পরিবর্তনটা দেখতে চাই নিজের জীবনে

· Prothom Alo

দেশ কতটা বদলাচ্ছে, একজন তরুণী হিসেবে সেই প্রশ্নের উত্তর আমি নিজের ভবিষ্যতের সঙ্গে মিলিয়ে খুঁজি। পড়াশোনা শেষে যোগ্যতা অনুযায়ী কাজ পাব কি না, নিজের মত নির্ভয়ে বলতে পারব কি না, রাস্তায় নিরাপদে চলতে পারব কি না—আমার কাছে পরিবর্তনের মাপকাঠি এগুলোও।

আমি চট্টগ্রামের বাসিন্দা। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে লোকপ্রশাসন বিভাগে চতুর্থ বর্ষে পড়ছি। বিশ্ববিদ্যালয়ের পাট শেষ করার কাছাকাছি এসে ভবিষ্যৎ নিয়ে ভাবনা বাড়ছে। নিজের পায়ে দাঁড়াতে চাই। নিজের সিদ্ধান্ত নিজে নিতে চাই। কিন্তু সেই পথ কতটা খোলা, বিশেষ করে একজন নারীর জন্য—এ প্রশ্নও ভাবায়।

Visit somethingsdifferent.biz for more information.

আমাদের প্রজন্মকে জেন–জি বলা হয়। আমরা প্রশ্ন করি, মত জানাই, অন্যায় দেখলে প্রতিবাদ করতে চাই। আমার মনে হয়, এই প্রবণতা সমাজের জন্য প্রয়োজন। বড়দের কথা শুনব, তাঁদের অভিজ্ঞতা থেকেও শিখব। তবে কোনো কিছু দীর্ঘদিন ধরে চলে আসছে বলেই তা বিনা প্রশ্নে মেনে নিতে হবে কেন? যে নিয়ম মানুষের অধিকার সংকুচিত করে, যে আচরণ কাউকে ছোট করে, সেগুলো বদলানোর কথা বলতেই হবে।

রাজনীতির কাছেও আমার প্রত্যাশা এখানেই। মানুষের কথা শোনার সুযোগ কতটা আছে, ভিন্নমত প্রকাশ করলে তাকে কীভাবে নেওয়া হচ্ছে, অন্যায়ের প্রতিকার পাওয়া যাচ্ছে কি না—এসব দেখতে চাই। রাজনৈতিক পরিবর্তনের সুফল মানুষের দৈনন্দিন জীবনে পৌঁছানো দরকার। ক্ষমতায় যাঁরাই থাকুন, তাঁদের সিদ্ধান্ত ও কাজ নিয়ে প্রশ্ন করার অধিকার নাগরিকের থাকতে হবে।

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়

একই সঙ্গে আমাদের প্রজন্মেরও দায়িত্ব আছে। নিজের মতপ্রকাশের স্বাধীনতা চাইলে অন্যের মত শোনার ধৈর্য রাখতে হবে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দ্রুত প্রতিক্রিয়া জানানো সহজ। কিন্তু কোনো তথ্য সত্য কি না, কাউকে আঘাত করছি কি না, ভিন্নমতের মানুষকে অপমান করছি কি না—সেটিও ভাবা দরকার। প্রতিবাদের সাহসের সঙ্গে এই দায়িত্ববোধটুকুও জরুরি।

অর্থনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে ভাবতে গেলে আমার কাছে সবার আগে আসে পড়াশোনার খরচ ও কাজের সুযোগ। যাতায়াত, খাবার, বই কিংবা প্রয়োজনীয় প্রযুক্তির খরচ—সবই একজন শিক্ষার্থীর পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়ার সঙ্গে জড়িত। পরিবারের সামর্থ্য কম হলে এসব খরচই বড় বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে। তাই শিক্ষার সুযোগ বলতে শুধু ভর্তির সুযোগ বুঝলে চলবে না, পড়াশোনা শেষ করার সামর্থ্যও থাকতে হবে।

পড়াশোনা শেষ করে সম্মানজনক কাজ পাওয়ার নিশ্চয়তা নিয়ে অনিশ্চয়তাও আছে। সনদের পাশাপাশি কাজ শেখার সুযোগ চাই। নিয়োগে যোগ্যতার মূল্যায়ন চাই। চট্টগ্রামে থেকেই একজন তরুণ বা তরুণী যেন নিজের পেশাগত ভবিষ্যৎ গড়তে পারেন, সে সুযোগ বাড়ানো দরকার।

নারীর ক্ষেত্রে এই পথের সঙ্গে আরও কিছু বাধা যুক্ত হয়। সুযোগ পেলেই যে তিনি তা গ্রহণ করতে পারবেন, এমন নয়। কর্মস্থলে পৌঁছানোর নিরাপদ ব্যবস্থা আছে কি না, হয়রানির অভিযোগ জানালে ব্যবস্থা হবে কি না, কাজের পরিবেশ সম্মানজনক কি না—এসবও গুরুত্বপূর্ণ। অনেক সময় নিরাপত্তার উদ্বেগ নারীর পড়াশোনা, কাজ ও চলাফেরার সিদ্ধান্তকে সীমিত করে দেয়। নিরাপত্তা নিশ্চিত করার বদলে মেয়েদের সুযোগ কমিয়ে দেওয়া কোনো সমাধান হতে পারে না।

একজন নারী হিসেবে আমি নিজেকে পুরোপুরি নিরাপদ মনে করি না। শুধু রাতে নয়, দিনের বেলায়ও বাইরে চলাফেরা নিয়ে দুশ্চিন্তা থাকে। অথচ স্বাভাবিকভাবে চলাফেরা করতে পারা আমার অধিকার। নিরাপদ থাকার জন্য একজন নারীকে প্রতিনিয়ত নিজের পোশাক, সময় বা গন্তব্যের ব্যাখ্যা দিতে হবে কেন?

নারীর নিরাপত্তার আলোচনা উঠলেই তাঁর আচরণ নিয়ে বিচার শুরু হয়। এতে হয়রানিকারীর দায় আড়ালে চলে যায়। আমি চাই অভিযোগ জানাতে গিয়ে কোনো নারীকে যেন উল্টো অপমানিত হতে না হয়। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও কর্মক্ষেত্রে অভিযোগ গ্রহণ এবং প্রতিকারের ব্যবস্থা কার্যকর হতে হবে। গণপরিবহন ও জনপরিসরেও নারীর নিরাপদ উপস্থিতি নিশ্চিত করা দরকার।

নারীর সুযোগের বিষয়টি পরিবারের ভেতর থেকেও দেখতে হবে। ঘরের কাজ ও স্বজনের যত্ন নেওয়ার দায়িত্ব শুধু তাঁর ওপর থাকলে বাইরের কাজে সমানভাবে এগোনো কঠিন। পরিবারের সদস্যদের দায়িত্ব ভাগ করে নেওয়া প্রয়োজন। কর্মক্ষেত্রে মাতৃত্বকালীন সুবিধা ও শিশুযত্নের ব্যবস্থা থাকাও জরুরি। নারীকে কাজের সুযোগ দিয়ে সেই কাজ চালিয়ে যাওয়ার পরিবেশ তৈরি না করলে সমতা আসবে কীভাবে?

চট্টগ্রামের সাংস্কৃতিক জীবন নিয়েও আমার প্রত্যাশা আছে। তরুণেরা বই পড়বেন, নাটক দেখবেন, গান করবেন, নিজেদের ভাবনা নিয়ে আলোচনা করবেন—এমন সহজলভ্য পরিসর বাড়ুক। মেয়েরাও যেন এসব আয়োজনে স্বচ্ছন্দে অংশ নিতে পারেন। সংস্কৃতিচর্চা মানুষের ভিন্ন অভিজ্ঞতা ও চিন্তার সঙ্গে পরিচয় করায়। সেই পরিচয় আমাদের আরও সহনশীল হতে শেখাতে পারে।

আমি এমন একটি সমাজ চাই, যেখানে নিজের ভবিষ্যৎ নিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় একজন তরুণীকে ভয় ও বাধার হিসাবই আগে কষতে হবে না। যেখানে তাঁর মেধা, শ্রম ও মতামতের মূল্য থাকবে। পড়াশোনা শেষে নিজের পায়ে দাঁড়ানোর স্বপ্নটা নিয়ে যখন ভাবি, দেশের পরিবর্তনকে তখন এই জায়গা থেকেই বিচার করি—আমার সামনে পথটা কতখানি খুলছে?

  • প্রথমা সিংহ, শিক্ষার্থী, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়

Read full story at source