আইনি ও কাঠামোগত বাধা দূর করা জরুরি

· Prothom Alo

বিশ্বজুড়ে গণমাধ্যমের স্বাধীনতা ২৫ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে আসার উদ্বেগজনক খবরটি আমাদের আরও একবার মনে করিয়ে দেয়, স্বাধীনভাবে গণমাধ্যমের ভূমিকা পালন করা বর্তমানে কতটা কঠিন হয়ে পড়েছে। অথচ মুক্ত ও স্বাধীন গণমাধ্যম শুধু গণতন্ত্রের জন্য অপরিহার্য উপাদান নয়; একটি দেশের অর্থনৈতিক উন্নতির জন্যও গুরুত্বপূর্ণ নিয়ামক।

দেশে দেশে অগণতান্ত্রিক সরকার এবং নানা স্বার্থবাদী গোষ্ঠী সাংবাদিকতাকে যখন অপরাধ হিসেবে গণ্য করছে—এ রকম একটি বাস্তবতায় আজ ৩ মে বিশ্বজুড়ে মুক্ত গণমাধ্যম দিবস পালিত হচ্ছে। বাংলাদেশের জন্য এদিনের তাৎপর্য আরও গভীর। কেননা, গত ১২ ফেব্রুয়ারি একটি পরিচ্ছন্ন ও শান্তিপূর্ণ নির্বাচনের মধ্য দিয়ে আমাদের গণতান্ত্রিক উত্তরণযাত্রা শুরু হয়েছে।

Visit extonnews.click for more information.

এই আশাবাদের মধ্যেই বড় উদ্বেগের জায়গাটি হলো, বৈশ্বিক গণমাধ্যমের স্বাধীনতা সূচকে তিন ধাপ পিছিয়েছে বাংলাদেশ। সাংবাদিকদের অধিকার নিয়ে কাজ করা প্যারিসভিত্তিক আন্তর্জাতিক সংগঠন রিপোর্টার্স সানস ফ্রন্টিয়ার্স (আরএসএফ) জানাচ্ছে, ২০২৫ সালে ১৮০ দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ছিল যেখানে ১৪৯তম, সেখানে ২০২৬ সালে তা নেমে দাঁড়িয়েছে ১৫২তম। দক্ষিণ এশিয়ার প্রতিবেশী দেশগুলোর মধ্যে ভারত ও পাকিস্তানের সূচক বাংলাদেশ থেকে খারাপ হলেও নেপাল, শ্রীলঙ্কা ও ভুটানের সূচক ভালো।

১৯৭১ সালে স্বাধীনতার পর থেকে যে সরকারই ক্ষমতায় থাকুক না কেন, সবাই সংবাদমাধ্যমের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছে। আওয়ামী লীগ সরকারের সাড়ে ১৫ বছরের শাসনামলে কিছু ব্যতিক্রম বাদে সংবাদমাধ্যমকে দলীয়করণের মাধ্যমে সরকারি প্রচারযন্ত্রে পরিণত করা হয়েছিল। সেন্সরশিপ, নিবর্তনমূলক আইন, সামরিক গোয়েন্দা সংস্থার চাপ, বিচারিক হয়রানির মধ্য দিয়ে সাংবাদিকদের নানাভাবে হয়রানি করা হয়েছিল।

অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে সংবাদমাধ্যমের ওপর সরকারি চাপ কমলেও মব সহিংসতা এবং অনলাইনে উগ্রপন্থীসহ বিভিন্ন গোষ্ঠীর সহিংসতার হুমকি ও চাপ গণমাধ্যমের স্বাধীনতাকে সংকুচিত করে ফেলে। এর ধারাবাহিকতায় গত বছরের ১৮ ডিসেম্বর প্রথম আলো ডেইলি স্টার কার্যালয়ে সন্ত্রাসী হামলা হয়, যা বাংলাদেশের সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতার ইতিহাসের অন্যতম কলঙ্কময় অধ্যায়।

 আরএসএফের প্রতিবেদন বলছে, যেসব গণমাধ্যম হাসিনা সরকারের সমর্থক ছিল, অন্তর্বর্তী সরকারের সমালোচনা থেকে তারা বিরত ছিল। এই কাঠামোগত সংকটই বাংলাদেশের গণমাধ্যমের স্বাধীন বিকাশের পথে বড় বাধা। এ ছাড়া অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে ১৩০ জনের বেশি সাংবাদিকের বিরুদ্ধে হত্যা ও মানবতাবিরোধী অপরাধের মতো গুরুতর অপরাধের অভিযোগ এনে মামলা করা হয়েছে। কয়েকজন সাংবাদিককে মাসের পর মাস আটক রাখা হয়েছে। ফলে বাংলাদেশের গণমাধ্যমের স্বাধীনতার সংকট কোনো একক কারণে তৈরি হয়নি। অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে গণমাধ্যম সংস্কার কমিশনের প্রতিবেদনে এটি স্পষ্ট করে উল্লেখ করা হয়েছে।

আমরা মনে করি, আরএসএফের সম্পাদকীয় পরিচালক অ্যান বোকান্দে ‘তথ্যের অধিকারের ওপর হামলা এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি বৈচিত্র্যপূর্ণ ও সূক্ষ্ম উপায়ে হচ্ছে’ বলে যে মন্তব্য করেছেন, সেটা বাংলাদেশের গণমাধ্যমের জন্য অনেক বেশি প্রাসঙ্গিক। বাংলাদেশ গণতান্ত্রিক পথে যাত্রা শুরু করলেও সংবাদমাধ্যম ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা রুদ্ধ করা যায়, এমন নিবর্তনমূলক আইন বহাল রয়েছে।

ব্যবসা-বাণিজ্য ও বিজ্ঞাপনী আয়ের বাজার সংকুচিত হয়ে পড়ায় বাংলাদেশের গণমাধ্যম এমনিতেই বড় একটা সংকটকাল পার করছে। এরপর আবার অনিয়ন্ত্রিত অনলাইন মাধ্যম গণমাধ্যমের ওপর নাগরিকদের আস্থার সংকট তৈরি করছে। অপতথ্য ও গুজব স্বাধীন গণমাধ্যম ও গণতন্ত্রের বিকাশের পথে অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বাংলাদেশের ভঙ্গুর গণতন্ত্রকে প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তির ওপর দাঁড় করাতে হলে সংবাদমাধ্যমের ওপর চেপে বসা নিবর্তনমূলক আইনগুলো বাতিল করা জরুরি। একই সঙ্গে কাঠামোগত সীমাবদ্ধতা অতিক্রমে সহায়ক পরিবেশ সৃষ্টি করাও প্রয়োজন।

এবারের মুক্ত গণমাধ্যম দিবসের প্রতিপাদ্য আমাদের স্মরণ করিয়ে দিচ্ছে শান্তিপূর্ণ ভবিষ্যৎ নির্মাণে মুক্ত গণমাধ্যমের ভূমিকা কতটা অপরিহার্য। আমরা মনে করি, একমাত্র গণতান্ত্রিক শাসনই মুক্ত গণমাধ্যমের বিকাশকে নিশ্চিত করতে পারে।

Read full story at source