রাজশাহীতে কলেজে ঢুকে নারী শিক্ষককে মারধর করা বিএনপির কর্মীর নামে আছে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা

· Prothom Alo

রাজশাহীতে গত বৃহস্পতিবার স্থানীয় মৎস্য ব্যবসায়ী ও বিএনপি কর্মী কলেজে ঢুকে একজন নারী শিক্ষককে জুতাপেটা করেন। ওই মৎস্য ব্যবসায়ীর বিরুদ্ধে আগে থেকেই গ্রেপ্তারি পরোয়ানা রয়েছে। তিনি পরোয়ানা মাথায় নিয়েই কলেজে ঢুকে নারী শিক্ষককে মারধর করেন। এরপর গতকাল শুক্রবার পর্যন্ত তিনি প্রকাশ্যে ঘুরে বেড়িয়েছেন, সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেছেন। পুলিশ তাঁকে গ্রেপ্তার করেনি।

Visit tr-sport.bond for more information.

ঘটনাটি রাজশাহীর দুর্গাপুর উপজেলার জয়নগর ইউনিয়নের দাওকান্দি সরকারি কলেজে। একই সময়ে কলেজে আরও একদল বিএনপি নেতা–কর্মীর সঙ্গে ওই নারী শিক্ষকের ঝামেলা হয়। একটি তাফসির মাহফিলের আমন্ত্রণ জানাতে ও কলেজ মাঠটি দুই রাতের জন্য গ্যারেজ হিসেবে ব্যবহার করার জন্য অধ্যক্ষের কাছে গিয়েছিলেন বিএনপির নেতা–কর্মীরা। তাঁদের মধ্যে ছিলেন ইউনিয়ন কৃষক দলের সভাপতি জয়নাল আবেদীন, ইউনিয়নের ২ নম্বর ওয়ার্ড বিএনপির সাবেক সভাপতি আফাজ উদ্দিন, ৪ নম্বর ওয়ার্ড বিএনপির সভাপতি এজদার আলী। তাঁদের নেতৃত্বে ছিলেন তাফসির মাহফিলের আয়োজক কমিটির সভাপতি আবদুস সামাদ।

নারী শিক্ষককে জুতাপেটার ঘটনা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে ও গণমাধ্যমে খবর প্রকাশিত হলে বিএনপির পক্ষ থেকে শুক্রবারই জয়নগর ইউনিয়ন বিএনপির সহসভাপতি আকবর আলীকে বহিষ্কার করা হয়। এর প্রতিবাদে আজ শনিবার দুপুরে রাজশাহীর একটি রেস্তোরাঁয় স্থানীয় বাসিন্দাদের ব্যানারে একটি সংবাদ সম্মেলনে আবদুস সামাদ, কৃষক দল নেতা জয়নাল আবেদিন, ওয়ার্ড বিএনপি নেতা আফাজ উদ্দিন ও এজদার আলী উপস্থিত ছিলেন। কিন্তু সেখানে নারী শিক্ষককে জুতাপেটা করা বিএনপি কর্মী ও মৎস্য ব্যবসায়ী শাহাদাত আলীকে দেখা যায়নি। উপস্থিত বিএনপি নেতা–কর্মীরা বলেন, শাহাদাত আলী অসুস্থ। তাঁর হাটে রিং পরানো রয়েছে। এ জন্য তিনি উপস্থিত হতে পারেননি।

রাজশাহীতে কলেজে ঢুকে নারী শিক্ষককে মারধরের ঘটনায় বিএনপি নেতা বহিষ্কারশাহাদাত আলী

তবে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে যে একটি হিমাগার থেকে ঋণ নিয়ে সেই টাকা মেরে দেওয়ার অভিযোগে তাঁর বিরুদ্ধে হিমাগার কর্তৃপক্ষ আদালতে মামলা করে। সেই মামলায় তাঁর বিরুদ্ধে অনেক আগেই গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি হয়েছে। এই গ্রেপ্তারি পরোয়ানা মাথায় নিয়েই শাহাদাত আলী গত বৃহস্পতিবার কলেজ অধ্যক্ষের কার্যালয়ে এসেছিলেন। সেখানে কলেজের প্রদর্শক আলিয়া খাতুন হীরার সঙ্গে তর্কে জড়িয়ে পড়েন।

আলিয়া খাতুন গণমাধ্যমে দাবি করেছেন, শাহাদাত আলী তাঁকে আপত্তিকর এবং বাজে কথা বলেছেন, তাঁর পরিপ্রেক্ষিতেই তিনি তাঁকে থাপ্পড় মেরেছেন। সঙ্গে সঙ্গে পা থেকে জুতা খুলে শাহাদাত আলী তাঁকে বেধড়ক পিটিয়েছেন, চুল ধরে টানাহেঁচড়া করেছেন। খবর পেয়ে শাহাদাত আলীর ছেলে লিটন ও তাঁর কর্মচারী মাহবুব কলেজে এসে তাঁদের ওপর দ্বিতীয় দফা হামলা করেন। এ সময় জাতীয় জরুরি সেবা নম্বর ৯৯৯ ফোন করার পর পুলিশ আসে। পরিস্থিতি শান্ত করে পুলিশ চলে যাওয়ার পর আবার ৪০–৫০ জন বিএনপি নেতা–কর্মী দল বেঁধে কলেজ কার্যালয়ে হামলা ভাঙচুর এবং অধ্যক্ষ ও আলিয়া খাতুনকে মারধর করেন। এরপর কলেজের অধ্যক্ষ আবদুর রাজ্জাক ও আলিয়া খাতুন রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসা নেন।

তৃতীয় দফা হামলার সময় ওই কলেজে স্নাতক পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হচ্ছিল। বেলা দুইটা থেকে মার্কেটিং ও ইসলামিক স্টাডিজ বিষয়ের পরীক্ষা ছিল। ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করেই হামলাকারীরা কলেজের সীমানার ভেতরে ঢুকে পড়েন। কলেজের একজন শিক্ষক বলেন, শাহাদাত আলী কলেজের পুকুর ইজারা নিয়ে আওয়ামী লীগের সময় থেকেই টাকাপয়সা দেন না। তিনি একটা হিমাগার থেকে মোটা অঙ্কের ঋণ নিয়ে সেই টাকা মেরে দিয়েছেন। এ ব্যাপারে হিমাগার কর্তৃপক্ষ তার নামে মামলা করেন। সেই মামলায় তাঁর বিরুদ্ধে আদালত থেকে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি হয়েছে।

এ ব্যাপারে শুক্রবার মুঠোফোনে শাহাদাত আলীর সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, আওয়ামী লীগের আমলে তাঁর টাকাপয়সা পরিশোধ করা আছে। ৫ আগস্ট সরকার পরিবর্তনের পর সব এলোমেলো থাকার কারণে টাকা দেওয়া হয়নি। তিনি ওই টাকার হিসাব–নিকাশ করার জন্যই কলেজে এসেছিলেন। তার আগেই তাফসির মাহফিলের চিঠি দিতে যাওয়া লোকজনের সঙ্গে প্রদর্শক আলিয়া খাতুন দুর্ব্যবহার করেছেন এবং একজনকে চড়ও দিয়েছেন। এই পরিস্থিতির মধ্যে তিনি অধ্যক্ষের কার্যালয়ে গিয়ে বলেন, ‘এই পরিস্থিতির মধ্যে কথা বলার পরিবেশ নাই। আমি না হয় পরের একদিন আসি।’

রাজশাহীতে সেই কলেজের অধ্যক্ষ ও নারী শিক্ষককে উল্টো অপসারণের দাবি

শাহাদাত আলী বলেন, ‘অধ্যক্ষ মহোদয় বিষয়টি আন্তরিকভাবে নিলেন কিন্তু পাশ থেকে আলিয়া বলে ওঠেন, “তুই ওদের সঙ্গে করে নিয়ে এসেছিস, তুই কিসের বিএনপি নেতা?”’ শাহাদত আলী দাবি করেন, এ কথা বলার পরই আলিয়া তাঁর গালে একটা থাপ্পড় মারেন। তখন তিনি পা থেকে স্যান্ডেল খুলে তাঁকে মেরেছেন। এরপর চলে এসেছেন।
আজ সংবাদ সম্মেলনে তাঁকে না পেয়ে শাহাদাত আলীর মুঠোফোনে যোগাযোগ করলে ফোনটি বন্ধ পাওয়া যায়। তাঁর বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা আছে কি না—বিষয়টি নিশ্চিত হওয়ার জন্য দুর্গাপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা পঞ্চনন্দ সরকারের কাছে জানতে চাইলে বলেন, শাহাদাত আলী নামে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা খুঁজে পেয়েছেন এবং তামিল করার জন্য সঙ্গে সঙ্গে পুলিশ পাঠিয়েছেন।

অবশ্য তার আগে বিষয়টি রাজশাহী জেলা পুলিশের মুখপাত্র অতিরিক্ত পুলিশ সুপার সাবিনা ইয়াসমিনকে জানানো হয়। তিনি বলেন, পরোয়ানা থাকলে তা কার্যকর করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

এদিকে সংবাদ সম্মেলনে তাফসির মাহফিলের সভাপতি আবদুস সামাদ দাবি করেন, আলিয়া খাতুন তাঁকে ধাক্কা দিয়েছেন। তাঁদের সঙ্গে আরও দুজনকে থাপ্পড় দিয়েছেন। একজনকে ধাক্কা দিয়ে নিচে ফেলে দিয়েছেন। এসব কারণেই তাঁরা ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে অধ্যক্ষ ও আলিয়া খাতুনের অপসারণ চান। এ সময়ের মধ্যে প্রত্যাহার করা না হলে তাঁরা বৃহত্তর আন্দোলনের কর্মসূচি ঘোষণা করবেন।

রাজশাহীতে কলেজে ঢুকে নারী শিক্ষককে লাঞ্ছনা, অভিযোগ বিএনপি নেতা-কর্মীদের বিরুদ্ধে

Read full story at source