সোলমেট পেতে জাদুবিদ্যার আশ্রয় নিচ্ছেন জেন–জিরা! প্রেমের জন্য ৬৪ শতাংশই ভরসা রাখছেন লাভ স্পেল, ট্যারো, ম্যানিফেস্টেশনে

· Prothom Alo

ডেটিং অ্যাপে একের পর এক সোয়াইপ, পছন্দের মানুষের মেসেজের অপেক্ষা কিংবা ভেঙে যাওয়া সম্পর্ক জোড়া লাগানোর চেষ্টা। প্রেমের অনিশ্চয়তা যেন কাটতেই চায় না। আর এই অনিশ্চয়তা থেকে মুক্তি পেতে জেন–জির একাংশ এখন ভরসা রাখছেন অন্য রকম কিছু অভ্যাসে।

Visit aportal.club for more information.

জেন–জিরা প্রেমের খোঁজে কেউ ম্যানিফেস্টেশন করছেন, কেউ ট্যারো কার্ডের সাহায্য নিচ্ছেন, আবার কেউ অনলাইনে খুঁজছেন লাভ স্পেল বা ভালোবাসার জাদুমন্ত্র। সোলমেট খুঁজে পেতে আধুনিক প্রযুক্তির পাশাপাশি জাদুবিদ্যার প্রতিও কেন বাড়ছে আগ্রহ?

প্রেমের জন্য ৬৪ শতাংশ জেন–জির বিশেষ চর্চা

যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক ডেটিং নিউজ (DatingNews)-এর ১ হাজার ১৩ জন প্রাপ্তবয়স্কের ওপর করা একটি জরিপে উঠে এসেছে চমকপ্রদ তথ্য। জরিপে অংশ নেওয়া যুক্তরাষ্ট্রের জেন–জিদের ৬৪ শতাংশ জানিয়েছেন, ভালোবাসার মানুষ খুঁজে পেতে বা প্রেমের সম্পর্ক ভালো করতে তাঁরা জীবনে অন্তত একবার আধ্যাত্মিক, সাইকিক কিংবা জাদুবিদ্যাসংশ্লিষ্ট কোনো পদ্ধতি চেষ্টা করেছেন।

এর মধ্যে সবচেয়ে জনপ্রিয় ম্যানিফেস্টেশন বা স্ক্রিপ্টিং। জরিপে ২৯ শতাংশ জেন–জি জানিয়েছেন, তাঁরা এই পদ্ধতি অনুসরণ করেছেন। ২৫ শতাংশ পরামর্শ নিয়েছেন সাইকিকের, ১৭ শতাংশ গিয়েছেন ট্যারো কার্ড রিডারের কাছে এবং ১৬ শতাংশ নির্ভর করেছেন অ্যাস্ট্রোলজি বা রাশিচক্রের সামঞ্জস্যের ওপর। শুধু তা-ই নয়, ১৯ শতাংশ অনলাইন প্ল্যাটফর্ম থেকে লাভ স্পেল বা ভালোবাসার বিশেষ রিচুয়ালের জন্য অর্থও ব্যয় করেছেন।
এটি যুক্তরাষ্ট্রের জরিপের ফল, বিশ্বের সব দেশের জেন–জির ওপর করা কোনো গবেষণা নয়। তবে অনলাইন সংস্কৃতিতে ছড়িয়ে পড়া এই প্রবণতা তরুণ প্রজন্মের প্রেম ও সম্পর্ক নিয়ে ভাবনার একটি নতুন দিক তুলে ধরছে।

ম্যানিফেস্টেশন থেকে লাভ স্পেল, কী করছেন তাঁরা?

ম্যানিফেস্টেশন হলো নিজের কাঙ্ক্ষিত ভবিষ্যৎ নিয়ে ইতিবাচক চিন্তা করা এবং সেই লক্ষ্য অর্জনের ইচ্ছাকে গুরুত্ব দেওয়া। প্রেমের ক্ষেত্রে কেউ কেমন জীবনসঙ্গী চান, সম্পর্কের মধ্যে কী ধরনের অনুভূতি ও বোঝাপড়া আশা করেন, সেসব লিখে রাখেন। এই প্রক্রিয়ার একটি পরিচিত ধরন স্ক্রিপ্টিং। এতে নিজের কাঙ্ক্ষিত সম্পর্কটি বাস্তবে তৈরি হয়েছে, এমনভাবে মনের ভাবনা লিখে রাখেন অনেকে।

অন্যদিকে, ট্যারো কার্ড রিডিংয়ের মাধ্যমে কারও প্রেমজীবনের ভবিষ্যৎ বা বর্তমান সম্পর্কের পরিস্থিতি সম্পর্কে ধারণা পাওয়ার চেষ্টা করেন কেউ কেউ। সাইকিকের কাছে গিয়ে ব্যক্তিগত জীবন ও প্রেমের ভবিষ্যৎ সম্পর্কে পরামর্শ নেওয়ার প্রবণতাও রয়েছে।
আর লাভ স্পেল বা লাভ রিচুয়াল বলতে বোঝায় ভালোবাসার মানুষকে আকৃষ্ট করা, পুরোনো সম্পর্ক ফিরিয়ে আনা কিংবা বর্তমান সম্পর্ক ভালো করার উদ্দেশ্যে বিভিন্ন প্রতীকী আচার পালন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও অনলাইন মার্কেটপ্লেসে এসব সেবা দেওয়ার বিজ্ঞাপনও দেখা যায়।

ডেটিং অ্যাপে হতাশা, জাদুবিদ্যায় বাড়তি আগ্রহ?

আধুনিক প্রেমের ক্ষেত্রে যোগাযোগের সুযোগ অনেক বেড়েছে। কিন্তু মনের কথা বোঝা কিংবা সম্পর্কের ভবিষ্যৎ নিয়ে নিশ্চিত হওয়া সহজ হয়নি। কখনো মেসেজের উত্তর আসে না, কখনো সম্পর্কের নাম দেওয়া যায় না, আবার কখনো দীর্ঘদিনের সম্পর্কও ভেঙে যায় কোনো স্পষ্ট কারণ ছাড়াই।

এমন পরিস্থিতিতে ভবিষ্যৎ সম্পর্কে একটু আশ্বাস পেতে চান অনেকেই। পছন্দের মানুষটি ফিরবেন কি না, নতুন কেউ জীবনে আসবেন কি না কিংবা চলমান সম্পর্কটি টিকবে কি না। এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে কেউ কেউ ট্যারো, অ্যাস্ট্রোলজি কিংবা ম্যানিফেস্টেশনের দিকে ঝুঁকছেন।

মনোবিজ্ঞানের গবেষণাতেও অনিশ্চয়তার সময়ে প্রতীকী আচার বা রিচুয়ালের প্রতি মানুষের আকর্ষণের একটি ব্যাখ্যা পাওয়া যায়। হার্ভার্ড বিজনেস স্কুলের গবেষক মাইকেল নর্টন ও ফ্রান্সেসকা জিনো ২০১৪ সালে প্রকাশিত এক গবেষণায় দেখিয়েছেন, প্রিয়জন হারানো কিংবা প্রেমের সম্পর্ক ভেঙে যাওয়ার পর বিভিন্ন রিচুয়াল পালন মানুষের শোক ও মানসিক কষ্ট কিছুটা কমাতে পারে। গবেষণায় এর পেছনে নিজের পরিস্থিতির ওপর নিয়ন্ত্রণ ফিরে পাওয়ার অনুভূতিকে গুরুত্বপূর্ণ কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।

অর্থাৎ, কোনো রিচুয়াল মানুষকে মানসিক স্বস্তি দিতে পারে। তবে এর অর্থ এই নয় যে, সেই আচার অন্য কারও অনুভূতি বা সিদ্ধান্ত বদলে দিতে পারে।

লাভ স্পেল কি সত্যিই কাজ করে?

জরিপে অংশ নেওয়া যেসব জেন–জি পদ্ধতিগুলো চেষ্টা করেছেন, তাঁদের ৪৬ শতাংশ জানিয়েছেন, তাঁদের অভিজ্ঞতায় এগুলো অনেক ক্ষেত্রেই কাজ করেছে। এর মধ্যে ১৭ শতাংশ মনে করেন, পদ্ধতিগুলো সত্যিই কার্যকর হয়েছে। অন্যদিকে ২৯ শতাংশের অভিজ্ঞতা ছিল আংশিক সফলতার।

তবে এই ফলাফল ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতাভিত্তিক। কোনো লাভ স্পেল বা ট্যারো রিডিংয়ের কারণে কারও সম্পর্ক ভালো হয়েছে কিংবা সাবেক সঙ্গী ফিরে এসেছেন, এমন বৈজ্ঞানিক প্রমাণ এই জরিপ দেয়নি। অনেক সময় কোনো ঘটনার সঙ্গে একটি রিচুয়ালের সময় মিলে গেলেই মানুষ সেটিকে কার্যকারণ হিসেবে ধরে নিতে পারেন।

এ বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয় ও ইউনিভার্সিটি অব ক্যালিফোর্নিয়া, বার্কলের গবেষকদের ২০১৬ সালের একটি গবেষণাও প্রাসঙ্গিক। গবেষণায় দেখা গেছে, নির্দিষ্ট কিছু রিচুয়াল উদ্বেগ কমাতে সাহায্য করতে পারে। এমনকি প্রথম ডেটের মতো পরিস্থিতিতেও মানসিক চাপ সামলাতে প্রতীকী ভূমিকা রাখতে পারে। তবে এটি লাভ স্পেল দিয়ে কাউকে প্রেমে ফেলা সম্ভব, এমন কোনো প্রমাণ নয়।

শুধু স্বপ্ন দেখলেই কি মিলবে ভালোবাসা?

কাঙ্ক্ষিত সম্পর্কের কথা ভাবা বা নিজের মনের ইচ্ছাগুলো লিখে রাখা অনেকের কাছে ইতিবাচক অভ্যাস হতে পারে। কিন্তু শুধু কল্পনা করলেই কাঙ্ক্ষিত সম্পর্ক তৈরি হবে, এমন নিশ্চয়তা নেই।

নিউইয়র্ক ইউনিভার্সিটি ও জার্মানির ইউনিভার্সিটি অব হামবুর্গের মনোবিজ্ঞানী গ্যাব্রিয়েলে ওটিঙ্গেনের গবেষণায় ইতিবাচক কল্পনা ও বাস্তব পদক্ষেপের সম্পর্ক বিশ্লেষণ করা হয়েছে। তাঁর গবেষণা বলছে, শুধু কাঙ্ক্ষিত ভবিষ্যতের স্বপ্নে ডুবে থাকলে লক্ষ্য অর্জনের জন্য প্রয়োজনীয় প্রচেষ্টা কমে যেতে পারে। বরং নিজের ইচ্ছার পাশাপাশি বাস্তব বাধাগুলো চিহ্নিত করে সেগুলো অতিক্রমের পরিকল্পনা করা বেশি কার্যকর।

প্রেমের ক্ষেত্রেও বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। কেমন সঙ্গী চান, তা জানা যেমন প্রয়োজন, তেমনি নিজের প্রত্যাশা স্পষ্ট করা, পারস্পরিক সম্মান বজায় রাখা এবং সম্পর্কের ক্ষেত্রে খোলামেলা যোগাযোগও জরুরি।

প্রেমের পরামর্শে এখনো এগিয়ে থেরাপি

জেন–জির এই নতুন প্রবণতা দেখে মনে হতে পারে, তাঁরা বুঝি সম্পর্কের সমস্যায় প্রচলিত পরামর্শের চেয়ে জাদুবিদ্যার ওপর বেশি নির্ভর করছেন। কিন্তু জরিপের ফল বলছে ভিন্ন কথা।

ডেটিং নিউজ (DatingNews)-এর জরিপে ৩৮ শতাংশ জেন–জি প্রেম ও সম্পর্কের বিষয়ে সবচেয়ে বেশি আস্থা রেখেছেন থেরাপির ওপর। অন্যদিকে ১৪ শতাংশ দৈনিক রাশিফল, ১০ শতাংশ সাইকিক বা ট্যারো রিডারের পরামর্শ এবং ৮ শতাংশ লাভ স্পেলের ওপর আস্থা রাখার কথা জানিয়েছেন। অর্থাৎ, আধ্যাত্মিক চর্চার প্রতি আগ্রহ থাকলেও মানসিক স্বাস্থ্য ও পেশাদার পরামর্শের গুরুত্ব তাঁদের কাছে এখনো রয়েছে।
সব মিলিয়ে, সোলমেট খোঁজার এই নতুন প্রবণতা আসলে ভালোবাসার অনিশ্চয়তার মধ্যে একটু ভরসা ও মানসিক স্বস্তি খোঁজারই আরেকটি প্রকাশভঙ্গি মাত্র।

ম্যানিফেস্টেশন, ট্যারো কিংবা ব্যক্তিগত কোনো রিচুয়াল নিজের চাওয়া-পাওয়াগুলো বুঝতে সাহায্য করতে পারে। কিন্তু একটি সুস্থ সম্পর্কের জন্য প্রয়োজন দুজনের সমান আগ্রহ, সম্মতি, বিশ্বাস ও পারস্পরিক বোঝাপড়া। কারণ ভালোবাসা একার ইচ্ছায় তৈরি হয় না; আর কোনো জাদুমন্ত্র দিয়ে অন্য মানুষের অনুভূতি নিয়ন্ত্রণ করাও সম্ভব নয়।

তথ্যসূত্র:

১. DatingNews, ৬ অক্টোবর ২০২৬: ১,০১৩ জন মার্কিন প্রাপ্তবয়স্কের ওপর করা জরিপ; জেন–জির প্রেমসংক্রান্ত আধ্যাত্মিক চর্চার পরিসংখ্যান ও গবেষণাপদ্ধতি।
DatingNews.com

২. Harvard Business School, ২০১৪: Michael I. Norton ও Francesca Gino-এর Rituals Alleviate Grieving for Loved Ones, Lovers, and Lotteries গবেষণা।
PubMed+1

৩. Harvard ও UC Berkeley-এর গবেষক দল, ২০১৬: Don''t Stop Believing: Rituals Improve Performance by Decreasing Anxiety।
faculty.haas.berkeley.edu

৪. Gabriele Oettingen, ২০১৬: The Power of Prospection: Mental Contrasting and Behavior Change।
Wiley Online Library

৫. Pew Research Center, ২০২৫: যুক্তরাষ্ট্রের প্রাপ্তবয়স্কদের অ্যাস্ট্রোলজি, ট্যারো ও ভাগ্য গণনার চর্চা নিয়ে ৯,৫৯৩ জনের জরিপ। এতে দেখা যায়, অধিকাংশ অংশগ্রহণকারী এসব চর্চায় মূলত বিনোদনের জন্য যুক্ত হন।

৬. নিউজ উইক ও সিবিএস নিউজ।

ছবি: এআই

Read full story at source