মধ্যবর্তী নির্বাচনে হেরে গেলেও কি ট্রাম্পের তাণ্ডব থামবে

· Prothom Alo

একজন মার্কিন প্রেসিডেন্টের মেয়াদের শেষ দুই বছরে যখন কংগ্রেসে সংখ্যাগরিষ্ঠতা হারিয়ে যায়, জনপ্রিয়তার পারদ তলানিতে গিয়ে ঠেকে এবং নিজ দল পরবর্তী উত্তরসূরি নিয়ে ভাবতে শুরু করে, তখন ওভাল অফিসের অধিপতির ক্ষমতা যেন ধীরে ধীরে বিলীন হতে থাকে। বিশেষ করে দ্বিদলীয় সহযোগিতার ছিটেফোঁটাও না থাকা এই যুগে অভ্যন্তরীণ আইন প্রণয়নের কাজ সম্পূর্ণ স্থবির হয়ে পড়ে।

Visit een-wit.pl for more information.

তবে মেয়াদ শেষ হওয়ার দিনগুলো যত ঘনিয়ে আসে এবং প্রেসিডেন্টরা নিজেদের রাজনৈতিক ঐতিহ্যের কথা চিন্তা করতে থাকেন, তখন তাঁদের সামনে একটা জায়গাই বাকি থাকে—বাকি বিশ্বের ওপর প্রভাব খাটানো।

১৯৯২ সালে নিজ মেয়াদের শেষ সপ্তাহে প্রেসিডেন্ট জর্জ এইচ ডব্লিউ বুশ দুর্ভিক্ষ দূর করার লক্ষ্যে সোমালিয়ায় ২৮ হাজার মার্কিন সেনা পাঠিয়েছিলেন। বিল ক্লিনটনের ক্ষেত্রে তা ছিল ইসরায়েল-ফিলিস্তিন সংঘাত অবসানের মাধ্যমে মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি ফিরিয়ে আনার একটি একনিষ্ঠ কিন্তু ব্যর্থ প্রচেষ্টা।

অন্যদিকে বারাক ওবামা কিউবার সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক পুনঃপ্রতিষ্ঠা করে হাভানা সফর করেছিলেন, যার মাধ্যমে রচিত হয় এক ঐতিহাসিক অধ্যায়। পাশাপাশি তিনি মেয়াদের শেষ লগ্নে ইরানের সঙ্গে পারমাণবিক চুক্তি সফলভাবে সম্পন্ন করতে জোর তাগিদ দিয়েছিলেন।

যুক্তরাষ্ট্রে মধ্যবর্তী নির্বাচনে বামমুখী হাওয়াট্রাম্প কি মধ্যবর্তী নির্বাচনের ফল মানবেন

আর মাত্র ১০ দিনের মধ্যে ডোনাল্ড ট্রাম্প তাঁর মেয়াদের এমন এক পড়ন্ত বিকেলে বা গোধূলিলগ্নে প্রবেশ করতে যাচ্ছেন। হাউস অব রিপ্রেজেন্টেটিভসের নিয়ন্ত্রণ হারানো তাঁর প্রায় নিশ্চিত, এমনকি ডেমোক্রেটিক সিনেটের মুখোমুখি হওয়াও তাঁর জন্য অসম্ভব কিছু নয়।

অভ্যন্তরীণ নীতি পাসের যেকোনো আশা একেবারেই মিলিয়ে যাবে। এর বদলে তাঁকে মুখোমুখি হতে হবে বেশ কিছু তদন্তের, যা তাঁকে আবারও অভিশংসনের মুখে দাঁড় করিয়ে দিতে পারে।

তবে বিশ্বমঞ্চের দৃশ্যপট সম্পূর্ণ ভিন্ন। আর বুশ সিনিয়র, ক্লিনটন বা ওবামার মতো ট্রাম্পের উদ্দেশ্যগুলো কিন্তু মোটেও শান্তিপূর্ণ নয়। তাঁর দ্বিতীয় মেয়াদের প্রথম দুই বছর যতটা বিপর্যয়কর ছিল, শেষের দুই বছর হতে পারে তার চেয়েও ভয়াবহ।

মধ্যবর্তী নির্বাচন শেষ হলেই যুক্তরাষ্ট্র ইরানের বিরুদ্ধে এক অন্তহীন যুদ্ধ নতুন করে শুরু করার পরিকল্পনা করছে বলে জানা গেছে। এরই মধ্যে ইসরায়েলি সামরিক বাহিনীর সঙ্গে যৌথ মহড়া পরিচালনা করা হচ্ছে এবং অঞ্চলটি থেকে মার্কিন কূটনীতিকদের সরিয়ে নেওয়া হচ্ছে।

এমন একটি নজিরবিহীন সম্মেলন যদি সত্যি বাস্তবায়িত হয়, তবে বাকি বিশ্বের জন্য এর পরিণতি হতে পারে ভয়াবহ। এই তিন নেতারই মূল লক্ষ্য বিশ্বের পরিচালনাব্যবস্থাকে বদলে দেওয়া, মূলত সমগ্র বিশ্বকে নিজ নিজ প্রভাববলয়ে বিভক্ত করে ফেলা।

অপর দিকে ইউক্রেনকে রাশিয়ার হাতে বিকিয়ে দেওয়ার প্রক্রিয়াও পুরোদমে চলছে। গত সপ্তাহেই ট্রাম্প যুক্তি দিয়েছেন, ‘রাশিয়া সত্যি বলতে ইউক্রেন ইস্যুতে ঠিকই আছে।’

মধ্যপ্রাচ্যে এক দায়িত্বজ্ঞানহীন যুদ্ধ এবং ইউরোপে তোষণনীতির পাশাপাশি মাথা চাড়া দিয়ে উঠছে এক নতুন বিশ্বব্যবস্থা, যা ট্রাম্প তাঁর মেয়াদের শেষ বছরগুলোতে নির্মমভাবে ত্বরান্বিত করবেন। পুতিন তিনি নিজে, ট্রাম্প ও চীনের সি চিন পিংয়ের মধ্যে একটি শীর্ষ সম্মেলনের প্রস্তাব করেছেন, যা আগামী মাসে চীনে অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা।

এমন একটি নজিরবিহীন সম্মেলন যদি সত্যি বাস্তবায়িত হয়, তবে বাকি বিশ্বের জন্য এর পরিণতি হতে পারে ভয়াবহ। এই তিন নেতারই মূল লক্ষ্য বিশ্বের পরিচালনাব্যবস্থাকে বদলে দেওয়া, মূলত সমগ্র বিশ্বকে নিজ নিজ প্রভাববলয়ে বিভক্ত করে ফেলা। একটি মাত্র শীর্ষ সম্মেলন একটি ধারণাকে হয়তো রাতারাতি বাস্তবে রূপ দেবে না, তবে এটি আমাদের এক অত্যন্ত বিপজ্জনক পথের দিকে ঠেলে দেবে।

দুই বছর ধরে আমরা পশ্চিমা বিশ্বের পতন নিয়ে অনেক আলোচনা করেছি, আর এ মুহূর্ত যেন সেই সব ভয়কেই বাস্তবে রূপ দেওয়ার মতো এক সন্ধিক্ষণ।

রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন ও মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প

বিশ্বকে প্রভাববলয়ে বিভক্ত করা এবং স্বৈরশাসকদের পক্ষে অবস্থান নেওয়ার ক্ষেত্রে ট্রাম্প প্রশাসনের যে প্রচ্ছন্ন আকাঙ্ক্ষা ছিল, তা বহু আগে থেকেই স্পষ্ট। গত বছরের জাতীয় নিরাপত্তা কৌশলে ইউরোপ ও পূর্ব এশিয়ার মার্কিন ঐতিহ্যবাহী মিত্রদের চরম সমালোচনা করা হয়েছিল।

তবে সবচেয়ে চমকপ্রদ বিষয় ছিল, দলিলটিতে যা লেখা হয়নি তা। সেখানে রাশিয়া ও চীন দুই দেশই সরাসরি সমালোচনা থেকে রক্ষা পেয়েছিল।

তাইওয়ানের প্রতি হুমকি বর্ণনা করে লেখা ছয়টি অনুচ্ছেদের একটিতেও চীনের নাম পর্যন্ত উল্লেখ করা হয়নি। উল্টো নথির অন্যত্র চীনের প্রশংসা করে বলা হয়েছে।

ইউক্রেনে রাশিয়ার যুদ্ধের অংশে এটি কীভাবে শুরু হয়েছিল, তার কোনো উল্লেখ ছিল না, কিংবা পুতিনকে পরাজিত করা উচিত বলেও কোনো প্রস্তাব দেওয়া হয়নি; বরং যুক্তরাষ্ট্র কীভাবে ইউরোপ ও রাশিয়ার মধ্যকার সম্পর্ক পুনর্গঠনে সহায়তা করতে পারে, সেদিকেই নজর দেওয়া হয়েছিল।

পুতিনের জন্য এটি প্রায় তিন দশকের দীর্ঘ এক প্রচেষ্টার সাফল্য। পূর্ব ইউরোপ ও মধ্য এশিয়ায় গণতন্ত্রের প্রতি মার্কিন সমর্থনকে তিনি দীর্ঘদিন ধরে রাশিয়ার পেছনে যুক্তরাষ্ট্রের ‘অনধিকার চর্চা’ হিসেবে দেখে এসেছেন।

আর এখন তিনি এমন এক মার্কিন প্রেসিডেন্টকে পেয়েছেন, যিনি তাঁর এই মতের সঙ্গে একমত। ট্রাম্প আবার পুতিনকে রাশিয়ার অর্থনীতি বা প্রযুক্তিগত সক্ষমতার তুলনায় অনেক বেশি উঁচু আসনে বসিয়েছেন।

আমেরিকার মধ্যবর্তী নির্বাচনে নতুন লড়াই

সি চিন পিংও পূর্ব এশিয়া থেকে যুক্তরাষ্ট্রের এই বাগাড়ম্বরপূর্ণ পিছু হটে যাওয়াকে স্বাগত জানিয়েছেন, বিশেষ করে যদি এটি চীনকে পূর্ব চীন সাগর ও দক্ষিণ চীন সাগরে বৃহত্তর সামুদ্রিক নিয়ন্ত্রণের সুযোগ করে দেয়। যুক্তরাষ্ট্রের ভাবমূর্তি যখন নিচের দিকে নামছে, তখন চীনের প্রতি বিশ্বজনমত নাটকীয়ভাবে উন্নত হয়েছে।

এখানে বিষয়টি কেবল ভূখণ্ড নিয়ন্ত্রণের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। তিনটি সরকারই নিজেদের অর্থনৈতিক সম্পর্ক বৃদ্ধির সম্ভাবনা দেখছে। যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের জন্য সবচেয়ে বড় বিষয় হলো ভবিষ্যতের অর্থনৈতিক সাপ্লাই চেইন এবং প্রযুক্তি প্ল্যাটফর্মগুলোর নিয়ন্ত্রণ নিজেদের কবজায় রাখা, আর রাশিয়ার জীবাশ্ম জ্বালানি সম্পদও এখানে একটি বড় অনুঘটক।

বাণিজ্যিক ও সামরিক উভয় দিক থেকেই পরবর্তী ‘মহাকাশ দৌড়ে’ এই তিন দেশই মূল খেলোয়াড়। ইউরোপ ও বিশ্বের বাকি অংশকে কাঁচকলা দেখিয়ে এই তিন দেশ যদি একসঙ্গে কাজ করা শুরু করে, তবে তা ভূরাজনীতি ও ভূ–অর্থনীতির মৌলিক রূপটাই বদলে দেবে।

ট্রাম্প যেভাবে ইউক্রেন যুদ্ধে রাশিয়াকে সহায়তা দিচ্ছেনট্রাম্প-সি বৈঠক শেষে কোন দেশ কী পেল

এখন পর্যন্ত পশ্চিমা বিশ্বের বাকি দেশগুলো মোটের ওপর পরিস্থিতির সঙ্গে কোনোমতে মানিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করে এসেছে। খাতা-কলমে ন্যাটো এখনো টিকে আছে; জি-৭ এবং জি-২০ সম্মেলনগুলো বিশৃঙ্খল হলেও নিয়মিত অনুষ্ঠিত হচ্ছে।

ব্রিটিশ পররাষ্ট্র দপ্তরের আশাবাদীরা মনে করিয়ে দিচ্ছেন যে ট্রাম্প জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে যোগ দিয়েছিলেন এবং তাঁর প্রশাসন এখনো জাতিসংঘের দৈনন্দিন কর্মকাণ্ডে গভীরভাবে যুক্ত।

মার্কিন অর্থনীতিবিদ মার্ক কার্নি বিশ্বব্যবস্থার এক ‘মহাবিপর্যয়ের’ কথা বলেছেন এবং সতর্ক করেছেন যে স্নায়ুযুদ্ধ-পরবর্তী পুরোনো বিশ্ব আর ফিরে আসবে না। অন্যদিকে এমানুয়েল মাখোঁর উষ্ণ বার্তা এবং মার্কিন সাহায্য ছাড়াই ইউরোপ কীভাবে নিজেকে রক্ষা করতে পারে, তা নিয়ে নতুন আলোচনা তৈরি হলেও সবার মনে এখনো একটাই ভাব—সবাই কেবল ট্রাম্পের মেয়াদ শেষ হওয়ার অপেক্ষায় প্রহর গুনছে। তবে শক্তিধর দেশগুলোর এমন এক শীর্ষ সম্মেলন সেই বাস্তবতাকে আর উপেক্ষা করার সুযোগ দেবে না।

হোয়াইট হাউসে ভাষণ দেওয়ার আগে সি চিন পিং ও ডোনাল্ড ট্রাম্প

মার্কিন প্রেসিডেন্টরা তাঁদের মেয়াদের শেষ মাসগুলোতে বৈদেশিক নীতিতে সাফল্য খুঁজলেও ইতিহাস বলে যে তাঁরা তা খুব কমই পান। এহুদ বারাক ও ইয়াসির আরাফাত কোনো চুক্তিতে পৌঁছাতে ব্যর্থ হওয়ার পর ক্লিনটনের ক্যাম্প ডেভিড আলোচনা ভেস্তে যায়।

বুশ হয়তো দাবি করতে পারেন যে সোমালিয়ায় তাঁর প্রাথমিক হস্তক্ষেপ দুর্ভিক্ষ লাঘব করেছিল, কিন্তু শেষ পর্যন্ত তা চরম অপমানে গিয়ে ঠেকেছিল। কিউবা ও ইরানে ওবামার কূটনৈতিক সাফল্য পেলেও ডোনাল্ড ট্রাম্প ক্ষমতায় এসে তার দুটিই নিমেষে বাতিল করে দেন।

ট্রাম্পের পররাষ্ট্রনীতি তাঁর নিজের ‘মাগা’ আন্দোলনকেই বিভক্ত করেছে এবং প্রথাগত রক্ষণশীলদের স্তম্ভিত করেছে। ভাইস প্রেসিডেন্ট ভ্যান্স বা রুবিওর মতো ব্যক্তিত্বরা হয়তো স্বৈরশাসকদের সঙ্গে আপস করতে অতটা ইচ্ছুক হবেন না।

তবে ট্রাম্প জয়ী হবেন না বলেই যে আমেরিকা হেরে যাবে না, তা কিন্তু নয়। তিনি তাঁর মেয়াদের সবচেয়ে দুর্বল মুহূর্তে শেনঝেনে পৌঁছাবেন। একজন ৮০ বছর বয়সী ‘খোঁড়া হাঁস’ নেতা, যাঁর কোনো আইন পাস করার ক্ষমতা নেই এবং যিনি তাঁর কথিত দুর্নীতির বিরুদ্ধে অন্তত দুই বছরের বিশৃঙ্খল তদন্তের মুখে কোণঠাসা হয়ে কোনোমতে শেষ রেখা অতিক্রম করার প্রহর গুনছেন।

ট্রাম্প ও পুতিন কেন ভুলের ফাঁদ থেকে বের হতে পারছেন নাট্রাম্প ও পুতিন দুজনই কেন ইউরোপকে ‘ধ্বংস’ করতে চান

তাঁর বিপরীতে বসে থাকবেন ১৯৭০-এর দশকের শুরুর দিকের দুজন কর্তৃত্ববাদী শাসক, যাঁরা বিশ্বাস করেন, তাঁদের আরও দুই দশক দেশ শাসন করার পথে একমাত্র বাধা হতে পারে স্বয়ং মৃত্যু।

প্রকৃতপক্ষে গত বছর দীর্ঘায়ু লাভের ওষুধ নিয়ে তাঁদের গোপন কথোপকথন শুনে তো মনে হয়, তাঁরা হয়তো বিশ্বাস করেন যে তাঁরা এর চেয়ে বেশি সময় বেঁচে থেকে রাজত্ব করতে পারবেন!

এ সম্মেলন যদি অনুষ্ঠিত হয়, তবে তা পুতিনকে একঘরে অবস্থা থেকে বিশ্বমঞ্চে ফিরিয়ে আনবে এবং সি চিন পিংয়ের অবস্থানকে এমন এক বিশ্বনেতা হিসেবে আবার প্রতিষ্ঠিত করবে, যাঁকে কোনোভাবেই উপেক্ষা করা যায় না। তিন নেতার এই একটি ফ্রেমবন্দী ছবিই মূলত সেই যুগকে সংজ্ঞায়িত করবে—যে যুগে নিয়মভিত্তিক আন্তর্জাতিক বিশ্বব্যবস্থা ছিন্নভিন্ন হয়ে গিয়েছিল।

  • স্টিভ ব্লুমফিল্ড ‘দ্য অবজারভার’-এর সাবেক আন্তর্জাতিক সম্পাদক। দ্য গার্ডিয়ান থেকে সংক্ষেপে অনূদিত।

Read full story at source