স্কুলে বুলিংয়ের শিকার হলে কী করবে?

· Prothom Alo

স্কুল মানে পড়াশোনা। পাশাপাশি এখানে নতুন বন্ধু হয়, খেলাধুলা চলে, জমে আড্ডা। কিন্তু কখনো কখনো এসব আনন্দ মাটি হয়ে যায় বুলিংয়ের কারণে। কেউ হয়তো গায়ের রং নিয়ে খোঁটা দেয়, কেউ শরীরের গড়ন নিয়ে হাসাহাসি করে। কেউ আবার ধাক্কা দেয়, জিনিসপত্র কেড়ে নেয় কিংবা অন্যদের সঙ্গে মিশতে বাধা দেয়। এমন ঘটনা শুধু মন খারাপের কারণ নয়, দীর্ঘদিনের জন্য মনের ওপরও প্রভাব ফেলতে পারে। কিশোর আলোতে প্রকাশিত ‘বুলিং নিয়ে তুমি কতটা সচেতন’ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, প্রতি চারজন শিক্ষার্থীর মধ্যে অন্তত একজন জীবনের কোনো না কোনো সময় স্কুলে বুলিংয়ের শিকার হয়।

বুলিং কী?

Visit esporist.org for more information.

ইচ্ছাকৃতভাবে কাউকে ভয় দেখানো, অপমান করা কিংবা কষ্ট দেওয়াকে বুলিং বলে। এটি হতে পারে শারীরিক, আবার মানসিকও। ২০২৩ সালের ১৪ সেপ্টেম্বর দ্য ডেইলি স্টারে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের মনোরোগ বিশেষজ্ঞ ডা. হেলাল উদ্দিন আহমেদ বলেন, ‘বুলিং শারীরিক, মানসিক উভয়ই হতে পারে। যেকোনো ধরনের বুলিং শিশুর মনে দীর্ঘস্থায়ী মনের ক্ষত তৈরি করতে পারে, যা ভবিষ্যতে ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে।’ তাঁর মতে, ইন্টারনেটে সহিংস কনটেন্ট দেখে কেউ কেউ সমবয়সীদের সঙ্গে তেমন আচরণ করার চেষ্টা করে এবং এতে সাময়িক আনন্দ পায়।

বুলিংয়ের ধরনও অনেক রকম। গায়ের রং, উচ্চতা কিংবা শরীরের গড়ন নিয়ে খোঁটা দেওয়া, অপমানজনক নামে ডাকা, ধাক্কা দেওয়া, টিফিনবক্স কেড়ে নেওয়া কিংবা দল থেকে কাউকে আলাদা করে রাখা—এসবই বুলিংয়ের উদাহরণ। শুধু সামনাসামনি নয়, অনলাইনেও বুলিং হতে পারে। ফেসবুক বা মেসেঞ্জারে কাউকে নিয়ে বাজে মন্তব্য করা, অপমান করা কিংবা হেনস্তা করাও এর মধ্যে পড়ে।

বুলিং নিয়ে তুমি কতটা সচেতনবুলিং শিশুর মানসিক স্থিতিশীলতা ও আত্মবিশ্বাসকে ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করে

বুলিংয়ের শিকার হলে কী হয়?

বুলিংয়ের শিকার হলে অনেকেই কাউকে কিছু বলতে চায় না। কেউ ভয় পায়, কেউ ভাবে, কথাটা জানালে পরিস্থিতি আরও খারাপ হবে। আবার কেউ মনে করে, এসব ঘটনা কাউকে বলার মতো কিছু নয়। কিন্তু কষ্ট চেপে রাখলে সমস্যা আরও বাড়তে পারে।

ডা. হেলাল উদ্দিন আহমেদের মতে, বুলিংয়ের কারণে শিশুর আত্মবিশ্বাস কমে যেতে পারে। স্কুলে যেতে অনীহা তৈরি হয়, মেজাজ খিটখিটে হয়ে যায়, খাবারে অরুচি দেখা দেয়, ঘুমের সমস্যা হয়। কেউ অবসাদে ভুগতে পারে, কেউ আবার নিজেকে সবার কাছ থেকে গুটিয়ে নেয়।

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোবিজ্ঞান বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক লাইলুন নাহার প্রথম আলোকে দেওয়া এক বক্তব্যে বলেন, ছোটবেলায় নিগৃহীত হওয়ার ঘটনা আমরা সহজে ভুলতে পারি না। কারণ, সে সময় আত্মমর্যাদার জায়গাটা শক্ত থাকে না। সেই কষ্ট অবচেতন মনের গভীরে জায়গা করে নেয়।

তাই বুলিংকে কখনোই হালকাভাবে নেওয়া উচিত নয়। কারও কাছে ঘটনাটি ছোট মনে হলেও, যার সঙ্গে ঘটছে, তার কাছে সেটি ভীষণ কষ্টের হতে পারে।

তাহলে তুমি কী করবে?

প্রথম কথা, চুপ করে থেকো না। বুলিংয়ের শিকার হলে মা-বাবা, শিক্ষক কিংবা বিশ্বস্ত কোনো বড় মানুষের সঙ্গে কথা বলো। কী ঘটেছে, কারা এমন করছে, কত দিন ধরে করছে সবকিছু খুলে বলো। সাহায্য চাওয়ার মানে দুর্বলতা নয়। বরং নিজের নিরাপত্তার জন্য সাহায্য চাওয়া খুব গুরুত্বপূর্ণ।

বুলিংয়ের ঘটনা লুকিয়ে না রেখে বিশ্বস্ত বড়দের সঙ্গে কথা বলা জরুরি।

মা-বাবার সঙ্গেও এমন সম্পর্ক তৈরি হওয়া দরকার, যাতে মন খারাপের কথা নির্ভয়ে বলা যায়। ডা. হেলাল উদ্দিন আহমেদ মনে করেন, শিশুকে সরাসরি বুলিং নিয়ে প্রশ্ন না করে অন্যকে কথা বা কাজের মাধ্যমে কষ্ট দেওয়ার বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করা যেতে পারে। এ ধরনের আচরণ যে মোটেও ভালো নয়, সেটিও বুঝিয়ে বলা দরকার।

বুলিংয়ের শিকার হলে সম্ভব হলে শান্ত থেকে স্পষ্টভাবে জানিয়ে দাও, এমন আচরণ তোমার ভালো লাগছে না। আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে প্রতিবাদ করতে পারলে কখনো কখনো অন্যজন থেমে যেতে পারে। তবে সব পরিস্থিতিতে একা প্রতিবাদ করতে যাওয়া নিরাপদ নয়। কেউ মারধর করলে, হুমকি দিলে কিংবা পরিস্থিতি বিপজ্জনক মনে হলে নিরাপদ জায়গায় সরে যাও এবং দ্রুত বড়দের সাহায্য নাও।

মনে রেখো, বুলিংয়ের শিকার হলে তোমাকে সব সময় চুপ থাকতে হবে, এমন কোনো কথা নেই। আবার প্রতিবার নিজেকেই পরিস্থিতি সামলাতে হবে, সেটিও নয়। একই ঘটনা বারবার ঘটলে কিংবা প্রতিবাদ করার পরও বুলিং চলতে থাকলে শিক্ষক বা স্কুল কর্তৃপক্ষকে জানাও। প্রয়োজন হলে মা-বাবাকে সঙ্গে নিয়ে বিষয়টি সমাধানের চেষ্টা করো।

অনলাইনে বুলিংয়ের শিকার হলেও চুপ করে থেকো না। অপমানজনক বার্তার উত্তর দিতে গিয়ে ঝগড়ায় জড়ানোর দরকার নেই। প্রয়োজনে বার্তার স্ক্রিনশট রেখে দাও, অ্যাকাউন্টটি ব্লক করো এবং বিশ্বস্ত বড় কাউকে জানাও।

অস্ট্রেলিয়ায় ১৬ বছরের নিচে সোশ্যাল মিডিয়া নিষিদ্ধ, এটা কি কিশোরদের জন্য ভালোবুলিং শিশুর মানসিক স্থিতিশীলতা ও আত্মবিশ্বাসকে ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করে

মনের যত্নও জরুরি

বুলিংয়ের ঘটনা ঘটলে মন খারাপ হওয়া, ভয় পাওয়া কিংবা স্কুলে যেতে না চাওয়া অস্বাভাবিক নয়। কিন্তু এসব কষ্ট যদি দীর্ঘদিন ধরে চলতে থাকে, দৈনন্দিন জীবন ব্যাহত হয় কিংবা নিজেকে সামলানো কঠিন হয়ে পড়ে, তাহলে মা-বাবা বা বিশ্বস্ত বড় কারও সাহায্য নাও। প্রয়োজন হলে মনোরোগ বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিতে হবে। ডা. হেলাল উদ্দিন আহমেদ মনে করেন, কিছু ক্ষেত্রে কাউন্সেলিং ও ওষুধেরও প্রয়োজন হতে পারে।

তবে বুলিং বন্ধ করার দায়িত্ব শুধু যে এর শিকার হচ্ছে, তার নয়। যে বুলিং করছে, তার আচরণও বদলানো জরুরি। নিজের সন্তান অন্য কাউকে বুলি করছে কি না, সে বিষয়ে মা-বাবাকে সচেতন থাকতে হবে। শিক্ষকদেরও খেয়াল রাখতে হবে, যাতে স্কুলে কেউ অন্যের হাতে নিয়মিত অপমানিত বা নিগৃহীত না হয়।

স্কুল হওয়ার কথা এমন একটি জায়গা, যেখানে সবাই নিরাপদ বোধ করবে, নতুন কিছু শিখবে এবং বন্ধুদের সঙ্গে আনন্দ করবে। সেখানে কাউকে ভয় নিয়ে দিন কাটাতে হবে কেন? তাই কোথাও বুলিং হতে দেখলে দর্শক হয়ে থেকো না। নিরাপদভাবে ভুক্তভোগীর পাশে দাঁড়াও এবং প্রয়োজন হলে বড়দের জানাও।

মনে রেখো, বুলিংয়ের শিকার হওয়া তোমার দোষ নয়। কারও গায়ের রং, চেহারা, উচ্চতা, পোশাক কিংবা অন্য কোনো বৈশিষ্ট্য নিয়ে তাকে অপমান করার অধিকার কারও নেই। একা সামলাতে না পারলে সাহায্য চাইবে। তোমার কথা শোনার এবং তোমাকে নিরাপদ রাখতে সাহায্য করার মতো মানুষ নিশ্চয়ই আছে।

অস্ট্রেলিয়ায় ১৬ বছরের নিচে সোশ্যাল মিডিয়া নিষিদ্ধ, এটা কি কিশোরদের জন্য ভালো

Read full story at source