উপন্যাসে বাঙালির আত্মপরিচয়

· Prothom Alo

বাঙলা উপন্যাস ১৯৬৭ সালে যুক্তরাষ্ট্রের ম্যাডিসন ইউনিভার্সিটি অব ভিকডনসিনে দেওয়া চারটি বক্তৃতার সংকলন, যা কলকাতা থেকে দ্য বেঙ্গলি নভেল নামে প্রকাশিত হয়। প্রায় ছয় দশক পর সুব্রত বড়ুয়া তা বাংলায় অনুবাদ করেছেন। এই গ্রন্থের চারটি অধ্যায়ে বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় এবং সমকালীন ঔপন্যাসিকদের সাহিত্যকর্ম পর্যালোচনার মধ্য দিয়ে লেখক বাংলা উপন্যাসের বিকাশধারাকে একটি সুসংবদ্ধ ঐতিহাসিক ও সমাজতাত্ত্বিক কাঠামোয় উপস্থাপন করেছেন। উপন্যাসকে তিনি চিহ্নিত করেছেন আধুনিক মধ্যবিত্ত শ্রেণি ও ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যের শিল্পরূপ হিসেবে এবং প্রতিটি লেখককে দেখেছেন তাঁর শ্রেণি, শিক্ষা ও সময়ের সীমার ভেতর থেকে।

গ্রন্থের প্রথম অধ্যায়ে বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়কে বাংলা উপন্যাসের প্রতিষ্ঠাতা সাহিত্যিক হিসেবে বিবেচনার পাশাপাশি তাঁর সাহিত্যকর্মের পেছনে ক্রিয়াশীল ঐতিহাসিক ও সামাজিক পরিস্থিতির অনুসন্ধান করা হয়েছে। ঔপনিবেশিক শাসন, পাশ্চাত্য শিক্ষার প্রভাব, নবজাগরণের চেতনা এবং বাঙালি মধ্যবিত্ত শ্রেণির বিকাশ বাংলা উপন্যাসের আবির্ভাবের সঙ্গে কীভাবে সম্পর্কিত, লেখক তা বিশ্লেষণ করেছেন। বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের ঐতিহাসিক ও সামাজিক উপন্যাসগুলো মূল্যায়ন করতে গিয়ে লেখক বঙ্কিমের শিল্পীসত্তা এবং তাঁর রক্ষণশীল নীতিবাদী সত্তার মধ্যকার অন্তর্দ্বন্দ্বকে উন্মোচন করেছেন। বঙ্কিমের ঐতিহাসিক উপন্যাসগুলোতে ইতিহাসের চেয়ে রোমান্টিক কল্পনাই বেশি প্রাধান্য পেয়েছে এবং তাঁর চরিত্রগুলোর সংলাপ ও আচরণে উনিশ শতকের মধ্যবিত্ত মানস ফুটে উঠেছে। বিশেষ করে বিষবৃক্ষ, কৃষ্ণকান্তের উইল, চন্দ্রশেখর কিংবা দেবী চৌধুরানী উপন্যাসের ক্ষেত্রে বঙ্কিম যখনই কোনো সমাজবিদ্রোহী বা স্বাধীনতাপ্রিয় নারী চরিত্র (শৈবলিনী বা রোহিণী) সৃষ্টি করেছেন, তখনই তাঁর ভেতরের প্রথাগত নীতিবাদী সত্তা জয়ী হয়েছে এবং তাদের ট্র্যাজিক পরিণতির দিকে ঠেলে দিয়েছে। তা সত্ত্বেও বাংলা উপন্যাসের ভিত্তি স্থাপন এবং একে বিশ্বমানের সাহিত্যধারার মুখোমুখি দাঁড় করানোর ক্ষেত্রে বঙ্কিমের ঐতিহাসিক ভূমিকা অপরিসীম।

Visit turconews.click for more information.

দ্বিতীয় অধ্যায়ে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের উপন্যাসের জগৎ বেশ বিস্তৃত ও দার্শনিক দৃষ্টিতে বিশ্লেষিত হয়েছে। লেখক দেখিয়েছেন কীভাবে রবীন্দ্রনাথ বাংলা উপন্যাসকে বঙ্কিমচন্দ্রের ইতিহাস ও সংকীর্ণ সামাজিক আবহ থেকে বের করে এনে বিশ্বজনীন গ্রহণযোগ্যতা ও মনস্তাত্ত্বিক গভীরতা দান করেছেন। এখানে রবীন্দ্র-উপন্যাসে ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্য, আত্মপরিচয়ের সংকট, পারিবারিক সম্পর্ক এবং ব্যক্তি ও সমাজের দ্বন্দ্ব বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে। সমালোচকের মতে, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর উপন্যাসকে ঘটনানির্ভরতা থেকে অনুভূতিনির্ভরতা ও চরিত্রকেন্দ্রিকতায় উন্নীত করেছেন। চোখের বালির বিনোদিনী আধুনিক নারীর পূর্ণাঙ্গ প্রতিনিধি এবং গোরা তাঁর শ্রেষ্ঠ উপন্যাস। চতুরঙ্গ, ঘরে-বাইরে ও শেষের কবিতায় ভাষা ঝকঝকে, কিন্তু চরিত্র কখনো লেখকের মুখপাত্র। দুই বোন ও মালঞ্চ-এর নিষ্ঠুরতাকে কবির ব্যাখ্যা করেছেন শেষ জীবনের নৈরাশ্য দিয়ে। অর্থাৎ গোরা-পরবর্তী রচনায় বুদ্ধিবৃত্তিক আতিশয্য, চরিত্রের মুখপাত্রসুলভ ভূমিকা ও শেষ পর্বের নৈরাশ্য প্রবণতাকে হুমায়ুন কবির সীমাবদ্ধতা হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। এ ছাড়া রবীন্দ্র-উপন্যাসে বিত্তবান ও সংস্কৃতিমান শ্রেণির প্রাধান্য এবং দরিদ্র বাঙালিজীবনের অনুপস্থিতিকে লেখক সমালোচনা করেন।

গ্রন্থের প্রথম অধ্যায়ে বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়কে বাংলা উপন্যাসের প্রতিষ্ঠাতা সাহিত্যিক হিসেবে বিবেচনার পাশাপাশি তাঁর সাহিত্যকর্মের পেছনে ক্রিয়াশীল ঐতিহাসিক ও সামাজিক পরিস্থিতির অনুসন্ধান করা হয়েছে। ঔপনিবেশিক শাসন, পাশ্চাত্য শিক্ষার প্রভাব, নবজাগরণের চেতনা এবং বাঙালি মধ্যবিত্ত শ্রেণির বিকাশ বাংলা উপন্যাসের আবির্ভাবের সঙ্গে কীভাবে সম্পর্কিত, লেখক তা বিশ্লেষণ করেছেন।

তৃতীয় অধ্যায়ে শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের উপন্যাসের বাস্তবধর্মী বৈশিষ্ট্য বিশ্লেষিত হয়েছে। শরৎচন্দ্রের সাহিত্যজগৎ মূলত সাধারণ মানুষের জীবন, সামাজিক অনাচার, পারিবারিক সংকট, প্রেম, বিবাহ, নারীর অবস্থান এবং প্রচলিত সমাজব্যবস্থার সঙ্গে ব্যক্তিমানুষের সংঘাতকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে। তাঁর উপন্যাসের জনপ্রিয়তার পেছনে মানুষের দৈনন্দিন অভিজ্ঞতা ও আবেগকে সহজ ভাষায় প্রকাশ করার অসাধারণ ক্ষমতা কাজ করেছে। তবে হুমায়ুন কবির শরৎচন্দ্রের জনপ্রিয়তাকে শুধু আবেগনির্ভর সাহিত্যিক সাফল্য হিসেবে বিবেচনা করেননি। তাঁর মতে, শরৎচন্দ্রের উপন্যাসে নিহিত সামাজিক প্রতিবাদ, মানবিক সহমর্মিতা এবং প্রচলিত নৈতিকতার বিরুদ্ধে ব্যক্তিমানুষের অবস্থান বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে।

গ্রন্থের শেষ অধ্যায় সমকালীন বাংলা উপন্যাস নিয়ে। এখানে বাংলা উপন্যাসের আধুনিক পর্যায়ের পরিবর্তনকে সামাজিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক বাস্তবতার সঙ্গে সম্পর্কিত করে দেখা হয়েছে। আধুনিক মানুষের অস্তিত্বসংকট, শ্রেণিবিভাজন, নগরজীবনের জটিলতা, গ্রামীণ সমাজের পরিবর্তন, ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্য, যৌনতা, নারী-পুরুষের সম্পর্ক এবং রাজনৈতিক চেতনার নানা দিক সমকালীন উপন্যাসে কীভাবে প্রতিফলিত হয়েছে, লেখক তা অনুসন্ধান করেছেন।

গ্রন্থের শেষ অধ্যায় সমকালীন বাংলা উপন্যাস নিয়ে। এখানে বাংলা উপন্যাসের আধুনিক পর্যায়ের পরিবর্তনকে সামাজিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক বাস্তবতার সঙ্গে সম্পর্কিত করে দেখা হয়েছে। আধুনিক মানুষের অস্তিত্বসংকট, শ্রেণিবিভাজন, নগরজীবনের জটিলতা, গ্রামীণ সমাজের পরিবর্তন, ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্য, যৌনতা, নারী-পুরুষের সম্পর্ক এবং রাজনৈতিক চেতনার নানা দিক সমকালীন উপন্যাসে কীভাবে প্রতিফলিত হয়েছে, লেখক তা অনুসন্ধান করেছেন। এই পর্যায়ে বাংলা উপন্যাসের বিষয়বস্তু ও আঙ্গিক উভয় ক্ষেত্রেই পরিবর্তনের পরিচয় পাওয়া যায়। বাস্তবতার প্রচলিত উপস্থাপন থেকে বেরিয়ে এসে মানুষের চেতনা, অভিজ্ঞতা ও অস্তিত্বের জটিলতাকে প্রকাশ করার প্রবণতা আধুনিক উপন্যাসকে নতুন মাত্রা দিয়েছে। সমকালীন উপন্যাসের আলোচনায় লেখকের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রবণতা হলো সাহিত্যকে তার সময় থেকে বিচ্ছিন্ন করে না দেখা। কোনো সাহিত্যকর্মের মূল্যায়নে তার সামাজিক পটভূমি, ঐতিহাসিক অবস্থান এবং মানুষের জীবন-অভিজ্ঞতাকে বিবেচনায় নেওয়ার প্রয়োজনীয়তা তিনি বারবার স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন।

সর্বোপরি এই গ্রন্থে গবেষক উপন্যাসকে দেখাতে চেয়েছেন সমাজ, দর্শন ও ইউরোপীয় সাহিত্যের সঙ্গে মিলিয়ে এবং বাংলা উপন্যাসের বিবর্তনকে উপস্থাপন করেছেন যুগবাস্তবতার নিরিখে। ফলে সূচনাপর্বের সীমাবদ্ধতা থেকে লেখক বঙ্কিমকে তুলনামূলক এগিয়ে রেখেছেন। যার ধারাবাহিকতা বঙ্কিম থেকে রবীন্দ্রনাথ এবং রবীন্দ্রনাথ থেকে শরৎচন্দ্র—এই তুলনামূলক আলোচনাতেও পাওয়া যায়। অধ্যাপক হুমায়ুন কবিরের বাঙলা উপন্যাস গ্রন্থটির মূল শক্তি নিহিত রয়েছে এর তুলনামূলক ও সমাজতাত্ত্বিক বিচারপদ্ধতিতে। সুব্রত বড়ুয়ার অনবদ্য অনুবাদ এবং বাংলা একাডেমির এই প্রকাশনা বাংলাভাষী পাঠক ও গবেষকদের জন্য অমূল্য সম্পদ হয়ে থাকবে।

...

বাঙলা উপন্যাস

হুমায়ুন কবির

অনুবাদক: সুব্রত বড়ুয়া

প্রকাশক: বাংলা একাডেমি

প্রকাশ: ফেব্রুয়ারি ২০২৬

প্রচ্ছদ: মামুন কায়সার

পৃষ্ঠা: ১০৮; মূল্য: ২৪০ টাকা

Read full story at source