাদেরের সঙ্গে। তিনি প্রায় দেড় শটি কাঁচা চামড়া বিক্রির জন্য এনেছেন। কিন্তু ব্যাপারীরা কেউ এসব চামড়ার দাম ৫৫০ টাকার বেশি বলছেন না।

আবদুল কাদের বলেন, ‘গাড়ি ভাড়া করে এতগুলো চামড়া এনেছি। এগুলো তো ফেরত নেওয়া যাবে না। যা দাম পাই তাতেই বাধ্য হয়ে ছেড়ে (বিক্রি) দিতে হবে।’ গত বছর এ ধরনের চামড়া সাড়ে ৭০০ টাকায় বিক্রি করেছিলেন জানিয়ে তিনি বলেন, সরকার শুধু দাম ঘোষণা করে বসে আছে। বাজার তদারকি থাকলে চামড়ার দামে এমন পতন হতো না।

ঢাকার বাইরেও দাম কম

ঢাকার বাইরের বিভিন্ন এলাকাতেও সরকার নির্ধারিত দামের চেয়ে অনেক কমে কোরবানির পশুর চামড়া বিক্রির খবর পাওয়া গেছে। যেমন চট্টগ্রামে প্রতিটি চামড়া ২০০ থেকে ৬০০ টাকার মধ্যে বিক্রি হয়েছে। তবে বেশির ভাগ মৌসুমি বিক্রেতা ৩৫০ টাকার বেশি দাম পাননি বলে জানিয়েছেন।

গতকাল চট্টগ্রাম নগরের চৌমুহনী এলাকায় অস্থায়ী চামড়ার বাজারে কথা হয় মৌসুমি বিক্রেতা মোহাম্মদ দিদার হোসেনের সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত ঘুরে ৪০টি চামড়া সংগ্রহ করেছি। প্রতিটির দাম গড়ে ৪০০ টাকা পড়েছে। এর সঙ্গে রয়েছে গাড়িভাড়া। কিন্তু চৌমুহনী এসে ১৫০-২০০ টাকার বেশি কেউ দাম দিতে চাইছে না।

সাভারে অবস্থিত চামড়াশিল্প নগরে ঢাকা ও আশপাশের এলাকা থেকে গরুর কাঁচা চামড়া নিয়ে আসেন মৌসুমি ব্যবসায়ীরা। সেখানেও গতকাল ৩০০ থেকে ৫০০ টাকার মধ্যে বেশির ভাগ চামড়া বিক্রি হয়েছে। ধামরাইয়ের একটি মাদ্রাসা থেকে ৫০টি চামড়া আনেন মুফতি মোহাম্মদ আবুল হাসান শাহ্জলি। তিনি বলেন, ‘এখানে চামড়ার দাম কেউ ৪০০ টাকা, কেউ ৩০০ টাকা বলছেন। গত বছর এ চামড়া ৮০০ থেকে ৯০০ টাকায় বিক্রি করেছিলাম।’

সরবরাহ কিছুটা কম

গত বছরের তুলনায় কাঁচা চামড়ার সরবরাহ কমার কথাও জানিয়েছেন কেউ কেউ। প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের তথ্যানুসারে, এ বছর কোরবানির পশুর চাহিদা প্রায় ১ কোটি ১ লাখ ৬ হাজার। সেখানে গরু-ছাগলসহ কোরবানির জন্য প্রস্তুত ছিল প্রায় ১ কোটি ২৩ লাখ ৩৪ হাজার পশু। যদিও কত পশু কোরবানি হয়েছে, সে হিসাব পাওয়া যায়নি। অর্থনৈতিক চাপের কারণে এবার কোরবানি কম হতে পারে—এমন ধারণা আগে থেকে করছিলেন ট্যানারির মালিকেরা। এ জন্য তাঁরা সব মিলিয়ে ৭৫ থেকে ৮০ লাখ চামড়া সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেন। গতবার এই লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৮০ থেকে ৮৫ লাখ।

রাজধানীর টাউন হল বাজারে গতকাল বেলা একটায় কথা হয় মৌসুমি ব্যবসায়ী উমায়ের হোসেনের সঙ্গে। তিনি বলেন, এবার চামড়ার সরবরাহ কিছুটা কম বলে মনে হচ্ছে। সকাল থেকে এ পর্যন্ত মাত্র ২৩টা চামড়া কিনতে পেরেছি। গত বছর এই সময়ে দেড় শর বেশি চামড়া কেনা হয়েছিল। উমায়েরের ধারণা, এ বছর পশু কোরবানি কিছুটা কম হয়ে থাকতে পারে।

মূল সমস্যা চামড়াশিল্প নগরে

কাঁচা চামড়ার দাম না বাড়লেও বাংলাদেশ থেকে চামড়া ও চামড়াজাত পণ্যের রপ্তানি টানা দ্বিতীয় বছরের মতো বেড়েছে। রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরো (ইপিবি) তথ্যানুযায়ী, চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম ১০ মাসে (জুলাই-এপ্রিল) ৯৯ কোটি ডলারের চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য রপ্তানি হয়েছে। এই রপ্তানি গত অর্থবছরের তুলনায় প্রায় ৬ শতাংশ বেশি। গত অর্থবছর ১১৫ কোটি ডলারের চামড়া ও চামড়া পণ্য রপ্তানি হয়েছিল। তবে রপ্তানি আয় আরও বাড়তে পারত।

চামড়া খাতের ব্যবসায়ীরা বলছেন, হেমায়েতপুরের চামড়াশিল্প নগরের দূষণ বন্ধ না হওয়ায় ইউরোপ-আমেরিকার বিশ্বখ্যাত ব্র্যান্ড ও ক্রেতা প্রতিষ্ঠানগুলো সরাসরি বাংলাদেশি চামড়া কিনছে না। ফলে বাংলাদেশি চামড়ার বড় ক্রেতা বর্তমানে চীনারা। তারা মূল্য কম দেয়। এ কারণে দেশে কাঁচা চামড়ার দাম বাড়ছে না।

রাজধানীর হাজারীবাগ থেকে চামড়াশিল্পকে দূষণমুক্ত পরিকল্পিত শিল্পনগরে স্থানান্তরের জন্য ২০০৩ সালে একটি প্রকল্প নেয় সরকার। ২১ বছরেও এই চামড়াশিল্প নগরকে পরিবেশবান্ধব হিসেবে গড়ে তোলা যায়নি। সাভারের হেমায়েতপুরের ২০০ একর জমিতে গড়ে ওঠা এই চামড়াশিল্প নগরের কেন্দ্রীয় বর্জ্য শোধনাগার (সিইটিপি) পুরোপুরি কার্যকর না হওয়ায় পাশের ধলেশ্বরী নদী দূষণের শিকার হচ্ছে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উন্নয়ন অধ্যয়ন বিভাগের অধ্যাপক এবং বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান রিসার্চ অ্যান্ড পলিসি ইন্টিগ্রেশন ফর ডেভেলপমেন্টের (র‌্যাপিড) নির্বাহী পরিচালক মো. আবু ইউসুফ প্রথম আলোকে বলেন, ‘দেশে চামড়া খাতের সমস্যা কী, আর সমাধান কী—তা আমরা ভালো করে জানি। মূল দুর্বলতা হলো বহু বছরেও এসব সমস্যা সমাধানে কার্যকর কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি।’

মাত্র দুই বছরের একটি সময়নির্দিষ্ট পরিকল্পনা নিলে চামড়া খাত সম্পূর্ণ ঘুরে দাঁড়াতে পারবে বলে মনে করেন আবু ইউসুফ। তিনি বলেন, ‘সিইটিপি ঠিক করা ও পৃথক ইটিপি স্থাপনের মাধ্যমে চামড়াশিল্প নগরের ১৫-২০টি চালু কারখানাকে লেদার ওয়ার্কিং গ্রুপের (এলডব্লিউজি) সনদ নেওয়া গেলে এ খাতে ১ হাজার থেকে ১ হাজার ২০০ কোটি ডলার রপ্তানি আয় সম্ভব। সেটি হলে কাঁচা চামড়ার দাম এমনিতেই বাড়বে।’

Read full story at source