আমার কাছে নিউট্রিনো ততটাই বাস্তব, যতটা বাস্তব সামনে রাখা কফির কাপটা—ফ্রান্সিস হ্যালজেন
· Prothom Alo

প্রতি মুহূর্তে অসংখ্য অদৃশ্য কণা ছুটে যাচ্ছে আমাদের শরীরের ভেতর দিয়ে। আমি-আপনি বসে আছি, হাঁটছি, ঘুমাচ্ছি কিংবা এই লেখাটি পড়ছি—কোনো অবস্থাতেই এই কণার যাওয়া আসা থামানো সম্ভব নয়। এসব কণা আমাদের শরীরের ভেতর দিয়ে চলে যাচ্ছে, অথচ আমরা কিছুই টের পাচ্ছি না। এমনকি এতে আমাদের শরীরের কোনো ক্ষতিও হচ্ছে না। এই কণাগুলোর নাম নিউট্রিনো।
নিউট্রিনো নিয়ে গবেষণার জন্যই এ বছর পদার্থবিজ্ঞানে নোবেল পুরস্কার পেয়েছেন বেলজিয়ামে জন্ম নেওয়া মার্কিন পদার্থবিজ্ঞানী ফ্রান্সিস হ্যালজেন। ২০২৬ সালের ৬ অক্টোবর তাঁকে এই পুরস্কার দেওয়ার ঘোষণা দেওয়া হয়। সুইডিশ রয়্যাল একাডেমি অব সায়েন্সেস জানিয়েছে, অ্যান্টার্কটিকার বরফের গভীরে তৈরি আইসকিউব নিউট্রিনো অবজারভেটরিতে তাঁর গুরুত্বপূর্ণ অবদান এবং মহাজাগতিক উৎস থেকে আসা উচ্চশক্তির নিউট্রিনো শনাক্ত করার জন্য তাঁকে এই সম্মান দেওয়া হয়েছে।
Visit raccoongame.org for more information.
হ্যালজেন যুক্তরাষ্ট্রের উইসকনসিন-ম্যাডিসন বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থবিজ্ঞানের অধ্যাপক। নিউট্রিনো নামে অতি ক্ষুদ্র কণাগুলো নিয়ে তিনি কয়েক দশক ধরে কাজ করছেন। তাঁর নেতৃত্বে তৈরি হয়েছে এমন এক বিশাল যন্ত্র, যা অ্যান্টার্কটিকার বরফের গভীরে লুকিয়ে থেকে মহাবিশ্বের দূরদূরান্ত থেকে ছুটে আসা নিউট্রিনো শনাক্ত করে।
নিউট্রিনো সম্পর্কে বিজ্ঞানীরা অনেক কিছুই জেনেছেন। কিন্তু এই কণাগুলো এখনো মহাবিশ্বের অনেক রহস্যের চাবিকাঠি। এগুলো কোথা থেকে আসে? কীভাবে তৈরি হয়? এত সহজে সবকিছুর ভেতর দিয়ে চলে যেতে পারা কণাগুলোকে শনাক্ত করাই-বা সম্ভব কীভাবে?
নোবেল পুরস্কার পাওয়ার পর নিউইয়র্ক টাইমসের রিপোর্টার স্টিভেন কার্টজকে নিউট্রিনো নিয়ে কয়েকটি প্রশ্নের উত্তর দিয়েছিলেন ফ্রান্সিস হ্যালজেন। চলুন, তাঁর কাছ থেকেই জেনে নেওয়া যাক এই অদ্ভুত কণাগুলোর গল্প। প্রশ্নগুলো বিজ্ঞানচিন্তার পাঠকদের জন্য তুলে ধরেছেন অনিক রায়।
তৃতীয় শ্রেণির শিক্ষার্থীকে নিউট্রিনো বোঝাতে হলে কী বলবেন?
ফ্রান্সিস হ্যালজেন: নিউট্রিনোকে এমন এক ধরনের কণা বলতে পারেন, যা নিউক্লীয় পদার্থবিদ্যার অনেক গুরুত্বপূর্ণ প্রক্রিয়া ঘটতে সাহায্য করে। নিউক্লীয় পদার্থবিদ্যা না থাকলে সূর্য আলো দিত না, বিগ ব্যাং ঘটত না, নক্ষত্রগুলোও বিস্ফোরিত হতো না। আর কার্ল সেগান যেমন বলেছিলেন, আমরা সবাই নক্ষত্রের উপাদান দিয়ে তৈরি। অর্থাৎ, মহাবিশ্বের পদার্থ যেসব মৌলিক কণা দিয়ে গঠিত, নিউট্রিনোও তাদের একটি। আসলে মহাবিশ্বে নিউট্রিনোর সংখ্যা নিউট্রন, প্রোটন ও ইলেকট্রনের চেয়েও বেশি।
নিউট্রিনোকে বলা হয় মহাবিশ্বের দূরদূরান্ত থেকে আসা ‘ভূতুড়ে কণা’। কথাটা শুনলে তো অলৌকিক কিছু মনে হয়!
হ্যালজেন: আমি কখনো কখনো নিউট্রিনোকে বাস্তবতার সবচেয়ে ক্ষুদ্র সত্তা বলে থাকি। মনে হয়, কণাটি যেন আছেই, আবার নেইও। এর কোনো বৈদ্যুতিক আধান নেই। অন্য যেসব বস্তুর সংস্পর্শে আনা হয়, সেগুলোর সঙ্গে এটি প্রায় কোনো মিথস্ক্রিয়াই করে না। আমরা সবচেয়ে বেশি শক্তির নিউট্রিনো নিয়ে কাজ করি। তারপরও এত বিপুল সংখ্যক নিউট্রিনোর মধ্যে মাত্র একটি শনাক্ত করতে পারি, বাকিগুলো আমাদের যন্ত্রের মধ্য দিয়ে চলে যায়।
অচেনা মেইল পেয়ে কল ব্যাক করতেই শুনলেন নোবেল জয়ের খবরচারপাশে এমন এক রহস্যময় জগৎ রয়েছে, এটা জানলে আমাদের দৈনন্দিন জীবনে কী পরিবর্তন আসে?
হ্যালজেন: আসলে কোনো পরিবর্তনই আসে না। আমরা সব সময় সূর্য থেকে আসা নিউট্রিনোর সমুদ্রে ডুবে আছি। কিন্তু সেটা টের পাই না। কারণ, নিউট্রিনোগুলো আমাদের শরীরের সঙ্গে মিথস্ক্রিয়া করে না বললেই চলে।
নিউট্রিনো নিয়ে গবেষণা করতে আগ্রহী হলেন কেন?
হ্যালজেন: আমার পুরো কর্মজীবনে বাস্তবের খুব কাছাকাছি কোনো বিষয় নিয়ে কাজ করেছি, এমন নয়! শুরুতে আমি কোয়ার্ক নিয়ে গবেষণাপত্র লিখতাম। তখন ব্ল্যাকহোল বা কোয়ার্কের মতো বিষয় নিয়ে কাজ করলে অনেকে ভাবত, গবেষকটি হয়তো উদ্ভট কোনো ধারণা নিয়ে পড়ে আছেন।
আমরা যখন এই পরীক্ষার কাজ শুরু করি, তখন আশা করেছিলাম, সৌরজগতের বাইরের মহাকাশ থেকে আসা নিউট্রিনো দেখতে পাব। আমার মনে হয় না, তখন মানুষ আমাকে পাগলাটে গবেষক ভাবত। বরং তারা মনে করত, বরফ ব্যবহার করে এমন একটা কাজ করার ধারণা বেশ মজার। তবে এটি যে শেষ পর্যন্ত সফল হবে, সেই আশা তাদের খুব একটা ছিল না।
ফান্ডের জন্য আবেদন লেখার সময় এল নোবেল জয়ের খবরনিউট্রিনোর সঙ্গে আপনার ব্যক্তিগত সম্পর্ক কেমন? চোখে দেখতে পান না, এমন কিছু কল্পনা করলে আপনার মনে কী ছবি ভেসে ওঠে?
হ্যালজেন: নিউক্লীয় কণা নিয়ে যাঁরা কাজ করেন—এমনকি নিউট্রিনো নিয়ে গবেষণা না করলেও—তাঁদের সবাইকে এমন সব জিনিস নিয়ে কাজ করতে হয়, যা চোখে দেখা যায় না।
আমার কাছে নিউট্রিনো ততটাই বাস্তব, যতটা বাস্তব আমি যে ভবনে বসে আছি, কিংবা আমার সামনে রাখা কফির কাপ। আপনি যখন কণা নিয়ে গবেষণা করেন না, তখন হয়তো বিষয়টা কল্পনা করা কঠিন। কিন্তু আমার কাছে নিউট্রিনো বাস্তব। আমি অবশ্য এখনো মাটিতে দুই পা রেখেই চলি!
অজানা ও অদেখা বিষয় নিয়ে দুশ্চিন্তা না করে স্বাভাবিকভাবে এগিয়ে যাওয়ার কোনো পরামর্শ দেবেন?
হ্যালজেন: এই শনাক্তকরণ যন্ত্র তৈরি করতে আমাদের তিন দশক লেগেছে। প্রতিদিনের সমস্যাগুলো এত বড় হয়ে সামনে আসে যে, অতীতে কী করেছি বা ভবিষ্যতে কী করতে হবে, তা নিয়ে বসে ভাবার সময়ই পাওয়া যায় না। তখন শুধু যে কাজটা করতে হবে, সেটাই করে যেতে হয়। আলাদা করে বসে চিন্তা করার সময় খুব কম। একের পর এক সমস্যা আসে, আর আমরা সেগুলোর সমাধান করি।
একটু অদ্ভুত প্রশ্ন করি। আপনার কি মনে হয়, নিউট্রিনোর কোনো সচেতনতা আছে? অর্থাৎ, তারা কি কিছু অনুভব করতে পারে বা নিজেদের অস্তিত্ব সম্পর্কে জানে?
হ্যালজেন: না। নিউট্রিনোকে আমি কখনো এভাবে ভাবিনি। আমাদের শনাক্তকরণ যন্ত্রে যেসব কণা ধরা পড়ে, নিউট্রিনোও সেগুলোর মতোই একটি কণা। অন্যদিকে, আমরা যে এখানে আছি, তার পেছনেও নিউট্রিনোর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। তবে এখন নিউট্রিনোর কথা ভুলে গেলেও চলবে!
এখন পর্যন্ত মাত্র একজন রোগী অপটোজেনেটিকস থেকে সরাসরি উপকৃত হয়েছেন—গেওর্গ নাগেল, চিকিৎসাবিজ্ঞানে নোবেলজয়ী