সফল মানুষদের শৈশবের ১০টি অভ্যাস

· Prothom Alo

বিজ্ঞানী, খেলোয়াড়, লেখক কিংবা ধনকুবের। সফল মানুষদের জীবন একেক রকম। তবে তাঁদের অনেকের শৈশবের কিছু অভ্যাস ছিল, যা পরবর্তী জীবনে এগিয়ে যেতে সাহায্য করেছে। বই পড়া, প্রশ্ন করা, নিয়মিত অনুশীলন কিংবা ব্যর্থতা থেকে শেখার মতো অভ্যাস ছোটবেলা থেকেই গড়ে তোলা যায়। সফল মানুষদের জীবনের নানা ঘটনা থেকে অনুপ্রেরণা নিয়ে জেনে নেওয়া যাক এমন ১০টি অভ্যাস।

Visit biznow.biz for more information.

কবি সৈয়দ শামসুল হক

১. প্রচুর বই পড়া

কবি সৈয়দ শামসুল হক বলেছিলেন, ‘পড়ার বাইরে আমার তিনটে উপদেশ আছে—পড়ো, পড়ো এবং পড়ো।’ বই পড়ার গুরুত্ব বোঝাতে কথাটি দারুণ। বই থেকে নতুন তথ্য জানা যায়, কল্পনাশক্তি বাড়ে, শেখা যায় নতুনভাবে চিন্তা করতে। ইলন মাস্কের শৈশবেও বই পড়ার বড় ভূমিকা ছিল। বিল গেটসও ছোটবেলা থেকে নানা বিষয়ে পড়তে পছন্দ করতেন। ওয়ারেন বাফেটের মতো সফল বিনিয়োগকারীরাও নিয়মিত পড়াশোনার গুরুত্বের কথা বলেছেন। গল্প, বিজ্ঞান, ইতিহাস কিংবা জীবনী—বিভিন্ন ধরনের বই পড়ার অভ্যাস তোমার জ্ঞানের জগৎকে বড় করে তুলতে পারে।

পদার্থবিদ আলবার্ট আইনস্টাইন

২. গভীর কৌতূহল ও প্রশ্ন করা

‘মাথায় কত প্রশ্ন আসে, দিচ্ছে না কেউ জবাব তার,

সবাই বলে মিথ্যে বাজে বকিস নে আর খবরদার।’

ছোটদের মনে প্রশ্নের শেষ নেই। আকাশ নীল কেন, পিঁপড়ারা সারি বেঁধে চলে কীভাবে, কিংবা চুম্বক লোহাকে আকর্ষণ করে কেন—এমন প্রশ্ন থেকেই শুরু হতে পারে নতুন কিছু জানার চেষ্টা। বিজ্ঞানী আলবার্ট আইনস্টাইন ছোটবেলায় বাবার দেওয়া একটি কম্পাস দেখে বিস্মিত হয়েছিলেন। কম্পাসের কাঁটা কেন নির্দিষ্ট দিকে ঘুরে যায়, সেই রহস্য তাঁকে ভাবিয়েছিল। বড় হয়ে তিনি প্রকৃতির নানা রহস্য বোঝার চেষ্টা করেছেন। কৌতূহল ধরে রাখো, প্রশ্ন করো এবং উত্তর খুঁজতে শেখো। কারণ, অনেক আবিষ্কারের শুরুই হয় একটি সাধারণ প্রশ্ন থেকে।

শিশু কথা বলছে, কিন্তু ঠিকভাবে বলছে তোলিওনেল মেসি

৩. অবিরাম ও নিবিড় অনুশীলন

‘প্র্যাকটিস মেকস আ ম্যান পারফেক্ট!’

কোনো কিছু ভালোভাবে শিখতে চাইলে নিয়মিত অনুশীলনের বিকল্প নেই। ফুটবল তারকা লিওনেল মেসি ও ক্রিস্টিয়ানো রোনালদোর মতো খেলোয়াড়দের দক্ষতার পেছনে রয়েছে বছরের পর বছর অনুশীলন। শুধু খেলাধুলা নয়, বিজ্ঞানী, সংগীতশিল্পী ও লেখকদের ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য। একটি কঠিন অঙ্ক বারবার সমাধান করা, বাদ্যযন্ত্র বাজানো কিংবা গল্প লেখার চর্চা—সবকিছুতেই সময় দিতে হয়। প্রথমবারেই ভালো না হলে হতাশ হওয়ার কিছু নেই। নিয়মিত চেষ্টা করলে নিজের উন্নতি বুঝতে পারবে।

৪. ছোট থেকেই উদ্যোগ নেওয়া

‘মর্নিং শোজ দ্য ডে!’

ছোটবেলা থেকেই কোনো কাজের দায়িত্ব নেওয়া, নতুন কিছু করার চেষ্টা কিংবা নিজের উপার্জনের পথ খোঁজা ভবিষ্যতে কাজে লাগতে পারে। বিনিয়োগকারী ও ব্যবসায়ী ওয়ারেন বাফেট ছোটবেলায় চুইংগাম বিক্রি করতেন। পরে খবরের কাগজ বিলি করেও অর্থ উপার্জন করেছেন। তাঁর জীবনের এই অভিজ্ঞতাগুলো থেকে বোঝা যায়, ছোট উদ্যোগ থেকেও শেখার অনেক কিছু আছে। নিজের কোনো ধারণা বাস্তবায়নের চেষ্টা করো। স্কুলের প্রকল্পে দায়িত্ব নাও, কোনো সমস্যার সমাধান খোঁজো কিংবা নতুন কিছু তৈরি করো। উদ্যোগ নেওয়ার অভ্যাস তোমাকে আত্মবিশ্বাসী করে তুলতে পারে।

ওয়াল্ট ডিজনির সৃষ্টি কার্টুন চরিত্র মিকি মাউস

৫. জেদ ও ব্যর্থতা থেকে শেখা

ওয়াল্ট ডিজনির একটি বিখ্যাত উক্তি হলো, ‘আমাদের সব স্বপ্নই সত্যি হতে পারে, যদি সেগুলো পূরণ করার সাহস থাকে।’

কোনো কাজে ব্যর্থ হলে অনেকে চেষ্টা ছেড়ে দেয়। কিন্তু ব্যর্থতা মানেই সব শেষ নয়। বরং কোথায় ভুল হয়েছে, তা বোঝার সুযোগও তৈরি হয়। মেসি ও রোনালদো—দুজনকেই ক্যারিয়ারের পথে নানা চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে হয়েছে। শারীরিক সমস্যা, প্রতিযোগিতা কিংবা প্রত্যাশার চাপ সামলে এগিয়ে যেতে হয়েছে তাঁদের। নিজের লক্ষ্য পূরণ করতে চাইলে ধৈর্য ধরতে হবে, ভুল থেকে শিখতে হবে এবং প্রয়োজনে নতুন কৌশলে চেষ্টা করতে হবে। শুধু জেদ করে একই কাজ বারবার করাই নয়, ভুল বুঝে নিজেকে বদলানোও জরুরি।

চিংড়ি মাছ, কাঁকড়া নয় কেন

৬. শারীরিক সক্রিয়তা

‘সুস্থ দেহে সুস্থ মন!’

শরীর সুস্থ রাখা জীবনের গুরুত্বপূর্ণ একটি অভ্যাস। নিয়মিত খেলাধুলা, হাঁটাচলা কিংবা বয়স উপযোগী ব্যায়াম শরীরকে সক্রিয় রাখতে সাহায্য করে। খেলোয়াড়দের জন্য শারীরিক অনুশীলন অপরিহার্য। তবে বিজ্ঞানী, লেখক কিংবা উদ্যোক্তা—সবার জীবনেই শরীরের যত্ন নেওয়া প্রয়োজন। দীর্ঘ সময় পড়াশোনা বা কাজ করার পাশাপাশি একটু হাঁটাহাঁটি করো, বন্ধুদের সঙ্গে খেলো এবং পর্যাপ্ত ঘুমাও। মনে রেখো, সুস্থ থাকার জন্য শরীরচর্চার পাশাপাশি বিশ্রামও দরকার।

নিজেদের আঁকা ছবি দেখাচ্ছে শিশুরা

৭. সৃজনশীল চর্চা: গান, আঁকা ও নতুন কিছু তৈরি

‘মম এক হাতে বাঁকা বাঁশের বাঁশরী!’

সৃজনশীল কাজ মানুষকে নতুনভাবে ভাবতে শেখায়। গান গাওয়া, ছবি আঁকা, গল্প লেখা, বাদ্যযন্ত্র বাজানো কিংবা নিজের হাতে কোনো কিছু তৈরি করার মধ্য দিয়ে চিন্তার নতুন পথ খুলে যেতে পারে। আলবার্ট আইনস্টাইন বেহালা বাজাতে পছন্দ করতেন। বিজ্ঞানচর্চার পাশাপাশি সংগীতের প্রতি তাঁর আগ্রহের কথাও জানা যায়। তোমারও হয়তো ছবি আঁকতে, গান গাইতে কিংবা কোনো যন্ত্র খুলে তার ভেতরের কলকবজা দেখতে ভালো লাগে। নিজের আগ্রহের কাজটি চর্চা করো। সবকিছুতেই সেরা হতে হবে না; শেখার আনন্দটাই আসল।

৮. নিজের মতো করে চিন্তা করা

দার্শনিক ফ্রান্সিস বেকনের একটি উক্তি হলো, ‘একটি বিচক্ষণ প্রশ্ন হলো প্রজ্ঞার অর্ধেক।’

অন্যের কথা শুনে সবকিছু মেনে নেওয়ার আগে নিজে ভাবতে শেখো। কোনো তথ্য শুনলে তার সত্যতা যাচাই করো, যুক্তি খোঁজো এবং ভিন্নমত শোনার চেষ্টা করো। আইনস্টাইনের মতো বিজ্ঞানীরা প্রচলিত ধারণা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন এবং প্রকৃতির নিয়ম বোঝার জন্য নতুনভাবে চিন্তা করেছেন। তবে নিজের মত ধরে রাখার অর্থ এই নয় যে অন্যের কথা শুনবে না। বরং যুক্তি দিয়ে বিচার করা, ভুল হলে তা স্বীকার করা এবং নতুন তথ্য থেকে শেখার মানসিকতাই স্বাধীন চিন্তার পরিচয়।

৯. সময়ের মূল্য বোঝা ও ধারাবাহিকতা

স্টিভ জবসের নামে প্রচলিত একটি উক্তি হলো, ‘সময় হলো মানুষের সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ।’

সময়কে কাজে লাগানোর মানে এই নয় যে প্রতিটি মুহূর্ত পড়াশোনা বা কাজ করতে হবে। খেলাধুলা, বিশ্রাম ও আনন্দেরও প্রয়োজন আছে। তবে কোনো কাজ কখন করবে, তার পরিকল্পনা থাকলে কাজ গুছিয়ে করা সহজ হয়। সফল মানুষদের অনেকেই দীর্ঘ সময় ধরে একটি বিষয়ে মনোযোগ দিয়ে কাজ করেছেন। তুমিও পড়াশোনা, খেলাধুলা ও নিজের পছন্দের কাজের জন্য আলাদা সময় রাখতে পারো। প্রতিদিন অল্প অল্প করে এগিয়ে যাওয়ার অভ্যাস গড়ে তোলো। ধারাবাহিকতা অনেক বড় লক্ষ্য পূরণের পথ সহজ করতে পারে।

‘উইমেনস মার্চ’ নামের এক নারী পদযাত্রায় বক্তব্য দিচ্ছেন গ্লোরিয়া স্টেইনেম। ওয়াশিংটন, যুক্তরাষ্ট্র। ২১ জানুয়ারি ২০১৭

১০. লক্ষ্য নিয়ে লেগে থাকা

‘যদি লক্ষ্য থাকে অটুট, বিশ্বাস হৃদয়ে,

হবেই হবেই দেখা, দেখা হবে বিজয়ে।’

লক্ষ্য মানুষকে সামনে এগিয়ে যেতে সাহায্য করে। কেউ ফুটবলার হতে চায়, কেউ বিজ্ঞানী, কেউ লেখক, আবার কেউ নতুন কিছু উদ্ভাবন করতে আগ্রহী। লেখক ও নারীবাদী চিন্তাবিদ গ্লোরিয়া স্টাইনেমের নামে প্রচলিত একটি উক্তি হলো, ‘স্বপ্ন দেখা তো আসলে একধরনের পরিকল্পনা।’ শুধু স্বপ্ন দেখলেই হবে না, তা পূরণের জন্য কাজও করতে হবে। নিজের আগ্রহ খুঁজে বের করো, ছোট ছোট লক্ষ্য ঠিক করো এবং সেগুলো পূরণের চেষ্টা করো। সময়ের সঙ্গে তোমার আগ্রহ বদলাতে পারে। নতুন কিছু শেখার সুযোগও তাই খোলা রাখো।

সফল হওয়ার কোনো একটিমাত্র সূত্র নেই। সবার জীবন, সুযোগ ও পরিস্থিতি আলাদা। তবে কৌতূহলী থাকা, নিয়মিত অনুশীলন করা, ব্যর্থতা থেকে শেখা এবং নিজের লক্ষ্যের দিকে এগিয়ে যাওয়ার অভ্যাস জীবনে কাজে লাগতে পারে। এসব অভ্যাস গড়ে তুলতে বড় কোনো পদক্ষেপের প্রয়োজন নেই। আজ থেকেই শুরু করা যায় একটি বই পড়া, একটি প্রশ্নের উত্তর খোঁজা কিংবা নতুন কোনো দক্ষতা শেখার মধ্য দিয়ে।

একঘেয়েমি ও আলসেমি কাটিয়ে ওঠার ৭টি সহজ উপায়

Read full story at source