বিশ্বমানের মেট্রোরেল, কিন্তু আমাদের নাগরিক আচরণ কি বিশ্বমানের?

· Prothom Alo

আমাদের বিশ্বমানের মেট্রোরেল আছে, আধুনিক যোগাযোগব্যবস্থা গড়ে উঠছে, নগরজীবনে যুক্ত হচ্ছে নতুন নতুন সুযোগ-সুবিধা। উন্নয়নের এই অগ্রযাত্রা নিঃসন্দেহে আশাব্যঞ্জক। কিন্তু একটি প্রশ্ন বারবার মনে জাগে—আমরা কি সেই উন্নত ব্যবস্থার উপযুক্ত নাগরিক হয়ে উঠতে পেরেছি? মেট্রোরেলের মতো আধুনিক গণপরিবহন ব্যবহার করতে শিখেছি ঠিকই, কিন্তু এর সুষ্ঠু ব্যবহার নিশ্চিত করার মতো ন্যূনতম নাগরিক শিষ্টাচার কি আমরা অর্জন করতে পেরেছি?

Visit arroznegro.club for more information.

খুব বেশি দেশ না হলেও বেশ কয়েকটি দেশ ভ্রমণের সুযোগ আমার হয়েছে। সেসব দেশের অভিজ্ঞতা থেকে দেখেছি, উন্নত দেশগুলোতে মেট্রোরেল কেবল এক স্থান থেকে অন্য স্থানে যাওয়ার বাহন নয়; এটি মানুষের শৃঙ্খলা বোধ, দায়িত্বশীলতা, পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও সামাজিক মূল্যবোধেরও একটি পরিচায়ক। সেখানে নিয়ম মেনে চলা, অন্যের সুবিধা-অসুবিধার প্রতি মনোযোগী হওয়া এবং গণপরিসরে নিজের আচরণ সম্পর্কে সচেতন থাকার বিষয়গুলো বিশেষভাবে লক্ষণীয়।

আমাদের দেশে মেট্রোরেল তুলনামূলক নতুন সংযোজন হলেও বিশ্বের অনেক দেশে বহু দশক আগেই এর ব্যবহার শুরু হয়েছে। দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতায় সেসব দেশের মানুষ গণপরিবহন ব্যবহারের নিয়মকানুন ও শিষ্টাচারকে নিজেদের দৈনন্দিন জীবনের অংশ করে নিয়েছেন। অবশ্য সব দেশের সব মানুষই যে নিয়ম মেনে চলেন, তা নয়। কিন্তু নিয়ম মানার সামাজিক সংস্কৃতি গড়ে তোলার ক্ষেত্রে তাদের অনেকের কাছ থেকেই আমাদের শেখার আছে।

দুঃখজনক বিষয় হলো, আমরা আধুনিক অবকাঠামো নির্মাণে এগিয়ে গেলেও আমাদের একাংশের মনমানসিকতা, আচরণ ও সামাজিক দায়িত্ব বোধে প্রত্যাশিত পরিবর্তন আনতে পারিনি।

সংরক্ষিত আসন: অধিকার নয়, মানবিকতারও পরীক্ষা—

মেট্রোরেলে বয়স্ক ব্যক্তি, প্রতিবন্ধী ব্যক্তি, গর্ভবতী নারী এবং যাঁদের চলাচলে বিশেষ অসুবিধা হয়, তাঁদের জন্য অগ্রাধিকারমূলক বা সংরক্ষিত আসনের ব্যবস্থা রাখা হয়। এই ব্যবস্থার উদ্দেশ্য অত্যন্ত মানবিক—যাঁদের বসার প্রয়োজন বেশি, তাঁরা যেন প্রয়োজনীয় সুবিধাটুকু পান।

কিন্তু আমাদের মেট্রোরেলে প্রায়ই এমন দৃশ্য চোখে পড়ে, যা সত্যিই বিব্রতকর। যাঁদের জন্য আসন সংরক্ষিত, তাঁদের অনেক সময় দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা যায়; অথচ সেই আসনগুলোতে বসে থাকেন এমন কিছু সুস্থ-সবল যাত্রী, যাঁদের পক্ষে অনায়াসেই অন্য কোথাও দাঁড়িয়ে থাকা সম্ভব।

সবচেয়ে হতাশাজনক বিষয় হলো, কোনো বয়স্ক ব্যক্তি, প্রতিবন্ধী ব্যক্তি কিংবা চলাচলে অসুবিধা হচ্ছে, এমন কোনো নারী সামনে দাঁড়িয়ে থাকলেও কেউ কেউ নির্বিকার থাকেন। কেউ অন্যদিকে মুখ ফিরিয়ে নেন, কেউ মুঠোফোনে ব্যস্ত হয়ে পড়েন, আবার কেউ এমনভাবে বসে থাকেন যেন সামনে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষটির প্রতি তাঁর কোনো দায়বদ্ধতাই নেই।

প্রশ্ন হচ্ছে, একজন মানুষের সামনে দাঁড়িয়ে থাকা অসহায় বা শারীরিকভাবে অসুবিধাগ্রস্ত ব্যক্তিকে দেখেও কীভাবে তাঁর বিবেক নীরব থাকে? একটি আসন ছেড়ে দেওয়া হয়তো কয়েক সেকেন্ডের ব্যাপার, কিন্তু সেই ছোট্ট কাজটিই অন্য একজন মানুষের জন্য অনেক বড় স্বস্তির কারণ হতে পারে।

এখানে বিষয়টি শুধু নিয়ম মানার নয়; এটি মানবিকতা, সহমর্মিতা ও বিবেকেরও প্রশ্ন। সংরক্ষিত আসনে বসে থাকা ব্যক্তির যদি সত্যিই বিশেষ কোনো প্রয়োজন থাকে, সেটি ভিন্ন বিষয়। কিন্তু কোনো প্রয়োজন না থাকা সত্ত্বেও অন্যের অধিকারের প্রতি উদাসীন থাকা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।

অবকাঠামোগত উন্নয়ন হচ্ছে, বদলাচ্ছে না আমাদের মানসিকতা—শৃঙ্খলা বোধ ও নাগরিক দায়িত্ব বোধের এই ঘাটতি আর কত দিন?

গণপরিবহন কি শুধু নিজের সুবিধা আদায়ের জায়গা?

মেট্রোরেলসহ যেকোনো গণপরিবহন একটি যৌথ পরিসর। এখানে প্রত্যেক যাত্রীর সমান মর্যাদা রয়েছে, কিন্তু সবার প্রয়োজন সমান নয়। কারও শারীরিক সীমাবদ্ধতা আছে, কারও বয়স বেশি, কেউ অসুস্থ, আবার কেউ সাময়িকভাবে দুর্বল বা ক্লান্ত। তাই গণপরিবহন ব্যবহারের ক্ষেত্রে নিজের সুবিধার পাশাপাশি অন্যের প্রয়োজন বিবেচনা করাও জরুরি।

কিন্তু আমাদের মধ্যে এমন একটি প্রবণতা লক্ষ করা যায়, যেখানে নিজের সুবিধাটুকু নিশ্চিত করতে পারলেই যেন দায়িত্ব শেষ। অন্য কেউ কষ্ট পাচ্ছেন কি না, তাঁর অধিকার ক্ষুণ্ন হচ্ছে কি না, কিংবা তাঁর জন্য সামান্য কিছু করা সম্ভব কি না—এসব ভাবার অবকাশ অনেকেরই নেই।

মনে রাখতে হবে, সভ্যতার পরিচয় শুধু আমরা কত দ্রুত গন্তব্যে পৌঁছাতে পারি, তা দিয়ে নির্ধারিত হয় না; বরং যাত্রাপথে অন্য মানুষের প্রতি কতটা দায়িত্বশীল আচরণ করি, সেটিও সভ্যতার গুরুত্বপূর্ণ মাপকাঠি।

বিশৃঙ্খলাকে আমরা যেন অলংকার হিসেবে পরিধান করেছি!

এ তো গেল মেট্রোরেলের কথা। বাস্তবে আমাদের দৈনন্দিন জীবনের আরও অনেক ক্ষেত্রেই একই ধরনের চিত্র দেখা যায়। সড়কে চলাচল, যানবাহনে ওঠানামা, ফুটপাত ব্যবহার, সারিতে দাঁড়ানো, সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে সেবা গ্রহণ কিংবা কোনো সামাজিক অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ—প্রায় সর্বত্রই শৃঙ্খলা বোধের ঘাটতি চোখে পড়ে।

সারিতে দাঁড়ানোর পরিবর্তে আগে যাওয়ার চেষ্টা, সামান্য সুবিধার জন্য অন্যকে ঠেলে সামনে এগিয়ে যাওয়া, যেখানে-সেখানে ময়লা ফেলা, উচ্চ স্বরে কথা বলে অন্যের বিরক্তির কারণ হওয়া কিংবা নিয়ম ভঙ্গ করেও নিজের আচরণকে স্বাভাবিক বলে মনে করা—এসব প্রবণতা আমাদের সামাজিক জীবনে নতুন নয়।

সবাই এমন আচরণ করেন, বিষয়টি অবশ্যই তা নয়। আমাদের সমাজে দায়িত্বশীল, মানবিক ও সচেতন মানুষেরও অভাব নেই। কিন্তু নিয়ম ভাঙার প্রবণতা যখন বারবার চোখে পড়ে এবং অন্যায় আচরণের জন্য মানুষ যখন সামাজিকভাবে বিব্রত বোধ করেন না, তখন বুঝতে হবে সমস্যাটি কেবল ব্যক্তিবিশেষের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই; এর সঙ্গে আমাদের সামাজিক মূল্যবোধ ও অভ্যাসেরও সম্পর্ক রয়েছে।

কথাটা কঠিন হলেও সত্য—কখনো কখনো মনে হয়, বিশৃঙ্খলাকে আমরা যেন অলংকার হিসেবে পরিধান করেছি। নিয়ম মানাকে দুর্বলতা আর নিয়ম ভেঙে নিজের সুবিধা আদায় করাকে বুদ্ধিমত্তা বলে ভাবতে শিখেছি। অথচ প্রকৃত বুদ্ধিমত্তা হলো এমনভাবে নিজের কাজ সম্পন্ন করা, যাতে অন্যের অধিকার ও সুবিধা ক্ষুণ্ন না হয়।

উন্নয়ন শুধু অবকাঠামোয় নয়, মানুষের মননেও প্রয়োজন—

একটি দেশের উন্নয়নকে শুধু সেতু, সড়ক, উড়ালসড়ক, মেট্রোরেল কিংবা সুউচ্চ ভবন দিয়ে পরিমাপ করা যায় না। এসব অবকাঠামো উন্নয়নের দৃশ্যমান প্রতীক। কিন্তু একটি দেশের প্রকৃত অগ্রগতির সঙ্গে নাগরিকদের মূল্যবোধ, দায়িত্বশীলতা, সহনশীলতা, আইন মানার প্রবণতা এবং অন্যের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ গভীরভাবে সম্পর্কিত।

আমরা যদি আধুনিক পরিবহনব্যবস্থা নির্মাণ করি, অথচ সেখানে অন্যের অধিকারের প্রতি শ্রদ্ধা দেখাতে না শিখি, তাহলে উন্নয়নের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক অপূর্ণ থেকে যায়। প্রযুক্তি আমাদের জীবনকে সহজ করতে পারে, কিন্তু প্রযুক্তির সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করার জন্য প্রয়োজন সচেতন ও দায়িত্বশীল মানুষ।

এ কারণে নাগরিক শিষ্টাচার শেখানোর কাজটি শুধু পরিবার কিংবা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ওপর ছেড়ে দিলে চলবে না। পরিবারে শিশুদের ছোটবেলা থেকেই অন্যকে সম্মান করা, দুর্বল মানুষের পাশে দাঁড়ানো, নিয়ম মেনে চলা এবং নিজের অধিকার চর্চার পাশাপাশি অন্যের অধিকারকে স্বীকৃতি দেওয়ার শিক্ষা দিতে হবে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নাগরিক দায়িত্ব বোধকে গুরুত্ব দিতে হবে। গণপরিবহন কর্তৃপক্ষকেও নিয়মিত প্রচার, দৃশ্যমান নির্দেশনা এবং প্রয়োজন অনুযায়ী কার্যকর তদারকির ব্যবস্থা করতে হবে।

একই সঙ্গে আমাদের প্রত্যেকের নিজের আচরণ নিয়েও প্রশ্ন তোলা প্রয়োজন। আমি কি নিয়ম মেনে চলছি? আমার আচরণে অন্য কেউ সমস্যায় পড়ছেন কি না? আমার সামান্য অসচেতনতা কি অন্য কারও কষ্টের কারণ হচ্ছে? এমন আত্মজিজ্ঞাসাই পরিবর্তনের প্রথম ধাপ হতে পারে।

পরিবর্তন শুরু হোক নিজের কাছ থেকে—

আমরা প্রায়ই দেশের সমস্যা নিয়ে কথা বলি, অন্যের ভুল তুলে ধরি এবং সমাজের পরিবর্তন প্রত্যাশা করি। কিন্তু পরিবর্তনের দায়িত্বটি নিজের ওপর নিতে কতটা প্রস্তুত? অন্যকে নিয়ম মানতে বলার আগে নিজে নিয়ম মানছি কি না, অন্যের কাছ থেকে মানবিক আচরণ প্রত্যাশা করার আগে নিজে সেই আচরণ করছি কি না—এসব প্রশ্নের উত্তরও আমাদের খুঁজতে হবে।

মেট্রোরেলে সংরক্ষিত আসনে বসার প্রয়োজন না থাকলে যাঁর প্রয়োজন বেশি, তাঁকে আসন ছেড়ে দেওয়া; সারিতে দাঁড়ানো; ওঠানামার সময় অন্যকে সুযোগ দেওয়া; ময়লা নির্দিষ্ট স্থানে ফেলা; অপ্রয়োজনে অন্যকে বিরক্ত না করা এবং গণপরিসরের নিয়ম মেনে চলা—এসব কোনো অসাধ্য কাজ নয়। প্রয়োজন শুধু সদিচ্ছা, সচেতনতা ও দায়িত্ববোধের।

আমাদের মনে রাখতে হবে, নাগরিক শিষ্টাচার কোনো বিলাসিতা নয়; এটি একটি সুস্থ ও সভ্য সমাজের মৌলিক উপাদান। নিয়ম মানতে পুলিশ বা কর্তৃপক্ষের উপস্থিতি সব সময় প্রয়োজন হবে কেন? মানুষের নিজের বিবেক, মূল্যবোধ ও সামাজিক দায়িত্ববোধই তো তাঁকে সঠিক পথে পরিচালিত করার কথা।

পরিশেষে বলতে চাই, বিশ্বমানের মেট্রোরেল নির্মাণ আমাদের সক্ষমতার পরিচয়, কিন্তু সেই মেট্রোরেলে দায়িত্বশীল যাত্রী হয়ে ওঠা আমাদের মানসিকতা ও নাগরিক সংস্কৃতির পরিচয়। অবকাঠামোগত উন্নয়নের পাশাপাশি যদি আমাদের চিন্তা, আচরণ ও মূল্যবোধের উন্নয়ন ঘটাতে না পারি, তাহলে উন্নয়নের পূর্ণ সুফল অর্জন করা সম্ভব হবে না।

আমরা শুধু উন্নত দেশের মতো অবকাঠামো চাই না; আমরা এমন নাগরিকও হতে চাই, যাঁরা নিয়ম মানবেন, অন্যের অধিকারকে সম্মান করবেন এবং মানবিক আচরণের মাধ্যমে নিজেদের দেশকে মর্যাদার আসনে প্রতিষ্ঠিত করবেন।

পরিবর্তনটা শুরু হোক আজ থেকেই—অন্যের কাছ থেকে নয়, নিজের কাছ থেকে।

*লেখক: মো. কাওছার আলম চৌধুরী, কবি, লেখক

Read full story at source