যে আয়নায় আজও আমাদের মুখ দেখা যায়
· Prothom Alo
রোচনা মজুমদারের আবুল মনসুর আহমদের পূর্ব বাংলা ভাষা, আত্মপরিচয় ও একটি জাতি হয়ে ওঠার ইতিহাস। অধিকৃত ভূখণ্ড থেকে স্বীকৃত স্বদেশ হয়ে উঠতে কত জাতিকে কত জীবন, কত প্রজন্মকে কত সংগ্রাম করতে হয়েছে। আমরাও তার ব্যতিক্রম নই।
Visit somethingsdifferent.biz for more information.
একটি ভূখণ্ডের স্বাধীনতা ঘোষণা করা যায় এক দিনে। কিন্তু একটি জাতির আত্মপরিচয় এক দিনে তৈরি হয় না। কখনো কখনো তার জন্য লেগে যায় শতাব্দী। মানচিত্রে একটি সীমারেখা টেনে দেওয়া সহজ, কিন্তু মানুষের মনে ‘আমরা’ আর ‘ওরা’র সীমারেখা তৈরি হয় অনেক ধীরে, আর সেটি হয় ভাষা, স্মৃতি, সংস্কৃতি, ধর্ম, সাহিত্য ও ইতিহাসের দীর্ঘ অভিজ্ঞতার ভেতর দিয়ে। এটি মূলত সেই ধীর জন্মের ইতিহাসের বই।
আবুল মনসুর আহমদকে নিয়ে এটি কোনো প্রথাগত বই নয়। বরং তাঁর চিন্তার ভেতর দিয়ে পূর্ব বাংলাকে দেখার একটি বুদ্ধিবৃত্তিক প্রয়াস। প্রকৃতপক্ষে বইটির কেন্দ্রীয় অনুসন্ধান, কীভাবে ‘বাংলা’ থেকে ‘পূর্ব বাংলা’ একটি স্বতন্ত্র রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক সত্তা হয়ে উঠল। কীভাবে ভাষা ও সংস্কৃতির প্রশ্ন ক্রমে রাষ্ট্র, স্বাধিকারের আকাঙ্ক্ষা ও আত্মপরিচয়ের প্রশ্নে পরিণত হলো এবং এই দীর্ঘ যাত্রায় আবুল মনসুর আহমদের চিন্তার অবস্থান কোথায়।
ব্যক্তিকে নয়, বরং চিন্তার ভূগোল পাঠই বইটির মূল অনুসন্ধান। এর কাঠামোগত শক্তি এখানেই যে লেখক আবুল মনসুর আহমদের জীবনকে নিছক কালানুক্রমিক জীবনী হিসেবে সাজাননি। জন্ম, শিক্ষা, চাকরি, রাজনীতি, সাহিত্য—এই পরিচিত জীবনী-ছক অনুসরণ না করে তিনি একটি চিন্তার ভূগোল নির্মাণ করেছেন। ফলে ব্যক্তি আবুল মনসুর ধীরে ধীরে তাঁর সময়ের এবং নানা ঐতিহাসিকতার সঙ্গে যুক্ত হয়ে ওঠেন।
ব্যক্তিকে নয়, বরং চিন্তার ভূগোল পাঠই বইটির মূল অনুসন্ধান। এর কাঠামোগত শক্তি এখানেই যে লেখক আবুল মনসুর আহমদের জীবনকে নিছক কালানুক্রমিক জীবনী হিসেবে সাজাননি। জন্ম, শিক্ষা, চাকরি, রাজনীতি, সাহিত্য—এই পরিচিত জীবনী-ছক অনুসরণ না করে তিনি একটি চিন্তার ভূগোল নির্মাণ করেছেন। ফলে ব্যক্তি আবুল মনসুর ধীরে ধীরে তাঁর সময়ের এবং নানা ঐতিহাসিকতার সঙ্গে যুক্ত হয়ে ওঠেন।
এই পদ্ধতির ফলে পাঠক একটি ঘটনার পর আরেকটি ঘটনা জানার চেয়ে বেশি কিছু পান। দেখা যায়, কীভাবে একটি চিন্তা অন্য একটি চিন্তার জন্ম দেয়, কীভাবে রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা সাংস্কৃতিক উপলব্ধিকে বদলে দেয়। কীভাবে ভাষার প্রশ্ন শেষ পর্যন্ত রাষ্ট্রের প্রশ্নে গিয়ে পৌঁছায়।
অর্থাৎ বইটির প্রকৃত নায়ক শুধু আবুল মনসুর আহমদ নন, বরং পূর্ব বাংলার আত্মপরিচয় নির্মাণের প্রক্রিয়াটি এই বইয়ের একটি প্রধান চরিত্র।
এই বাংলার এক যুগান্তকারী কাজ আমার দেখা রাজনীতির পঞ্চাশ বছর বইটির ইংরেজি অনুবাদ করতে গিয়ে লেখক হয়তো ‘প্রবেশিকা’ হিসেবে এটি লিখেছেন।
২.
ভাষা থেকে রাষ্ট্রযাত্রার ধারা ধরে এগিয়েছেন রোচনা। বইটির যুক্তির একটি গুরুত্বপূর্ণ স্রোত ভাষা ও সংস্কৃতি ঘিরে। আবুল মনসুর আহমদের কাছে ভাষা নিছক সাহিত্যিক রুচির বিষয় ছিল না। ভাষার ভেতর তিনি দেখেছিলেন সামাজিক মর্যাদা, সাংস্কৃতিক ক্ষমতা ও আত্মপরিচয়ের প্রশ্ন। একদিকে পূর্ব বাংলার মানুষের ভাষা ও সাহিত্যিক প্রকাশ, অন্যদিকে ভাষা প্রশ্নে পশ্চিম বাংলার সাংস্কৃতিক কর্তৃত্ব ও নিজের স্বতন্ত্র কণ্ঠ প্রতিষ্ঠার প্রয়োজন—এসব প্রশ্ন তাঁর চিন্তায় পরস্পরের সঙ্গে যুক্ত। ফলে বইটির আলোচনাও ভাষা থেকে সংস্কৃতি, সংস্কৃতি থেকে আত্মপরিচয় এবং আত্মপরিচয় থেকে রাজনীতির দিকে অগ্রসর হয়। এই বিন্যাস বইটির যুক্তিকে স্বাভাবিক গতি দেয়।
‘পূর্ব বাংলা’ বইটির শিরোনামমাত্র নয়। এটি বইটির বিশ্লেষণের একটি গুরুত্বপূর্ণ ধারণা। ১৯৪৭-এর দেশভাগ একই ভাষাভাষী মানুষের ভূগোলকে রাজনৈতিকভাবে বিভক্ত করেছিল। কিন্তু বিভাজনের সঙ্গে সঙ্গে পূর্ব বাংলার মানুষের আত্মপরিচয়ের প্রশ্ন মুছে যায়নি, বরং পাকিস্তান রাষ্ট্রের ভেতরে প্রবেশের পর ভাষা, সংস্কৃতি ও রাজনৈতিক ক্ষমতার সম্পর্ক নতুনভাবে সামনে আসে।
এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো রোচনা মজুমদার পূর্ব বাংলার স্বাতন্ত্র্যকে কোনো আকস্মিক রাজনৈতিক ঘটনার ফল হিসেবে দেখেন না। বরং তিনি দেখান, তার পেছনে ছিল দীর্ঘ সাংস্কৃতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক সংগ্রামী প্রস্তুতি, যার পুরোভাগে ছিলেন আবুল মনসুর আহমদ ।
‘পূর্ব বাংলা’ নামটির মধ্যেই ইতিহাস
‘পূর্ব বাংলা’ বইটির শিরোনামমাত্র নয়। এটি বইটির বিশ্লেষণের একটি গুরুত্বপূর্ণ ধারণা। ১৯৪৭-এর দেশভাগ একই ভাষাভাষী মানুষের ভূগোলকে রাজনৈতিকভাবে বিভক্ত করেছিল। কিন্তু বিভাজনের সঙ্গে সঙ্গে পূর্ব বাংলার মানুষের আত্মপরিচয়ের প্রশ্ন মুছে যায়নি, বরং পাকিস্তান রাষ্ট্রের ভেতরে প্রবেশের পর ভাষা, সংস্কৃতি ও রাজনৈতিক ক্ষমতার সম্পর্ক নতুনভাবে সামনে আসে।
আমরা ইতিহাসকে প্রায়ই কয়েকটি তারিখে বন্দী করি—১৯৪৭, ১৯৫২, ১৯৬৬, ১৯৭১। অথচ একটি জাতির ইতিহাস তৈরি হয় তার মানুষের ভাষায়, সাহিত্যিক স্বপ্নে, সাংস্কৃতিক আত্মমর্যাদায়, অপমানের স্মৃতিতে এবং স্বাধিকারের আকাঙ্ক্ষায়। আবুল মনসুর আহমদ সেই অন্তর্গত ইতিহাসের একজন গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষী।
এই জায়গায় আবুল মনসুর আহমদের চিন্তাকে পড়ার অর্থ দাঁড়ায়—পূর্ব বাংলার মানুষ কীভাবে নিজেদের ‘বাংলা’ পরিচয়ের ভেতর মুসলমান পরিচয়, আবার মুসলমান পরিচয়ের ভেতর বাঙালি সাংস্কৃতিক সত্তাকে নতুন করে ভাবতে শুরু করেছিল।
বইটি এই জটিলতাকে সরল কোনো সূত্রে নামিয়ে আনে না। এটাই তার বৌদ্ধিক সততা, যা একটি ধারণা থেকে আরেক ধারণায় মিশেছে অনায়াসে।
বইটির কাঠামোকে যদি একটি নদীর সঙ্গে তুলনা করা যায়, তবে তার কয়েকটি প্রধান স্রোত সহজেই চিহ্নিত করা যায়—ভাষা, সাহিত্য, সংস্কৃতি, মুসলমান সমাজের আত্মচেতনা, রাজনৈতিক স্বাতন্ত্র্য ও রাষ্ট্রের প্রশ্ন। এই স্রোতগুলো আলাদা হলেও শেষ পর্যন্ত এক জায়গায় এসে মেশে।
৩.
ভাষার প্রশ্ন থেকে সংস্কৃতি, সংস্কৃতি থেকে আত্মপরিচয়, আত্মপরিচয় থেকে রাজনৈতিক অধিকার আর রাজনৈতিক অধিকার থেকে রাষ্ট্রের কাঠামো—এই অন্তঃস্রোত বইটিকে শুধু আবুল মনসুরের চিন্তার ইতিহাসের পাঠ না রেখে পূর্ব বাংলার রাজনৈতিক আধুনিকতারও একটি পাঠে পরিণত করেছে।
এখানে বইটির আরেকটি গুণ লক্ষণীয়, লেখক আবুল মনসুরের চিন্তাকে তাঁর সময়ের বাইরে এনে আধুনিক কোনো মতাদর্শের ছাঁচে বসাননি। বরং তাঁর সময়, অভিজ্ঞতা ও বৌদ্ধিক পরিসরের ভেতর থেকেই তাঁকে বোঝার চেষ্টা করেছেন।
লাহোর প্রস্তাব ও ফেডারেল রাষ্ট্রব্যবস্থা নিয়ে আবুল মনসুর আহমদের অবস্থান এই বৃহত্তর কাঠামোর আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। ১৯৫৬ সালের পাকিস্তানের সংবিধান বিতর্কে তিনি প্রাদেশিক স্বায়ত্তশাসন ও ক্ষমতার নিশ্চয়তার প্রশ্নকে সামনে এনেছিলেন। ১৯৭২ সালেও তিনি মনে করেছিলেন, বাংলাদেশের অভ্যুদয় লাহোর প্রস্তাবের পরাজয় নয়, বরং তার একটি ঐতিহাসিক বাস্তবায়ন হিসেবে দেখা যেতে পারে।
এই বক্তব্যের মূল্য শুধু তার রাজনৈতিক তাৎপর্যে নয়। এর মাধ্যমে বোঝা যায়, আবুল মনসুর রাষ্ট্রকে কীভাবে ভাবতেন—কেন্দ্র ও প্রান্তের সম্পর্ক, ক্ষমতার বণ্টন এবং জনগোষ্ঠীর স্বায়ত্তশাসনের প্রশ্ন তাঁর চিন্তার কেন্দ্রে ছিল। এখানেই বইটি অতীত থেকে বর্তমানের দিকে একটি সেতু তৈরি করে।
৪.
সাহিত্যিক আবুল মনসুরের সঙ্গে রাজনৈতিক আবুল মনসুর
বইটির সবচেয়ে আকর্ষণীয় দিকগুলোর একটি হলো, আবুল মনসুরের সাহিত্যিক ও রাজনৈতিক সত্তাকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন করে দেখা হয়নি।
আয়নার ব্যঙ্গের ভেতর যে সমাজ দেখা যায়, সেটিই অন্য এক পরিসরে তাঁর রাজনৈতিক চিন্তার বিষয় হয়ে ওঠে। ভণ্ডামি, ক্ষমতার অপব্যবহার, ধর্মের সামাজিক ব্যবহার, শ্রেণিগত বৈষম্য—সাহিত্যের হাস্যরসের ভেতর যে প্রশ্নগুলো উঠে আসে, রাজনৈতিক লেখাতেও তাদের অন্য রূপ দেখা যায়। অর্থাৎ তাঁর সাহিত্য ও রাজনীতি একই চিন্তার দুই ভাষা। এই সংযোগ আবুল মনসুরকে আরও পূর্ণাঙ্গভাবে বুঝতে সাহায্য করে।
৫.
এই বইয়ের ঘনত্বও এর একটি বৈশিষ্ট্য। এটি এমন পাঠ, যা আবুল মনসুর আহমদের সঙ্গে একেবারেই পরিচিত নন—এমন পাঠকের কাছে কিছু জায়গায় অধিকতর প্রেক্ষাপট দাবি করতে পারে। বিশেষ করে পূর্ব বাংলার রাজনৈতিক ইতিহাস সম্পর্কে পূর্বজ্ঞান না থাকলে কিছু বৌদ্ধিক সূত্র অনুসরণে অতিরিক্ত মনোযোগ প্রয়োজন হতে পারে।
কিন্তু এটিকে দুর্বলতার চেয়ে বইটির প্রকৃতির অংশ বলাই হয়তো যুক্তিযুক্ত। কারণ, বইটি দ্রুত পাঠের জন্য লেখা জনপ্রিয় জীবনী নয়, এটি চিন্তার ভেতর প্রবেশের আমন্ত্রণ।
আর সেই আমন্ত্রণ গ্রহণ করতে পাঠকেরও কিছুটা শ্রম দিতে হয়।
আমরা ইতিহাসকে প্রায়ই কয়েকটি তারিখে বন্দী করি—১৯৪৭, ১৯৫২, ১৯৬৬, ১৯৭১। অথচ একটি জাতির ইতিহাস তৈরি হয় তার মানুষের ভাষায়, সাহিত্যিক স্বপ্নে, সাংস্কৃতিক আত্মমর্যাদায়, অপমানের স্মৃতিতে এবং স্বাধিকারের আকাঙ্ক্ষায়। আবুল মনসুর আহমদ সেই অন্তর্গত ইতিহাসের একজন গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষী।
আবুল মনসুর আহমদের পূর্ব বাংলা রোচনা মজুমদার প্রকাশক: প্রথমা প্রকাশন প্রকাশ: জুন ২০২৬ প্রচ্ছদ: আনিসুজ্জামান সোহেল পৃষ্ঠা: ৭২; মূল্য: ২০০ টাকারোচনা মজুমদারের কৃতিত্ব হলো, তিনি সেই সাক্ষীকে আবার আমাদের সামনে বসিয়েছেন, একটি স্মৃতিস্তম্ভ হিসেবে নয়, একজন প্রশ্নকারী মানুষ হিসেবে।
বইটি তাই কেবল একজন সাহিত্যিক-রাজনীতিকের পুনঃপাঠ নয়। এটি পূর্ব বাংলার মানুষ কীভাবে নিজেদের চিনতে শিখল, নিজেদের ভাষাকে নতুন করে মূল্য দিতে শিখল এবং সাংস্কৃতিক স্বাতন্ত্র্যকে রাজনৈতিক অধিকারের সঙ্গে যুক্ত করল, তার একটি সংক্ষিপ্ত কিন্তু গভীর অনুসন্ধান।
বইটি ছোট, কিন্তু এর প্রশ্ন বড়। একটি ভালো বইয়ের সবচেয়ে বড় কৃতিত্ব হয়তো এখানেই—বইটি বন্ধ করার পরও তার প্রশ্নটি বন্ধ হয় না। শেষ পৃষ্ঠার পরও মনে হয়, পূর্ব বাংলা আসলে শুধু একটি ভূখণ্ডের নাম নয়। এটি একটি দীর্ঘ আত্মপরিচয়ের যাত্রা। আর সেই যাত্রায় আবুল মনসুর আহমদের কণ্ঠ এখনো শোনা যায়—দূরের কোনো অতীত থেকে নয়, আমাদের নিজেদের ভাষার ভেতর থেকেই।