বড় পাপে ডুবে গেছেন, কীভাবে ফিরে আসবেন

· Prothom Alo

মানুষ স্বভাবতই ভুলের ঊর্ধ্বে নয়। শয়তানের প্ররোচনা, নফসের তাড়না বা পারিপার্শ্বিক পরিস্থিতির কারণে মানুষের দ্বারা বড় কোনো পাপ (কবিরা গুনাহ) হয়ে যাওয়া অস্বাভাবিক নয়।

Visit syntagm.co.za for more information.

ইসলামে বড় পাপ বলতে সেসব অপরাধকে বোঝায়, যার জন্য কোরআন ও হাদিসে কঠোর শাস্তির কথা বলা হয়েছে—যেমন শিরক, মানুষ হত্যা, ব্যভিচার, সুদ খাওয়া বা পিতা-মাতার অবাধ্য হওয়া।

বড় পাপ মানুষের অন্তরকে অন্ধকার করে দেয় এবং আল্লাহর রহমত থেকে দূরে সরিয়ে নেয়। তবে ইসলাম কখনো মানুষকে হতাশ হতে শেখায় না। পাপ যত বড়ই হোক না কেন, ফিরে আসার পথ সর্বদা খোলা।

সুরা জুমার, আয়াত: ৫৩যারা নিজেদের ওপর অবিচার করেছ, তোমরা আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হোয়ো না। নিশ্চয়ই আল্লাহ সমস্ত পাপ ক্ষমা করে দেবেন। নিশ্চয়ই তিনি পরম ক্ষমাশীল।

১. আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ না হওয়া

পাপ করার পর শয়তানের সবচেয়ে বড় চাল হলো মানুষকে হতাশ করে দেওয়া, যেন সে ভাবে—‘আমি এত বড় পাপ করেছি, আল্লাহ আমাকে আর ক্ষমা করবেন না’। ইসলামে আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হওয়াকে আলাদা একটি বড় পাপ হিসেবে ধরা হয়।

মহান আল্লাহ আশার বাণী শুনিয়ে বলেছেন, ‘বলো, হে আমার বান্দাগণ, যারা নিজেদের ওপর অবিচার করেছ, তোমরা আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হোয়ো না। নিশ্চয়ই আল্লাহ সমস্ত পাপ ক্ষমা করে দেবেন। নিশ্চয়ই তিনি পরম ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।’ (সুরা জুমার, আয়াত: ৫৩)

পাপ আসলে কী, পাপের ক্ষতি কী, কীভাবে বুঝব কোনটা পাপ

২. গভীর অনুশোচনা

ক্ষমা পাওয়ার প্রথম শর্ত হলো নিজের কৃতকর্মের জন্য গভীরভাবে লজ্জিত হওয়া। অপরাধবোধ বা অনুশোচনাই হলো তওবার প্রাণ।

মহানবী (সা.) সংক্ষেপে অথচ গভীরভাবে বলেছেন, ‘অনুশোচনাই হলো তওবা।’ (সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদিস: ৪২৫২)

অনুশোচনা হলো এমন এক আত্মিক দহন, যা মানুষকে তার প্রভুর সামনে বিনম্র করে দেয় এবং এই দহনই পাপের কালিমা ধুয়ে আত্মাকে পুনরায় পবিত্র করার সবচেয়ে শক্তিশালী মাধ্যম। (মোল্লা আলী কারি, মিরকাতুল মাফাতিহ শারহু মিশকাতিল মাসাবিহ, ৪/১৬১৯, দারুল ফিকর, বৈরুত, ২০০২)

বড় পাপটি যদি শুধু আল্লাহর সঙ্গে জড়িত না হয়ে কোনো মানুষের অধিকার বা সম্মানের সঙ্গে যুক্ত হয় (যেমন—কারও সম্পদ আত্মসাৎ, গিবত বা জুলুম), তবে শুধু আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাইলে হবে না।

৩. খাঁটি তওবা করা

বড় পাপ সাধারণ নেক আমলের মাধ্যমে মাফ হয় না, এর জন্য প্রয়োজন ‘তাওবাতুন নাসুহা’ বা একনিষ্ঠ তওবা। আল্লাহ নির্দেশ দিয়েছেন, ‘হে ইমানদারগণ, তোমরা আল্লাহর কাছে তওবা করো—খাঁটি তওবা।’ (সুরা তাহরিম, আয়াত: ৮)

ইমাম নববি তাঁর গ্রন্থে খাঁটি তওবার তিনটি প্রধান শর্ত উল্লেখ করেছেন—এক. তাৎক্ষণিকভাবে পাপকাজটি ছেড়ে দেওয়া, দুই. কৃতকর্মের জন্য অনুতপ্ত হওয়া এবং তিন. ভবিষ্যতে আর কখনো এই পাপ না করার দৃঢ় সংকল্প করা। (ইমাম নববি, রিয়াদুস সালিহিন, ১/১৪, দারুল ফিকর, বৈরুত, ১৯৯৫)

৪. মানুষের হক ফিরিয়ে দেওয়া

বড় পাপটি যদি শুধু আল্লাহর সঙ্গে জড়িত না হয়ে কোনো মানুষের অধিকার বা সম্মানের সঙ্গে যুক্ত হয় (যেমন—কারও সম্পদ আত্মসাৎ, গিবত বা জুলুম), তবে শুধু আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাইলে হবে না।

মুমিন কেন পাপ করে: ইবনে আতাউল্লাহর বিস্ময়কর দর্শন

ইমাম নববির উল্লিখিত তওবার শর্তের চতুর্থটি হলো, যার হক নষ্ট করা হয়েছে, তার পাওনা বুঝিয়ে দেওয়া অথবা তার কাছ থেকে ক্ষমা চেয়ে নেওয়া।

মহানবী (সা.) সতর্ক করে বলেছেন, ‘যার কাছে তার ভাইয়ের কোনো পাওনা থাকে—তা সম্মানের হোক বা অন্য কোনো কিছুর, সে যেন আজই (দুনিয়াতে) তা মিটিয়ে নেয়, সেই দিন আসার আগে, যেদিন কোনো দিনার বা দিরহাম (বিনিময় মুদ্রা) থাকবে না।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ২৪৪৯)

৫. পাপ গোপন রাখা

ভুলবশত কোনো পাপ হয়ে গেলে তা গর্ব করে বা আড্ডার ছলে অন্যের কাছে প্রকাশ করা ইসলামে কঠোরভাবে নিষিদ্ধ। নিজের পাপ গোপন রেখে একান্তে আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাওয়াই মুমিনের বৈশিষ্ট্য। 

মহানবী (সা.) বলেছেন, ‘আমার সব উম্মতকে ক্ষমা করা হবে, তবে দোষ প্রকাশকারী ছাড়া।’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ২৯৯০)

কেউ নিজের পাপ গোপন রাখলে আল্লাহ পরকালেও তা গোপন রাখবেন এবং ক্ষমা করবেন; কিন্তু কেউ তা মানুষের কাছে প্রকাশ করলে সে মূলত আল্লাহর দেওয়া পর্দা ছিঁড়ে ফেলে এবং ক্ষমার অধিকার হারায়। (আল-আসকালানি, ফাতহুল বারি শারহু সহিহিল বুখারি, ১০/৪৮৬, দারুল মাআরিফ, বৈরুত, ১৩৭৯ হিজরি)

বড় পাপ করে ফেলা মানুষের দুর্বলতা, কিন্তু পাপের ওপর অটল থাকা শয়তানের বৈশিষ্ট্য। খাঁটি তওবার মাধ্যমে শুধু পাপই মাফ হয় না, বরং দয়াময় আল্লাহ চাইলে সেই পাপগুলোকে নেকি দিয়ে পরিবর্তন করে দিতে পারেন।

৬. বেশি বেশি পুণ্যের কাজ করা

তওবা করার পর বেশি বেশি সৎ কাজ করলে তা অতীতের পাপগুলো মুছে দেয়। আল্লাহ কোরআনে বলেছেন, ‘নিশ্চয়ই পুণ্য কাজ পাপকে দূর করে দেয়।’ (সুরা হুদ, আয়াত: ১১৪)

সাহাবি মুয়াজকে মহানবী (সা.) উপদেশ দিয়ে বলেছিলেন, ‘যেখানেই থাকো আল্লাহকে ভয় করো, আর কোনো মন্দ কাজ হয়ে গেলে তার পরপরই একটি ভালো কাজ করো, যা ওই মন্দকে মুছে দেবে।’ (সুনানে তিরমিজি, হাদিস: ১৯৮৭)

বড় পাপ করে ফেলা মানুষের দুর্বলতা, কিন্তু পাপের ওপর অটল থাকা শয়তানের বৈশিষ্ট্য। খাঁটি তওবার মাধ্যমে শুধু পাপই মাফ হয় না, বরং দয়াময় আল্লাহ চাইলে সেই পাপগুলোকে নেকি দিয়ে পরিবর্তন করে দিতে পারেন।

তাই মৃত্যুযন্ত্রণা শুরু হওয়ার আগেই প্রভুর দরবারে মাথা নত করে ফিরে আসাই বুদ্ধিমানের কাজ।

নামাজ: গোপন পাপ থেকে মুক্তির প্রধান উপায়

Read full story at source