পাকিস্তান–আফগানিস্তান লড়াই কেন জোরালো হচ্ছে
· Prothom Alo
আফগানিস্তান ও পাকিস্তানের মধ্যে গভীর সংঘাত চলছে প্রায় ছয় মাস ধরে। ইরানের মতো এখনো একে যুদ্ধের সংজ্ঞা দেওয়া না হলেও কার্যত যুদ্ধই চলছে প্রতিবেশী দুই দেশের মধ্যে। বিশেষ করে যখন দেখা যাচ্ছে আফগানিস্তানের একেবারে কেন্দ্র অর্থাৎ কাবুলে বড় ধরনের হামলা চালাচ্ছে পাকিস্তান; অন্যদিকে পাকিস্তানের শুধু সীমান্তবর্তী অঞ্চলেই হামলা চালাতে পারছে তালেবান-নিয়ন্ত্রিত ইসলামি আমিরাতের সরকার।
Visit lej.life for more information.
সোমবার রাতে মাদকাসক্তদের পুনর্বাসনকেন্দ্রে যে আক্রমণ হলো, তার জন্য যতটা জায়গা আন্তর্জাতিক প্রচারমাধ্যমে ব্যয় হওয়া উচিত ছিল, তা হলো না। সম্ভবত ইরান-ইসরায়েল-যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে আরও বড় ধরনের একটা যুদ্ধ চলার কারণে।
পাকিস্তান অবশ্য বারবারই বলছে, মাদকাসক্তদের হাসপাতালে তারা আক্রমণ চালায়নি। তারা হামলা চালিয়েছে এমন এক প্রতিষ্ঠানে যেখানে ‘ফিদাইন’ বা আত্মঘাতী হামলার প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়।
যেকোনো সংঘাতের সময় যেটা হয়, কে সত্য বলছে আর কে মিথ্যা, তা চট করে ধরা যায় না। বিশেষ করে এমন একটা সময় যেখানে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাকে ব্যবহার করে এমন ধরনের ভিডিও তৈরি হচ্ছে, যা দেখে সাধারণভাবে বোঝার উপায় নেই তা আসল না নকল। এ ধরনের নকল ভিডিও দেখেই পর্যবেক্ষকরা অনেক ক্ষেত্রে তাদের ন্যারেটিভ (আখ্যান) প্রকাশ্যে তুলে ধরছেন।
ফলে আফগানিস্তান-পাকিস্তানের যুদ্ধে কে জিতছে, তা চট করে বলা মুশকিল, যেমনটা ইরান-যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষেত্রেও। ফলে এই মুহূর্তে দাঁড়িয়ে জেতা-হারার বাইরে গিয়ে বিষয়টাকে পর্যালোচনা করা প্রয়োজন। সেটা করার জন্য এটা দেখা প্রয়োজন যে দুই দেশ—আফগানিস্তান ও পাকিস্তান—কীভাবে এই যুদ্ধকে ব্যাখ্যা করছে, তাদের ন্যারেটিভ ঠিক কী?
কাবুলে মাদক পুনর্বাসন হাসপাতালে পাকিস্তানের বিমান হামলার পর একটি মৃতদেহ অ্যাম্বুলেন্সে তোলা হচ্ছেদুই পক্ষেই লড়াই হচ্ছে সুন্নি মুসলমানের মধ্যে এবং ইতিহাস বলছে যে যখন বাইরের দেশ এই অঞ্চলকে আক্রমণ করেছে—যেমন ১৯৭৯ সালে রাশিয়া বা ২০০১–এ যুক্তরাষ্ট্র—তখন সীমন্তের দুই পারের পাঠানরা এক হয়ে তাদের বিরোধিতা করেছে। অথচ এখন তারা নিজেদের মধ্যে লড়ছে।
আফগানিস্তানে হাসপাতালে পাকিস্তানের বিমান হামলায় নিহত ৪০০: দাবি তালেবান সরকারেরকেন?
সার্বিকভাবে অবশ্যই একটা ব্যাখ্যা সব সময়ই ঠিক। সেটা হলো দুই দেশের মধ্যে বিতর্কিত ‘ডুরান্ড লাইন’কে কেন্দ্র করে বিরোধ রয়েছে। কখনো এই বিরোধ বাড়ে, কখনো এই বিরোধ কমে। এটা সার্বিক ও স্বাভাবিক সত্য। কিন্তু এর বাইরে একটা বড় প্রশ্ন হলো যে ‘ডুরান্ড লাইন’ তো ১৮৯৩ সাল থেকে আছে এবং প্রায় ৮০ বছর আগে পাকিস্তানের জন্ম হয়েছে। তাহলে সব সময় তারা নিজেদের মধ্যে লড়াই করে না কেন? কেন ইতিহাসের নির্দিষ্ট সময়কালেই লড়াই করে আফগানিস্তান ও পাকিস্তান?
কাবুলে কত কয়েক দিনে বেশ কয়েকজন বিশ্লেষক, সামরিক পর্যবেক্ষক ও সাবেক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল এবং সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা হলো। তাঁদের প্রত্যেকেই নাম প্রকাশ না করার শর্তে ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে একটাই কথা বললেন। সেটা হলো, সাম্প্রতিক এই আফ-পাক সংঘাতের প্রধান কারণ যুক্তরাষ্ট্রের মধ্য এবং দক্ষিণ এশিয়া নিয়ন্ত্রণের নীতি।
ইরান যুদ্ধের এক দিন আগে পাকিস্তান ও আফগানিস্তানের মধ্যে এই সাম্প্রতিক লড়াই শুরু হয়। এর কারণ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে আফগানিস্তানের এক সাবেক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল বললেন, যুক্তরাষ্ট্র বেশ কিছু সময় ধরে আফগানিস্তানে নতুন করে একটা ঘাঁটি বানাতে চায়।
‘প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প খোলাখুলি বলেছিলেন যে তিনি বাগরাম বিমান ঘাঁটি ফেরত পেতে চান, কারণ এটি পুরোপুরিভাবে বানিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। সেখানে এখনো প্রচুর যুদ্ধাস্ত্র রয়েছে, যার সবই যুক্তরাষ্ট্রের। সেখান থেকে ইরানের ওপর নজর রাখা ও হামলা চালানো যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষে আরও সহজ হতো। যে কারণে গত বছরের শেষের দিকে ওই ঘাঁটি ফেরত পেতে চেয়েছিলেন ট্রাম্প,’ বলেন তিনি।
পাকিস্তান-আফগানিস্তান কী কারণে ‘যুদ্ধ’ করছে, এটা কি অনিবার্য ছিলআফগানিস্তান ওয়াশিংটনকে খুব স্পষ্ট ভাষায় জানিয়ে দিয়েছে যে তাদের দেশে ভবিষ্যতে আর কখনোই ঘাঁটি গড়তে পারবে না যুক্তরাষ্ট্র। আফগানিস্তানের একাধিক মন্ত্রী ও সরকারি আমলা প্রথম আলোকে সাক্ষাৎকার দিয়েও গত অক্টোবরে এ কথা বলেছিলেন।
মঙ্গলবার গভীর রাতে একটি প্রেস বিবৃতি জারি করে সন্ত্রাসী সংগঠন আল–কায়েদা ইন ইন্ডিয়ান সাব কন্টিনেন্ট (একিউআইএস)। সেই বিবৃতিতে তারাও বলেছে, পাকিস্তান বাগরাম বিমান ঘাঁটি দখল করে তা যুক্তরাষ্ট্রকে ফিরিয়ে দিতে চাইছে। এভাবেই তারা যুক্তরাষ্ট্রকে একটা পরিষেবা দিতে চাইছে, বলেছে একিউআইএস। আফগানিস্তানের ওপরে সাম্প্রতিক বিমান হামলার নিন্দা করে এই জঙ্গি সংগঠন পাকিস্তানকে আফগানিস্তান থেকে পিছু হটতে বলেছে।
আফগানিস্তানের পর্যবেক্ষকদের একাংশের বক্তব্য, যুক্তরাষ্ট্র বরাবরই যে কাজটা করে, সেটা হলো পাকিস্তানের সাহায্য নিয়ে আফগানিস্তানে একটা অরাজকতা সৃষ্টির চেষ্টা।
আফগানিস্তানের এক জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক এই প্রসঙ্গে প্রথম আলোকে বলেন, ‘পাকিস্তানে একটা গোষ্ঠী আছে, যারা আফগানিস্তানের সঙ্গে কাজ করতে চেষ্টা করে এবং এরা মূলত ধর্মবিশ্বাসী। এরা একটা সার্বিক ইসলামি রাষ্ট্র চায়। অন্যদিকে পাকিস্তান রাষ্ট্র (যা পুরোপুরি শরিয়াভিত্তিক নয়) যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক ভালো রাখার চেষ্টা করে নানান অর্থনৈতিক ও ভূরাজনৈতিক সুবিধা পাওয়ার লক্ষ্যে। সম্প্রতিও আমরা দেখছি যে পাকিস্তানের একেবারে শীর্ষ পর্যায়ের নেতারা ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে সম্পর্ক দৃঢ় করার চেষ্টা করছেন। এই অবস্থায় স্বাভাবিকভাবেই আফগানিস্তানের মানুষ মনে করছেন যে পাকিস্তান যুক্তরাষ্ট্রের হয়ে এই যুদ্ধটা করছে।’
অর্থাৎ আফগানিস্তান ও পাকিস্তানের মধ্যকার বর্তমান উত্তেজনা কেবল সীমান্ত সংঘাত নয়, বরং এর গভীরে রয়েছে আঞ্চলিক আধিপত্য, আদর্শগত লড়াই এবং আন্তর্জাতিক শক্তির অদৃশ্য প্রভাব। সম্প্রতি কাবুলে এবং নানগারহার প্রদেশে পাকিস্তানি বিমান হামলার পর এই সংকট আরও গভীর হয়েছে।
পাকিস্তানকে জবাব দিল আফগানিস্তান, চালাল ড্রোন হামলাকৌশলগত গভীরতা ও পাকিস্তানের সমীকরণ
আফগানিস্তানের তালেবান সেনাবাহিনীর সঙ্গে যুক্ত পর্যবেক্ষকদের অনেকে এটা মনে করছেন, এই হামলাগুলো কোনো বিচ্ছিন্ন সামরিক ঘটনা নয়। পাকিস্তান আসলে আফগানিস্তানকে তাদের ‘স্ট্র্যাটেজিক ডেপথ’ বা কৌশলগত বলয়ের মধ্যে রাখতে চায়। এর প্রধান উদ্দেশ্য হলো আফগানিস্তানে ভারতের প্রভাব ঠেকানো এবং অঞ্চলে নিজেদের অবস্থান সুসংহত করা। পাকিস্তানে যখনই টিটিপির (তেহরিক–ই–তালেবান পাকিস্তান) হামলা বৃদ্ধি পায়, তখন দেশটির সেনাবাহিনী ও সরকারের ওপর অভ্যন্তরীণ চাপ তৈরি হয়। এ অবস্থায় আফগান সীমান্তে বিমান হামলা চালিয়ে পাকিস্তান মূলত নিজেদের দেশের জনমতকে শান্ত করতে চায় এবং সেনাবাহিনীর ‘কঠোর অবস্থান’ জাহির করার চেষ্টা করে।
এদিকে কাবুলের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক সাবেক কর্মকর্তা আরও এক জটিল বাস্তবতার কথা জানান। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ওই অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তা বলেন, আফগান সরকার প্রায় ৬ হাজার টিটিপি যোদ্ধাকে আটক করলেও তাদের পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ করা আফগান সরকারের পক্ষে প্রায় অসম্ভব। এর কারণ হিসেবে তিনি বললেন, এই যোদ্ধাদের একটা ধর্মীয় আদর্শগত অনুপ্রেরণা রয়েছে। এই ধর্মীয় আবেগ অতীতে মার্কিন বাহিনীর বিরুদ্ধে লড়াইয়ের সময় যেমন ছিল, এখনো তেমনই অটুট রয়েছে।
‘এরা শরিয়াভিত্তিক একটা রাষ্ট্র চায়, যেটা তারা আফগানিস্তানে পেয়েছে। এখন এদের ইচ্ছা যে এ ধরনের শরিয়াভিত্তিক রাষ্ট্র পাকিস্তানেও স্থাপিত হোক। শরিয়াভিত্তিক রাষ্ট্র আফগানিস্তানের তালেবানরা চাইলেও তারা পাকিস্তানে টিটিপির এই লড়াইকে সব সময় সমর্থন করে না। কিন্তু আবার তাদের নিয়ন্ত্রণ করার অবস্থাতেও আফগান তালেবানরা নেই,’ বলেন এই কর্মকর্তা।
এই বক্তব্যের সূত্র ধরেই রাজনৈতিক বিশ্লেষক মঈন গুল চামকানি আফগানিস্তানের স্থানীয় প্রচারমাধ্যমকে বলেছেন, পাকিস্তান আসলে আফগানিস্তানে কোনো শক্তিশালী বা স্বাধীন ব্যবস্থা দেখতে চায় না। তাঁর মতে, তালেবান যদি টিটিপির বিরুদ্ধে সরাসরি যুদ্ধে নামে, তবে তা হবে তাদের নিজস্ব ধর্মীয় ও রাজনৈতিক আদর্শের পরিপন্থী। এমন পদক্ষেপ নিলে তালেবানের নিজস্ব যোদ্ধাদের মধ্যেই বিদ্রোহ বা চরম অভ্যন্তরীণ কোন্দল দেখা দিতে পারে। ফলে আফগানিস্তান টিটিপিকে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে একটি ‘চাপের হাতিয়ার’ হিসেবে ধরে রাখতে চাইছে।
পাকিস্তানের দৃষ্টিকোণ
পাকিস্তানের তরফে অবশ্য এভাবে দেখা হয় না বলে মনে করছেন সে দেশের নাগরিক সমাজের সদস্যরা। সরকারের চিন্তাভাবনা সম্পর্কে খোঁজখবর রাখেন পেশাওয়ারের এমন এক সাংবাদিক ও আইনজীবী এ প্রসঙ্গে প্রথম আলোকে বলেন, পরিস্থিতি যেভাবে এবং যেদিকে এগোচ্ছে, তাতে পাকিস্তানের আক্রমণ করা ছাড়া কোনো রাস্তা খোলা নেই। ওই সাংবাদিকও বলেন, মাদকাসক্তদের নিরাময় ক্লিনিকে হামলা করা হয়নি; যে হামলা হয়েছে তা করা হয়েছে গোপন সেনা ছাউনিতে।
পাকিস্তানের বোমা হামলায় বাস্তুচ্যুত আফগান পরিবারতবে আফগান তালেবান যে পাকিস্তানে হামলায় মদদ দিচ্ছে, এ দাবি করে ওই সাংবাদিক বলেন, তেহরিক-ই-তালেবান পাকিস্তান (টিটিপি) ও আফগান তালেবানের (টিটিএ) মধ্যে একটি গোপন সমঝোতা বা বোঝাপড়া রয়েছে, যার ভিত্তিতে টিটিপি অতীতের (মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং আফগান সরকারি বাহিনীর বিরুদ্ধে) যুদ্ধে আফগান তালেবানকে সমর্থন করেছিল। এর বিনিময়ে বর্তমানে স্বাধীন রাষ্ট্রের দায়িত্বে থাকা আফগান তালেবান পাকিস্তানের খাইবার পাখতুনখাওয়ার সীমান্ত জেলাগুলোতে একটি ইসলামি ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠায় টিটিপিকে সহায়তা করবে বলেই তাদের মধ্যে সমঝোতা হয়েছিল।
এই সমঝোতার কারণেই এখন পাকিস্তানের সীমান্ত প্রদেশে আক্রমণ হচ্ছে, যে কারণে পাকিস্তানকে পাল্টা আক্রমণ করতে হচ্ছে বলে মনে করছেন ওই জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক।
এর পেছনে ভারতের হাত থাকার অভিযোগও করা হয়েছে পাকিস্তানের পর্যবেক্ষকদের তরফে। অর্থাৎ ভারত আফগান তালেবানকে সাহায্য করছে টিটিপিকে সাহায্য দিয়ে পাকিস্তানে অরাজকতা সৃষ্টি করার উদ্দেশ্যে। যদিও ভারতের তরফে এ ধরনের অভিযোগ বরাবরই অস্বীকার করা হয়েছে।
ইরান যুদ্ধের কারণে আফগানিস্তান পাকিস্তানের এই ‘যুদ্ধ’ ততটা প্রচার পাচ্ছে না। কিন্তু যদি দু’পক্ষে মৃতের সংখ্যা হিসাব করা হয়, তবে দেখা যাবে হয়তো গত ছয় মাসে আফ-পাক সীমান্তে বেশি মানুষ মারা গিয়েছেন। আজ না হয় কাল গোটা বিশ্বকেই নজর দিতে হবে ২৬০০ কিলোমিটারের এই সীমান্তে।