প্রথমবার ডাইনোসরের জীবাশ্মে পাওয়া গেল লাল রক্তকণিকা

· Prothom Alo

জুরাসিক পার্ক মুভির সেই কল্পকাহিনী কি তবে সত্যিই বাস্তবে রূপ নিতে চলেছে? ১১ কোটি ৫০ লাখ বছরের জমাট বাঁধা পাথরের বুকে সুরক্ষিত থাকা ডাইনোসরের লাল রক্তকণিকাগুলো কি আমাদের এমন কোনো ভয়ংকর আণবিক রহস্যের সন্ধান দিতে যাচ্ছে, যা কোটি কোটি বছর আগের পৃথিবীর অজানা প্রাণীদের নতুন করে জাগিয়ে তুলতে পারে...

জুরাসিক পার্ক বা জুরাসিক ওয়ার্ল্ড মুভি দেখেছেন? দেখে থাকলেই নিশ্চয়ই জানেন, সেখানে কীভাবে মশার পেটে থাকা লাখো কোটি বছরের পুরোনো ডাইনোসরের রক্ত থেকে বিজ্ঞানীরা আস্ত ডাইনোসর তৈরি করে ফেলেছিলেন! মুভির পর্দায় এমন গা ছমছমে দৃশ্য দেখে আপনার মনেও হয়তো কখনো প্রশ্ন জেগেছে—সত্যিই কি কোটি কোটি বছর আগের কোনো ডাইনোসরের রক্ত আজও পৃথিবীতে টিকে থাকতে পারে? বিজ্ঞানীদের দীর্ঘদিনের ধারণা ছিল, ফসিল হওয়ার সময় প্রাণীদের নরম রক্ত বা মাংসপেশি পুরোপুরি নষ্ট হয়ে যায়, শুধু শক্ত হাড় বা দাঁতগুলোই পাথর হয়ে টিকে থাকে। কিন্তু সম্প্রতি অস্ট্রেলিয়ার কার্টিন ইউনিভার্সিটির বিজ্ঞানীদের নেতৃত্বে এক আন্তর্জাতিক গবেষক দল এমন এক অবিশ্বাস্য আবিষ্কার করেছেন, যা জীবাশ্ম বিজ্ঞানের পুরোনো সব তথ্যকে যেন এক নিমেষে ভুল প্রমাণ করে দিয়েছে!

Visit betsport.cv for more information.

বিজ্ঞানীরা প্রথমবারের মতো প্রায় ১১ কোটি ৫০ লাখ বছরের পুরোনো একটি ডাইনোসরের জীবাশ্মের ভেতরে অবিকৃত লাল রক্তকণিকা এবং রক্তের মূল উপাদান ‘হিম’ খুঁজে পাওয়ার অকাট্য প্রমাণ হাজির করেছেন। এই যুগান্তকারী আবিষ্কারটি শুধু একটি নির্দিষ্ট ডাইনোসরের গল্প নয়, বরং এটি জীবাশ্ম নিয়ে আমাদের প্রচলিত ধারণাকে পুরোপুরি বদলে দিয়েছে।

ডাইনোসর কি এখনো টিকে থাকতে পারত
বিজ্ঞানীরা প্রথমবারের মতো প্রায় ১১ কোটি ৫০ লাখ বছরের পুরোনো একটি ডাইনোসরের জীবাশ্মের ভেতরে অবিকৃত লাল রক্তকণিকা এবং রক্তের মূল উপাদান হিম খুঁজে পাওয়ার প্রমাণ হাজির করেছেন।

বিজ্ঞানীরা মূলত অ্যারাটাসরাস (Aratasaurus museunacionali) নামের একটি থেরোপড ডাইনোসরের পেছনের পায়ের হাড় নিয়ে গবেষণা করছিলেন। এই ভয়ংকর চেহারার ডাইনোসরটি আজ থেকে প্রায় ১১ কোটি ৫০ লাখ বছর আগে বর্তমানের ব্রাজিল অঞ্চলে দাপিয়ে বেড়াত। হাড়ের ভেতরের গঠন পরীক্ষা করতে গিয়ে বিজ্ঞানীরা অণুবীক্ষণ যন্ত্রের নিচে গোল গোল কিছু অদ্ভুত আণুবীক্ষণিক গঠন দেখতে পান, যেগুলো দেখতে হুবহু লাল রক্তকণিকার মতো! কিন্তু শুধু চোখের দেখায় তো আর বিজ্ঞানের দুনিয়ায় কিছু প্রমাণ করা যায় না। তাই তারা আধুনিক প্রযুক্তির সাহায্য নিলেন।

হাই-পারফরম্যান্স লিকুইড ক্রোমাটোগ্রাফি-ম্যাস স্পেকট্রোমেট্রি (HPLC-MS) নামের এক অত্যাধুনিক প্রযুক্তির মাধ্যমে তারা নিশ্চিত হন, ওই গোলাকার গঠনগুলোর ভেতরে ‘হিম’ (Heme) নামে অণু রয়েছে। হিম হলো সেই বিশেষ উপাদান, যা আমাদের রক্তে অক্সিজেন বহন করে। এটি আমাদের রক্তের লোহিত রক্তকণিকায় অবস্থিত হিমোগ্লোবিন (Hemoglobin) নামক প্রোটিনের মূল উপাদান।

আপনার মনে হতে পারে, কোটি কোটি বছর ধরে মাটিতে পড়ে থাকা হাড়ের ভেতরে অন্য কোনো ব্যাকটেরিয়া বা উদ্ভিদের রক্তকণিকাও তো মিশে যেতে পারে! তবে বিজ্ঞানীরা এই বিষয়েও পুরোপুরি নিশ্চিত হয়েছেন। তারা দেখেছেন, ডাইনোসরের হাড়ের ভেতরের এই হিম বাইরের কোনো উদ্ভিদ বা ব্যাকটেরিয়ার উপাদানের সঙ্গে মিশে যায়নি।

ডাইনোসর কত বছর বাঁচত
হাড়ের ভেতরের গঠন পরীক্ষা করতে গিয়ে বিজ্ঞানীরা অণুবীক্ষণ যন্ত্রের নিচে গোল গোল কিছু অদ্ভুত আণুবীক্ষণিক গঠন দেখতে পান, যেগুলো দেখতে হুবহু লাল রক্তকণিকার মতো!

এরপর বিজ্ঞানীরা রামন স্পেকট্রোস্কোপি এবং ইলেকট্রন মাইক্রোস্কোপ ব্যবহার করে হাড়ের ভেতরের সেই সূক্ষ্ম গঠনগুলোকে আরও গভীরভাবে বিশ্লেষণ করেন। তাঁরা দেখতে পান, এই লাল রক্তকণিকাগুলো হাউসম্যানাইট নামে এক ধরনের প্রাকৃতিক ম্যাঙ্গানিজ অক্সাইড খনিজের (Mn3O4) ভেতরে আটকে গিয়ে খনিজ পদার্থে রূপান্তরিত হয়ে গেছে। মূলত এই বিশেষ খনিজ আবরণটিই একটি বর্মের মতো কাজ করেছে এবং কোটি কোটি বছর ধরে ডাইনোসরের রক্তের অণুগুলোকে নষ্ট হওয়া থেকে বাঁচিয়ে রেখেছে।

গবেষক দলের অন্যতম প্রধান অধ্যাপক ক্লিটি গ্রাইস এই আবিষ্কারকে রোমাঞ্চকর বলে বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেন, একজন ভূ-রসায়নবিদ হিসেবে যখন তিনি এই রক্তের উপাদানগুলো খুঁজে পেলেন, তখন তিনি বুঝতে পেরেছিলেন যে তারা বিজ্ঞানের ইতিহাসে কত বড় একটি মাইলফলক ছুঁতে চলেছেন।

এই আবিষ্কার আমাদের সামনে এক নতুন সম্ভাবনার দরজা খুলে দিয়েছে। অধ্যাপক গ্রাইসের মতে, জীবাশ্ম মানেই কেবল নির্জীব পাথর আর মিনারেলের টুকরো নয়। বিশেষ কিছু পরিবেশে এই জীবাশ্মগুলো তাদের আদিম মালিকের আণবিক ও রাসায়নিক তথ্যও বুকে ধারণ করে রাখতে পারে। মানে আমরা এখন হয়তো এমন সব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে পারব, যা কেবল জীবাশ্মবিদ্যা দিয়ে সমাধান করা সম্ভব ছিল না।

ডাইনোসর বাস্তবে কেমন ছিল
গ্রাইস বলেন, একজন ভূ-রসায়নবিদ হিসেবে যখন তিনি এই রক্তের উপাদানগুলো খুঁজে পেলেন, তখন তিনি বুঝতে পেরেছিলেন যে তারা বিজ্ঞানের ইতিহাসে কত বড় একটি মাইলফলক ছুঁতে চলেছেন।

অধ্যাপক গ্রাইস সারা বিশ্বের জাদুঘরগুলোকে একটি বিশেষ আহ্বান জানিয়েছেন। তাঁর মতে, জাদুঘরের কাঁচের শোকেসে যে হাজার হাজার জীবাশ্ম যুগ যুগ ধরে অলস পড়ে আছে, সেগুলোকে আধুনিক প্রযুক্তি দিয়ে নতুন করে পরীক্ষা করার সময় এসেছে। কে জানে, হয়তো সেই ধুলোপড়া পাথরগুলোর ভেতরেই লুকিয়ে আছে কোটি কোটি বছর আগের পৃথিবীর জীববিজ্ঞান এবং পরিবেশের এক অসাধারণ আর্কাইভ! এই একটিমাত্র আবিষ্কার প্রমাণ করে দিয়েছে, আণবিক জীবাশ্মবিদ্যার সাহায্যে আমরা অদূর ভবিষ্যতে বিলুপ্ত প্রাণীদের শারীরবৃত্তীয় আরও কত গভীর রহস্যের পর্দা উন্মোচন করতে পারব।

সূত্র: আইএফএল সায়েন্সটি-রেক্স কি সবচেয়ে বড় মাংসাশী ডাইনোসর

Read full story at source